প্রয়োজন পর্ব: ২৭

0
884

#গল্প_পোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
প্রয়োজন পর্ব: ২৭
লেখায়: তানিয়া তানু

দোকানিকে থানায় নিয়ে চলে যাবার পরপরই উনি আমার কাছে এসে বললেন, “দীপ্তি, আর কাউকে সন্দেহ হয় তোমার?”
আমি সন্দেহজনক লোক বের করবো কীভাবে? কারণ সন্দেহভাজন ব্যক্তি খোঁজা তো মাথায় নেই। মাথায় শুধু একটা জিনিসই ঘুরপাক খাচ্ছে। না জানি এখন কী হয়! এর কারণ হলো উনি এই কথা তুমি করে বলায় মানুষ এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন তাদের চাঁদ বৃত্তের মতো গোলাকার সেই চোখ দিয়ে আমাকে খেয়ে ফেলবে। সবার এক প্রশ্ন উনার সাথে আমার পরিচয় কী? যদিও তারা এই প্রশ্ন করছে না। কিন্তু তাদের অদ্ভুত চাহনিতে এই ধারণাই বলে দিচ্ছে। আচমকা একজন ভুলবশত না হয় ইচ্ছে করেই বলে দিয়েছে, “কীরে, এই পুলিশ ব্যাটায় এমনে কথা কয় কেমনে? লাগে না তা কি কিছু?”
উনি এই কথা শুনে ওদের দিকে তেড়ে যেতেই উনার হাত ধরে ইশারায় না করে বললাম,”আমার বোনকে খোঁজে দিন,প্লিজ।”

উনি এবার থেমে গিয়ে শান্তসুরে বললেন, দীপ্তি, সন্দেহভাজন ব্যক্তি আছে?”

না বলতে যখনই যাবো তখন একটা ছেলের উপর নজর পড়লো। সে আর পাঁচটা মানুষের মতোই আমাদের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে।ও হচ্ছে সুজনের চ্যালা। তাই উনাকে সুজনের শিস বাজানোর কথা আর আমার বোনকে উত্যক্ত করার কথা বললাম। সুজনের কথা উনাকে বলার সাথেই দেখলাম ওর চ্যালা দৌড়ে গেল ওর কাছে। তৎক্ষণাৎ উনাকে এই কথা বললে দুজন কনস্টেবল পাঠিয়ে দেয় চ্যালার পিছনে।

খানিক উনার দিকে চাওয়ার পর আকস্মিক হাতে কারোর হ্যাচকা টান অনুভব করলাম। আপা আমাকে হাতে টান দিয়ে অন্যত্র নিয়ে গেলেন। সন্দেহের তীক্ষ্ণ বিষাক্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, অফিসারের গা ঘেঁষে কী এমন কথা বলছিলি? চিনিস নাকি?
আপার কথার উত্তর দেওয়ার আগেই দুলাভাই উনার প্রশ্ন জোড়ে দিলেন। বললেন, ওরা জিডি করলো কেমনে? তোমার কাছে তো পর্যাপ্ত টাকা ছিলো না।”
দুলাভাইয়ের প্রশ্ন দেওয়ার সময় চলে এলো সুজন। দুজন কনস্টেবল গলার কলার ধরে ও কে নিয়ে এসেছে। ও তো মিনি বেড়াল হয়ে গেছে। যেন কিছুই সে বুঝে না।

“কী স্যার? এমনভাবে ধরে আনলেন ক্যান?আপনার লোকেরা তো বড্ড অসভ্য। আমারে তো একটু সম্মানও দিলো না। পাছায় যখন বারি খাবে তখন চিনবে আমি কার ছেলে। কীভাবে আমারে সম্মান দেওন লাগে।”
ওর এমন কথায় উনার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। ক্রোধের সহিত বললেন

“তোরে তো এখন সম্মান দিবোই। কেমন সম্মান দিবো তা তুই দেখতে পারবি তখন যখন ওদের পাছায় না তোর পাছায় বারি পড়বে।”

“আরে স্যার, আমি তো কোনো দোষ করছি না। মারবেন ক্যান? কিতা করছি আমি?”

“স্মৃতি কোথায়? ”
” সেটা আমি জানমু কেমনে? ইলা কী আমারে কইয়া গেছলো না তা? এমনভাবে কইতাছুইন যে,ইলা দেখা যায় কইয়া গেছলো, আমি ঐখানে যাইতাছি, পুলিশ আইলে আমার কথা কইয়ো সুজন ভাই। ”

ওর এমন ভাব মূলক কথা শুনে আমরা সবাই হতবাক। কিন্তু উনি একটা থাপ্পড় দিয়ে বললেন, “তুই ও করে দেখে শিস দিছলি কেন? উত্যক্ত কেন করছিলি?”

“শিস তো স্যার সবাই রে দেই।যারে পাই তারে দেই। হেইদিন স্মৃতিরে পাইছিলাম। তাই দিছিলাম। আর হ্যাঁ,স্যার বখাটে আমি। খারাপ আমি। সেইটা সবাই জানে। তাই মনে হয় আপনার সন্দেহ সবার আগেই গেছে। তবে একটা কথা, এই সুজন মেয়েদের উত্যক্ত করে ঠিকই। কিন্তু গুম করে না। ”
“উত্যক্ত করিস কেন?”রাগে এই কথা সুজনের উদ্দেশ্য বললেন।
“স্যার আপনিও উত্যক্ত কইরা দেখবেন। কী মজা! ওদের বিরক্ত করলেই ওরা যে ভয়ার্ত চেহেরা নিয়ে তাকায় দেখলে নিজেকে পুরুষ পুরুষ মনে হয়। খুব ভাল্লাগে।
এই কথায় উনি ওর ঠোঁট বরাবর একটা ঘুষি দিন। আবার জিজ্ঞেস করলে তাও যখন সে উত্তর দিলো না। তখনো বেদরম মারতে থাকেন। নাক-মুখ চটকে যায় রক্তে। শেষে কেঁদে কেঁদে সুজন বাঁচার আকুতি করলে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এবার উনি বলার পূর্বে আমি নিজেই বললাম আর কাউকে সন্দেহ হয় না আমার। উনিও দীর্ঘশ্বাস ফেলে দিলেন। তখনই উনার শুরুতে পাঠানো পুলিশ আসে।

“স্যার, এদিকে কারোর কথায় কোনো ক্লু পাইনি। আমরা ইতোমধ্যে নিকটস্থ থানায় স্মৃতির ছবি দিয়েছি। ওরা কোথাও পেলে শীঘ্রই আমাদের জানাবে বলছে। আর হ্যাঁ স্যার,স্মৃতিকে সবাই শেষবার শানুদের বাসায়ই দেখেছে। আর কোথাও দেখেনি।

“হুম শেষবার। আচ্ছা শানুদের বাসায় গিয়েছিলে।”
“যাইনি স্যার। তবে ওই পরিবারের মেয়ে শানুর সাথে বাইরে কিছু কথা হয়েছে। ওর ভাষ্যমতে, “প্রতিদিন যে সময় বের হয় তার অনেক আগেই স্মৃতি বের হয়ে গেছে।”

“অনেক আগে কেন বের হলো?”
“তা জিজ্ঞেস করায় কোনো উত্তর মেলেনি। শানু সেটা জানে না।”

“ওদের বাসায় কে কে আছে?”
“জিজ্ঞেস করেনি,স্যার।”
“তাহলে চলো আবার ঘুরে আসি। এবার আমিও যাবো।ওদের বাবা-মার সাথে কথা বলতে।”

ওনারা নিজেদের মধ্যে কথোপকথন চালালে নির্বাক শ্রোতা হিসেবে আমিসহ আমাদের পড়শীরা শুনছি। আচমকা উনার উদ্দেশ্য একজন প্রতিবেশী বললো, ওদের মা-বাবা তো বাড়িতে নেই, স্যার।”
উনি এই কথা শুনে ভ্রুযুগল খানিক সংকোচ করে বললেন, “তাহলে এখন কারা আছে?”
“শানু আর শানুর ভাই শাহিন?”
“শাহিন কী করে?”
“শাহিন তো এবার নতুন কলেজে উঠছে।”

উনি এই কথা শুনে তেমন উত্তর না দিয়ে শানুদের বাসায় যেতে চাইলে বলেন, তুমি এখানেই থাকো। পেলে আমি তোমাকে জানাবো।”

হতাশ হয়ে অসহায়ের দৃষ্টিতে খানিক তাকিয়ে রইলাম। উনি চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করে চলে গেলেন।

শাহিন এবার ইন্টার প্রথম বর্ষের স্টুডেন্ট। ওর মতো এত ছোট ছেলে আমার বোনকে কিডন্যাপ করতে পারে না। ও তো খুব ভালো ছেলে। দেখা হলেই সালাম দিয়ে সব সময় হাসিমুখে কথা বলে।

উনি চলে যাবার পরপরই মানুষের কানাঘুষা শুরু হলো। কিন্তু সেদিকে পাত্তা না দিয়ে চলে গেলাম মায়ের কাছে। মা এখনো এক ধ্যানে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে। কোনো চেতনা নেই। এতক্ষণ যে এতকিছু হলো মনে হয় না মা কোনোকিছু শুনেছে। দুলাভাই আর আপা এসেছিলো আবারও প্রশ্ন করতে কিন্তু আমার অগ্নিচোখে তাকানো দেখে আর এগুলো না। মায়ের কাছে গিয়ে মায়ের কোলে মাথা রেখে অনেক বার মা মা বলে ডাকলেও কোনোকিছু বলেননি। নীরব হয়ে এখন শুধু অশ্রু ফেলছেন। এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর মাথায় কারোর হাতের স্পর্শ অনুভব করলাম। চেয়ে দেখলাম মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।

“আমার ঝগড়ার সাথী চইলা গেল। আর কোনোদিন এই বাড়িত ঝগড়ার শব্দ শুনবনা। কেউ ঝগড়া আর করতো না।”

মায়ের থেমে থেমে বলা দুঃখের কথায় আমিও কেঁদে দিলাম। বাবা মায়ের সব কিছুর সাথী ছিলো। আজ বাবা নেই। বাড়িটা যেন কেমন হয়ে গেল। মায়ের কাছ থেকে কান্না লুকানোর জন্য চলে আসলাম নিজের ঘরে। তারপর অতীতের শহরে পা দিলাম। যেখানে বাবা, আমি, বেবলি, মা আর বড় আপা ছিলো।

সন্ধ্যে হয়ে গেল। সবাই যার যার কাজ থেকে ফিরছে। এমন সময় বাবা আর বেবলিও আসে। তাই তো জানালা ধরে পথের দিকে চেয়ে রইলাম। কবে ওরা আসবে? একজন তো আর আসবে না জানি। কিন্তু বেবলির জন্য অপেক্ষায় রইলাম।
এদিকে পেটের মধ্যে ক্ষিধা। আবার তার থেকেও অন্তরে বেশি ক্ষিধা। দুই ক্ষিধায় অন্তর আর বাহির পুরো জ্বালিয়ে দিচ্ছে। কোনো মতেই শান্তি পাচ্ছি না। তাই মায়ের ঘরে যাবার জন্য পা বাড়ালেই বিছানায় পড়ে থাকা ফোনের রিংটোন আমার পথে বাঁধা দিলো। ফোনে আননোন নাম্বার ভেসে উঠলো। তবে এটা আর আননোন নাম্বার না। কারণ কয়েকবছর আগ থেকেই এই নাম্বারটা আমার বেশ জ্বালাতান করতো। বার বার ফোন করতো ঠিকই।কিন্তু কথা বলতো না। যত্তসব ফালতু কোথাকার! এবার রাগ নিয়ে কতগুলো কথা শুনানোর জন্য ফোন ধরে কানে নিতে গেলে শুনতে পেলাম,
“দীপ্তি,তুমি আজ রাত্রে বারোটায় তোমাদের বাড়ির রাস্তায় এসো।”
উনার কণ্ঠ শুনে অবাক হয়ে বললাম আপনি, “এতকাল আমাকে ফোন করেছেন?
উনি সেসব পাত্তা না দিয়ে আবারও একই কথা বললেন। উনার এমন অদ্ভুত কথা শুনে না উচ্চারণ করতে গেলেই আবারও বলে উঠলেন, তোমার ইচ্ছা হলে আসো। কারণ আমি মনে করেছি এই সময় তোমার থাকা দরকার।”
এবারের কথায় আচ্ছা বলে বললাম, “আপনি আমার নাম্বার কোথায় পেলেন?” উত্তরে বললেন, “তোমার নাম্বার অনেক আগেই নিলার নাম্বার থেকে নিয়েছিলাম।”

বিষাদময় রাত্রে পড়শী দেওয়া খাবার খেয়ে সময়ের অপেক্ষা করতে লাগলাম। অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে রাতের আঁধারে চললাম রাস্তায়। পূর্ণ চাঁদের আলোয় দেখলাম উনি দাঁড়িয়ে আছেন। তার সাথে অনেক পুলিশও। সবাইকে এক সাথে দেখে মনের ভেতর ভয় ঢুকলো। না জানি কী হবে!

আমরা শানুদের বাসার সামনে আছি। তাও আবার লুকিয়ে। কিন্তু কেন? তা জিজ্ঞেস করলেও উত্তরে মেলেনি। রাত যত গভীর হচ্ছে বুকের ভেতর ভয় তত বাড়ছে। হৃদস্পন্দনও ক্রমশ বেড়ে চলেছে।

আচমকা নজর পড়লো শানুদের বাড়ির নিচে। ওখানে দুজন মানুষ গাড়িতে কিছু একটা ঢুকাচ্ছে। ভয় হচ্ছে। প্রচুর! কিন্তু ওরা এত রাত্রে কী কাজ করার জন্য বের হলো?গাড়িতে উঠে গাড়ি ছেড়ে দিলো। সাথে সাথে উনিও আমার হাত টেনে গাড়িতে নিয়ে বসালেন।
দুই গাড়ির এমন অবস্থা দেখে চোর-পুলিশের খেলা খেলছি বলে মনে হলো। গাড়িতে কারা ছিলো তা এখনো বুঝতে পারছি না। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ ফলো করার পর সেই গাড়ি এক জায়গায় থামলো।

চলবে„„„„„

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে