4.3 C
New York
Tuesday, November 19, 2019
Home প্রতিশোধ প্রতিশোধ পার্ট_11

প্রতিশোধ পার্ট_11

প্রতিশোধ
পার্ট_11
#জামিয়া_পারভীন

হেনার সাথে তুষারের কয়েকবার দেখাদেখি হলেও কেউ কথা বলছে না কারোর সাথে। হেনা তার ছেলে মাসুদ কে বলে ঘরে তার বাবা মাহমুদ একা আছে। তাই মাসুদকে পাঠিয়ে দেয়।

হেনা আবির কেও বাড়ি পাঠিয়ে দেয়, আবির আর কিছু মনে না করে বাসায় চলে আসে। দুই মেয়ে এক কেবিনেই আছে, দুই মেয়ের মাঝে বসে আছে হেনা। আর এক পাশে বসে আছে তুষার।

__ জানিনা, দুই মেয়েকে কি এমন বলেছো? তাই তারা দুইজনে ই জ্ঞান হারিয়েছে। ( হেনা)

__ পুরো টাই তোমার উপর দোষ চাপিয়েছি হেনা। চিন্তাও করিও না তৃণা কখনো তোমার মুখ দেখতে চাইবেনা। ( তুষার)

__ আর কতো শাস্তি দিবে তুমি আমাকে? ( হেনা)

__ কখনো মন ভরবে না ( তুষার)

__ তুমি তোমার দুই মেয়েকে নিয়ে চলে যাও, আর পারছিনা সহ্য করতে আমি ( হেনা)

__ এমন করে বলতে নেই, ওরা তো তোমার ও মেয়ে। ( তুষার)

__ হ্যাঁ, আমার মেয়ে, শুধু জন্ম দিলেই মা হওয়া যায়না। যখন ওরা জানতে পারবে তখন কেউ আমার মুখ দেখতে পারবেনা। কিন্তু আর সব সহ্য করতেও পারছিনা। এবার সব বলে দিয়ে সবার জীবন থেকে চলে যাবো। ( হেনা)

__ ভুলেও এই কাজ করিও না, নিজের সাথে সাথে আমার মুখ টাও কালি করে দিতে তুমি পারোনা। ( তুষার)

নিরার জ্ঞান ফিরে আসে ওই মুহুর্তে, আর মাকে জিজ্ঞেস করে…

__ কিসের সত্য কথা মা, কি গোপন রেখেছিলে এতো দিন, আর কিছু লুকিয়ে রেখোনা, সব বলে দাও, দয়া করে। ( নিরা)

ওইদিকে তৃণার ও জ্ঞান ফিরে আসে, হেনাকে মা বলে ডেকে উঠে। দুই মেয়েকে দুইপাশে নিয়ে বসে আছে হেনা।

__ আমি জানি আমার মা খারাপ না। ( নিরা)

__ আমার ড্যাডিও খারাপ না, বিশ্বাস করিনা ( তৃণা)

__ কি হয়েছিলো সব খুলে বলোনা মা। ( তৃণা ও নিরা একসাথে বলে উঠে)

হেনা নিজের সব কষ্ট ভুলে বলতে শুরু করে দুই মেয়েকে আর পাশে তুষার মাথা নিচু করে বসে থাকে।

হেনা : আমি ক্লাস নাইন থেকে তুষার এর প্রেমে পড়ি। প্রেম এতো টাই গভীর ছিলো যে কেউ কাউকে ছেড়ে থাকার কল্পনাও করতাম না।

তুষার : দুজনে সংসার করার স্বপ্ন দেখতাম , এক সাথে ঘর বাধার স্বপ্নে সব সময় বিভোর থাকতাম। এভাবেই স্কুল শেষ করে কলেজে উঠি। সেখানে ও একসাথে ভর্তি হই। সব ক্লাস একসাথে করতাম, প্রাইভেট ও একই সাথে পড়তাম । এক সাথে ঘুরতে যেতাম , কতো রঙিন স্বপ্ন ছিলো দুইজনের চোখে।

হেনা: হ্যাঁ! ভালোবাসা এতো ই গভীর ছিলো, কখনো চিন্তা ও করিনি একে অন্যকে ছাড়া থাকতে হবে।

তুষার : এভাবেই আমরা অনার্স এ ভর্তি হই। দুইজন একসাথেই বিশ্ববিদ্যালয় এ চান্স পাই। বেশ খুশিই ছিলাম দুইজনে, কিন্তু সুখ বেশিদিন টিকলো না আর। হটাৎ ই হেনা মিসিং হয়ে যায়। আমি অনেক চেষ্টা করেও আর যোগাযোগ করতে পারিনি।

হেনা : সেদিন বাসায় জানতে পারে আমি তুষারের সাথে রিলেশন করি। সেদিন বাবা খুব মেরেছিলো, এখনকার মতো তো আর তখন ফোন ছিলো না। ঘরে দরজা লাগিয়ে বন্দী করে রাখে। অনেক কেঁদেছিলাম সেদিন, কেউ আসেনি চোখের পানি মুছে দিতে।

তুষার : এসব কথা তো আগে বলোনি।

হেনা: বলবো কিভাবে, জানতেই পারতাম না কখন সকাল আর কখন রাত হতো। সব সময় বন্দী থেকে থেকে অতিষ্ট হয়ে গেছিলাম। হটাৎ একদিন মা এসে বলে গেলেন আমার বিয়ে। আমি না দেখেছি বর না দেখেছি ঘর। তুষার কে ছাড়া আমি নিজেকে কল্পনা ও করতে পারতাম না তখন। আমার অনিচ্ছায় বিয়ে হয়ে যায় মাহমুদের সাথে। বিশাল ব্যবসায়ী সে, বাড়ি, গাড়ি , টাকা, ধন দৌলত সবিই ছিলো। কিন্তু আমি কখনো সুখী ছিলাম না। আমি শুধু তুষার কেই ভালোবাসতাম। বিয়ের রাতেই মাহমুদ এসে বলে, সে সব জেনে শুনেই বিয়ে করেছে। সে আমাদের প্রেমের কথা বাবাকে বলে দেয়৷ আর সে প্রেমের কথা সমাজে রটিয়ে দিবে এই ভয় দেখিয়ে বিয়ে করে আমাকে। বিয়ের পর থেকে শুরু হয় মানসিক, শারিরীক নির্যাতন। নির্যাতন সহ্য করতে করতেই একটা বছর পার হয়ে যায়। এক বছর পর আমি জানতে পারি আমি অন্তঃসত্ত্বা। কিন্তু নির্যাতনের মাত্রা কমেনি, কারণ আমার জীবনে অন্য ছেলে ছিলো । মাহমুদ কখনো ই বিশ্বাস করতো না আমাকে। মার খেয়ে খেয়েই মাসুদের জন্ম হয়, তাও আমাকে শুনতে হয়েছে মাসুদ নাকি আমার পাপের ফসল। মাসুদ কে কখনো মাহমুদ নিজের সন্তান হিসেবে মেনে নেয়নি। এতো ই যখন অত্যাচার করার ছিলো তাহলে আমার সুখের জীবন টা নষ্ট করার কারণ আমি আজও খুঁজে পাইনি।

তুষার : এতো কিছু আমাকে কখনো বলোনি কেনো হেনা। ( কান্না জড়িত কন্ঠে তুষার)

হেনা : অবহেলা অনাদরে মাসুদ এর বয়স তখন ৫ হয়। কখনো আমরা মা ছেলে সুখে ছিলাম না। সব সময় সংসার এর কাজ করাতো সে আর আমার একটু অসাবধানতা হলেই লাত্থি ঝাটা আমার যেন পাওনা হয়ে গিয়েছিলো। কিছুদিনের মাঝেই জানতে পারি মাহমুদ পর নারীতে আসক্ত। এই কথাটা আমাকে মোটেও অবাক করেনি কারণ যার নিজের চরিত্র খারাপ সেইই অন্যকে খারাপ ভাববে।

এভাবেই মাসুদ এর বয়স ৬ বছর হয়ে যায়, মাসুদ তখন আমার মার আর নিজে মার খেয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। একদিন সকাল বেলা জানতে পারি মাহমুদ এর গ্রামের সকল পুকুরের মাছ এক সাথে বিষ খেয়ে মারা গেছে। ৫ টা পুকুরে মাছ ছিলো, এক দিনে এতো লস খেয়ে মাহমুদ পাগলের মতো চিৎকার করতে থাকে। সেদিন জিজ্ঞেস করাতে আমাকে কুকুরের মতো পেটায়। বলে আমার জন্য তার লস হয়েছে।

মুখ বুজে মার সহ্য করে ছিলাম, এরপর সেদিন দুপুরবেলা খবর আসে মাহমুদ এর তিনটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি তে আগুন লাগে। একদিনে শত কোটি টাকা লস খাত মাহমুদ। এতো লস খেয়ে কিছু করতে না পেরে বাড়িটা বন্ধক রেখে লোন তুলে আবার বিজনেস শুরু করবে ভেবে। কিন্তু পার্টনার এবার ধোকা দেয়। সব টাকা মেরে নিয়ে পালিয়ে যায়। সেদিন লোনের টাকা দিতে না পেরে এক মাসের মাঝে আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দেয়। বাড়ির বাইরে আমি আর মাসুদ বসে ছিলাম তখন খবর আসে মাহমুদ অনেক ড্রিংক্স করে গাড়ি চালাতে গিয়ে এক্সিডেন্ট করে।

তুষার : এই সব ক্ষতির পিছনে আমিই ছিলাম।

হেনা : কিহহহহ! ( বেশ অবাক হয়)

তুষার : তোমার ধোকা পেয়ে নিজেকে প্রতিশোধ এর আগুনে জ্বলিয়ে নিয়েছিলাম । তাই, কিন্তু জানতাম না তুমি কতো কষ্ট পেয়েছো। শুধু নিজের কষ্ট দেখেছিলাম, আর কিছুই দেখিনি।

হেনা: এরপর একটা লোক এসে চিঠি দিয়ে যায়। চিঠি তে একটা ঠিকানা ছিলো, উপশহর এর একটি বাড়ির ঠিকানা । সেখানে স্পষ্ট লিখা ছিলো আমি যেনো একা যায়। মাসুদ কে হাসপাতালে বাবার পাশে এক নার্সের দায়িত্বে রেখে সেই ঠিকানা তে যায়। যা দেখলাম বেশ অবাক হয়ে গেছিলাম আমি। এ যে আমার তুষার , এতো বছর পর সামনে দেখে হাসবো কি কাঁদবো না বুঝে হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

তুষার আমায় অবাক করে দিয়ে বলে “এখন তোমার অনেক বিপদ তাইনা হেনা

আমি কিছু না বলেই কেঁদে ফেলি। সে কিছুই না বলার সুযোগ দিয়ে বলে সব কষ্ট দূর হয়ে যাবে একটু ত্যাগ করলে। তুষার সেদিন মাহমুদ এর সব চিকিৎসা খরচ দিতে চায়। বিনিময়ে একটা শর্ত আছে, মাহমুদ কে ডিভোর্স দিতে হবে। কিন্তু এই ডিভোর্স এর কথা কেউ জানবে না কখনো। আমি কথা বলতে পারিনি, ডিভোর্স পেপার রেডিই ছিলো। সেখানে অনেক ভেবে সাইন করে দিই। কয়েকটা সাইন করে দিয়ে চলে আসি সেখান থেকে। তুষার মাহমুদ এর চিকিৎসা আর আমাদের মা ছেলের থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। এভাবে আমি তুষারের পাঠানো টাকাতেই চলতে থাকি।

তুষার কখনো তার ঠিকানা আমায় বলতো না। ঠিক সময় মতো টাকা চলে আসতো। এরপর এভাবেই একটা বছর কেটে যায়, ডিভোর্স দেয়া পঙ্গু স্বামী, আর ছেলে কে নিয়ে। মাহমুদ সুস্থ হবার কোন আশাই ছিলো না। তাও তার সেবা করতাম , মাহমুদ কথাও বলতে পারেনা আর, সাথে হুইল চেয়ার ছাড়া চলতে পারেনা। তাই তুষার একজন কাজের লোক পাঠায়। সেই ছেলেই মাহমুদ এর সব সেবা যত্ন করতো।

এরপর একদিন তুষার আমাকে ডেকে পাঠায় এক ঠিকানা তে। আমি যেন পুতুল হয়ে গিয়েছিলাম। তুষার যা বলত তা শুধু করতাম কিন্তু তুষার কে কিছুই বলতাম না। সেদিন তুষার একটা কাগজে সাইন করতে বলে। আমি করে দিই, এরপর চলে আসার সময় আর আসতে পারিনি। তুষার আমায় কাছে টেনে নেয়, কিন্তু সকালবেলা আমাকে বের করে দেয় । এভাবে সে প্রায়ই আমাকে ডেকে পাঠাতো সেই ফ্লাটে। আমি যেতে বাধ্য ছিলাম কারণ আমি পড়াশোনা বেশি করিনি, না করি কোন চাকরি । এভাবে চলার কিছুদিন পর আমি জানতে পারি আমি মা হতে চলেছি। আমি কখনো তুষার কে এই খবর দিই নি । সে নিজেই জেনে নেয়, সব সময় খোঁজ রাখতো সেভাবেই হয়তো।

ডেলিভারি র ডেট এগিয়ে আসে, আত্মহত্যা করতে চেয়েও পারিনা। কারণ সন্তান পেটে নিয়ে মরলে পাপ হবে তাই। জীবন্ত প্রাণ মারতে চাইনি আমি কখনো ই। প্রায় দিনিই চিঠি আসতো যেনো নিজের খেয়াল রাখি। কখনো ই যেন মাহমুদ এর ঘরে না যায়। এরপর যেদিন পেইন উঠে, মাসুদ ই আসেপাশের মানুষ ডেকে হাসপাতালে নিয়ে যায় আমাকে। মাহমুদ অসুস্থ হলেও বেশ ভালো করেই বুঝে গেছিলো আমি আর তার নাই। আমিও তার ঘরে ভুলেও যেতাম না, তাই সে জানতো না আমার মা হবার খবর। নার্স আমায় এসে বলে আমার দুইটা মেয়ে হয়েছে। আনন্দিত হতে পারিনি সেদিন কারণ যাকে একদিন ভালোবাসতাম তার পাপের ফল এই সন্তান।

তুষার: না পাপের না, ওরা দুই বোন আমার বৈধ সন্তান ।

হেনা: কিভাবে?

তুষার : লাস্ট যেদিন একটা পেপার এ সাইন করায় সেটা তোমার আমার বিয়ের পেপার ছিলো। তোমাকে কখনো জানাতে চাইনি রাগের জন্য।

হেনা: এরপর তুষার নার্স দিয়ে একটা মেয়েকে নিয়ে চলে যায়। চিঠি লিখে যায় স্মৃতি হিসেবে নিয়ে গেলাম। ভেবেছিলাম আর কখনো হয়তো খোঁজ নিবেনা। কিন্তু আজ অব্দি আমার সব খরচ ই আসে তুষারের কাছ থেকে।

চলবে……

জামিয়া পারভীন তানি
স্বপ্ন ই জীবনের বেচে থাকার আশা।
Comments are closed.

- Advertisment -

Most Popular

Love At 1st Sight-Season 3 Part – 70 [ Ending part ]

♥Love At 1st Sight♥ ~~~Season 3~~~ Part - 70 Ending part Writter : Jubaida Sobti সময় ঘনাতে লাগলো, মান-অভিমান সব ভুলে এই রাতটিতেই রাহুল তার...

ব্ল্যাকমেল ও ভালোবাসা

দোস্ত দেখ মেয়েটা সিগারেট খাচ্ছে! আমি একবার ওই দিকে দেখে বললাম- কুয়াশার কারণে তোর এমন মনে হচ্ছে। তারপর বললাম খেলার মাঝে ডিস্টার্ব করিস নাহ, এমনিতে...

অভিমান ও ভালোবাসা

সুন্দরী মেয়ে হাত ধরে হাটার ফিলিংসটা অন্যরকম, মেয়েটির সাথে হাঁটতে হাঁটতে জমিন থেকে উপরে উঠতে লাগলাম। আকাশে ভাসমান একটা রেস্তোরায় গেলাম, কোনো ওয়েটার নাই। মেনু দেখে...

ভালবাসা_ও_বাস্তবতা

ভালবাসা_ও_বাস্তবতা #লেখক-মাহমুদুল হাসান মারুফ #সাব্বির_অর্নব ঢাকা শহরে এত জ্যাম, বিকালটা শেষ হতেই যেন থমকে যায় রাস্তা গুলো। এত মানুষ,  এত গাড়ি তার উপর আবার মেট্রোরেলের কাজ। এই...

Recent Comments

গল্প পোকা on দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা on মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা on গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা on গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা on গল্পঃ ভয়
Samiya noor on গল্পঃ ভয়
Samia Islam on গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া on মন ফড়িং ❤ ৪০.
Siyam on বিবেক
Sudipto Guchhait on My_Mafia_Boss পর্ব-৯
মায়া on মন ফড়িং ৩০.
মায়া on মন ফড়িং ৩০.
মায়া on মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta on  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas on  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya on অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি on নষ্ট গলি পর্ব-৩০
সুরিয়া মিম on খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা on মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা on নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা on Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা on Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা on খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া on মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা on মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা on খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা on খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা on মন ফড়িং ❤ ১৬. 
Foujia Khanom Parsha on মা… ?
SH Shihab Shakil on তুমিহীনা
Ibna Al Wadud Shovon on স্বার্থ