নতুন সকাল পর্ব-০১

0
175

নতুন সকাল
লেখক : আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা
পর্ব-১

“আচ্ছা, কী কারণে তুমি আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছো জানতে পারি?”
গলায় ফাঁস দেয়ার জন্য সিলিংয়ের সাথে দড়ি বাধার সময় কারো কথা শুনে ঘুরে তাকালো মিহিকা। খানিক আগে আসা গলার স্বর অনুসরণ করে বারান্দার দরজায় তাকালো। দেখল বারান্দার দরজায় এক মধ্যবয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে আছেন।লোকটাকে চিনে না মিহিকা।

ঘড়ির কাটায় এখন রাত আড়াইটা কী তিনটা বাজে।এতরাতে কোন আগন্তককে তার ঘরে দেখে বিস্ময়ের আভা ফুটে উঠল মিহিকার চোখে মুখে। অন্যসময় হলে চেঁচিয়ে লোক জড়ো করতো। কিন্তু আজ মন ভালো নেই, মন খারাপের মধ্যবেলায় চেঁচানোর মতো মন মানুষিকতায় নেই সে। মিহিকা ভ্রু কুঁচকে প্রশ্নবোধক চাহনিতে আগন্তকের দিকে তাকাল। যার অর্থ, আপনি কে? এখানে এসেছেন কেনো! আর কিভাবে এসেছেন!

আগন্তক মিহিকার ভ্রু কুঁচকানো দেখে মুচকি হাসলেন। হেসে বললেন,
“আমি গালিব, আহমেদ গালিব। আমি তোমার প্রতিবেশী। তোমার মুখোমুখি বিল্ডিংয়ের চতুর্থ তলার দক্ষিণ পাশেত ফ্ল্যাটটায় থাকি। ।”

গালিব সাহেবের কথায় বেশ বিরক্ত হলো মিহিকা। কান্নার প্রভাবে রক্তিম বর্ণের চেহারায় একরাশ বিরক্তি ঢেলে গালিব সাহেবের দিকে তাকাল। গালিব সাহেব মিহিকার চেহারা পড়ে নিয়ে বললেন,

” তোমার বয়সী আমার একটা মেয়ে আছে। নাম, রুফাইদা। রুফাইদা আর ওর মা আজ বিকেলে রুফাইদার নানুর বাসায় গেছে। বাসায় আমি একা। একাকিত্ব ঘুচাতে বারান্দায় এসেছিলাম সিগারেট খেতে। তখনি সামনের বারান্দা দিয়ে তোমার রুমে চোখ গেলো। দেখলাম বারান্দা বরাবর খাটে তুমি
সিলিংয়ে দড়ি বাধছো। দেখেই খটকা লাগল। তোমার কান্নাভাব দেখে ব্যাপারটা পরিস্কার হলো। অনেকদিন গল্প করা হয়না। ইচ্ছে হলো তোমার সাথে কিছুক্ষণ গল্প করতে, তোমার আত্মহত্যার পেছনের গল্পটা শুনার কৌতুহল জাগল মনে। ”

মিহিকা এবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো গালিব সাহেবের দিকে। রাতদুপুরে কোত্থেকে বাবার বয়সী লোক বারান্দা টপকে তার বাসায় হাজির হয়েছে । এসে বলছে কিনা আত্মহত্যার পেছনের গল্পটা শুনতে এসেছে! এ কি পাগল না কি এলিয়েন! দেখে তো তেমন মনে হচ্ছে না। বরং বেশ ভদ্রলোক মনে হচ্ছে। বয়স কত হবে? পঞ্চাশ কি বায়ান্ন? পরনে তার ধূসর পতুয়া, আর কালো টাউজার। গায়ের রং তামাটে। চতুর্ভুজাকৃতির চোয়ালে কাচা পাকা খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি, কালো মনির চোখ দুটোর উপর চতুর্ভুজাকৃতির ফ্রেমলেস চশমা। হাতের তর্জনী আর মধ্যমার মাঝে আধখাওয়া একটা সিগারেট। তবে রুমে আসার পর থেকে সিগারেট হাতেই শোভা পাচ্ছে, তা আর মুখ অবধি এগুচ্ছে না। হয়তো মেয়ের বয়সী কারো সামনে খেতে চাচ্ছেন না। তার চোখে সচ্চ চাহনী, দুষ্টু লোক হলে তার চোখে লালসা কিংবা ভয়ানক চাহনি থাকতো। যা এই লোকের নেই।

মিহিকা নাক টেনে গালে লেগে থাকা নোনাজল হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে গালিব সাহেবের দিকে রক্তরাঙা চোখে তাকালো। তারপর রাগত স্বরে বলল,
“কেন এসেছেন এখানে? আপনি চলে যান এখান থেকে! আমাকে শান্তিমতো মরতে দিন। না হলে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না।”

বলে দড়ি ঠিক করতে শুরু করল মিহিকা। গালিব সাহেব এবারো হাসলেন। বললেন,
“আচ্ছা, আমি চলে যাব। কোন বিরক্ত করব না তোমাকে। শুধু তোমার জীবনের শেষ দশ মিনিট আমাকে দাও। আমার সাথে খানিক গল্প করো। দশমিনিট শেষ হলে আমি চলে যাবো।”

হতাশার প্রভাবে আজকাল প্রায়ই মুড সুইং হয় মিহিকার। সামান্য কথাতেও রক্ত চলকে মাথায় উঠে যায়। হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে সামনে থাকা মানুষের সাথে খারাপ আচরণ করা যেন স্বভাবে পরিণত হয়েছে। আজ ও তার ব্যাতিক্রম হলো না। গালিব সাহেবের কথায় মাথায় যেন রক্ত উঠে গেল মিহিকার। এমনিতেই বিষন্নতায় মন বিষিয়ে আছে, অসহ্য যন্ত্রণা আর হৃদবিষাদে চটপট করছে দিন পনেরো যাবত । আর যেন সহ্য হচ্ছে না। কোথায় ভেবেছিলো জীবন নামক ডায়েরিটা নিজ হাতে বন্ধ করে ওপারে পাড়ি জমাবে। মুক্তি পাবে এই যন্ত্রণা থেকে। কিন্তু হলো কি! কোত্থেকে এক বুড়ো লোক এসে তাকে কিসব উদ্ভট কথা বলছে! এক যন্ত্রণা শেষ করতে গিয়ে আরেক যন্ত্রণার সম্মুখীন হলো সে। এ যেন মরতে গিয়েও শান্তি নেই! নাহ, এত ভাবলে হবে না। আমাকে মরতে হবে। প্রথমে এই বুড়োকে ভাগাতে হবে তারপর গলায় দড়ি দিতে হবে। এই ভাবনা মাথায় হানা দিতেই রাগী গলায় বলল,
“দশমিনিট না আর এক মিনিট যদি আপনি এখানে থাকেন, তবে আমি চেঁচিয়ে লোক জড়ো করব। এই মুহুর্তে চলে যান আমার বাসা থেকে। ”

মিহিকার রাগ দেখে এবার শব্দ করেই হাসলেন গালিব সাহেব। হাসতে হাসতে বললেন,
“তুমি রুফাইদার বয়সী। তাই আমি তোমাকে মেয়ের চোখেই দেখছি। তুমি আমাকে আংকেল ডাকতে পারো। আর হ্যাঁ, এখন তুমি চেঁচিয়ে লোক জড়ো করলে তোমারই ক্ষতি হবে। আমার কিছুই হবে না। আমি তো খোলা বারান্দার রেলিং টপকে চলে যাবো নিজের বাসায় । আমি নিয়মিত ব্যায়াম করি। তাই বয়স হলে ও শরীর ফিট আছে। পালাতে সর্বোচ্চ মিনিট খানেক লাগবে। কেউ খুঁজে পাবে না আমাকে। তাছাড়া, তোমার কাছে কোন প্রমাণ নেই যে আমি এখানে এসেছি। সুতারাং মা বলি কী? লোক ডেকে নিজের ক্ষতি না করে আমার সাথে মিনিট দশেক গল্প করো, এই দশ মিনিট তোমার জন্য লাভ বৈ ক্ষতি বয়ে আনবে না।।”

গালিব সাহেবের কথা শুনে মিহিকা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“লোক জড়ো করলে আমার কী ক্ষতি হবে?”

“এই যে তুমি লোক ডাকবে, আশেপাশের বাসা থেকে তোমার চিৎকার শুনে মানুষ বাসার বাইরে জড়ো হবে। তারপর তারা সবাই মিলে মালিক সমিতিকে কল করবে, তারা এসে ডুপ্লিকেট চাবি কিংবা দরজা ভেঙে ভিতরে ডুকবে। তারপর তুমি তাদের সব ঘটনা খুলে বলবে। তারা আমাকে খুঁজবে, কেউ কেউ তোমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। এতসবের মাঝে রাত কেটে যাবে, তোমার আত্মহত্যা করা আর হবে না। তারচেয়ে বরং আমাকে তোমার আত্মহত্যার পেছনে লুকানো গল্পটা বলো, শুনে আমি চলে যাবো। তারপর তুমি শান্তিমতো মরার রাস্তায় পা বাড়াতে পারবে।”

শান্ত কন্ঠে বললেন গালিব সাহেব। গালিব সাহেবের কথা শুনে মিহিকা খানিক ভাবলো। এই আপদ বিদায় করতে হলে দশমিনিট দিতে হবে, নয়তো এই লোক যাবে না, তার আত্মহত্যা করাও হয়ে উঠবে না। তারচেয়ে ভালো দশমিনিট গল্প করা যাক, লোকটা চলে গেলে নির্ঝঞ্ঝাটে আত্মহত্যা করতে পারবে, কেউ বাধা দিবে না। এ ভেবে বলল,
“সত্যিই আপনি চলে যাবেন? কোন বাধা দিবেন না তো!”
“নাহ, আমি কোনপ্রকার বাধা দিবো না। কাউকে এই ব্যাপারে বলবো ও না। ”
“সত্যিই?”
অনেকটা বাচ্চাদের মতো করে বললো মিহিকা। গালিব সাহেব হেসে সায় জানালেন। মিহিকা খাটের পাশ ঘেঁষে সাদা টাইলসের উপর বসে পড়লো। তারপর হাটুতে থিতুনী রাখল। মিহিকাকে বসতে দেখে গালিব সাহেব বারান্দা দিয়ে সিগারেট ফেলে দিয়ে মিহিকা থেকে কয়েকগজ দূরে মেঝেতে রাখা বিনব্যাগে বসে পড়লেন।
তারপর বললেন,
“এবার তোমার বিষাদময় গল্প বলো। আমি কিন্তু রুফাইদার সাথে একদম ফ্রি। বাবা মেয়ে নয়, বন্ধুত্বময় সম্পর্ক আমাদের । তুমি নিজেকে রুফাইদার জায়গায় রেখে সহজভাবে আমাকে সব বলতে পারো। ”

মিহিকা ভাবলেশহীন ভাবে গালিব সাহেবের কথা শুনল। তারপর আনমনে বলতে শুরু করলো,
“আমি মিহিকা, মাইশা রহমান মিহিকা। সবাই মিহি বলেই ডাকে। রাবিতে রসায়ন নিয়ে পড়ছি। বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। বাবা যমুনা ব্যাংক ঢাকা শাখার কর্মরত একজন ব্যাংকার। মা গৃহিনী। বাবা মাকে নিয়ে ঢাকাতেই থাকেন। আমিও ঢাকা থাকতাম বাবা মায়ের সাথে। কিন্তু এইচএসসির পর রাবিতে চান্স পেয়ে পরিবার ছেড়ে রাজশাহী চলে আসি। থাকার জন্য বাবা এই ফ্ল্যাট কিনে দেন। আমি এখানে থাকতে শুরু করি। মা বাবা আর শ্রাবণকে ছেড়ে এতদূর এসে থাকতে প্রথমে খুব কষ্ট হতো। কিন্তু মাস তিনেকের মাঝে অবশ্য নিজেকে মানিয়ে নিই।”

“শ্রাবণ কে?”
কথার মাঝে ফোঁড়ন কাটেন গালিব সাহেব। এ পর্যায়ে মিহিকার চেহারায় উদাসীনতার চাপ ফুটে উঠল। মেঝেতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে উদাস ভঙিমায় বলল,
“শ্রাবণ, আমার প্রথম ভালোবাসা। বর্ষার এক বিকেলে ঝুম বৃষ্টিতে বাস স্টপে তার সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছে। তখন আমি সবে দশম শ্রেণিতে পড়ি। প্রাইভেট শেষে কাক ভেজা হয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছি৷ শ্রাবন তখন উচ্চমাধ্যমিক দিবে। সেও প্রাইভেট পড়ে বাসায় ফেরার তাড়ায় বাস স্টপে দাঁড়িয়ে ছিলো। বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে আমার চশমার কাঁচ ঝাপসা হয়ে গিয়েছিলো। মাইগ্রেনের সমস্যাটা তখন প্রবল ছিলো। চশমা ছাড়া একবারেই চলতে পারতাম না। তাই আমি চশমার কাঁচ মুছার জন্য টিস্যু খুঁজছিলাম। ব্যাগ থেকে টিস্যুর প্যাকেট বের করে দেখি টিস্যু আমার মতো কাকভেজা হয়ে গেছে। এদিক ওদিকে দোকান খুঁজছিলাম। শ্রাবণ হয়তো ব্যাপারটা খেয়াল করেছিলো। সে তার পকেট থেকে একটা টিস্যুর প্যাকেট এগিয়ে দিলো। তার সেই উপকারের পর সৌজন্যে মূলক পরিচয় , তারপর আলাপ, তারপর প্রেম। শ্রাবণের হাত ধরে পার করলাম চারটি শ্রাবণ। সময়গুলো বেশ ভালোই ছিলো। মাস কয়েক আগেই শুরু হলো সমস্যা। সেই সমস্যাই আমাকে এই দড়ির মুখে দাঁড় করিয়েছে।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here