পরী পর্ব ১৫(অন্তিম)…

0
824

পরী পর্ব ১৫(অন্তিম)…
.
ডায়েরি পড়তে পড়তে সকাল হয়ে গেছে। ডায়েরিটি রেখে এলাম। সজীব বাইরে গিয়ে জেনে এলো, হাজিরাপুরের বাস সাতটায় ছাড়বে। আমরা সবাই ব্যাগ গুছিয়ে সাতটা বাজার অপেক্ষায় সোফায় বসে রইলাম।
সবাই নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে। আমি আবার সেই অতি পরিচিত সুগন্ধটি পেলাম। অদৃশ্য আদিল পাশেই বসেছেন। ওদিকে মুখ করে বললাম, ‘গতবার আমরা খালেকের সন্ধানে বেরুনোর সময়ের আগের রাত আপনি আমাকে আশীর্বাদ করেছিলেন। আজ সেলিমকে খুঁজতে যাচ্ছি, আপনার খুনিদের মাঝের একজন। আজ করবেন না?’
ভাইয়া অবাক হয়ে বলে উঠল, ‘তুই কার সাথে কথা বলছিস?’
আমার জবাবই দেওয়ার প্রয়োজন হলো না। পরমুহূর্তে আদিল দৃশ্যমান হলেন। তিনি এতক্ষণ আমার মতোই পায়ের উপর পা রেখে বসে ছিলেন। আমি আর আমার বহুরূপী পাশাপাশি বসে আছি। আমাদের মাঝের তফাতটা কেবল চোখের দিক থেকে। তাঁর চোখগুলো সম্পূর্ণই কালো।
‘আমি জানতাম,’ তিনি বললেন, ‘একদিন তুমি অবশ্যই আমার সত্যগুলো জানবে। এই আশায় তোমাকে তেমন দেখা দিইনি এবং কিছু বলিনি। সাবরিনাকে একবার আমি বলেছিলাম, আমি আজীবন এই ঘরেই থাকতে চাই। মরার পর আমার ইচ্ছাটা পূরণ হয়ে গেল। আমি এখানেই আছি। বাইরে যেতে পারি না। সবসময় সেই তালাবন্ধ রুমটিতে থাকি। আমার পক্ষে তালা খোলা কঠিন কোনো ব্যাপার নয়। এজন্য সাবিলার বেঁধে যাওয়া রুমটায় গিয়ে সাবরিনার শেষ লেখাগুলো পড়ে নিজেকে আশ্বাস দিতাম, একদিন আমার মেয়ে আসবে।
এখানে কারো থাকা আমার পছন্দ নয়। এক রাতে রুম থেকে বেরুনোর পর দেখতে পেলাম, পাশের রুমে কে যেন ঘুমাচ্ছে। আমি রেগে উঠে ওখানে যাই। তুমি জানই, আমি যেখানেই যাই, ওখানে গরম বাতাস বয়ে যায়। তখন লোকটি ঘুম থেকে উঠে গেলে আমি তাকে পাশের রুমে নিয়ে গিয়ে মারার চেষ্টা করলাম। তখনই আজান শুনলাম। আমার রাগও শান্ত হয়। আমি তাকে আর কিছুই করলাম না। কিন্তু ব্যক্তি বুদ্ধিমান থাকায় ভাই নিয়ে চলে গেল। আরেকবার এলো সে একই ব্যক্তি। কিন্তু সেইবার কিছুই করলাম না। কারণ তার সাথে সাবিলা আর দুটো মেয়ে ছিল। সাবিলাকে দেখে আমি আমাদের রুমটি খুলে দিলাম। সে সেইরাত ওখানেই ছিল। আকবর সাহেবকে রুমটির অস্বাভাবিকতা সম্বন্ধে সে কিছুই জিজ্ঞেস করেনি। কেবল তোমরা এখান থেকে না যাওয়ার জন্যই সে মিথ্যে বলেছিল। আমি তাকে ডায়েরিটি পড়ালাম। সে আমাদের মুক্তির প্রতিজ্ঞা করল। এরপর একদিন রান্নাঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রান্নার খুশবো পেলাম। গিয়ে দেখি তোমার ভাই রান্না করছে। আমি জানতাম না তোমাদের এখানে সাবিলা নিয়ে এসেছিল। যুবক ছেলে দেখে দয়া হয়েছিল। তাই ওকে কিছু না করে চলে যাওয়ার হুমকি দিলাম। কিন্তু গেল না। বরঞ্চ সে আমার পাশের রুমে শুয়েছে দেখে মেজাজ বিগড়ে গেল। তাই গলা চেপে ধরলাম। তার চিৎকারে তুমি আসার পর তোমাকে দেখে আমি হতভম্ব হয়ে যাই। মুহূর্তের জন্য লেগেছিল, এই বুঝি এটি জীবন্ত সেই আমি। আমার বুঝতে দেরি হয়নি, তুমি কে হতে পার। তুমি তাকে তোমার ভাই বললে আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। এরপর থেকে প্রায়ই তোমাদের আশেপাশে থাকতাম। তুমি অনেক ভালো রান্না করতে পার, তবে লবণ কম দাও। সেদিন সাবিলার জন্য তোমার রাঁধা খাবারে আমিই লবণ দিয়েছিলাম। আর পাখাগুলো আমার ইশারায় চলতো। একবার তোমাদের জন্য রান্না আমিই করে রেখেছিলাম। আমি জানালা দিয়ে দেখতাম, তুমি আমার মেয়েকে সাইকেল চালানো শেখাতে। যে সুখ আমি তাকে দিতে পারিনি, তার সবই তুমি ওকে দিলে। খালেকের সন্ধানে তোমরা এখান থেকে বেরুনোর সময় সাবিলাকে হাত নেড়ে আমি বিদায় দিয়েছিলাম। কিন্তু সাবিলা ব্যতীত তোমরা আমাকে কেউ দেখতে পাওনি। সাবিলা জানতো আমার লাশ তালাবন্ধ রুমটিতে ছিলাম। কিন্তু আমরা জানতাম না, সে মুখোশধারী কে ছিল। কেন সে আমাকে মেরেছে। তুমি যে স্বপ্নটা দেখেছিলে তার কারণেই জানতে পেলাম। আমাকে যে খঞ্জর দিয়ে মারা হয়েছিল সাবিলা সেটি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। এখন সে কোথায় আমিও জানি না। আবির, আমিও আমার মেয়ের কথা অনেক মনে করি। জানি না, মেয়েটি এখন কোথায়। তোমরা এখন সঠিক জায়গায় যাচ্ছ। আমি আগে ভাইদের সাথে হাজিরাপুরেই থাকতাম। সেখানেই হয়তো তোমরা সেলিমের সন্ধান পাবে। আর শুনো একটি কথা, তোমরা যথাসম্ভব সাবরিনার ডানাগুলো খোঁজার চেষ্টা করবে। ওইগুলো একবার পেলে ডানাগুলোই তোমাদের সাবরিনার কাছে নিয়ে যাবে। কারণ পরীদের ডানা তাদের খুঁজে নিতে পারে। ওরা যথাসম্ভব তার মালিকের কাছে থাকার চেষ্টা করে। সাতটা বাজার আর কয়েকটা মিনিট বাকি। তোমরা বেরিয়ে পড়। আমার দোয়া তোমাদের সাথে রইল।’
তাঁর সাথে কথা বলে আমরা বেরিয়ে পড়লাম হাজিরাপুরের উদ্দেশ্যে। জায়গাটি বেশি দূরে নয়। আধাঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম। এসে একটি ছোট হোটেলে তিনটি রুম বুক করে নিই। তারপর বেরিয়ে একজনের কাছে জানতে পেলাম, গ্রামের চেয়ারম্যান এখন পারভেজের বড়ভাই রুবেল। শুরুতে আমরা তাদের বাসায় যাই।

এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share


পারভেজের আকস্মিক মৃত্যুর কথা জানতে পেয়ে এখানে তদন্ত করতে এসেছে, ভাইয়া এরূপ অজুহাত দেখিয়ে সবাইকে নিয়ে ভেতরে ঢুকল। আমি ঢুকিনি। কারণ আমি রুবেলের সৎভাই আদিলের বহুরূপী। তবে রুমটির জানালার পাশ দিয়ে তাদের কথাবার্তা শুনে রইলাম। রুবেল সাহেব বলছেন, পারভেজের মৃত্যু কীভাবে হয়েছে তা কেউ জানে না। ভাইয়ারা আর কথা না বাড়িয়ে মূল পয়েন্টে এলো।
‘আপনি কি সেলিম নামের কাউকে চেনেন?’
‘হ্যাঁ, সেলিম তো পারভেজের অনেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু।’
‘তিনি এখন কোথায়?’
‘আমার তো জানা নেই। পারভেজের মৃত্যুর পর সে এখান থেকে চলে গেছে।’
‘আপনার মতে এমন কেউ আছে, যে কিনা সেলিম সাহেবের ঠিকানা জানেন?’
‘না। তবে আগে সে এই গ্রামে থাকতো বউ আর বাচ্চাকে নিয়ে। তাদের খোঁজ নিয়ে দেখ। হয়তো সেলিমকে পেয়ে যাবে। কিন্তু ওকে কেন খুঁজছ তোমরা?’
ভাইয়া কিছুই বলছে না। এবার আমি বাসায় ঢুকলাম। রুবেলকে দেখে লাগছে, তার মাথার ওপর যেন বাজ পড়েছে। আমি সামনে গিয়ে বসে বললাম, ‘আমরা আদিলের আত্মাকে শান্তি দিতে এসেছি।’
‘ত-তুমি কে?’, তিনি কিছুটা আমতা আমতা করলেন।
‘তা বরং অজানাই থাক। আপনার আদরের ভাই নিজের কর্মের শাস্তিই ভোগ করেছেন। তিনি নিজস্বার্থে আপন সৎভাইয়ের খুন করেছেন এবং তার স্ত্রীকে কিডন্যাপ করিয়েছেন। তাঁকে তাদের মেয়েই মেরেছে। এখন রহস্য গুছল তো? এসবে সেলিমও তার সাথে দিয়েছে। তার কাছে শাস্তি পেতেই হবে।’
আদিলের বহুরূপীর রহস্য গুছিয়ে না দিয়েই বেরিয়ে পড়লাম। কিছু রহস্য উন্মোচন না করে প্রকৃতিকে বিস্ময়কর করে রাখাই শ্রেয়। অনেকের কাছে জিজ্ঞেস করি। কেউই জানে না সেলিমের সম্বন্ধে। আমরা আবার হোটেলে ফিরে এলাম। বিকেল হলে গ্রামের অবশিষ্ট জায়গায় জিজ্ঞাসাবাদ করে দেখেছি। গ্রামের শেষ প্রান্তে একটি চায়ের দোকানের এক ছেলে বলেছে, সেলিম তার স্ত্রী-বাচ্চাকে নিয়ে এখানেই থাকতো। পারভেজের মৃত্যুর পর সে বউয়ের সাথে ঝগড়া করে চলে গেছে। আর সে কোনোদিকে গেলে তার বউ কয়েকদিন বাপের বাড়ি ঘুরে আসে।
আরেক ঝামেলা, সেলিমের বউ কখন আসবে তা কে জানে? দিনটি কেটে গেল। পরদিন আমরা আবারও সেই জায়গায় যাই। এখনও তাদের বাসার দরজা বন্ধ।
সেলিমের স্ত্রীর খোঁজ না পেয়ে হতাশ হয়ে সবাই চলে এলাম। কী করা যায় তাই ভাবছিলাম।
‘এখন কি হাতে হাত রেখে বসে থাকতে হবে?’, নাদিয়া বলল, ‘সাবিলাকে পাব কোথায়?’
‘লতিফ মারা গেছে,’ আমি বললাম, ‘পারভেজও শাস্তি পেয়ে গেছে। এখন বাকি সেলিম। সাবিলা হয়তো সেলিমকেই খুঁজতে বেরিয়েছে। সে হয়তো কোনো সমস্যায় পড়েছে বা আমাদের মতোই দিশাহারা হয়ে গেছে। তার কাছে যে করে হোক, আমাদের পৌঁছতে হবেই।’
কিছুক্ষণ নীরবতা বিরাজ করল আমাদের মাঝে।
‘আবির,’ নাঈমা বলল, ‘আমরা ডায়েরিতে গ্রামের যে পুকুরটির সম্বন্ধে পড়েছিলাম, চলো আমরা ওখানে যাই। টাইম পাসও হবে। পুকুরটি একবার দেখাও হবে।’
‘এসব কী বলছ তুমি?’ সজীব বলল, ‘কীভাবে আমরা সাবিলাকে খুঁজব তা ভাবা উচিত, আর তুমি কিনা পুকুরঘাটে যাওয়ার কথা বলছ!’
‘ম্যাডামের হয়তো পিছলা খাওয়ার ইচ্ছা জেগেছে।’ আমি কিছুটা রসিকতা করেই বলি।
নাঈমার সাথে অবশ্য আগের মতো সম্পর্ক নেই। এখন নাঈমা আর সজীব একে অপরকে দুজনা খুব ভালোবাসে। যাইহোক, এতদিন পর সবার মুখে হাসি দেখা গেল।
‘দেখ,’ ভাইয়া বলল, ‘সে ভুল বলেনি। আমরা এখন কীই বা করব? সেলিমের বউয়ের অপেক্ষা করা ছাড়া তো আর কোনো উপায় দেখছি না। আমরা বরং পুকুরটিতে যাই। গ্রামে গেলাম বহুদিন হলো। পুকুরে সাঁতার কাটার কথা বেশ মনে পড়ছে।’
কথাবার্তা শেষে আদিলের বাড়ির পাশের পুকুরটিতে গেলাম। আমরা কাপড় নিয়ে পুকুরঘাটে নামি। বেশ বড় পুকুরটি। যাওয়ার সাথে সাথেই ছেলেরা পুকুরে লাফ দিই। নাদিয়া এবং নাঈমা পুকুরের অন্যান্য দিকে ঘুরে ঘুরে প্রকৃতি দেখছে। পুকুরের পাশে একটি বেশ সুন্দর ফুলগাছ আছে। এটির সম্বন্ধে ডায়েরিতে পড়েছিলাম। এই গাছটির নিচে সাবরিনা আর আদিল বসে গল্প করতো। ইশ, এক সময় এই মানুষগুলো এখানে একসাথে সময় কাটাতো। আজ একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন। আমরা অনেকক্ষণ সাঁতার কাটলাম। পুকুরের গভীরতা খুবই কম। পায়ের নাগালেই মাটি। সজীব পুকুরের মাঝ বরাবর ছিল। হঠাৎ সে আমাকে বলে উঠল, ‘বৎস, আমার মনে হচ্ছে, আমার পায়ের নিচে বড় কিছু একটা আছে।’
সজীবের কথা ফেলতে না পেরে আমি উদ্বিগ্ন হয়ে ওই জায়গায় গেলাম। পা দিয়ে হাঁটিয়ে, ডুব দিয়ে দেখলাম, সত্যিই পায়ের নিচে অনেক বড় একটা কিছু লাগছে। আমরা একে অপরকে বলাবলি করে ডুব দিয়ে জিনিসটি তোলে পুকুরপাড়ে আনি। এটি অনেক বড় একটি বস্তা। দেখে লাগছে, এখানে অনেক বড় কিছু একটা রাখা আছে। তবে ওজনের দিক থেকে তেমন ভারী ছিল না। তড়িঘড়ি করে কাপড় পাল্টালাম বস্তাটি খোলার জন্য।
কৌতুহলবশত, বস্তার মুখ খুলতে যাব, বস্তাটি নড়ে উঠল। আমরা ভয়ে পিছিয়ে গেলাম। বস্তাটির নড়াচড়া ক্রমশ বেড়েই চলেছে। পরক্ষণে বস্তা ছিঁড়ে ঝাঁপটিয়ে বেরিয়ে এলো বড় বড় দুটো সাদা ডানা। ডানাগুলো আমাদের সামনে হাওয়ায় ভাসতে লাগল। শুরুতে একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। পরমুহূর্তে তিনজনই জয়ের হাসি হাসতে লাগলাম সাবরিনার ডানা পাওয়ায়। ডানাগুলো অচল থাকার জন্যই সেলিম হয়তো পুকুরের পানিতে ফেলে দিয়েছিল। নাদিয়াদের আমরা ডাক দিই। তারা ছুটে এসে অবাক চোখে উড়ন্ত ডানাগুলো দেখতে লাগল। আমি সবার সাথে হাসাহাসি করতে করতে পকেট থেকে ব্যান্ডদুটো বের করে পরে নিলাম। ভিজে যাবে ভেবে খুলে রেখেছিলাম। ঠিক তখনই ডানাগুলোর ঝাপটানো বেড়ে গেল। ওগুলো মুহূর্তেই আমার পিছনে চলে গেল। আমি ডানাগুলো আশেপাশে খুঁজতে লাগলাম। সবাই বলে উঠল, ‘আবির, ডানা তোর পিঠে।’
লক্ষই করিনি ডানাগুলো কবে এসে আমার পিঠে বসেছে। পিঠে এখন ভারী কিছু অনুভব করতে লাগলাম। পরক্ষণে আমার শরীরে কেমন এক ধাক্কা অনুভব করি। আমি এই ধাক্কায় সামনে এগুতে লাগলাম। সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললাম, ‘ডানাগুলো হয়তো আমাকে কোথাও নিয়ে যেতে চাইছে। সবাই আমাকে ফলো কর।’
আমাকে সকলে ফলো করল। কিছুক্ষণ পর জনমানবপূর্ণ একটি রাস্তায় এসে উঠে পড়লাম। সাথে সাথেই ডানাগুলো অদৃশ্য হয়ে গেল। কিন্তু ওইগুলোর অবস্থান আমার পিঠে এখনও অনুভব করছি। ডানাগুলো হয়তো অন্য কাউকে দেখা দিতে চায় না। এখনও ডানাগুলো ধাক্কা দিচ্ছে। সবাই সেই অনুসারে চললাম। ডানাগুলোর ধাক্কায় এগুলে অনেক দূরে এসে একটি পুরনো বন্ধ ফ্যাক্টরির সামনে পৌঁছলাম। আমরা গেইটের সামনে দুটো গার্ড দেখে শীঘ্রই লুকিয়ে পড়লাম। ভাইয়া রিভলভার বের করে আমাদের বিপরীত দিকে নিশানা করে গুলি করল। গার্ডগুলো সাথে সাথে ওইদিকে দৌড় দেয়। আমরা সেই ফাঁকে গেটের ভেতর ঢুকে গেলাম।
ফ্যাক্টরির সামনে এলে এবার ডানাগুলো দৃশ্যমান হয়। সাথে সাথেই আমি উড়তে লাগলাম মাটি থেকে কয়েক ইঞ্চি উপরে। ভাইয়ারা দরজার তালা ভাঙতে লাগল। ভেঙে ফেললে ডানাগুলো স্বয়ং ঝাপটিয়ে উড়ে আমাকে ভেতরে নিয়ে যায়। সবাই আমার সাথে ভেতরে ঢুকল। ডানাগুলো আমাকে আবারও উড়িয়ে দু’তলার একটি রুমের সামনে এনে উপস্থিত করল। বাকি সবাই এলে আমরা দরজার তালা ভাঙতে লেগে পড়লাম। ডানাগুলোর ঝাপটানো ক্রমশ বেড়েই চলেছে। দরজা খুলতেই ডানাগুলো আমাকে এক সজোরে ধাক্কা দেয়। সেই ধাক্কায় গিয়ে আমি রুমটির ভেতরের মাটিতে পড়লাম। ডানাগুলো তৎক্ষণাৎ আমার পিঠ ছেড়ে কিছুদূরে গিয়ে অদৃশ্য কিছু একটার পেছনে বিরাজমান হলো। আমি উঠে দাঁড়াই। বাকিরা আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে আমার মতোই সবকিছু চেয়ে রইল। ইতোমধ্যে ডানাগুলো ঝাপটানো বন্ধ করে দিয়ে স্থির হয়ে গিয়েছে। আমি উঠে দাঁড়ালাম। ডানাগুলো আগে থেকে আরও ঝকঝকে হয়ে গেছে। যে জায়গায় ওগুলো আছে, ওখানে কয়েকটা স্টিলের শিকল ঝুলছে, যেন কিছু একটা বেঁধে রাখা হয়েছে। কিন্তু কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
আমরা গিয়ে তড়িঘড়ি করে শিকলগুলো খুলতে লেগে পড়লাম। মুহূর্তেই দুই জায়গায় সাদা কিছু আলো দৃশ্যমান হয়ে দুটো মেয়েতে পরিণত হলো। তার মধ্যে একটি সাবিলা। শিকল না খুলতেই সে এসে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার ঘন ঘন কাঁপুনি দেখে অনুভব করলাম, সে আমার মতোই কাঁদছে। আমি আবেগে নীরবে কেঁদেই চললাম। আজ কতদিন পরেই না তার সাথে দেখা!
‘সাবিলা,’ আমি বললাম, ‘তুমি ঠিক আছ তো?’
‘হু, আর স্যরি। আমি তোমাকে কোনোকিছুই বলিনি। বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম।’
‘আজ তোমার স্থলে আমি থাকলে আমিও তাই করতাম।’
বাকিরা সাবরিনার দিকে মুখকে হা করে তাকিয়েছিল। সাবিলার চোখের পানি মুছে দিয়ে আমি পরীর নিকট এসে দাঁড়ালাম। তাঁকে ছবিতে যেমনটা দেখে এসেছি, তিনি এখনও তেমনটাই, রূপবতী। চোখ সরানোর মতো নয়। দেখতে তাঁকে সাবিলার সমবয়সীই লাগছে। সাবিলা পরিচয় করিয়ে দেয়, ‘ইনি আমার মা।’
‘সবই জানি, তাঁকে ছবিতে দেখেছিলাম।’
‘তুমি সবই জেনে ফেলেছ?’
‘হ্যাঁ।’
‘আসলে আমিই বাবার শরীরটি কবর থেকে নিয়েছিলাম। এরপর তাঁর শরীরে প্রবেশ করে পারভেজকে শাস্তি দিয়েছি। কিন্তু সেলিমকে পাওয়ার আগেই সে পারভেজের মৃত্যুর রহস্য জেনে ফেলে। এরপর সে আমাকে বাবার শরীরে থাকা অবস্থায় ধরে তার গুণ্ডা মাধ্যমে শিকল দিয়ে পেঁচিয়ে এখানে এনেছে। পরে আমি বাবার দেহ ত্যাগ করলে তারা আমাকে মায়ের পাশে বেঁধে দেয়। আমি শিকলের কারণে এতদিন নিরুপায় হয়ে অদৃশ্য হয়ে ছিলাম।’
‘এখান থেকে আমাদের যথাশীঘ্র বেরুতে হবে। চলুন সবাই।’
কথা শেষ না করতেই অনেকগুলো গুন্ডা এসে আমাদের ঘিরে ধরল। ভাইয়া সাথে সাথেই রিভলভার বের করে কয়েকজনকে গুলি করে। আমি আর সজীবও যেটুকু সম্ভবত লড়াই করতে লাগলাম। এক পর্যায়ে আমাকে কয়েকজন ধরে মারতে লাগল। আমি একজন তাদের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারছি না। তখনই আশেপাশে ভয়ঙ্কর একটা তুফানের সৃষ্টি হলো। বালি উড়ছে, কেউ ভালো করে চোখ খুলতে পারছে না। চোখ পিটপিট করে পেছনে ফিরে তাকালাম, সাবরিনা তাঁর বড় ডানাগুলো দিয়ে এই তুফানের সৃষ্টি করেছে। এই সুযোগে আমি কয়েকজনকে মেরে ধরাশায়ী করলাম। একজন সুযোগ পেয়ে মোবাইল হাতে নিয়ে কাকে যেন কল করল। আমিও সুযোগে মোবাইলটা ছিনিয়ে নিই। তাদের বাকিরা জান বাঁচিয়ে পালাল।
আমি মোবাইল কানে দেওয়ার পর ওইপাশ থেকে কে যেন ঘনকণ্ঠে বলে উঠল, ‘কাজ হয়েছে কি? আর কারা ফ্যাক্টরিতে ঢুকেছে? তাদের তুলনায় তোমাদের সংখ্যা বেশি। আমি ওদের মরা মুখ দেখতে চাই।’
গলাকাঁপা কণ্ঠে আমি ভান করে বললাম, ‘তাদের সবাইকে মেরে ফেলেছি। তবে ওই পরী শিকলছাড়া হয়ে অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। আপনি তাড়াতাড়ি এখানে চলে আসুন।’
‘তোরা ওই পরীটিকে অল্প কিছুক্ষণ আটকিয়ে রাখার চেষ্টা কর্। আমি গ্রাম থেকে সামান্য দূরেই। এখনই আমি আরও স্টিলের ব্যবস্থা করে আসছি।’
আমি ফোন কেটে সাবরিনার কাছে গিয়ে বললাম, ‘আপনার ডানাগুলো যে কেটেছিল, সে এখন নিজ পায়ে হেঁটে তার মৃত্যুর দোয়ারে আসছে।’
সাবরিনা মায়াবী এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমার গালে হাত রেখে তিনি বললেন, ‘তুমি আদিলের অনুরূপ বুদ্ধিমান। আমি ঠিক তোমার মতোই একজন চেয়েছিলাম আমার মেয়ের জীবনসঙ্গি হিসেবে। তুমি চিরজীবী হও।’ এটুকু বলে তিনি চলে গেলেন পাশে পড়ে থাকা আদিলের লাশের কাছে। এরপর কাঁদতে লাগলেন, কিন্তু চোখে কোনো পানি নেই।
আমরা কিছুক্ষণ দরজার পাশে গিয়ে উৎপেতে রইলাম। প্রায় মিনিট দশেক পর দেখলাম, এক বয়স্ক লোক গাড়ি করে এসেছে। লোকটি দেখতে অনেক কুৎসিত। ঠিক তার হৃদয়ের মতো তার বীভৎস রূপ। সে নেমে হাতে করে অনেকগুলো স্টিলের শিকল নিয়ে এদিকে এগিয়ে আসছে।
সাবরিনা তাকে চিনলেন। এই সেই সেলিম, যে এক নির্দোষের বদ করেছিল, একটি পরীর কাছ থেকে তার ডানা আলাদা করেছিল। সে ঢুকতেই লাটি দিয়ে তার মাথায় সজোরে আঘাত করলাম। সে মাটিতে পড়ে গেল শিকলগুলো হাতে নিয়ে। তাকে পুনরায় আঘাত করতে যাব, একটা ছায়া এসে পড়ল। ডানাওয়ালা ছায়া। আমরা তাকে আর কিছুই করলাম না। বাকিটা সাবরিনার উপর ছেড়ে দিলাম। তিনি অসুর শক্তি নিয়ে সেলিমের আনা শিকলগুলো দিয়ে সেলিমকেই মারতে লাগলেন। সেলিম ব্যথায় ককিয়ে কেঁদে বলতে লাগল, ‘আমাকে ক্ষমা করে দাও, আমাকে মাফ করে দাও।’
তার একটা কথাও তিনি কর্ণপাত করলেন না। সর্বশক্তি নিয়ে তাকে মারতে লাগলেন। স্টিলের শিকলগুলো তাঁর হাতে থাকায় তাঁর হাত ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাচ্ছে। ওইদিকে তাঁর কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। মনের দুঃখ উজাড় করতে তিনি মেরেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। সেলিম তার গুনাহের শাস্তি পেয়ে গেছে। আমরা তাকে ফ্যাক্টরিতেই মাটি চাপা দিলাম। শেষ হলো লোভের কাহিনি। আমরা বেরিয়ে পড়ি।
সাবরিনা আমাদের আগেই চলে গেলেন। জঙ্গলের বাড়ির সামনে এলে শুনলাম, ভেতর থেকে কেউ একজনের করুণ সুরে কান্না করার আওয়াজ ভেসে আসছে। সেই কান্নায় আমার গা শিউরে উঠল। এই কান্না ওই মুহূর্তের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন আমি সাবিলার অপেক্ষায় ব্যথিত ছিলাম।
আমরা বাড়িটির ভেতরে ঢুকলাম। আদিলের আত্মা আর সাবরিনা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। উভয়ের চোখে পানি নেই। আমাদের দেখে তাঁরা দু’জন এগিয়ে এলেন। আর শুকরিয়া জানাতে লাগলেন। আমি তাদের পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নিই। একটু পর সাবিলা ডায়েরিটি নিয়ে আসে। আদিলের আত্মা নিজ হাতেই ওই অভিশপ্ত ডায়েরি জ্বালিয়ে দিলেন যাতে আগামীতে অন্য কোনো লোভী পারভেজের জন্ম না হয়। আদিলের আত্মা এখন হয়তো শান্তি পাচ্ছে। এখন সম্ভবত তিনি বাইরে বেরুতে পারবেন। তাঁরা আমাদের বিদায় দিলে আদিলের দেহ নিয়ে সাবরিনা বাহিরে বেরিয়ে উড়াল দিলেন। কিছুক্ষণ তাদের হাত নেড়ে বিদায় দিলাম। একটু পর তাঁরা আকাশের অসীমেই মিলিয়ে গেলেন। যাওয়ার সময় সাবরিনা বলে গিয়েছিলেন, তাঁদের সর্দারের সাহায্যে আদিলের আত্মা তাঁর শরীরে প্রবেশ করিয়ে জ্বীনের রূপ দান করাবেন। এতে করে আদিলের আত্মা ফিরে যাবে না।
আমি সাবিলাকে বাড়িটির চাবি দিয়ে বললাম, ‘এখন থেকে এই বাড়িটি তোমার, আমাদের।’
আমোদে সে নেচে উঠল। আমরা সবাই জঙ্গলের অন্য প্রান্তে গেলাম, কঙ্কালের গর্তের কাছে। কঙ্কালটি আগে থেকেই দাঁড়িয়েছিলেন। মুক্তি পেয়েছে দেখে হয়তো আমাদের অপেক্ষা করছিলেন। এবার ওটা আমাদের কাউকেই কিছু করেনি।
আমরা ছেলেরা কঙ্কালটি নিয়ে জানাজা পড়িয়ে কবর দিতে নিই। শেষ মুহূর্তে কঙ্কালটি হাত নেড়ে আমাদের বিদায় জানালেন। আমার চোখ থেকে একফোঁটা পানি বেরিয়ে পড়ল। কঙ্গালটা নিস্তেজ হয়ে পড়ল। আত্মা মুক্ত হয়ে গেছে। কেবল রেখে গেল কঙ্কাল। আমি মাটি দেওয়ার সময় আদিলের গর্তে পাওয়া ঘড়িটি ভদ্রলোকটির কবরের মাটিতে ফেলে দাফন করিয়ে দিলাম। সবার চোখ শ্রদ্ধাঞ্জলিতে ভিজে গেছে।
সবশেষে আমরা বাড়ির দিকে রওনা দিই। আমার হাত থেকে কালো একটি ব্যান্ড নিয়ে সাবিলার হাতে পরিয়ে দিলাম। আর তার হারিয়ে ফেলা নূপুরটি আবারও তার অন্যপায়ে পরিয়ে দিই।
সে রসিকতা করে বলে উঠল, ‘পায়েলটা কোথায় পেয়েছ তা জিজ্ঞেস করব না। কারণ আমি সবকিছুই জানি।’ সে গলা খুলে উঁচু স্বরে হাসল। আমি সেই হাসি মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইলাম।
পরদিন আমরা জঙ্গলের বাড়িতে তালা লাগিয়ে শহরে চলে যাই। দুটো দিন কেটে গেলে মা-বাবা গ্রামের বাড়ি থেকে চলে এলেন। বাবা বড় করে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন, সাবিলাকে গৃহবধূ হিসেবে গ্রহণ করার জন্য। আমি তার জন্য অনেক বড় একটি সারপ্রাইজ রেডি করে রেখেছি। সবশেষে সঠিক সময়টি এলে তাকে তার চোখ বন্ধ করিয়ে একটি জায়গায় আমার বাকি সঙ্গি সকলের সামনে নিয়ে এলাম। চোখ খুলতেই সে অবাক হলো। খুশিতে আত্মহারা হয়ে যাওয়ায় তার চোখ থেকে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ল। কারণ তার সামনে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছেন রূপবতী পরী সাবরিনা ও বুদ্ধিমান জ্বীন আদিল। এই সময় আমি গিয়ে আমার ডুপ্লিকেট পারসন ও শাশুড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজেই এক রহস্যময় হাসি হাসলাম।
(সমাপ্ত….!)
লেখা: ফারিয়া কাউছার
[গল্পটা খুব কাল্পনিক। তবে এটার মাধ্যমেই লেখালেখির যাত্রার শুরু বলে একে খুব গুরুত্ব দিই। বেশিরভাগই কপি হচ্ছে। অনেক জায়গায় ক্রেডিট ছাড়াই। 🙁 যাইহোক, এতদিন নীরবে অনেকেই পড়লেন। এইবার তো nxt লিখতে পারবেন না। অন্তত আপনার অনুভূতিটা কমেন্ট করবেন। এতে করে আমিও উৎসাহ পেতে পারি। আর তাছাড়া এটা এমনভাবে শেষ করলাম যে, সহজেই সিরিজ করা যাবে না। তাই অনেকের রিকুয়েস্টেও পরীর প্রেম ২ লেখার চিন্তা কখনও করিনি। তবে আশা করা যায়, ওদের সিকুয়েন্স নিয়ে গল্প আরও পাবেন।]