ফুলশয্যা_সিজন(০৩) ☀পর্ব- ০২☀

0
1808

ফুলশয্যা_সিজন(০৩)
☀পর্ব- ০২☀
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

অদুরে বসে থাকা শুভর চোখ দুটিও কখন যে জলে ভিঁজে একাকার হয়ে গেছে, সে নিজেও জানে না।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে হেসে দেয় নুহা। বলতে শুরু করে আবারো। জানেন তো, আমার এসবে একদম মন খারাপ হয় না। আমার ভালোই লাগে। ওরা আমায় কটু কথা বলে আর আমি সেখান থেকে শক্তি পাই। সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি পাই। নিন্দুকের কথার আঘাতে জর্জরিত আমি প্রতিবার সম্মুখ পথে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি সঞ্চয় করি ওদের বিষমাখা কথা থেকেই। ওরা আমাকে দাবাতে চায়, কিন্তু পারে না। কারন ওরা হয়তো জানে না কালো কিংবা শ্যাম বর্ণে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। বিশ্বাস করোন গায়ের রঙ নিয়ে আমি একটুও হীনমন্যতায় ভুগি না। কারন আমার আছে অগাধ আত্মবিশ্বাস। আর সেই আত্মবিশ্বাসের জোরেই আমি সামনে এগিয়ে যাই। আমি ওদের বুঝিয়ে দিতে চাই, হেরে আমি যাইনি। হেরে গেছিস তোরা। আমি বুঝিয়ে দিতে চাই আমিও পারি।

অবাক শুভ বিস্মিত দৃষ্টিতে নুহার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে মনে ভাবছে, কি সাংঘাতিক মেয়ে! মুহূর্তে কাঁদাতে পারে আবার মুহূর্তেই হাসিয়ে দিতে পারে। ভাবতে ভাবতেই ভাবনার অতল গহ্বরে হারিয়ে যায় শুভ। ঘোর কাটে নুহার ডাকে।
‘ ঘুমিয়ে গেছেন?’

ফিরে তাকায় শুভ। ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বলে, তুমি ঘুমাবে না? রাত তো অনেক হয়েছে। মাথা নাড়িয়ে না-বোধক জবাব দেয় নুহা। তারপর প্রশ্ন করে শুভকে, কয়টা বাজে আপনার হাত ঘড়িতে? শুভ ঘড়িতে সময় দেখে জানায়, তিনটে বেজে সতেরো।

বসা থেকে লাফিয়ে উঠে নুহা। উত্তেজিত গলায় বলে, হায়! হায়! সময় যে বয়ে গেল।
পাশ থেকে প্রশ্ন করে শুভ, কিসের সময়? কিচ্ছু বলেনি নুহা। একরকম দৌঁড়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। ফিরে আসে মিনিট দুয়েক পর। চোখে মুখে ছিটা লেগে আছে। দু’হাতও পানিতে ভেঁজা। মাথা ওড়না দিয়ে ঢাকা।
প্রশ্ন করতে চাচ্ছিল শুভ, এই শীতে আপনি শরীর কেন ভিঁজিয়েছেন? কিন্তু পারেনি। কৌতূহলী শুভ পারে নি ওর কৌতূহল মেটাতে। তার আগেই নুহার প্রশ্ন, কিছুক্ষণের জন্য একটু কি বাহিরে যেতে পারবেন? আসলে আমার একটা কাজ বাকি আছে।

” Oh, sure…” বলে রুম থেকে বেরিয়ে যায় শুভ। দরজা বন্ধ করে দেয় নুহা। শূন্য বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে শুভ। মিনিট পাঁচেক অতিবাহিত হলে দরজায় কড়া নাড়ে। ‘তোমার হলো?’ প্রতিউত্তরে কোনো সাড়া আসে নি ভিতর থেকে। শুভ ভাবছে, হয়তো বা চেঞ্জ করছে নুহা। তাই আবারো বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। কেটে যায় আরো পাঁচ মিনিট। এবার মনে হয় হয়ে গেছে। শীতে জড়োসড়ো শুভ আবারো দরজায় কড়া নাড়ে, মিস নুহা! আপনার কাজ হয়েছে কি? এবারো কোন সাড়া নেই। ব্যাপার কি? আমায় বাইরে রেখে দরজা দিয়ে ঘুমিয়ে গেল না’তো…!

জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় শুভ। পর্দাটা সরিয়ে ভিতরে দৃষ্টি দিতেই একটা স্থানে চোখ আটকে যায় শুভর। বিছানায় রেখে আসা ওর গায়ের চাঁদর বিছিয়ে গভীর ধ্যানে নামাজে বসেছে নুহা। কিন্তু এখনো তো ফজরের আজানই দেয়নি। কিসের নামাজ এটা? কোন নামাজের সময় হতে পারে এটা? ভাবতে থাকে শুভ। পিছন থেকে বাচ্চা কন্ঠে ডাক আসে, শুনছেন? ঘোর কাটে শুভর। পিছনে ফিরে তাকায়। মাথা নিচু করে নুহা দাঁড়িয়ে।
প্রশ্ন করে শুভ, ওহ! হয়ে গেল তোমার? চলো রুমে যাই। নিচু স্বরে শুভর জবাব, স্যরি। অবাক হয়ে যায় শুভ। প্রশ্ন করে নুহাকে, ‘কিন্তু কেন?’
জবাব আসে, আসলে আপনার চাদরে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ব কথাটা আপনাকে আগেই জানানো দরকার ছিল।
হেসে দেয় শুভ। ও, আল্লাহ! এই কথা? আমি ভাবলাম কি না কি…! আচ্ছা, বাদ দাও।

রুমে চলে যায় শুভ। তার পিছুপিছু নুহাও রুমে ঢুকে।

সোফায় শুয়ে ওড়না দিয়ে পুরো শরীর ঢেকে নেয় নুহা। আশ্চর্য শুভ প্রশ্ন করে, এত তাড়াতাড়ি আপনার সব দুশ্চিন্তা দুর হয়ে গেল?
মাথা তুলে তাকায় নুহা। মিষ্টি হেসে বলে, বারে! আল্লাহর প্রিয় বান্দার মন খারাপ। আর সেই মন খারাপি দুর করার জন্য তার বান্দা প্রচন্ড শীতকে উপেক্ষা করে ওজু করে নামাজে দাঁড়িয়েছে। তার দরবারে কিছু চেয়েছে। আল্লাহ কি তার মন ভালো না করে দিয়ে পারে?
স্তব্ধ হয়ে যায় শুভ। প্রতি পলে পলে শুভ এক নতুন নুহাকে আবিষ্কার করছে। আর সেই নতুন নুহাকে প্রত্যেকটা নতুন রূপেই লাগছে অমায়িক সুন্দর। এক মুগ্ধতার রেশ কাটতে না কাটতেই আরো মুগ্ধতার আবেশে জড়িয়ে যাচ্ছে।

এসব নিয়ে ভাবতে গিয়ে ভাবনার অতলে হারিয়ে গিয়েছিল শুভ। ভাবনাচ্ছেদ ঘটে দরজায় করাঘাতের আওয়াজে। উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেয় শুভ। দরজার সামনে বন্ধু রাকিব দাঁড়িয়ে। এভাবে বাথরুম- বারান্দা, বারান্দা- জানালার পাশে দৌঁড়াদৌঁড়ি কেন করতেছিস? তোদের কি এ রুমে থাকতে কোন সমস্যা হচ্ছে?
‘আরে না..’ বলে মাথা ঝাকায় শুভ। লাজুক হেসে বন্ধু রাকিবের আরো একটা প্রশ্ন, কিরে কেমন কাটলো মধুরাত? মধু কেমন আহরণ করলি?
ঠাস করে থাপ্পর বসিয়ে দেয় শুভ ওর বন্ধুর গালে। গালে হাত বুলাতে বুলাতে রাকিবের জবাব- স্যরি, আমি তো ভুলে গেছিলাম তুই রক্তমাংসে তৈরি মানব নয়, তুই হইলি যন্ত্র মানব। যার কোন ফিলিংস নেই। দাঁতে দাঁত চেপে কলার ধরে টানতে টানতে শুভ ওর বন্ধুকে ওর রুমে ঢুকিয়ে তার স্ত্রীকে বলে আসে, সকালে চলে যাব। তার আগ পর্যন্ত ভাবি আপনি অমানুষটারে রুমে আটকে রাখেন। হেসে দেয় রাকিবের স্ত্রী স্বর্ণা। হা, হা দেবর মশায়! মেজাজ এত চড়া কেন? মধু আহরণে কি ব্যর্থ হয়েছেন নাকি? রাগে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে রাকিবের স্ত্রীর দিকে তাকায় শুভ। স্বর্ণা আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল। মুখ চেপে ধরে রাকিব। বইন শান্ত হো! আল্লাহর ওয়াস্তে বইন তুই মুখে তালা লাগা। না হলে যন্ত্রমানব আমাদের ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দিবে। স্বামীর মুখে বইন ডাক শুনে মুখ চেপে ধরে রাখা অবস্থায়’ই চোখ বড় বড় করে ফেলে স্বর্ণা। মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলে উঠে শুভ, পুরো তার ছিড়া দুই মানব মানবি। রুম থেকে বেরিয়ে যায় শুভ।

দরজায় সামনে গিয়ে লজ্জায় ঘরের দিকে পা বাড়াতে পারছে না শুভ। ইস! কি লজ্জার কথাটাই না বলে গেল। না জানি কি ভেবেছে মেয়েটা। প্রচন্ড লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে যায় শুভর। সেই মাথা নিচু অবস্থাতেই রুমে ঢুকে। দরজা আংশিক মিশিয়ে খাটে গিয়ে বসে। পাকনা বুড়ির ভাবমূর্তিটা এখন কেমন সেটা দেখার জন্য আড়চোখে সোফার দিকে তাকায় শুভ। থ হয়ে যায় সে। পা থেকে গলা পর্যন্ত পুরো শরীর সুন্দর করে ওড়না দিয়ে ঢেকে সোফায় ঘুমিয়ে আছে নুহা।
ঘাড়টা সোজা করে এবার ভালোভাবেই সোফার দিকে দৃষ্টি নেয় শুভ। নড়ে চড়ে উঠে নুহা। ফিরে তাকায় শুভর দিকে। ক্ষাণিকটা লজ্জায় শুভ ওর দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় অন্য দিকে।
ধীর গলায় বলে উঠে নুহা, জানতাম একজোড়া চোখ আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। এই জন্যই আমার কেমন জানি লাগছিল। চোখ বোজেও শান্তি পাচ্ছিলাম না।
জিজ্ঞাসো দৃষ্টিতে শুভ ফিরে তাকায় নুহার দিকে। স্মিতহাস্যে নুহার জবাব, অাপনিও অবাক হলেন না? কিন্তু বিশ্বাস করেন কেউ যদি আমার দিকে তাকিয়ে থাকে, আমি সত্যি’ই চোখ বোজা অবস্থায় সেটা টের পায়।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে শুভ। কি জানি হতে পারে।

হতে পারে নয়, এটাই সত্যি। আমি সত্যিই ব….(…)..? পুরো কথা বলতে পারেনি নুহা। তার আগেই ফজর নামাজের আজান দিয়ে দেয়। পুরো আজানটা চুপ করে শুনে সোফা থেকে উঠে বসে নুহা। ফিরে তাকায় শুভর দিকে। মৃদু হেসে বাহিরে চলে যায় শুভ।
রুমে ফিরে আসে নুহার নামাজ পড়া শেষে। দরজাটা কেবল আটকাতে গিয়েছিল শুভ। তখনি পিছন থেকে বাচ্চা কন্ঠে ভেসে এলো, ওজু করে তবেই দরজা আটকান। বেনামাজির স্থান নেই আমার ঘরে। চমকে উঠে পিছনে তাকায় শুভ।

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here