প্রহেলিকা

1
679

বিভিন্ন দোকান ঘুরে ঘুরে ইতোমধ্যে প্রচুর কেনাকাটা হয়ে গেছে। শাওলির এই এক বাতিক। খুব একটা যে শপিং এ আসা হয় আমাদের ঠিক তা নয়, তবে যেবারই আসি, একগাদা প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে ঠাসা ব্যাগ দু হাত ভরে বাড়ি ফিরি। এবারো তার ব্যতিক্রম হয়নি। আলমারী ভরা পনেরো বিশটি টাই হবে আমার, তারপরও আমাকে আরো দুটি টাই কিনতে বাধ্য করলো। নতুন যে দুটি শার্ট কিনেছি, তার সাথে নাকি ম্যাচিং হবে। আসলে দিপধার জন্যই কেনাকাটা করতে আসা। কতো দোকান যে ঘোরা হলো ওর কাপড় কিনতে! ফ্রক, স্কার্ট, হট প্যান্টস। জিন্সের তিন রকমের প্যান্ট, এর মাঝে একটি আবার থ্রি কোয়ার্টার। টপস, সালোয়ার কামিজ। কী আর বাকী! ফেরার পথে এই দোকানে ওর চোখ আটকে গেল, একটা গাউন ঝোলানো ছিল। ধবধবে সাদা, সাথে সাদা ফুলের কাজ করা। আমার হাত চেপে ধরলো, এই, আমাদের দিপধার সামনের বার্থডেতে এই সাদা গাউন পরালে একদম পরীর মতো লাগবে না?

মিনমিন করে বলেছিলাম, অনেক কিছুই তো কেনা হলো, আজ না হয় থাক!

শাওলি কপট রাগ দেখালো। আমার আর তোমার জন্য এতো কিছু কিনলাম, আর আমাদের মেয়েটির জন্য একটা গাউন কিনতে বলাতে এমন করছো!

আমি হতাশ হয়ে পড়ি। বলি, চলো।

কাউন্টারে টাকা পে করে শাওলিকে খুঁজলাম। আশে পাশে কোথাও দেখছি না। আমার দু হাত ভরা শপিং এর ব্যাগ। ব্যাগগুলো ভালো করে গুছিয়ে বাইরে এসে দাঁড়িয়ে শাওলিকে খুঁজতে লাগলাম। বসুন্ধরা মার্কেটে এই সময়ে প্রচণ্ড ভিড়।

এদিক সেদিক তাকাতে একটু দূরে শাওলিকে দেখতে পেলাম। এই ভিড়ে আমাকে না জানিয়ে এতদূরে চলে এসেছে, ভর্ৎসনা করবো ভাবতে ভাবতে এগিয়ে গেলাম। শাওলি হাঁটু গেড়ে বসে আছে। সামনে পরীর মতো বাচ্চা একটি মেয়ে। কী যে মায়া কাড়া দুটি চোখ মেয়েটির! ধবধবে ফর্সা। গাল দুটো বেশ ফোলানো। কাছে গিয়ে খেয়াল করে দেখি চোখ দুটি নীলচে। আর তাতে চোখে রাজ্যের মায়া এসে ভর করেছে! দোকানে সাজিয়ে রাখার মতো ম্যানিকুইন লাগছিলো বাচ্চা মেয়েটিকে! শাওলির প্রতি যে ক্ষণিকের রাগ ছিলো, বাচ্চা মেয়েটিকে দেখে মুহূর্তেই সে রাগ পানি হয়ে গেল।

শাওলি মেয়েটির গাল টিপে দিচ্ছিলো! আর মেয়েটিও খিলখিল করে থেকে থেকেই হেসে উঠছিলো। আমি দুজনের খুনসুটি বেশ উপভোগ করছিলাম, হঠাৎ মধ্য তিরিশের অপরূপা এক মহিলার কণ্ঠ শুনে ফিরে তাকালাম। মেয়েটির মা। পরীর মতো মেয়েটির এক ঝুঁটি করা চুলে আলতো করে টেনে দিলেন, বললেন, আম্মু, আন্টিকে আমাদের বাসায় আসার দাওয়াত দিয়ে দাও!

আমি তাকাতেই চোখে চোখ পড়ে গেল! ওহ! আমার পায়ের নীচে মাটি কেঁপে উঠেছে বলে মনে হলো। বড়ো বড়ো দুটি কাজল কালো টানা চোখে এত মায়া ভর করে আছে! এমন গভীর চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না, প্রায় সাথে সাথেই চোখ নামিয়ে ফেললাম।

শাওলি উপরের দিকে তাকালো, ওর চোখে স্পষ্ট অনুনয়, আপনার মেয়েটির গালে একটা চুমু খেতে পারি?

আমি পেছনে ফিরে ভিড়ের দিকে তাকালাম, শাওলির চোখের এই দৃষ্টি আমার সহ্য হয় না। রাস্তা ঘাটে কারো বাচ্চা দেখলেই ও এমনটা করে। কষ্টে বুক ভরে উঠে আমার। দশ বছরের সংসার আমাদের। এতোদিনেও ওকে একটা বাচ্চা উপহার দিতে পারি নি। আমরা পালিয়ে বিয়ে করেছিলাম। আমি সবেই খুব কম বেতনে একটা চাকরিতে ঢুকেছিলাম। সাথে দুটো টিউশনি করতাম। সেই চাকরি আর টিউশনি করে করে প্রায় হাজার পঞ্চাশেক টাকার মতো জমিয়েছিলাম। সেই টাকায় সংসারের জন্য টুকিটাকি যা যা লাগে আমি আর শাওলি মিলে সারা ঢাকা শহর ঘুরে ঘুরে কিনেছিলাম। খুব কৃপণের মতো কেনাকাটা করেছিলাম। আমরা হানিমুনে যাবো, তার জন্য অনেক কষ্টে বিশ বাইশ হাজার টাকার মতো বাঁচিয়েছিলাম। সেই টাকার পুরোটাই প্রায় কক্সবাজারে হানিমুনে এসে খরচ করে ফেলেছিলাম। শাওলি একটি তারার নাম, ওর বাবা বিদেশী শিপের ক্যাপ্টেন ছিলেন। উনি রাতের আকাশের তারার নামে নিজের একমাত্র মেয়ের নাম রেখেছিলেন। স্পষ্ট মনে আছে। শীতের আসন্ন সন্ধ্যায় আমরা হাত ধরাধরি করে সমুদ্র বালিয়াড়িতে খালি পায়ে হাঁটছিলাম। ভাটার শুরু, ছোট ছোট ঢেউ এসে আমাদের খালি পায়ে স্পর্শ দিয়ে যাচ্ছিল। আমি গভীর আবেগে শাওলিকে জড়িয়ে ধরেছিলাম একটা সময়। আমার বুকে মুখ গুঁজে বলেছিল, এই, আমাদের প্রথম সন্তান কিন্তু একটা মেয়ে হবে!

আমি নীচু হয়ে ওর ঠোঁটে চুমু দিয়ে বুকে খুব খুব ঠেসে জড়িয়ে ধরেছিলাম। আমার চোখে খুব অকারণে জল চলে আসে। লুকোতে প্রায় ডুবন্ত সূর্যের দিকে তাকিয়ে বড়ো করে দীর্ঘশ্বাস নিয়েছিলাম। শাওলি ফিসফিস করে বুকে নাক ঘষতে ঘষতে বললো, শোনই না! আমি আমার মেয়ের নামও তারার নামেই রাখবো। বাবার সাথে ছোট বেলায় শিপে যখন ঘুরতাম, তখন আকাশে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করতাম বাবাকে, বাবা, বলো না শাওলি কোন তারাটা! শাওলি দেখেছি, দেখেছি আরো অনেক নাম না জানা তারা। আর বাবা আমাকে একদিন দিপধা তারা দেখালেন। আর আমি সেই যে দিপধা নামের প্রেমে পড়ে গেলাম! ঠিক করে ফেলি আমার মেয়ের নাম দিপধাই রাখবো!


কয়েকবছরের আপ্রাণ চেষ্টায়ও আমাদের সন্তান হবার কোন লক্ষণ দেখা গেল না। তখন দুজনেই চাকুরী করি। একদিন শাওলি বললো, এই চলো না, ল্যাব এইড হাসপাতালে যাই একটু!

আমি চমকে উঠেছিলাম, বলে কী! সত্যিই কিছু খবর আসলো কী!

অফিস থেকে ফিরে এসে চা হাতে নিয়ে বিছানায় এসে বসেছিলাম দুজনে। শাওলি আমার বুকে চেপে এলো, এই অমন কিছু নয় বাবা!

আমি ওর মাথা একটু উঠিয়ে দেই হাত দিয়ে, মানে?

আরে, এমন করছো কেন! এই, চলো না দুজনে একটু টেষ্ট করে দেখি কেন আমাদের বাচ্চা হচ্ছে না!

সত্যি বলতে, আমার পুরুষত্বের অহমিকায় লেগেছিল খুব। হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু এভাবে যেতে যেতে আর উড়িয়ে দিতে পারছিলাম না। একদিন নিজেই ওকে বললাম, এই জান, চলো না সেই যে তুমি বলেছিলে ল্যাব এইড না কোন হাসপাতালে যেতে চাচ্ছিলে!

শাওলি খুব উচ্ছসিত হয়ে উঠেছিল। সেদিন শাওলিকে বেশ রাত করে অফিসে থাকতে হয়েছিল। কাজে কাজেই ও ভীষণ ক্লান্ত ছিল। আমি রাতের খাবার গরম করে টেবিলে দিয়ে রেখেছিলাম। আমার এখনো মনে পড়ে, ও আমার কথা শেষ হবার আগেই এক দৌড়ে কিচেনে গিয়ে ঢুকে যায়। চিৎকার করে বলে, এই, তোমার না অনেক ক্ষুধা লেগেছে বললে? এক সেকেন্ড দাঁড়াও, তোমার প্রিয় অমলেট করে আনছি।

শুধু ল্যাব এইডই নয়। আরো অনেক হাসপাতালে টেষ্ট করালাম। ফার্টিলিটি ক্লিনিকেও গেলাম বেশ কয়েক জায়গায়। সব খানেই একই রেজাল্ট। আমার স্পার্ম কাউন্ট ভীষণ রকমের কম। কয়েকজন ডাক্তার জানতে চেয়েছিলেন, আমি কখনো আমার পুরুষাঙ্গে আঘাত পেয়েছিলাম কি না। সত্যি বলতে, আমি আজীবনই ভীষণ রকমের ঘরকুনো ছিলাম। বাইরে খুব কমই খেলাধুলা করতে গিয়েছিলাম। জিজ্ঞেস করেছিলেন, সাইকেল চালাই কিনা। তাও না করে দিলাম। ডাক্তারদের কোন ওষুধ বা চেষ্টায় কাজ হচ্ছিল না। শেষে এক ডাক্তার বললেন শাওলিকে চাকুরি ছেড়ে দিতে। তাতে নাকি সে বেশি মনোযোগ দিতে পারবে। আর আমাকেও বেশ বড়ো একটা ছুটি নিতে বললেন। আরো বললেন টেনশন ফ্রি সময় কাটাতে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। এক এক করে কবে যে দশ দশটি বছর চলে গেল! ওকে বলেছিলাম, টেষ্ট টিউব বেবি নিতে। ও তাতে মোটেই রাজী না, বলে, ন্যাচারাল হতে হবে বাবা। আমার নকল বেবি চাইনা!

শুধু যে ডাক্তার দেখিয়েই ক্ষান্ত দিয়েছিলাম, তাও নয়। সারা বাংলাদেশে যত পীর ফকির আছে, যেখানেই আশ্বাস পেয়েছি, ছুটে গিয়েছি সেখানেই।

ইদানিং শাওলির মাঝে বেশ অস্বাভাবিকতা দেখা যাচ্ছে। ওর রাজ্য জুড়ে কল্পিত দিপধা। প্রথম প্রথম হেসে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলাম। দিন দিন তা কেমন যেন নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছিল। আমি নিজেকে এতো ধিক্কার দিতাম! না পেরে একদিন বলেছিলামও, তোমার তো সব ঠিক আছে জান, কেন এমন করছো? চলো আমরা আলাদা হয়ে যাই। তুমি নতুন করে সংসার সাজাও। উফ! কেন যে এটা বলতে গিয়েছিলাম! ও পাগলমতো হয়ে উঠেছিল। চিৎকার চেচামিতে নরক গুলজার করে ফেললো। আমাকে পাগলের মতো নখ দিয়ে আঁচড় দিয়ে রক্তাক্ত করে ফেললো। পাগলের মতো কামড়াতে লাগলো। আমি ভীষণ কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম।

আমি ওকে সেদিনের পর থেকে আরো আরো বেশি ভালোবাসতে লাগলাম। আর খুব খুব প্রার্থণা করতে লাগলাম, আল্লাহ যেন একটু দয়া করেন আমাদের প্রতি।

শাওলির মেজ খালা বেশ নামকরা সাইক্রিয়াটিস্ট। উনার কাছে নিয়ে গেলাম শাওলিকে। খুব লজ্জায় নত হতে হতে আমার মাঝেও বেশ পরাজিত একটা ভাব চলে এসেছিল। উনি আমাদের বেশ আশ্বাস দিলেন। অনেকদিন পর শাওলিকে হাসতে দেখেছিলাম সেদিন। কিছু ওষুধ দিলেন শাওলির জন্য। আর প্রতি সপ্তাহে আপডেট জানাতে তার কাছে নিয়ে যেতে বললেন।

শাওলি এখন মন ভার করে দিন কাটায়। ওকে নিয়ে ডাক্তার খালার কথা অনুযায়ী কয়েকটা দেশ ঘুরে এসেছিলাম। কয়েকটা দিন খুব ফুরফুরে মেজাজে কাটানোর পর হঠাৎ একদিন শুরু হয় ওর অস্বাভাবিকতা। সেদিন ওকে নিয়ে মার্কেটে চলে যাই। দিপধার জন্য কেনাকাটা করি।

আমাদের কল্পনার দিপধার জন্য রাজ্যের কেনাকাটা করে বেড়াই দুজনে। আমার তাতে কোন ক্লান্তি নেই।


সে রাতে অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখে এমন ভয় পেয়েছিলাম! মনে হচ্ছিল অতলে তলিয়ে যাচ্ছি। ধড়ফড় করে উঠে বসে আকুলিবিকুলি করে শাওলিকে খুঁজছিলাম! শাওলি উঠে বসে আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমার মাথায় বিলি কেটে দিতে দিতে নরম সুরে জিজ্ঞেস করে, এই, কী হয়েছে বলো না প্লিজ!

আমার বেশ কয়েক মিনিট লাগলো বুঝতে আমি ঠিক কোথায় আছি! মনে হচ্ছিলো, আমি এক অন্য পৃথিবীতে, যেখানে সব কিছুই এত বেশী অচেনা, অজানা। খুঁজে পেতে শাওলির বুকে মুখ গুঁজে রইলাম। ঘেমে নেয়ে উঠেছি। আস্তে করে বললাম, পানি খাবো জান!

আমি স্বপ্নের কিছুই মনে করতে পারছিলাম না, শুধু মনে আছে এক আশ্চর্য রূপবতী এক মেয়ে আমার নাম ধরে ডাকছে। খুব অস্পষ্ট সে উচ্চারণ। কেমন যেন ঘোর লাগা এক সন্ধ্যা হবে সেই সময়টা। শাওলি আমাকে গভীর আদরে জড়িয়ে ধরে রাখলো অনেকটা সময়। কখন ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম মনে নেই, আবারো সেই স্বপ্ন আমায় ঘিরে ধরলো। এবার প্রায় লাফিয়ে উঠে বসি বিছানায়। শাওলি ওয়াশরুমে ছিল, আমার হঠাৎ চিৎকারে সে এক দৌড়ে ছুটে আসে। মনে হচ্ছিল, আমি এই জগতেই নেই!
..
#মনোয়ার_হোসেন

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here