নিষিদ্ধ প্রেম পর্ব-০২

0
651

#নিষিদ্ধ প্রেম
#জান্নাতুল ফারিয়া প্রত্যাশা
|২|
~
‘মা, আমি ঐ মেয়েকে বিয়ে করবো না।’

কাপড় ভাজ করছিলেন লিমা সোবহান, ছেলের তিক্ত কন্ঠ শোনে ঘাড় ফিরিয়ে তার দিকে তাকালেন। বিরক্তিতে ব্রু কুঁচকে বললেন,

‘কেন? কি সমস্যা?’

অরিক নাক মুখ ফুলিয়ে কঠোর গলায় বললো,

‘আমার ওকে পছন্দ হয়নি তাই।’

ছেলের কথায় বিরক্তির মাত্রা টা যেন আরো বাড়ল। তিনি বললেন,

‘পছন্দ না হওয়ার কি কারণ? মেয়ে রূপে গুণে সবদিক থেকে একদম পারফেক্ট। তাহলে, কি জন্য তোমার তাকে পছন্দ হলো না?’

‘মা, ওর কথার ধরণ আমার ভালো লাগেনি।’

লিমা সোবহান এবার জোরে নিশ্বাস নিলেন। ছেলের সমস্যা টা যেন ধরতে পেরেছেন। ছেলের কাছে এগিয়ে গেলেন তিনি। বুকের উপর দুহাত ভাজ করে গম্ভীর সুরে বললেন,

‘এখন আর এসব কথা বলে কোনো লাভ নেই অরিক। কাল আমাদের পাকা কথা বলা হয়ে গিয়েছে। পরের সপ্তাহে তোমাদের বিয়ে। অযথা ভেজাল বাঁধিও না। আমি জানি তুমি ইচ্ছে করেই বিয়ে টা ভাঙতে চাইছো। আর ঐ মেয়ে কে পছন্দ না হওয়ার কোনো কারণ’ই আমি দেখছি না। তোমার বাবার আর আমার ওকে যথেষ্ট পছন্দ হয়েছে। সেক্ষেত্রে তোমার পছন্দ না হলেও চলবে। তোমার পছন্দের মেয়ে গুলোকে আমার দেখা আছে। ঐ ধরনের মেয়েকে আমি কখনো আমার বাড়ির বউ বানাবো না। তাই এখন এসব বাদ দিয়ে বিয়ের প্রিপারেশন নাও, যাও।’

অরিকের চোখ মুখ কালো হয়ে যায়। মা কে কি করে বোঝাবে, কেন সে এই মেয়েকে বিয়ে করতে চাইছে না। সত্যি’টাও তো বলতে পারছে না। মা জানলে তাকে কোনোদিনও ক্ষমা করতে পারবে না। এদিকে সে এটাও টের পাচ্ছে তার জন্য সামনে খুব খারাপ কিছু অপেক্ষা করছে। ঐ মেয়ে তাকে এমনি এমনি বিয়ে করছে না। নিশ্চয়ই এর পেছনে তার কোনো ভয়ানক উদ্দেশ্য আছে। শুনেছে মেয়েদের যখন আর কিছু হারানোর ভয় থাকে না তখন নাকি তারা জানোয়ারের চেয়েও হিংস্র হয়ে উঠে। তবে কি এবার তাকেও রাইমার হিংস্রতার স্বীকার হতে হবে?

কথাগুলো ভাবতেই গলা শুকিয়ে উঠে তার। যেই ছেলেটা আজ পর্যন্ত কাউকে পরোয়া করতো না সে আজ এক সাধারণ মেয়ের ভয়ে এইভাবে অস্থির হয়ে উঠছে? নিজেকেই যেন চিনতে পারছে না অরিক। তার এই একটা ভুল তার জীবনটাকে যে ঠিক কিভাবে এলোমেলো করে দিবে সেটা সম্পর্কে আদৌ তার কোনো ধারনা নেই।

.
মায়ের কথায় মন মরা হয়ে রুমে এসে বসলো অরিক। অস্থির মনটা কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না। শুয়ে বসে কোনোকিছুতেই শান্তি মিলছে না যেন। এসির পাওয়ার টা আরো কমিয়ে দিল। যেন একটু হলেও শরীরের উষ্ণতা টা কমে। মনে যেন প্রশান্তি পায়। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে নিরবকে কল লাগাল। ওপাশ থেকে কল রিসিভ হতেই অরিক বলে উঠল,

‘ফ্রি থাকলে এক্ষুণি বাসায় আয়।’

নিরব আর কথা বাড়াল না সোজা অরিকদের বাসায় চলে এলো। ছয়তলা বিল্ডিং এর চারতলায় এক বিশাল এপার্টমেন্টে থাকে তারা। লিফট থেকে নেমেই সোজা অরিকের রুমে গিয়ে ঢুকল নিরব। বিছানায় এলোমেলো হয়ে শুয়ে থাকা অরিকের অবস্থা দেখেই নিরব টের পেল সে কতটা দুশ্চিন্তায় আছে। নিরব গিয়ে বসলো তার পাশে। ক্ষীণ সুরে বললো,

‘দোস্ত, কি হবে এখন?’

অরিক চোখ তুলে তাকাল। ক্ষেপা কন্ঠে বললো,

‘কি হবে সেটা আগে থেকেই জানলে কি আর এখন এত দুশ্চিন্তা করতাম?’

‘হ্যাঁ, তাও ঠিক। কিন্তু দোস্ত, ঐ মেয়ে চায় টা কি বলতো? তুই ওকে রেপ করলি অথচ ও তোকে কিছুই করলো না উল্টো তোকে বিয়ে করতে চাইছে? ব্যাপার টা না ঠিক আমার মাথায় ঢুকছে না রে।’

অরিক উঠে বসল। চিন্তিত কন্ঠে বললো,

‘সেটাই তো আমি বূঝতে পারছি না। মেয়েটা আসলে চায় কি? তার মনে কি চলছে? এইটুকু আমি নিশ্চিত যে এমনি এমনি এই মেয়ে আমাকে বিয়ে করছে না নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো গভীর উদ্দেশ্য আছে।’

নিরব ভয়ার্ত দৃষ্টিতে অরিকের দিকে তাকায়। বলে,

‘তোর জন্য আমিও ফেঁসে গেছি। সেদিন বারবার বারণ করেছিলাম, শুনিস নি আমার কথা। ইচ্ছে মতো মেয়েটার সাথে..আর এইদিকে আমি কিছু না করেও ফেঁসে গেছি। ঐ মেয়ে আমাকেও ছাড়বে না। যেভাবে কালকে আমার দিকে তাকাচ্ছিল!’

অরিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বলে,

‘সেদিন অনেক বেশি নেশা করে ফেলেছিলাম। নেশার ঘোরে যে এসব করে ফেলব জীবনে কল্পনাও করেনি। আর ঐ মেয়ে অত রাতে ঐ রাস্তায় কি করছিল? আর সবচেয়ে বড়ো কথা হলো আমি তখন নেশার ঘোরে ছিলাম তাই ওকে একটু টিচ করে ফেলি; তাই বলে কি ও আমাকে চড় মারবে? এই একটা চড়েই তো আমার মাথা গরম হয়ে যায়, তাই রাগ সামলাতে না পেরে এতকিছু করে ফেলি। এখন বুঝতে পারছি কি করেছি, কিন্তু এখন আর কিছু করারও নেই। না জানি আমার কপালে কি আছে?’

চোখ বুজে ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলতে থাকে অরিক। নিরব ভীত সন্ত্রস্ত মন নিয়ে বসে বসে ভাবতে থাকে কি করা যায়। ভাবতে ভাবতেই সে হঠাৎ বলে উঠে,

‘দোস্ত, এক কাজ কর তুই মেয়েটার কাছে ক্ষমা চেয়ে নে। দরকার পড়লে পা ধরে ক্ষমা চা। আমার মনে হয় মেয়ে টা তোকে ক্ষমা করে দিবে।’

অরিক হতাশ কন্ঠে বলে,

‘একটা মেয়ের সবথেকে মূল্যবান সম্পত্তিই হলো তার সতীত্ব। সেই সতীত্বটাকেই আমি নষ্ট করে দিয়েছি। তোর কি মনে হয়, মেয়েটা আমাকে এত সহজে ক্ষমা করে দিবে?’

নিরব চুপ হয়ে যায়। না দিবে না। সে যদি মেয়ে হতো তবে সেও দিত না। কিন্তু ঐ যে পুরুষ মানুষ, রাগের বশে মারাত্মক ভুল করে ফেলেছে। সেই ভুলের প্রায়াশ্চিত্ত তো এবার তাদের করতেই হবে।
.
.
অনেকক্ষণ বসে দুই বন্ধু কথা বললো। তারপর এক সময় নিরব চলে গেল তার বাসার দিকে। কেউই কোনো উপায় আওড়াতে পারলো না। ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত হয়ে এক পর্যায়ে তারা আশাই ছেড়ে দিল। ভেবে নিল ভাগ্যে যা আছে তাই হবে।

নিরব যেতেই অরিক গোসলের জন্য উঠল। টাওয়াল টা গলায় ঝুলিয়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াতেই হঠাৎ সে তার ফোনে পরপর অনেক গুলো নোটিফিকেশনের শব্দ পেল। সে এগিয়ে গিয়ে বিছানা থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল কিসের এত নোটিফিকেশন। ফোনের স্ক্রিনে তখন একটা আননোন নাম্বার থেকে কিছু ম্যাসেজ দেখতে পেল। অরিক সেটা দেখার জন্য হুয়াটস অ্যাপ এ ঢুকল। তারপর সেই নাম্বারে গিয়ে দেখল অনেকগুলো ছবি। আর সেই ছবিগুলো আর কারোর না রাইমার। বেশ কয়েকটা শাড়ি গায়ে দিয়ে তোলা ছবি। তার নিচে একটা ছোট্ট ম্যাসেজ, ‘আচ্ছা, কোন শাড়ি টা তে আমাকে বেশি মানাচ্ছে একটু বলুন তো!’ অরিক এবার নিশ্চিত হলো এটা রাইমার নাম্বার। সঙ্গে সঙ্গে ভীষণ বিরক্তও হলো সে। এই মেয়েটা তাকে কেন ম্যাসেজ দিচ্ছে? সিন করেও রিপ্লাই দিল না। ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে ওয়াশরুমে চলে গেল সে।
.
.
ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে চুল মুছতে মুছতে কৌতুহল বসত অরিক আবার ফোনটা চেক করলো। চোখ যেন এবার বেরিয়ে আসবে তার। একশো বিশ টা ম্যাসেজ। আর এটা ক্রমাগত বেড়েই চলছে। তাড়াতাড়ি সে ইনবক্স ওপেন করে দেখে রাইমা তাকে লাগাতার ম্যাসেজ দিয়েই যাচ্ছে। তার একটা তে লেখা, ‘সিন করেও রিপ্লাই দিচ্ছেন না কেন মি. অরিক সোবহান? এত ভয় পান আমায়?’ পাশে দুইটা হা হা ইমুজি। ম্যাসেজ টা দেখা মাত্রই রাগে চোখ মুখ লাল হয়ে উঠে অরিকের। সে ডিরেক্ট কল দেয় সেই নাম্বারে। সঙ্গে সঙ্গেই রিসিভ হয়ে যায়। রাগি গলায় অরিক বলে,

‘কি শুরু করেছেন আপনি? এত ম্যাসেজ কেন দিচ্ছেন?’

ওপাশ থেকে ক্ষীণ হাসির শব্দ শুনতে পেল সে। জবাবে রাইমা বললো,

‘বারে আমি বুঝি আমার হবু বরকে ম্যাসেজ দিতে পারবো না?’

রাগ টা ধপ করে বেড়ে যায় অরিকের। চেঁচিয়ে উঠে বলে,

‘মজা করা বন্ধ করুন। ইচ্ছে করে করছেন এসব তাই না? আমি জানি আপনার উদ্দেশ্য খুব খারাপ। তাই যা বলার সরাসরি বলুন, অযথা এত নাটক করবেন না।’

রাইমা বাঁকা হাসে। বলে,

‘নাটক করছি? বাহ, আপনি তো খুব চালাক! যাই হোক, আমার নাটকে কিন্তু আপনার পরিবার খুব সুন্দর ফেঁসে গেছে। এবার আপনার পালা। জানেন তো আপনি আমার জীবনে খুব স্পেশাল একটা পারসন। আপনাকে আমি আমার জীবন থেকে দূরে সরে যেতে দিব না। আপনাকে আমার লাগবে, আমার অন্ধকার জীবনের প্রতিটা হিসাব নিকাশ মেটানোর জন্য আপনাকে আমার প্রয়োজন। তাই নাটক বলুন আর যাই বলুন, আপনাকে আমি ফাঁসিয়েই ছাড়ব।’

কথাটা বলেই বিকট শব্দে হেসে কলটা কেটে দেয় রাইমা। অরিক স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কোনরূপ প্রতিক্রিয়া নেই তার মাঝে। তবে কি সত্যিই তার সাথে ভয়ানক কিছু হতে চলছে?

চলবে..

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে