পরী পর্ব ১৩..

0
516

পরী পর্ব ১৩..

বেশ কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ থেকে আমরা বিগত কথাগুলোই ভাবতে লাগলাম।
‘এখন খাওয়ার সময় হয়েছে।’ নাদিয়া বলল, ‘চল সবাই। আমরা বাকি কিছু পরে দেখব।’
তার কথায় সবাই চলে যাচ্ছে। তাদের হয়তো ক্ষিধে পেয়েছে। কিন্তু আমার রাতের ঘুম, পেটের ক্ষুধা সবই হারিয়ে গেছে সেই রাতে। অনেক স্বপ্ন বুনেছিলাম, মনের মানুষটাকে আজীবন পাশে রাখব, আগলে রাখব। কিন্তু তা আর হয়ে উঠল না। আর এই রুমটি, এই রুমের প্রতিটি জিনিসই যেন আমার সাথে কথা বলতে চায়।
ভাইয়া এসে আমাকে টেনে নিয়ে যায়। বসার ঘরে খাওয়ার সময় কেবল রুমটিকেই দেখছিলাম। দরজাটি এখনও খোলা। মনের ভেতর কেমন এক বিষণ্ণতা, অস্থিরতা ছড়িয়ে আছে। কেন যেন লাগছে বারংবার, রুমটি আমাকে ডাকছে। এসো, আমার কাছে এসো। সব প্রশ্নের উত্তর পাবে।
খাওয়ার অধ্যায় শেষ করে সবাই আবার রুমটিতে গেলাম। এইবারও কিছুই পাইনি। আমি রুমে কিছুক্ষণ পায়চারি করলাম।
‘এখানে একটি ডায়েরি পাওয়ার কথা।’ ভাইয়া বলল, ‘কোনোদিকে ডায়রিটা পেলাম না কেন?’
‘দেয়ালের লেখাগুলো যে লিখেছে, সে বোধহয় সাবিলার আপন কেউ।’ নাদিয়া বলল, ‘ওকে মা বলে সম্বোধন করেছে।’
‘এমনও হতে পারে যে,’ সজীব বলল, ‘সাবিলা ডায়রিটা পেয়েছে আর সাথে করে নিয়ে গেছে।’
সজীবের কথা শুনে ঘুরে ভ্রূ কুঞ্চিত করে ওর দিকে তাকাই, ‘সজীব, একটা কথা বল তো। তুই যে রাতে আকবর আঙ্কেলকে রাস্তায় দিয়ে এসে তাঁর বাসায় ঢুকেছিলি, তখন উপরের তালার জানালা দিয়ে কি কেউ তোকে দেখেছিল?’
‘না তো। উপরের তলায় কেউ আদৌ থাকে না। তাদের প্রয়োজন হয় না। হ্যাঁ, জানালা মাঝে মাঝে খোলা রাখা হয় রুমগুলোয় আলো ঢোকার জন্য। আর কেউ না দেখে মতোই আমি ঢুকেছিলাম।
‘তার মানে এই কেস্ আমরা সলভ্ করিনি।’ ভাইয়া বলল, ‘সাবিলাই আমাদেরকে খুনির কাছে পৌঁছিয়েছে। আমরা তো স্রেফ তাকে ধরার উৎস ছিলাম।’

এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share

‘মানে?’ সজীব বলে উঠল।
‘সাবিলাই আমাদেরকে তোর কথা বলেছিল।’ আমি বললাম, ‘বলেছে, সে জানালা দিয়ে তোকে সেই রাতে আজাদ আঙ্কেলের বাসায় ঢুকতে দেখেছিল। আরও বলল, সে আর তার আপু সে রাতে উপরের রুমটায় ঘুমিয়েছিল। এটা জানার কারণেই আমরা কেসটা সলভ্ করতে পেরেছি। আমরা তোর কথা জানার পর ইভার কাছে তোর পরিচয় পেলাম। তারপর রবিনের কাছে তোর ইচ্ছার সম্বন্ধে জানলাম। তোকে পাওয়ার পর খালেককে পেলাম যে কিনা লতিফের হয়ে কাজ করত। খালেকের কারণে লতিফকে পাই। এখন লতিফের আকস্মিক এক্সিডেন্টে তার মৃত্যু হয়। এতে করে আমার বহুরূপীর একজন খুনির শাস্তি হয়। এরপর পারভেজ মারা পড়ে। এখন বাকি আছে সেলিম।’
ভাইয়া বলল, ‘এসবের পেছনে সাবিলা নয় তো?’
‘সে হয়তো আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু লুকিয়েছে। কিন্তু ওর ভালোবাসা মিথ্যে ছিল না। এসবের পেছনে কেবল সেই হতে পারে না। আর সে যদি আমাকে ভালো না বাসতো, তবে আমার নিরাপত্তার জন্য তাবিজ নিজেরটাও আমায় পরিয়ে যেত না। আজ আমি কঙ্কালটার সাথে দেখা করেছিলাম। সে আমাকে কিছুই করেনি এই তাবিজ আমার সাথে থাকায়।’
‘সেই রাতে জঙ্গলের পশুপাখিরা সবাই কীভাবেই না ওকে ঘিরে ধরেছিল!’ হঠাৎ নাদিয়া বলল, ‘ওকে কেউ কিছু করেনি। ওর মুখে একটুও ভয় দেখা যায়নি। অথচ আমরা ভয়ে কাঁপছিলাম। সাবিলাকে আমার শুরু থেকেই কেমন অদ্ভুত মনে হতো। মুখ দিয়ে কিছু বলার আগেই মেয়েটি বুঝে যেত।’
এরপর আবারও চারিদিকটা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। কোনোকিছুর হদিস না পেয়ে আমরা বসে রইলাম। হঠাৎ আমার বামহাতে প্রচণ্ড রকমের ব্যথা অনুভব করলাম। ব্যথা নয়, একপ্রকার টান। হাতটা তুলে দেখলাম। বোধ হচ্ছে, কালো ব্যান্ডগুলো আমার হাতকে জোরে জোরে টানছে। আমি এই টানে উঠে দাঁড়ালাম। আমার হাতে এখনও টান পড়ছে। আমি সামনে এগুতে লাগলাম। যতই এগুই ব্যান্ডগুলো আমার হাত টেনে আমাকে আরও সামনে নিয়ে যায়। সবাই আমাকে জিজ্ঞেস করছে, কেন আমি এমনটা করছি। নিজেরই বাকশক্তি কাজ করছে না। আমি আসতে আসতে ওই ছবিটার সামনে এসে দাঁড়ালাম, যেটাতে আমার বহুরূপী আর তার স্ত্রী ফ্রেমবদ্ধ আছে। এটা বিছানার সাথে লাগানো দেয়ালটায় টাঙানো। এখন আমার হাত স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। কোনো টান পড়ছে না। আমি ছবিটার দিকে চেয়ে রইলাম। বিছানায় ভাইয়াও উঠে এসেছে। কী হয়েছে জিজ্ঞেস করছে। আমি বললাম, ‘জানি না। এই ছবিটাতে বোধহয় কিছু আছে।’ ফ্রেমটা আমি হাতে নিয়ে দেখতে লাগলাম।
‘আবির,’ ভাইয়া বলে উঠল, ‘এদিকে দেখ।’
দেয়ালের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, যেখান থেকে ফ্রেমটা নিয়েছি, ওখানে ওই দেয়ালে একটি ছোট দরজা। দেখে লাগছে, কোনোকিছু গোপনভাবে এখানে রাখা হয়েছে। দরজাটি খোলামাত্র কিছু তাবিজ দেখতে পেলাম। ভেতরে কী আছে দেখা যাচ্ছে না। ভাইয়া তাবিজের মধ্য দিয়ে হাত ঢোকাতে গেলেই সে ছিটকে বিছানায় পড়ল। ফ্রেম রেখে তাকে তুললাম। অন্যরাও ইতোমধ্যে বিছানায় উঠে এলো।
‘বাপরে!’, ভাইয়া ক্ষীণ স্বরে বলল, ‘কীভাবেই না শক্ খেয়েছি বলে বুঝাতে পারব না। সম্ভবত এই তাবিজগুলোর কারণেই।’
আমি কাউকে না জানিয়ে সাহস করে ওখানে আমার বামহাত ঢুকিয়ে দিলাম। হাতটা অনায়াসে ঢুকেছে। সবাই তা অবাক হয়ে দেখে আছে। বলা বাহুল্য, আমিও কম আশ্চর্যান্বিত নই। ভেতরে কিছুক্ষণ হাতরানোর পর আমি আনন্দে চিৎকার করে উঠলাম, ‘এখানে কিছু একটা আছে।’
‘আবির কী আছে টেনে আন।’ বেশ কয়েকটা আওয়াজ শোনা গেল।
জিনিসটা ভারী, টেনে আনলাম। এটা অন্য কিছু নয়, সেই ডায়েরিটিই। সবার সামনে উপুড় করে তোলে দেখিয়ে মুচকি হাসি হাসলাম। ডায়েরি দেখে আমার ন্যায় বাকিরাও খুশি হলো।
‘আবির,’ সজীবের প্রশ্ন, ‘এটা তুই কীভাবে করলি?’
‘সবই এই ব্যান্ডগুলোর কারসাজি। এগুলোই আমাকে ছবিটার কাছে এনেছে। আর ছবির ফ্রেমের পেছনে এই ডায়েরি লুকিয়ে রাখা হয়েছে বিধায় তাবিজগুলো ডায়েরির সুরক্ষার জন্য হয়তো দেওয়া হয়েছে। আর আমার বামহাতের তাবিজগুলোর কারণেই খুব সম্ভব আমার কিছু হয়নি।’
সবাই রুম থেকে ডায়েরি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। ডায়েরিকে মাঝখানে রেখে সবাই গোল করে বসলাম। বসার পর ডায়েরির মলাট ধরার আগেই বাহির থেকে হঠাৎ কিছু কুকুরের ঘেউঘেউ ভেসে এলো। দুয়েকটা নয়, অনেকগুলো কুকুরের আওয়াজ। আমরা সবাই কিঞ্চিত অবাক হলাম, এই সময় কুকুর কোথা থেকে এসেছে ভেবে। ডায়েরিটা আমি বুকে চেপে ধরি। ভাইয়া আর সজীব গিয়ে দরজা খুলল। আমরাও পিছু পিছু গেলাম। একি! অনেকগুলো কুকুর পুরোটা বাড়ি যে ঘিরে রেখেছে! পাগলা কুকুরদের মতোই ঘেউঘেউ করে চলেছে। আমাদের দরজার কাছে দেখে কয়েকটা কুকুর আমাদের দিকেই তেড়ে এলো। তড়িঘড়ি করে ডায়েরিটা নাদিয়াকে দিয়ে তাকে ঘরে ঢুকিয়ে ফেলি। কারণ বিপদজনক এই ডায়রিটার রক্ষা এখন আমাদেরই করতে হবে। দরজা বেঁধে দিতেই কুকুরগুলো আমাকে আক্রমণ করতে লাফিয়ে পড়ল। অপ্রস্তুত থাকায় চোখ বেঁধে ফেললাম। কয়েকটা সেকেন্ড নিস্তব্ধ পেরিয়ে গেল। আমার কিছুই হলো না। হঠাৎ বাঘের এক হাড় কাঁপানো গর্জন শুনতে পেলাম। চোখ খুলে দেখলাম, সেদিনের বাঘটি ওদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আমার বিস্ময় তখনও কাটল না, যখন দেখলাম বাঘটি ইতোমধ্যে হিংস্র ভাবে কামড় দিয়ে কয়েকটা কুকুরের জান কবজ করে ফেলেছে। এমতাবস্থায়, ভাইয়া আর সজীব আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। এখন বাঘটিকে ঘিরে আছে কুকুরগুলো। বাঘটি একটু সরে গিয়ে প্রবল জোরে গর্জন করতে উঠল, পূর্বের ন্যায় পুরো জঙ্গল কেঁপে উঠার মতো। মুহূর্তেই সেদিনের ন্যায় অনেক প্রজাতির প্রাণী ছুটে এসেছে। আমাদের সামনেই সবাই কুকুরগুলোর উপর হামলা করছে। ইতোমধ্যে এদের মাঝে তুমুল লড়াই বেঁধে গেল। ভাইয়া কী ভেবে যেন তার রিভলভার বের করে জঙ্গলের অন্য দিকে ছুটে যায়। বেশ কিছুক্ষণ পর আমাদের সাহায্য ব্যতীতই অনেক কুকুর মারা যায় এবং কয়েকটা পালিয়ে গেল। এরপর প্রাণীগুলো সব ধীরে ধীরে জঙ্গলের আঁধারে মিলিয়ে গেল। এসব কোত্থেকে এসেছে? আমাদের বাঁচানোর জন্য এতকিছু কেন করেছে? অঘটন যেসব হচ্ছে, তার হদিস পাব কোথায়? কে দেবে? ডায়েরি? ওখানে আছে সবকিছু? যে করেই হোক, আজ আমার ডায়েরিটা পড়তেই হবে।
একটু পর ভাইয়া জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলো। সাথে করে একটি ছেলেকে শার্টের কলার ধরে টেনে আনছে। ছেলেটির সারা গায়ের এদিক-ওদিক ট্যাটু। পা দিয়ে রক্ত ঝরছে।
‘ভাইয়া, কে এই ছেলে?’
‘এই ছেলেটিই কুকুরগুলোকে এনেছিল।’ ভাইয়া কলার ছেড়ে দিয়ে ছেলেটিকে দোয়ারে ফেলে দেয়।
‘বল,’ ভাইয়া ধমকের সুরে বলল, ‘তুই এই কুকুরগুলোকে আমাদের মারতে কেন পাঠিয়েছিস?’
‘স্যার, আমাকে টাকা দেওয়া হয়েছিল এমনটা করার জন্য। আমি আর কিছুই জানি না।
‘কে তোকে টাকা দিয়েছে?’
‘মিস্টার সেলিম।’
আমি এবং ভাইয়া উভয়েই একত্রে বিস্ময়ের সাথে বললাম, ‘সেলিম?’
‘হ্যাঁ, আমি পোষা কুকুর নিয়ে ব্যবসা করি। আসলে আমি তার পরিচিত কাস্টমার। কয়েকদিন আগে এসে আমার পোষা কুকুরগুলো দিয়ে তিনি আপনাদের উপর আক্রমণ করাতে বলে গেলেন। তিনি আমার কাছে টাকাও পাঠিয়েছেন।’
‘এখন সেলিম কোথায়?’
‘আমি জানি না।’
‘সে থাকে কোথায় সেটা জানো?’
‘আমি একবার শুনেছিলাম তিনি কোন একটা গ্রামে থাকেন।’
‘গ্রামের নাম তো বলো?’
‘মনে পড়ছে না। কেমন এক আনকমন নাম ছিল। হাজি…’
‘হাজিরাপুর?’, আমি বলে উঠি।
‘হ্যাঁ হ্যাঁ। হাজিরাপুর।’
আমরা দু’জনই বিস্ময় বিনিময় করলাম, ‘ঠিক আছে, তুমি যেতে পারো।’
‘থ্যাংক ইউ স্যার।’
‘ওয়েট, এক মিনিট দাঁড়াও।’
সজীব ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে এলো। ভাইয়া আর সে ছেলেটির পায়ের গুলি বের করে আপাতত ব্যান্ডেজ করে দেয়। ভাইয়া তাকে চিকিৎসার টাকা দিতে চাইলে ছেলেটি তা প্রত্যাখ্যান করে চলে যায়।
‘ভাইয়া,’ তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুই ছেলেটিকে কোথায় পেয়েছিস?’
‘কুকুরগুলো আসার পর যখন জঙ্গলের প্রাণীরা এসে পড়ে, তখন আমি জঙ্গলের ভেতরে কেউ একজনকে পালাতে দেখে রিভলভার নিয়ে দৌড় দিয়েছিলাম। দেখলাম, ছেলেটিকে একটি শেয়াল তাড়া করে জঙ্গল থেকে বের করিয়ে দিচ্ছে। সে রাস্তায় উঠে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে থাকে। তার অজান্তেই আমি গিয়ে তাকে ধরে ফেললাম। সে পালানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলে তার পায়ে গুলি করে তাকে এখানে নিয়ে আসি। ওসব কথা বাদ দে। তোরা গিয়ে কুকুরগুলোকে কোনোদিকে ঠিকানা করে দিয়ে আয়।’
আমি আর সজীব জঙ্গলে কুকুরগুলোকে গনকবর দিয়ে এলাম। এরপর আমরা সকলে পুনরায় ডায়েরিটিকে ঘিরে মাঝখানে রেখে অনেক আগ্রহ নিয়ে পড়তে বসি। আর শপথ নিয়েছি, পরীর শক্তির ব্যবহার সম্বন্ধে কিছু থাকলেও পড়ব না। আমি ডায়েরির মলাট ধরতে গেলে তারই মধ্যে কারেন্ট চলে যায়। অগত্যা একটি মোম জ্বালিয়ে মাঝখানে রেখে আবারও বসলাম। ডায়েরিটি ধরতেই ডায়েরির মধ্যে দুটো চোখ দৃশ্যমান হয়। আমরা প্রচণ্ড ঘাবড়ে গিয়ে একে অপরের হাত ধরে ফেললাম। আমাদের বিস্মিত করে দিয়ে ডায়েরিটা কথা বলা শুরু করেছে; “এটি একটি মায়াবী ডায়েরি। আমি এই ডায়েরির রক্ষক। আমার তিনজন মালিক ব্যতিত অন্য কাউকে পড়তে দেওয়া নিষিদ্ধ। অন্য কেউ পড়তে চাইলে তার কাছে আমার শর্ত মানতে হবে। শর্ত হলো: পাঠককে তার স্বর, আর তার শরীরের শক্তির বলি দিতে হবে। অর্থাৎ পাঠক এই ডায়েরি পড়ার পর বোবা এবং পঙ্গু হয়ে যাবে। বলো পাঠক, এই শর্ত কি তোমার মঞ্জুর?”
সবাই হতভম্ব হয়ে ঢোক গিললাম। এসব শুনে ডায়েরি পড়ার সাধটাই মিটে গেছে।
‘আবির,’ সজীব বলল, ‘একটি মানুষের বোবা ও পঙ্গু হয়ে যাওয়া মৃত্যুর চেয়ারে বসে থাকার সমতুল্য। বাদ দে, পড়তে হবে না।’
‘ধুর,’ নাদিয়া বলল, ‘একটি ডায়েরি কীভাবে কারো স্বর-শক্তি নিতে পারে? যত্তসব ফালতু। আবির পড়, সমস্যা নেই।’
ডায়েরি বলল, “আমি একটি সামান্য ডায়েরি ভেবে উপহাস করো না বালিকা। একটা মূর্খ এই শর্তগুলোকে অবহেলা করেছে বিধায় আজ তার করুণ অবস্থা।”
আমার হঠাৎ পারভেজের কথা মনে পড়ে গেল।
‘সবাই শোন,’ আমি বললাম, ‘পারভেজই ডায়েরিটা পড়েছে। সে পঙ্গু আর বোবা ছিল। তার মানে এই ডায়েরির শর্তগুলো সঠিক।’
ভাইয়া গম্ভীরভাবে চিন্তায় মগ্ন, ‘এখন কী করা যায়?’
আমি আমার বামহাতের কালো ব্যান্ডগুলোর দিকে তাকালাম। এই দুটো ব্যান্দের কারণেই ডায়েরিটি পেয়েছিলাম। সেই বামহাত দিয়ে আমি ডায়েরিটি ধরতে যাই। সবাই বলছে, ‘আবির এ কী করছিস? ওটা খুলিস না।’
ডায়েরিটার চোখের সামনে আমার মুখ নিয়ে গিয়ে দেখালাম। ডায়েরি বলল, “স্বাগতম আপনাকে।”
আমার দিকে সবাই অবাক চোখে তাকালো। আমি রহস্যময় এক হাসি হেসে বললাম, ‘আগে যেহেতু আমার বহুরূপী তার স্ত্রীকে নিয়ে এখানে থাকতো, হোক না হোক এটা তাদেরই ডায়েরি। তাদের ছাড়া অন্য কারো পড়ার অনুমতি নেই। আর আমার চেহারা ওদের একজনের মতোই। হা হা হা, এই কারণে অনুমতি পেয়ে গেলাম।’
এমনটা বলতেই ডায়েরিও হেসে উঠল আমাকে ব্যঙ্গ করে। বলল; “আমাকে কি মূর্খ ভাবো? আমি কি বিনা কারণেই অনুমতি দিয়েছি আপনাকে? না, আপনারা সৎ লোক। পারভেজের মতো বিপদজনক না। আর আপনি দ্বিতীয় মালিকের প্রার্থনার প্রতিদান। তাই আপনাকে শর্ত ছাড়া পড়তে অনুমতি দিলাম। মালিকদের হৃদস্পন্দন এখানে পৌঁছায় না। তাঁরা সম্ভবত বিপদে পড়েছে। আপনারা তাদের সাহায্য করতে পারবেন ভেবে আপনাদের ক্ষেত্রে শর্তটা প্রযোজ্য করছি না।”
‘আমি প্রার্থনার প্রতিদান মানে?’
“ডায়েরিটা পড়লে সব বুঝে যাবেন। পাঠক, প্রবেশ করুন।”
আমি ডায়েরির মলাট উল্টালাম। প্রথম পৃষ্ঠা খালি।
ডায়েরি নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, “আমাকে মালিকরা পাঠ করলে কথা বলি না। আপনাদের ক্ষেত্রে বলব। এই ডায়েরিটা ডিগ্রী শেষ করার খুশিতে এক বৃদ্ধলোক তার ছেলেকে উপহার হিসেবে দেয়। এখন মূল পাতায় প্রবেশ করুন।”
দ্বিতীয় পৃষ্ঠা উল্টালাম। ওখানের খচিত অঙ্কন দেখে সকলেই অবাক হয়ে যাই। ওখানে আমার বহুরূপীর জীবন্তকালের ছবি। তার গঠন, চেহারা, হাসি সবই আমার মতো। ছবিটা আলাদা নয়, পেইজের মধ্যেই সাদাকালো হয়ে অঙ্কিত।
ডায়েরি বলল, “এই ছেলেকেই ডায়েরি উপহার দেওয়া হয়েছিল। তিনি আমার প্রথম মালিক। এই ডায়েরিতে কিছু ছবি আছে। তাও আমি নিজেই লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তী পাতায় প্রবেশ করুন।”
পরের পেইজে কিছু লেখা আছে। সম্ভবত ছেলেটিই লিখেছে।
ডায়েরি বলল, “লেখাগুলো প্রথম মালিক লিখেছেন। পড়তে পারেন।”
আমার বহুরূপীর সম্বন্ধে জানা উচিত ভেবে পড়তে লাগলাম, “আমি আদিল হোসেন। এইমাত্র বিএ পাস করলাম। এই কারণে আব্বা এটি উপহার দিয়েছেন। প্রথম পেইজটা খালিই রাখলাম।
পরিবার: আমি ছোট থাকতেই মা মারা গেছেন। আব্বা এক বিধবা মহিলাকে বিয়ে করেন, যার কিনা আমার চেয়ে বড় দুটো ছেলে আছে। বড় ভাইয়ার নাম মোহাম্মদ রুবেল, মেজ ভাইয়ার নাম মোহাম্মদ পারভেজ। এছাড়া আমার বেশ কিছু সহপাঠী আছে।” এভাবে পরের দুয়েক পৃষ্ঠায়ও সে নিজের সম্বন্ধে লিখেছে। তারও ভ্রমণ অনেক পছন্দ। ভ্রমণকাহিনি বিষয়ক বই পড়তে তারও ভালো লাগে। কিন্তু সে কোনোদিকে যেতে পারে না। দুটো ভাই থাকার সত্ত্বেও তার একার কাছেই পরিবারের সংসার চালাতে হয়। এই কারণে তার কোনোদিকে ভ্রমন করা হয় না। তাদের গ্রামটা পরিসরে খুবই ছোট। আদিলের বাবা এই গ্রামের চেয়ারম্যান। এরই সুযোগ নিয়ে দুটো ভাই গ্রামের মধ্যে মাস্তানি করে বেড়ায়। কিন্তু চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি পর্যাপ্ত ধনী ছিলেন না।
(চলবে..)
লেখা : ফারিয়া কাউছার