তোমার স্পর্শে পর্বঃ ০৬

0
1796

তোমার স্পর্শে পর্বঃ ০৬
– আবির খান

হঠাৎই মায়া জোরে চিৎকার দিয়ে উঠে আর মাথায় হাত দিয়ে চেপে ধরে অজ্ঞান হয়ে যায়। আমি মায়াকে দেখে স্তব্ধ হয়ে যাই। পাশের রুম থেকে খালাও চিৎকার শুনে দৌড়ে আসে। আমি দ্রুত মায়ার কাছে গিয়ে বলি,

আমিঃ মায়া…মায়া…কি হয়েছে তোমার?? মায়া…

মায়া কোনো কথা বলছে না। আমার হাত পা সব ভয়ে সমানে কাঁপছে। মায়া কোনো রেস্পন্স করছে না। আমার মাথা কাজ করছে না। চোখ থেকে শুধু অঝোরে পানি ঝরছে। পাশ থেকে খালা বলে উঠলো,

খালাঃ বাবা, তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যাও।

আমি অার কিছু না ভেবে দ্রুত মায়াকে কোলে তুলে নিচে এসে গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যাই। মায়া নিথর হয়ে আমার কোলে মাথা দিয়ে পরে ছিল। হাসপাতালে গেলে মায়াকে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাওয়া হয়। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। শরীরে কোনো শক্তি খুঁজে পাচ্ছি না। পা দুটো কেমন জানি লেগে আসছে। কোনো রকম কাঁপা হাতে রাফিকে ফোন দিয়ে আসতে বলি। আমি শুধু কান্না করছি আর আল্লাহকে ডাকছি। কেন জানি মনে হচ্ছে, এই বুঝি মায়া আমার থেকে দূরে চলে গেলো। কোনো ভাবেই নিজেকে শান্ত রাখতে পারছিনা। আধা ঘণ্টার মধ্যে রাফিও চলে আসে। আমি ওকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পরি। ও কোনো ভাবেই আমাকে সামলাতে পারছে না। আমার বুকের পিঞ্জিরাতে অনেক ব্যাথা অনুভব হচ্ছে। শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। আমাদের মাঝে সময়টা অল্প হলেও আমার মনে হয় আমাদের মনের মিলন বহু কাল আগ থেকেই। মায়াকে ছাড়া আমার পক্ষে থাকা সম্ভব নয়। হঠাৎই ডাক্তার দীর্ঘ ১ ঘন্টা পর বাইরে বের হলেন। আমি দ্রুত তার কাছে ছুটে যাই।

আমিঃ স্যার স্যার, আমার মায়া কেমন আছে?? ওর কিছু হবে না তো?? ও ঠিক আছেতো?? অস্থির হয়ে।

ডাক্তারঃ আরে শান্ত হন। উনি এখন ঠিক আছে। আসলে হঠাৎ মাথায় চাপ পরায় উনার এ অবস্থা হয়েছে। কিন্তু এই চাপটা উনি পেলো কোথা থেকে??

আমিঃ স্যার, ও হঠাৎ ওর মায়ের ছবি দেখে চিৎকার দিয়ে উঠে আর অজ্ঞান হয়ে যায়।

ডাক্তারঃ ওও..তাহলেতো উনার স্মৃতি শক্তি ফিরে আসার ৯৯.৯% সম্ভাবনা আছে। সচারাচর এরকমটাই হয়। আমরা এখন আশাবাদী। আল্লাহকে ডাকুন।

ডাক্তার চলে গেলেন। ডাক্তারের কথা শুনে আমি সেখানে বসে পরলাম। রাফি আমার পাশেই আছে। আমি রাফির দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বললাম,

আমিঃ দোস্ত, ও কি সুস্থ হলে আমাকে ভুলে যাবে??কাঁদো কণ্ঠে।

রাফিঃ ভাই এতো ভেঙে পরিস না। বাস্তবতাকে মেনে নে।

আমিঃ দোস্ত, মায়া…আমার মায়া ও। ওকে ছাড়া আমার পক্ষে বাঁচা সম্ভব না। ওকে নিয়েতো আমি সারাজীবনের স্বপ্ন দেখেছিলাম। এতো তাড়াতাড়ি আমার স্বপ্নটা ভেঙে যাবে?? কাঁদতে কাঁদতে।

রাফিঃ ভাই, আল্লাহর উপর ভরসা রাখ। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।

আমি অঝোরে শুধু কাঁদছি। আর মনে মনে আল্লাহ তায়ালার কাছে মায়াকে ভিক্ষা চাচ্ছি। আরও ১ ঘন্টা কেটে গেলো। হঠাৎ নার্স এসে বলল, মায়ার জ্ঞান এসেছে। কথাটা শুনে আমার বুকে ধরপাকড় শুরু হয়ে গেলো। মনে হচ্ছে বুকটা ফেটেই যাবে।

রাফিঃ দোস্ত চল। বাস্তবতা যাই হোক তোকে মেনে নিতে হবে। চল।

আমি আস্তে আস্তে মায়ার কাছে গেলাম। দরজার সামনে যেতেই মায়া আমার দিকে তাকায়। আমি আস্তে আস্তে ওর একদম কাছে এগিয়ে যাই। ও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমিও ওর দিকে তাকিয়ে আছি। বুঝতে পারছি না ওর স্মৃতি শক্তি ফিরে এসেছে কিনা। মায়া ডাক্তারকে কিছু বলে নি। আমি কথা বলতে পারছি না। মুখ আটকে আসছে। চোখ থেকে অজান্তেই অশ্রু ঝরছে এক অজানা ভয়ে। তাও অনেক কষ্ট করে বললাম,

আমিঃ মায়া, আমাকে চিনতে পারছো?? তোমার কি সব মনে আছে??

মায়া আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,

মায়াঃ তুমিতো আমার ভালোবাসা। আমাল বন্ধু আবির। বাচ্চাদের মতো করে।

উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়। সবাই কি ভাবছে আমি জানি না। আমি এখন শুধু জানি আমার মায়া আমারই আছে।

আমিঃ রাফি, দোস্ত ও কি বলল, আমি ওর ভালোবাসা?? আমি ভুল শুনছি নাতো ভাই?? অনেক খুশি হয়ে।

রাফিঃ না দোস্ত, তোর মায়া তোরই আছে।

আমি এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। খুশিতে একদম আত্নহারা হয়ে যাই। ডাক্তার, রাফি সবার কাছে গিয়ে বলি আমার মায়া আমাকে ভুলে যায় নি। ও আমার মায়াই আছে। সবার শেষে কাঁদতে কাঁদতে মায়াকে জড়িয়ে ধরি। আর বলি,

আমিঃ মায়া, খুব ভয় পেয়ে ছিলাম। ভেবে ছিলাম তুমি আমাকে ভুলে যাবে। কিন্তু তুমি আমাকে ভুল নি। তুমি সেই আমার আগের মায়াই আছো। তোমার কোনো কিছু মনে আছে?? তুমি কে??

মায়াঃ কেন আমি তো মায়া। তোমার বান্ধবী। আর কিছু মনে নেই।

আমি আরো খুশি হয়ে গেলাম। ডাক্তাররা বুঝলো মায়ার স্মৃতি শক্তি এখনো ফিরে আসেনি। তারা বেশ অবাক। মায়ার কন্ডিশন অনুযায়ী মায়ার স্মৃতি শক্তি ফিরে আসার কথা কিন্তু আসেনি। আর তার চেয়েও বেশি অবাক আমাকে দেখে। সবাই বাইরে চলে যায় আমাদের রেখে। মায়া আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

মায়াঃ তোমার এই অবস্থা কেন?? চোখ মুখ একদম কেঁদে ফুলিয়ে ফেলেছো?? আমার জন্য এত্তো চিন্তা??

আমিঃ বুকের হারটা ভেঙে যাচ্ছিলো কাঁদবো না। তোমার কিছু হলে আমি কি নিয়ে বাঁচতাম বলো।

মায়াঃ আমাকে অনেক ভালোবাসো তাইনা??

আমিঃ হ্যাঁ অনেক। আমার বাচ্চা মায়াটাকে আমি অনেক ভালোবাসি। তোমার স্মৃতি ফিরে আসে নি। ভালো হয়েছে। নাহলে আমাকে যদি ভুলে যেতা। লাগবে না ওই স্মৃতি। শুধু তোমাকে চাই।

মায়াঃ সত্যি??

আমিঃ হুম। কিন্তু তুমি ওই ছবি দেখে ওভাবে চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলে কেন??

মায়াঃ হয়তো আমার অনেক কাছের কেউ ছিল।

আমিঃ হ্যাঁ হয়তো।

আমি এতোটা সময় মায়াকে জড়িয়ে ধরেই ছিলাম। হঠাৎ মনে হলে মায়া খুব গুছিয়ে আর বড়দের মতো কথা বলছে। আমি মাথা তুলে মায়ার দিকে তাকাই। ওর চোখে চোখ রাখি। আর বলি,

আমিঃ মায়া, তুমি আমার মায়াই তো??

মায়া একটু হেসে বলে,

মায়াঃ কেন আমার হ্যান্ডলুলুর বুঝি সন্দেহ হয়?? হিহি।

আমিঃ হ্যাঁ এখন মনে হচ্ছে তুমি আমার মায়া। হ্যাঁ শুধু আমিই তোমার হ্যান্ডলুলু। আর কেউ না। হেসে বললাম।

মায়াকে আবার জড়িয়ে ধরলাম। ওর প্রতিটি হার্টবিট আমি শুনতে পাচ্ছি।

মায়াঃ ধন্যবাদ।

আমিঃ কেন??

মায়াঃ এমনি। রেখে দেও। তোমার দাড়িটা একটু দেও ধরি।

আমিঃ তোমার বাচ্চামিটা আর গেলো না। তাহলে আমিও তোমার মিষ্টি ঠোঁটটা ছুঁয়ে দেখবো। মজা করে।

মায়াঃ এহহ আসছে।

আমিঃ আচ্ছা লাগবে না। নেও আমার দাড়িই ধর।

মায়াঃ এদিকে আসো। লজ্জা নিয়ে।

আমি মায়ার কাছে এগিয়ে গেলে ও আমার কপালে একটা চুমু এঁকে দেয়। জীবনে প্রথম কেউ আমাকে চুমু দিলো। আমি অবাক চোখে মায়ার দিকে তাকিয়ে আছি।

মায়াঃ আমারটা কই?? লজ্জা নিয়ে।

আমি আর দেরি না করে ওর কপালেও গভীর একটা চুমু এঁকে দিলাম। এরপর দুদিন কেটে গেলে মায়াকে বিকালের দিকে বাসায় নিয়ে আসি। মায়া এখন বেশ সুস্থ। বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে মায়াকে খাইয়ে দিয়ে সেদিনের মতো ঘুমিয়ে পরি।

পরদিন সকালে,

আমার ঘুমটা ভেঙে যায়। আশেপাশে হাতিয়ে দেখি মায়া নাই। আমার বুকটাও খালি। আমি একলাফে শুয়া থেকে উঠে বসি। রুমের চার দিকে তাকিয়ে দেখি মায়া নাই। আমি বিছানা ছেড়ে উঠতে যাবো তখনই দেখি মায়া আমার রুমে ঢুকছে। আমি ওকে দেখে পুরো অবাক। ও চা হাতে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে৷

আমিঃ তুমি চা বানিয়েছো?? অবাক হয়ে।

মায়াঃ হ্যাঁ। আস্তে করে।

আমিঃ কিভাবে??

মায়াঃ আহ, চা বানানো কোনো ব্যাপার নাকি। এখন উঠে ফ্রেশ হয়ে আসো। এসে চা’টা খেয়ে বলো কেমন হয়েছে??

আমি আস্তে করে উঠে ফ্রেশ হতে চলে যাই। আমি বোকা হয়ে গিয়েছি পুরো মায়াকে দেখে। ও চা বানালো কিভাবে?? আমার মাথায় কিচ্ছু ঢুকছে না। ফ্রেশ হয়ে এসে মায়ার কাছ থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে একটা চুমুক দি। আমরা জন্মে এত্তো মজার চা আমি আগে খেয়েছি বলে মনে হয়না। আমি খুব মজা করে চা’টা খেলাম। চা’টা শেষ করে মায়ার দিকে তাকিয়ে দেখি, ও কেমন করে যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ওকে বললাম,

আমিঃ তুমি এত্তো ভালো চা বানাতে পারো। আগে কেন বানাও নি??

মায়াঃ ইচ্ছে হয়নি তাই। হিহি।

বলেই মায়া ছো মেরে আমার হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,

মায়াঃ যাও গোসল করে আসো। আজ অফিসে যাবা। আমি এখন ভালো আছি। খালা আছে। সমস্যা নেই।

আমি মায়ার কথার শুনে রীতিমতো অবাকের উপর অবাক হচ্ছি। ও দিব্বি একদম সুস্থ মানুষের মতো কথা বলছে।

মায়াঃ কি হলো হা করে আছো যে?? যাও।

আমিঃ না মানে…বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে তুমি আমার বউ।

মায়া আমার একদম কাছে এসে আমার চোখে চোখ রেখে বলল,

মায়াঃ মনে হলে হবে খালি, সত্যিকারী বানানো যায়না। হিহি।

বলেই মায়া দৌড়ে চলে গেলো। আর যাওয়ার আগে বলল, নাস্তা করে যেতে।

আমি ভাবছি, মায়া এটা বললটা কি। ওকি ইন্ডায়রেক্টলি আমাকে বিয়ের কথা বলল নাকি। ধুর আমার মাথাই ঘুরে যাচ্ছে। হঠাৎ মায়ার এই পরিবর্তন আমাকে বেশ অবাক করে দিচ্ছে। তবে সব কথার এক কথা মায়া আমাকে ভালোবাসে। শুধু আমাকে।

আমি এরপর গোসল করে অফিসের জন্য রেডি হয়ে খাবার টেবিলে গিয়ে বসি। মায়া নিজ হাতে নাস্তা বেরে দেয় আমাকে। আমি শুধু অবাক হয়ে মায়াকে দেখছি। ওকে এখন একদম বউয়ের মতো লাগছে। ইসসস, মন চাচ্ছে ওকে এখনই বিয়ে করে ফেলি।

মায়াঃ আমাকে খাইয়ে দিবা না?? না হলে কিন্তু খাবো না। আহ্লাদী কণ্ঠে।

আমিঃ হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই দিবো। নেও হা করো।

মায়াঃ আয়ায়ায়া….

আমি হাসি দিয়ে ওকে খাইয়ে দি। ও আমাকে নিজ হাত দিয়ে খাইয়ে দেয়। এরপর খাওয়া শেষ করে ওকে ঔষধ খাইয়ে আমি অফিসে চলে আসি। অনেক দিনের কাজ আজ একদিনে পরেছে। সব কাজ শেষ করতে করতে প্রায় সন্ধ্যা ৭ টা বেজে যায়। এত্তো কাজের চাপ ছিলো যে, মায়াকে একটা ফোন করার সময়ও পাইনি। তাই মায়াকে ফোন দিলাম। কিন্তু রিসিভ না করে বারবার কেটে দিচ্ছে। মানে নিশ্চিত রাগ করেছে। তাই ওকে খুশি করার জন্য আমার পছন্দের কয়টা জিনিস ওর জন্য গিফট হিসেবে নিলাম। দেখি মায়া কি করে। আমি গিফটগুলো নিয়ে গাড়িতে করে তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসি। বেল দিতেই খালা দরজা খুলে।

আমিঃ আপনি!! ও কই??

খালাঃ আপনার উপর অনেক রাগ করে আছে।

আমিঃ কোথায়??

খালাঃ আপনার রুমে।

আমিঃ আচ্ছা।

আমার বাচ্চা মায়াটা আজ একদিনেই অভিমান করেছে। দেখি গিফট গুলো দিয়ে অভিমান ভাঙা যায় কিনা। আমি আস্তে আস্তে করে আমার রুমে যাই। গিয়েতো পুরো অবাক। রুম পুরো ফাঁকা। কোথাও কেউ নেই। হঠাৎ…

চলবে…

কেমন লেগেছে জানাবেন কিন্তু। আর সাথে থাকবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here