তোমার স্পর্শে পর্বঃ ০৯

0
1849

তোমার স্পর্শে পর্বঃ ০৯
– আবির খান

এরপর মায়া আর মায়ার মাকে আমার নিজ বাসায় নিয়ে আসি। মায়া ওর মাকে পেয়ে অনেক অনেক খুশী। আমি বাসায় এসে আমার রুমে যাই। জামা কাপড় চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে আসি। ওয়াশরুম থেকে বাইরে আসতেই মায়া আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। আমিতো পুরো অবাক হয়ে যাই। এরপর যা করলো মায়া, আমিতো লজ্জায়ই পরে যাই। মায়া আমাকে ধরে অজস্র চুমু দিচ্ছে। আমি মায়ার কান্ড দেখে পুরো বোকা হয়ে গিয়েছি।

আমিঃ একি মায়া কি করছো?? অবাক হয়ে।

মায়াঃ আপনি আজ আমাকে যা খুশী করেছেন না তার জন্য এগুলা। অনেক খুশী হয়ে।

আমি মায়ার কোমর জড়িয়ে ধরে বললাম,

আমিঃ তাহলে তো তোমাকে প্রতিদিনই খুশী করতে হবে দেখছি। রসিকতার স্বরে।

মায়াঃ যাহ, দুষ্ট। শুনো একটা কথা বলবো রাগ করবে না তো??

আমিঃ না না বলো।

মায়াঃ আজ রাতে আমি মায়ের সাথে ঘুমাবো। অনেক দিন পর আজ মাকে পেলাম। আমি মায়ের সাথে ঘুমাই??

আমার একটু কষ্ট লাগলেও আমি হাসি মুখ নিয়ে ওকে বলি,

আমিঃ আচ্ছা ঘুমাও। তবে বিয়ের পর কিন্তু শুধু আমার কাছেই ঘুমাতে হবে ঠিক আছে??

মায়াঃ আচ্ছা বাবুটা ঠিক আছে। অনেক গুলা থ্যাঙ্কিউ তোমাকে।

আমিঃ মায়া…

মায়াঃ হুম…

আমিঃ ভালোবাসি…

মায়া আমার এভাবে ভালোবাসি বলা শুনে থমকে যায়। কিছুক্ষণ আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ কেঁদে দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে। আর বলে,

মায়াঃ আমিও তোমাকে খুব খুব ভালোবাসি। কান্নাসিক্ত কণ্ঠে।

আমিঃ আহ কাঁদছো কেন বোকা মেয়ে। কাঁদে না। তোমার কান্না যে আমি সহ্য করতে পারি না।

মায়াঃ আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করি?? আস্তে করে।

আমিঃ হুম করো।

মায়াঃ আমার যদি কিছু হয়ে যায় তুমি কি খুব কষ্ট পাবে??

আমি হঠাৎ মায়ার মুখে এমন কথা শুনে আমার মনে হলো আমি অনেক জোরে কোনো কিছুর সাথে ধাক্কা খেয়েছি। বুকের পিঞ্জিরায় ব্যাথা অনুভব করছি। মায়া এটা বলল কি?? আমি ঠাস করে বিছানায় বসে পরি। নিজেকে খুব অসহায় লাগছে। আমার অবস্থা দেখে মায়া ভয় পেয়ে যায়। আর অস্থির হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে,

মায়াঃ প্লিজ এতোটা দূর্বল হয়ে পরো না। তুমিতো আমার সব।

পুরুষ মানুষ খুব কম কাঁদে। কারণ তাদের মন হয় খুব শক্ত। কিন্তু তারা ঠিক তখনই কাঁদে যখন তার মনে সে কষ্ট পায়। আমিও হয়তো পেয়েছি। তাই নিঃশব্দে চোখের কোণা হতে নোনা জল পরছে। মায়া আমার সামনে বসে ছিল। আমি ওকে বললাম,

আমিঃ তোমার স্পর্শ ছাড়া আমি কখনো বাঁচতে পারবো না। তোমার স্পর্শে আমি এখন শান্তি, সুখ আর ভালোবাসা খুঁজে পাই। যেটা এখন আমার জীবনের এক প্রকার অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। তোমাকে হারানোর কথা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনা মায়া। কখনো না। কান্নাসিক্ত কণ্ঠে।

মায়া আমার কান্না দেখে আরো কেঁদে দেয়। আমাকে ওর বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে। আর বলে,

মায়াঃ এতোটা ভালোবাসা যে কেউ কাকে বাসতে পারে আমার জানা ছিল না। আল্লাহ যেন আমাদের কখনো আলাদা না করে।

আমিঃ আমিন।

আমিও মায়াকে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে কান্না থামিয়ে বলি,

আমিঃ হয়েছে অনেক পঁচা কথা বলছো আর কখনো এসব কথা বলবে না। এখন যাও। মায়ের সাথে গিয়ে ঘুমাও। আমিও ঘুমাই।

মায়াঃ আচ্ছা।

মায়া উঠে দাঁড়ায় সাথে আমিও। মায়া চোখ মুছে চলে যাচ্ছিলো আমি তাকিয়ে তাকিয়ে ওকে দেখছিলাম। হঠাৎ ও আমার দিকে ফিরে তাকায়। আমি একটা হাসি দি। ও দৌড়ে এসে আমার গালে একটা চুমু দিয়ে আবার চলে যায়। মায়ার এই বাচ্চাদের মতো আচরণ গুলোর কারণেই বারবার আমি ওর প্রেমে পরি। ওর প্রতি আমার ভালোবাসা হাজার গুন বেড়ে যায়। মায়া চলে গেলে আমিও শুয়ে পরি। অনেক সময় জেগে ছিলাম। ওকে ছাড়া যেন চোখের পাতা একই হচ্ছিল না। অনেক রাত অব্ধি ওর কথা ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে পরি। হয়তো মায়ারও তাই হয়েছে।

পরদিন সকালে,

এখন সকাল ৮.২৩ মিনিট। আমি এয়ারপোর্টে বাবা-মা আর আমার ছোট্ট আদরের বোনটার জন্য অপেক্ষা করছি। ওইতো ওরা বের হয়ে এসেছে।

মা কাঁদতে কাঁদতে এসে অামাকে জড়িয়ে ধরে। সাথে বোনও। আমি অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে রাখি। বাবার দিকে তাকিয়ে বাবাকে সালাম দি।

আমিঃ আসসালামু আলাইকুম বাবা।

বাবাঃ অলাইকুম আসসালাম। কেমন আছিস??

আমিঃ জ্বি বাবা ভালো।

মাঃ আরে রাখো তোমাদের হাই হ্যালো। আগে ছেলেটাকে একটু প্রাণ ভরে দেখি।

আমিঃ কেমন আছো মা??

মাঃ সন্তানকে ছাড়া মা কখনো ভালো থাকে। এখন তোকে দেখে একটু ভালো লাগছে।

সুমিঃ ভাইয়া আমাকে তো তুমি ভুলেই গেছো। যাও তোমার সাথে আর কথাই নাই। মজা করে।

আমিঃ আরে না না। তুইতো আমার সবচেয়ে প্রিয় আমার আদরের বোন। তোকে কিভাবে ভুলি। এখন তোমারা চলো। বাসায় দুজন তোমাদের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

মাঃ হ্যাঁ হ্যাঁ চল। বউমাকে দেখার আমারও খুব ইচ্ছা।

বাবাঃ আমি আগেই বলে দি, যদি আমার পছন্দ না হয় তাহলে কিন্তু বিয়ে হবে না।

আমিঃ বাবা,আমার চোখে ও সেরা। তোমার অপছন্দ হওয়ার প্রশ্নই উঠে না। আগে চলো।

এরপর আমি সবাইকে নিয়ে আমার বাসায় যাই। সবাই অনেক খুশী। তার ছেলে এবার বিয়ে করবে। সবাইকে নিয়ে উপরে উঠে বেল বাজাতেই মায়া দরজা খুলে। খুলেই বাবা-মাকে সালাম করে। ওর মাথায় ওড়না ছিল। একদম বউয়ের মতো লাগছিল ওকে। আমার পরিবার মায়াকে দেখে পুরো অবাক। হঠাৎ আমার বোন সুমি বলে উঠলো,

সুমিঃ মা, ভাবিতো আমার চেয়েও অনেক সুন্দরী। এটা ঠিক না। আমিতো ভাবির সাথে ঘুরতেই যেতে পারবো না। এএএ…এটা ঠিক না।

মায়া একটু হেসে আস্তে করে বলল,

মায়াঃ আমি মুখ ঢেকে বের হবো নে।

সুমিঃ হ্যাঁ তাহলে ঠিক আছে। মা ভাবিকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে।

আমিঃ তোমারা এভাবে দরজায় দাঁড়িয়ে আছো কেন!! ভিতরে যাও।

সবাইঃ হ্যাঁ হ্যাঁ।

বাবা-মা আর বোনকে নিয়ে আমি বাসার ভিতরে আসি। বাবা-মা সোফায় গিয়ে বসে। এরই মধ্যে মায়ার মা আসেন।

মায়ার মাঃ আসসালামু আলাইকুম।

আমিঃ বাবা মা, উনি মায়ার মা।

বাবাঃ অলাইকুম আসসালাম বেয়াইন সাব। বসেন বসেন।

আমার মাঃ বেইয়ান সাব, এই চাঁদের টুকরাটাকে কি সত্যিই আমাদের দিচ্ছেন?? আমিতো মায়া মার দিক থেকে চোখই সরাতে পারছিনা। সেই আমাদের সময়ে মেয়েরা যেমন সুন্দরী মায়াবতী ছিল ঠিক তেমন ও। আহ দেখলেই প্রাণ জুড়িয়ে যায়।

মায়ার মাঃ কি যে বলেন না আপনি। আপনার ছেলেও একটা হীরার টুকরা। আপনি এমন একজন ছেলের মা হয়েছেন সত্যিই এটা খুবই গর্বের ব্যাপার। আবিরের মতো ভালো ছেলে আমি আগে কখনো দেখেনি। ও আমাদের দুজনের জীবন বাচিঁয়েছে। নাহলে আমার মেয়েটার জীবন শেষ হয়ে যেতো।

বাবাঃ বেয়াইন সাব, পুরনো কথা থাক। এখন আসল কথা বলি, আমাদের বউমাকে খুব পছন্দ হয়েছে। কাল শুক্রবার শুভকাজটা করে ফেলতে চাই। আল্লাহ রহমতে টাকা পয়সার কোনো অভাব আমার নাই। কিন্তু ছেলের কঠোর আবদারে সম্পূর্ণ ইসলামিক ভাবে ওদের বিয়েটা হবে। তারপর না হয় সবাইকে দাওয়াত দিয়ে খাইয়ে দিলাম।

মাঃ হ্যাঁ এটাই ভালো হবে।

মায়ার মাঃ আপনারা আমার মেয়েকে যেভাবেই নিবেন আমি তাতেই খুশী। আপনাদের মতো এত্তো ভালো পরিবারে আমার মেয়ে বউ হয়ে যাবে এটা আমার সৌভাগ্য। সত্যিই আপনারা সবাই অনেক ভালো।

মাঃ কি যে বলেন না আপনি। আমার তো মায়া মাকে খুব পছন্দ হয়েছে। আহরে কি মায়া ওর মুখে।

সুমিঃ ভাইয়া তুই খুব লাকিরে।

আমিঃ আসলেই আমি খুব লাকি ওকে পেয়ে।

বাবাঃ আচ্ছা। তাহলে এই কথাই রইলো কাল ওদের বিয়ে।

আমি খেয়াল করলাম মায়া চোখে মুখে আনন্দের ছাপ। সাথে সবারও। আমারও খুব ভালো লাগছে। কাল আমরা দুজন সারাজীবনের জন্য পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হবো। শুধু অপেক্ষা কালকের।

এরপর সারাদিন মায়াকে নিয়েই কেটে গেলো। শপিং আড্ডা মাস্তি অনেক কিছু। কাল আমাদের বিয়ে। ভাবতেই কেমন জানি লাগছে। কুড়িয়ে পাওয়া ভালোবাসার মানুষটার সাথে আমার বিয়ে। ভাগ্যে যে এভাবে মায়াকে লিখা ছিলো কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি। কাল থেকে মায়ার স্পর্শেই আমার বাকিটা জীবন কাটবে। এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পরি।

পরদিন,

মায়াকে আমার বোন আর মা সাজাতে নিয়ে গেছে। আমি তাদের বললাম, মায়া তো এমনিই বেশ সুন্দরী। তার উপর আবার সাজানোর কি দরকার আছে। মা বলল,

মাঃ দরকার আছে। বউকে ছাড়া যেন অন্য কোনো মেয়েকে ভালো না লাগে তাই ওকে সাজিয়ে তোর চোখে আটকে দিবো। হাহা।

আমিঃ ধুর, তোমারাও না।

এরপর আমি আমার সব বন্ধুদের দাওয়াত দি। ওরা তো অনেক খুশী। বন্ধুর বিয়ে খাবে। সবচেয়ে বেশি খুশী রাফি। এই বন্ধুটা অনেক সাহায্য করেছে আমাকে। এছাড়া আমাদের বাবা-মার পরিবার থেকে কিছু মুরুব্বিরাও আসেন।

বিকেলে সবার উপস্থিতিতে মায়া আর আমার শুভ বিবাহ হয়ে যায়। সবাই অনেক খুশী। সবার জন্য খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সবাই খাওয়া দাওয়া করে যে যার বাসায় চলে যায়। আমি আর আমার বন্ধুরা রাত ১১ টা পর্যন্ত আড্ডা দি মজা করি। আর ওদিকে মায়াকে সাজিয়ে আমার বাসর ঘরে রাখা হয়েছে। এর আগে অনেকেই মায়াকে দেখে গেছে। সবার নাকি মায়াকে খুব পছন্দ হয়েছে।

রাফিঃ দোস্ত, এখন বউয়ের কাছে যা। না হলে রাগ করবে। পরে দেখা যাবে সারারাত চুপচাপ বসে কাটিয়ে দিতে হয়েছে। হাহা।

আমিঃ কি বলিস ভাই। তাহলে আমি এখনই যাচ্ছি।

সবাইঃ হ্যাঁ হ্যাঁ যা বেটা। হাহা।

আমি তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে আসি। বাসায় ঢুকতেই বাবার সাথে দেখা হয়।

আমিঃ বাবা, আসসালামু আলাইকুম।

বাবাঃ হুম। অলাইকুম আসসালাম। তুই এতোক্ষন কই ছিলি?? বউ মাকে সেই কবে থেকে একা বসিয়ে রাখা হয়েছে। তোর মা তোকে বকাবকি করছে। তাড়াতাড়ি যা বোকা। শোন, মায়াকে কখনো কষ্ট দিবিনা। ওর সব কিন্তু তুই।

আমিঃ জ্বি বাবা অবশ্যই।

এরপর বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোজা আমার রুমের সামনে চলে আসি। বুকটা ধুকপুক ধুকপুক করছে। নার্ভাস নার্ভাস ফিল হচ্ছে অনেক। আজ এই দরজা পাড় হলেই শুরু হবে নতুন এক জীবন। যেখানে থাকবে শুধু মায়ার স্পর্শ। আমি…

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here