10 C
New York
Tuesday, December 10, 2019
Home ত্যাগ ত্যাগ পর্ব - এক

ত্যাগ পর্ব – এক

ত্যাগ পর্ব – এক

লেখিকাঃ Jara Tasnim(Hidden Girl)

সেদিন প্রায় এক বছর পর আমার প্রাক্তন স্বামী আতিকের সাথে দেখা হয়েছিল। সঙ্গে তার বর্তমান স্ত্রীও ছিল। তার স্ত্রী পেসেন্ট আর আমি ডাক্তার। দীর্ঘ চার বছর রিলেশনের পর বিয়ে করে দুবছরও সম্পর্ক টা কে টিকিয়ে রাখতে পারি নি। এক বছর আগে, এক বারও পেছনে না তাকিয়ে আতিক এতো বছরের সম্পর্ক টা কয়েক মুহূর্তে ভেঙে দিয়ে নিষ্ঠুরের মতো চলে গিয়েছিল।

আর মাত্র চার ঘন্টা পর আমার ফ্লাইট ছিল। জীবনের সব কিছু হারিয়ে যখন নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলাম ঠিক তখন ই জীবনে এতো বড় একটা সুযোগ এসেছিল । হাসপাতালের সবার থেকে বিদায় নিতে এসেছিলাম। হঠাৎ পুরুষ কন্ঠের কারো কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো কানে। কারো কিছু হয়েছে কিনা তা দেখার জন্য এগিয়ে যেতেই দেখলাম এক লোক নার্সদের সামনে হাত জোর করে খুব কান্না-কাটি করছে আর বলছে,,,,,,
:— দয়া করে আমার স্ত্রী কে সু্স্থ করে দিন।

আর সেই লোক টি অন্য আর কেউ নয়। আমার ই প্রাক্তন স্বামী আতিক। বুকের ভেতর টা আমার মুছরে উঠেলো। দ্রুত সেখান থেকে প্রস্থান করলাম। চেম্বারে গিয়ে মুখে মাক্স আর গায়ে এ্যফ্রন জড়িয়ে নিয়ে ফিরে এলাম। কাপা কাপা কন্ঠে আতিক কে জিঙ্গাস করলাম,,,,,,,
:— কি হয়েছে আপনার ওয়াইফের??

আতিক কান্না জড়িত কন্ঠে বলল,,,,,,
:— আমার ওয়াইফ চার মাসের প্রেগনেন্ট। হঠাৎ ওর খুব পেইন হচ্ছিলো। হাসপাতালে নিয়ে আসতে আসতে মিরা(আতিকের স্ত্রী) সেন্সলেস হয়ে গেছে।

আতিকের স্ত্রীর প্রেগনেন্সির কথা শুনে আমার বুকের ভেতরটা আবারও মুছড়ে উঠলো।

আমাকে চুপ থাকতে দেখে আতিক আমার সামনে হাটু গেরে বসে পরে। কাদতে কাদতে বলতে লাগে,,,,,,,
:— প্লিজ ডক্টর আমার ওয়াইফের ট্রিটমেন্ট শুরু করুন।

আরো অনেক কিছুই সে বলছিলো হয় তো। তবে আমার সে দিকে মনোযোগ ছিলো না। আমি চলে গিয়েছিলাম এক বছর আগে। যে দিন আতিক হঠাৎ সামনে এসে হাটু গেরে বসে আমার মুখের সামনে ডিভোর্স পেপার এগিয়ে দিয়েছিল আর বলেছিল,,,,,,,,,
:— আমাদের ডিভোর্স টা করতেই হবে। না হলে আমার বাবা কে বাচাতে পারবো না।

আমি কেবল থ্… হয়ে আতিকের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
বিষ্মিত চোখে আতিক কে জিঙ্গেস করেছিলাম,,,,,,
:— কি হয়েছে তোমার আতিক….!!! এসব কি বলছ তুমি??
:— প্লিজ কোনো প্রশ্ন করো না। আমি কোনো উত্তর দিতে পারবো না। প্লিজ ডিভোর্স পেপারে সাইন করে দাও।

সেদিন প্রথম আমি আতিকের চোখে জল দেখেছিলাম।
ওর চোখের এক এক ফোটা জল এক এক বার করে আমার বুকের ভেতর টায় আঘাত করে যাচ্ছিলো।
তাই সাইন করে দিয়েছিলাম ডিভোর্স পেপারে কোনো প্রশ্ন না করেই।
ভালোবাসার মানুষের জন্য একবার না হয় #ত্যাগ স্বীকার করলাম।

সেদিন কেবল “আমাকে ভুলে যাওয়ার চেস্টা করো। আর পারলে ক্ষমা করে দিও” বলেই আতিক চিরদিনের জন্য আমার থেকে দূরে চলে গিয়েছিল।
আর আমি….? আমি নিঃস্ব-অসহায়ের মতো অশ্রুসিক্ত চোখে ওর চলে যাওয়ার পথের দিকে চেয়েছিলাম।

চোখে প্রায় জল চলে আসছিলো। চোখের পানি কে চোখে বন্দি করে বহু কষ্টে নিজেকে সামলে নিলাম। এগিয়ে গিয়ে মিরা কে চেকআপ করলাম। অবস্থা খুব একটা ভালো না। ইমিডিয়েটলি অপারেশন করতে হবে।
এদিকে এই মুহুর্তে ড. রাবেয়া ছাড়া ভালো কোনো ডক্টর ডিউটিতে নেই। আর তাকে সাহায্যের জন্য অবশ্যই আর এক জন ডক্টর লাগবে।

আতিক এখনো কেদেই যাচ্ছে আর মিরার মাথায় হাত বোলাচ্ছে।
এক বছর আগেও আমি ওর চোখের জল সহ্য করতে পারি নি। আর আজও পারলাম না…..
কেন্সেল করে দিলাম কানাডা যাওয়া। হাত ছাড়া করে দিলাম জীবনে সাফল্যের সব চেয়ে বড় সুযোগ টাও।
ভালোবাসার মানুষের জন্য আর এক বার না হয় #ত্যাগ স্বীকার করলাম।

O.T. তে যাওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছিলাম হঠাৎ পেছন থেকে কেউ নাম ধরে ডাক দিলো। পেছনে ফিরতে ই দেখলাম ড. রাবেয়া আমার দিকে বিষ্মিত চোখে তাকিয়ে আছেন।

ড. রাবেয়া আমাকে জিঙ্গেস করলেন,,,,,,
:— তোমার না ফ্লাইট আছে…! O.T. ‘র জন্য রেডি হচ্ছো যে….!! যাবে না তুমি….?
:— নাহ….. রাবেয়া আপা।
:— কি বলছো তুমি !! এমন সুযোগ তুমি আর পাবে ?? পাগল হয়েছো নাকি???
আমি মুচকি হেসে উত্তর দিলাম,,,,,,
:— অপারেশন টা আপনি একা করতে পারবেন না তা আমি জানি। আর পেসেন্টের জীবনের থেকে কি ডাক্তারের ক্যারিয়ার বড়…. রাবেয়া আপা??

রাবেয়া আপা বেশ কিছুক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি তার চোখ দেখে স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম যে তিনি কিছু আন্দাজ করেছেন। রাবেয়া আপা আমাকে কোনো প্রশ্ন করার আগে ই আমি সেখান থেকে এক প্রকার পালিয়ে এলাম।


অপারেশন শেষ…….
মিরার বাচ্চা টা কে বাচানো সম্ভব হয় নি। বাচ্চাটি আরো কিছুদিন আগেই পেটের মধ্যে মারা গিয়েছিল। মেয়ে টা খুব পাগলামি করছে। বাচ্চা কে হারানোর কষ্ট বেশ বড় একটা ধাক্কা হয়ে দাড়িয়েছে ওর জন্য।

#দুদিন_পর…….
মিরা ঘুমাচ্ছে। আতিক মিরার হাত টা ধরে বসে আছে।
আর আমি দূর থেকে ওকে দেখছি।
আচ্ছা আতিক তোমার কি আমার কথা একটুও মনে নেই?
যার চোখের গহীনে বারবার তলিয়ে যেতে বলতে, তার চোখ দেখেই তুমি আজ চিনতে পারলে না।
যার কন্ঠস্বর না শুনে থাকতে পারতে না, তোমার নিশ্বাস থেমে যায় বলতে, তার কন্ঠ এতোবার শুনেও তুমি চিনতে পারলে না।
যাকে ছাড়া তুমি বাচবে না বলতে তাকে ছাড়া তুমি দিব্বি অন্য এক মেয়ের সাথে সুখে সংসার করছো। এখন আমি তোমার কাছে কেবলি এক বেগানা নারী।

হায় রে…. আমার নিঠুর ভবিতব্য….
তবে কেমন ভালোবাসতে তুমি আমায়???
না না…. হয় তো আমার ই অপারগতা। হয় তো আমার ভালোবাসায় খাদ ছিলো। হয় তো মিরার ভালোবাসা তোমায় আমার ভালোবাসা ভুলিয়ে দিয়েছে…..
নিজের অজান্তেই গাল বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়লো।

হঠাৎ একজন নার্স এসে বলল,,,,,,,,,
:— ম্যডাম আপনাকে রাবেয়া মেডাম ডেকে পাঠিয়েছেন।
তাড়াতাড়ি চোখ মুছে বললাম,,,,,,,,
:— হু….. গিয়ে বলো আসছি।
:— আচ্ছা।

আমি চোখ ভালো করে মুছে নিয়ে রাবেয়া আপার রুমে চলে গেলাম। রাবেয়া আপার রুমে যেতেই তিনি আমার হাতে একটা খাম তুলে দিলেন।

পরের দিন……
মিরার পাগলামি আরো বেড়ে গেছে। কিছুতেই খাওয়ানো যাচ্ছে না ওকে। এমোতাবস্থায় একটা শিশু বাচ্চা ওর কোলে তুলে দেওয়াটা খুবই জরূরি। রাবেয়া আপার পরামর্শ অনুযায়ী আতিক এতিম খানায় ছুটেছে একটা বাচ্চার আসায়। কিন্তু আমি জানি আতিক কে খালি হাতে ফিরতে হবে। এই শহরে এতো ছোট বাচ্চা পাওয়া অসম্ভব ছাড়া আর কিছুই না।

আমি মিরার কেবিনে গেলাম, একটা ছোট্ট শিশু কে কোলে নিয়ে। দরজা খুলতেই কিছু একটা এসে স্বজরে আমার কপালে আঘাত করলো।
আমি কপালে হাত চেপে তাকিয়ে দেখলাম একটা চামচ।
মিরা জিনিস পত্র সব ছুড়ছে আর চিৎকার করছে। নার্স দুজনের প্রায় নাজেহাল অবস্থা ওকে সামলাতে গিয়ে।

আমি এগিয়ে গিয়ে বলতে লাগলাম,,,,,,,
:— মিরা শান্ত হও….
:— না আমি থামবো না। আগে আমার বেবি কে আমার কাছে এনে দাও। তোমরা সবাই আমার বেবি কে লুকিয়ে রেখেছো। ফিরিয়ে দাও আমার বেবি কে…. ফিরিয়ে দাও বলছি…..
আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে আমার কোলে থাকা তিন মাসের মেয়ে শিশুটি কে মিরার কোলে তুলে দিয়ে বলল,,,,,,
:—এই তো তোমার বেবি….তোমার মেয়ে….
মিরা বিষ্ময় নিয়ে আমাকে প্রশ্ন করলো,,,,,,,
:— আমার মেয়ে….!!??

কথা টা বলে মিরা বাচ্চটির দিকে অবাক নয়নে তাকিয়ে রইল। আর সে চাহনি তে বিষ্ময়ের সাথে আমি স্পষ্ট ঢিকরে পরা মাতৃস্নেহ দেখতে পারছিলাম। পরম স্নেহে বাচ্চা টি কে সে বুকে জড়িয়ে নিলো।

#কয়েকঘন্টাপর
আমি মিরার রুমে ই ছিলাম। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ শুনে পেছনে তাকিয়ে দেখলাম আতিক এসেছে…..

#চলবে………

(ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইরো)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Lists of writers

Sultana Toma
200 POSTS0 COMMENTS
Maria Kabir
159 POSTS1 COMMENTS
Jubaida Sobti
126 POSTS0 COMMENTS
Rabeya Sultana Nipa
117 POSTS0 COMMENTS
Jannatul Ferdaus
64 POSTS0 COMMENTS
Jannatul Ferdous
48 POSTS1 COMMENTS
মিম
42 POSTS0 COMMENTS
AL Mohammad Sourav
39 POSTS0 COMMENTS
Tabassum Riana
21 POSTS0 COMMENTS
Shahazadi Humasha
12 POSTS0 COMMENTS
Abdullah Al Ador Mamun
12 POSTS0 COMMENTS
Tamanna
10 POSTS0 COMMENTS
Farzana Akter
8 POSTS0 COMMENTS
Sadiya Afrin
7 POSTS0 COMMENTS
Umme Nipa
7 POSTS0 COMMENTS
Nilufar_Nijhum Nijhum
4 POSTS0 COMMENTS
Tamanna Khan
4 POSTS0 COMMENTS
Shahriar Shuvro Sabbir
3 POSTS0 COMMENTS
Maruf Sabbir
3 POSTS0 COMMENTS
Joy Khan
2 POSTS0 COMMENTS

Most Popular

গল্প:-নব দম্পতি পর্ব:-(১৭-শেষ)

গল্প:-নব দম্পতি পর্ব:-(১৭-শেষ) লেখা:- AL Mohammad Sourav !! আম্মা কিছু বলতে চায়ছে ঠিক তখনি আমি আম্মাকে থামিয়ে দিয়ে বলছি। আম্মা আপনি কি বলবেন তা আমি জানি। আম্মা:- নাহ...

গল্প:- নব_দম্পতি পর্ব:-(১৬)

গল্প:- নব_দম্পতি পর্ব:-(১৬) লেখা:- AL Mohammad Sourav !! তসিবার ব্যাপারে আব্বা কি কথা বলবে তা ভাবতে ভাবতে অফিসে এসেছি। অফিসের কাজ গুলি করতেছি তখনি আব্বা ফোন করেছে।...

গল্প:-নব_দম্পতি পর্ব:-(১৫)

গল্প:-নব_দম্পতি পর্ব:-(১৫) লেখা_AL Mohammad Sourav !! সৌরভ তোর আম্মাকে এখন কিছু জিজ্ঞেস করে লাভ হবেনা কারন তোর মা এখন তসিবার ভক্ত হয়ে গেছে। এখন শুধু তসিবার কথা...

গল্প:-নব_দম্পতি পর্ব:-(১৪)

গল্প:-নব_দম্পতি পর্ব:-(১৪) লেখা:- AL Mohammad Sourav !! তসিবা কোনো দিন মা হতে পারবেনা এই কথাটা শুধু তুই ছাড়া আমরা সবাই জানি। আর এই কথাটা বলছে তোর বাবা।...

Latest Posts

More