নিষিদ্ধ প্রেম পর্ব-০৫

0
521

#নিষিদ্ধ প্রেম
#জান্নাতুল ফারিয়া প্রত্যাশা
|৫|
~
দুই দিন পেরিয়ে গেল। পরদিন এক বিকেলে অরিক গেল কাছেরই একটা কফি শপে। রাইমাকেও সে সেখানে আসতে বলেছে। অরিক আগে আগেই পৌঁছে গেছিল। তাই সে কফি শপের এক কোণে সে গিয়ে বসল। হাতে ফোনটা নিয়ে দেখল চারটা পঁচিশ বাজে। সে অপেক্ষা করতে থাকে। প্রায় পনেরো মিনিট পর সেখানে রাইমার আগমন ঘটে। অরিকের অগোছাল দৃষ্টি হঠাৎ রাইমার উপর পড়তেই সে যেন কিছুক্ষণের জন্য আটকে গেল। খেয়াল করে দেখল, মেয়েটা ভীষণ সুন্দর। আর তার সবথেকে সুন্দর জিনিসটা হলো তার চুল। একেবারে কোমর ছুঁয়েছে। বিনুনি বাঁধা চুলে যেন স্নিগ্ধ লাগছে তাকে। রাইমা এসে চেয়ার টেনে বসতেই অরিক চোখ নামিয়ে ফেলল। নিজের আগের মুডে ফিরে গেল সে। গম্ভীর গম্ভীর চোখ মুখ করে রাইমার দিকে তাকাল। রাইমা তখন বিরস মুখে তাকে জিগ্যেস করলো,

‘কেন ডেকেছেন আমায়?’

‘বলছি।’

এইটুকু বলে অরিক প্রথমে একজন ওয়েটারকে ডেকে দুইটা কফি অর্ডার দিয়ে নিল। ওয়েটার অর্ডার নিয়ে চলে যাওয়ার পর অরিক দুহাত টেবিলের উপর রেখে সোজা হয়ে বসল। চোখ বুজে একটা তপ্ত নিশ্বাস ছাড়ল। তারপর মিহি কন্ঠে বললো,

‘আমি সরি রাইমা। আমি জানি আমি খুব ভুল করেছি, জঘন্য ভুল করেছি। এই ভুলের কোনো ক্ষমা হয় না। তাও আমি ক্ষমা চাইছি, মন থেকে চাইছি। প্লীজ রাইমা, প্লীজ আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমি আর এত প্রেসার নিতে পারছি না। হ্যাঁ, আমি আপনাকে বিয়ে করবো। আর পাঁচটা মানুষের মতো আমরাও ছোট্ট একটা সংসার গড়ে তুলবো। আমি আপনাকে প্রমিস করছি, নিজের সবটুকু দিয়ে আমি চেষ্টা করবো আপনার সব কষ্ট দূর করে দেওয়ার জন্য। আপনি প্লীজ আমাকে একটা সুযোগ দিন, প্লীজ।’

অরিক থামল। চোখ মুখ ফ্যাকাশে হয়ে আছে তার। রাইমা অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল অরিকের দিকে। তার মধ্যে কোনো হেল দোল নেই। অরিক থমথমে কন্ঠে জিগ্যেস করলো,

‘কি হলো, রাইমা? কিছু বলছেন না কেন?’

রাইমা জিভ দিয়ে তার ঠোঁট ভেজাল। একটু নড়েচড়ে বসে অতঃপর বললো,

‘আচ্ছা, আপনার তো বোন আছে। বোনকে নিশ্চয়ই খুব ভালোবাসেন? যদি আজকে আপনার বোনের সাথে এমন কিছু হয়, যদি তার চরিত্রেও কেউ এইভাবে কালি মেখে দেয়; তবে আপনি কি করবেন? পারবেন সেই লোকটাকে ক্ষমা করে দিতে? নিজের মনকে একবার প্রশ্ন করে দেখুন তো সে কি বলে। যদি আপনার মন বলে হ্যাঁ আপনি ঐ ব্যাক্তিকে ক্ষমা করে দিতে পারবেন, তবে ঠিক আছে আমিও আপনাকে ক্ষমা করে দেব। এবার আপনিই বলুন, কি বলছে আপনার মন? পারবেন ক্ষমা করতে?’

অরিক তার কথার পিঠে আর কোনো কথা খুঁজে পেল না। সে থম মেরে নিচের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। রাইমা তখন তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো,

‘পারবেন না তাই তো? কারণ ও তো আপনার বোন, আপনার পৃথিবী। নিজের বোনের বেলায় যেটা ভাবতে পারেন, সেটা অন্যের বোনের বেলায় কেন ভাবতে পারেন না বলুন তো? আমার হয়তো ভাই নেই তবে আমার তো মা বাবা আছে, ওদের কাছে আমি অক্সিজের। ওদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। জানেন আমার মা বাবা এখনও কিছুই জানেন না। জানলে বাঁচবে না। মরে যাবে। আপনি একবার ভাবুন তো আপনি কি করেছেন। শুধু একটা না তিন তিনটা প্রাণকে আপনি মেরে ফেলেছেন। একটা সুন্দর জীবন, সুন্দর পরিবারকে নষ্ট করে দিয়েছেন। জানেন আমি কিভাবে বেঁচে আছি? নিজের এই শরীরটা দেখলে কতটা ঘৃণা লাগে জানেন? ইচ্ছে করে নিজেকে নিজে শেষ করে দেই। কিন্তু পারি না, মা বাবার জন্য পারি না। আপনি এই কষ্ট কোনোদিনও বুঝবেন না। কারণ আপনি তো কোন মানুষ না, কেবল যৌন ক্ষুধায় ক্ষুধার্ত এক প্রাণী। মন, মস্তিষ্ক, বিবেক কোনোটাই আপনার নেই।’

এইটুকু বলে রাইমা থামল। জোরে দম ফেলে আবারও সে বললো,

‘ক্ষমা করবেন আমাকে, আপনার মতো একটা মানুষকে আমি কখনো ক্ষমা করতে পারব না।’

কথাটা শেষ করেই রাইমা উঠে দাঁড়ায়। তারপর হনহন করে বেরিয়ে যায় সেখান থেকে। অরিক স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে। শেষের কথাগুলো খুব লেগেছে তার। এখন মনে হচ্ছে ক্ষমা চাওয়ারই উচিত হয়নি। নিরবের আইডিয়া শুনতে গিয়ে আবারও একবার অপমানিত হলো সে। রাগে দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিল। কপালের রগ ফুলে উঠল তখন। এইভাবে অপমান আজ পর্যন্ত কেউ করেনি তাকে। মেয়েটা ইচ্ছে করেই এমন করছে। চাইলেই তাকে ক্ষমা করে দিতে পারতো। কিন্তু তা না করে সে ব্যাপারটাকে আরো জটিল করছে। সে ইচ্ছে করেই ঝামেলা পাকাতে চাইছে। তবে এবার অরিকও আর চুপ থাকবে না। সেও এবার দেখবে এই মেয়ে আর কি কি করতে পারে।
.
.
বিয়ের দিন ঘনিয়ে এল। দুই বাড়িতেই বিয়ের প্রস্তুতি চলে জড়সড় ভাবে। কিন্তু যাদের বিয়ে তাদের মাঝেই কোনরূপ প্রতিক্রিয়া নেই। কোনরকমে যেন দিন পাড় করছে কেবল। মনের মধ্যে দুজনেরই চলছে মারাত্মক বিদ্বেষ। দুজনেই যেন কেবল সময়ের অপেক্ষায় অপেক্ষাকৃত। যত সময় গড়াবে সুন্দর মুহুর্তগুলো ততো তাড়াতাড়ি কেটে যাবে। তারপর আসবে সেই কুৎসিত মুহূর্তগুলো। যেই মুহূর্তগুলো কখনো কেউ ভুলতে পারবে না। মস্তিষ্কের স্মৃতির কৌটায় বিচ্ছিরি কিছু স্মৃতি হিসেবে সেগুলো জমা থাকবে আজীবন।
.
.
হলুদ শেষে ছাদ থেকে নেমে এল অরিক। রুমে এসে কাকে যেন একটা কল লাগাল। সেই কল রিসিভ হতেই সে উদ্বেগ নিয়ে বললো,

‘যা যা বলেছি সব মনে আছে তো? কোন গন্ডগোল যেন না হয়। নয়তো এক পয়সাও পাবি না।’

ঐ পাশের মানুষটি অরিককে আশ্বাস দিয়ে বললো,

‘কোন চিন্তা করবেন না ভাই। সময় মতো সব কিছু হয়ে যাবে। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন।’

এবার যেন কিছুটা হলেও প্রশান্তি পাচ্ছে অরিক। ফোনটা বিছানায় রেখে সে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। হলুদে ভূত সেজে আছে। তখন সে গালের হলুদটা আলতো হাতে মুছতে মুছতে বললো,

‘বিয়ে করার খুব শখ তাই না? এবার বুঝবে তুমি ডেয়ার, কার সাথে পাঙ্গা নিতে এসেছো।’

কথাটা বলেই বাঁকা হাসল সে। তারপর একটা টাওয়াল নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল ফ্রেশ হতে..

চলবে..

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে