তুমি রবে ৫৪

0
1028
তুমি রবে ৫৪ . . – “দরজা খুলে রেখেছিস কেন রে?” মাহতীম সোফার ওপর থেকে খেলনাগুলো ঝুড়িতে তুলছিল। ফয়সাল ঢুকতেই মাহতীম দ্রুত সোফাটা পরিষ্কার নিলো। – “মেহরিন প্লে গ্রাউন্ডে গেছে। ওকে নামিয়ে দিয়ে এসে রুম গোছাতে গিয়ে দরজা আটকাতে ভুলে গেছি। তুই একা এলি যে?” – “তৌহিদ আসছে সন্ধ্যার পর ওর বউকে নিয়ে।” ফয়সাল সোফায় বসতে বসতে প্রশ্ন করল, – “দেখা করবি না?” – “কার সঙ্গে?” হাতের কাজ সাড়তে সাড়তে মাহতীম তার প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন করল। – “কার জন্য এসেছিস?” – “ও, আমি ভাবলাম…” – “যাদের কথা ভেবেছিলি তাদের সঙ্গেও তো দেখা করা উচিত।” – “কোন মুখ নিয়ে করব?” – “যে মুখ নিয়ে বোনের সঙ্গে করবি।” – “বোনের বিবাহিত জীবন দেখার তীব্র ইচ্ছাতে দেশে আসা। দেখা হলে চলে যাব।” – “তো এত বড় ফ্ল্যাট কিনতে গেলি কেন তাহলে? যদি না-ই থাকবি।” – “মেহরিন আসবে তো দেশে। আসার পর যাতে ওর থাকার জায়গার অভাব না পড়ে তার জন্য।” – “চাচিমার সঙ্গে অন্তত দেখা করতি।” – “এত পিছুটান নিয়ে ফিরতে পারব না তো।” ফয়সাল আর কিছুই বলল না মাহতীমকে। মাহতীম তার কাজ শেষ করে কিচেনে চলে গেল কফি করতে। এর মাঝে ফয়সাল গলা ছেড়ে তার উদ্দেশে বলল, – “তোর বোনের জামাইকে দেখবি না কি?” মাহতীমও গলা ছেড়ে উত্তর দিলো, – “তা কীসের জন্য দেশে এলাম?” – “আরে ব্যাটা ফেসবুক প্রফাইল দেখার কথা বলছি।” – “ফেসবুকে প্রফাইলে দেখার সাধ নেই। সামনাসামনি গিয়েই মিট করব।” – “একটা কথা আছে না! মেড ফর ইচ আদার। তোর বোন আর বোনের জামাইকে দেখলে এই কথাটা আমার বারবার মনে পড়ে রে।” – “শালা তুই একদম নজর দিবি না। তোর নজর আমার চেনা আছে।” মাহতীম কফির মগ ফয়সালের সামনে রেখে বসে বলল কথাটি। ফয়সাল বেশি ব্যথিত চোখে তাকাল মাহতীমের দিকে। তারপর বলল, – “শালা একচোখা! তুই বলতে পারলি এই কথা আমাকে? আমি যখন নজর দিতাম তখন সে সিঙ্গেল ছিল। আর সব থেকে বড় কথা আমি নিজেও এখন বিবাহিত। তুই শালা মাঝখানে খাম্বা না হলে ভাগিয়েই নিতাম ওকে।” মাহতীম ফয়সালের আক্ষেপের বাণী শুনে মিটমিট করে হাসতে থাকল। ফয়সাল তার হাসি দেখে রেগে গিয়ে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। . গোধূলির সময়টাতে ঐন্দ্রী ঘরে বসে থাকতে পারে না। নতুন ফ্ল্যাট কেনার পর কোনো প্রতিবেশীর সঙ্গেও সে ভাব জমায়নি। তাই অবসর বিকেলে গল্প করার মতো কেউ নেই-ই তার ধরতে গেলে। তবে এই অবসরের কিছু সময় সে বাচ্চাদের প্লে গ্রাউন্ডে গিয়ে তাদের সঙ্গেই সময় কাটায়।আজও চলে আসে সে বাচ্চাদের খেলার জায়গাটিতে। ক’জন ছোট ছোট পিচ্চিও তাকে দেখে লাফিয়ে উঠে খুশিতে। কারণ তার কাছে এলেই চকলেটসের অভাব পড়ে না তাদের। তেমনই আজও কিছু বাচ্চা এসে তার সঙ্গে কথা বলে মুঠো ভর্তি চকলেটস নিয়ে চলে গেল। ওই মুহূর্তেই নজর পড়ল সেই দেখতে বাঙালি তবে ধাতে বৃটিশ পিচ্চিটির দিকে। কিছুটা বিস্মিত হলোও ঐন্দ্রী। বুঝতে পারল তার প্রতিবেশীই তবে সে। ঐন্দ্রী এগিয়ে গেল মেহরিনের কাছে। সে হাতে একটা ছোট বল ধরে একাই দাঁড়িয়ে আছে। – “হ্যালো বেবি ডল!” মেহরিন চকিতেই ফিরে তাকাল তার দিকে। চিনতে তারও ভুল হলো না। সে কিছুক্ষণ ঐন্দ্রীর দিকে চেয়ে থেকে হঠাৎ বলে উঠল, – “ইয়্যু নোটিস মি!” – “ওহো! এটা তোমার ভুল ধারণা সোনা। হয়তো আমরা পড়সী।” – “মিহু!” পেছন থেকে মাহতীম ডেকে উঠল মেহরিনকে। মেহরিন তার বাবাকে দেখে ‘ড্যাড’ বলে ছুটে চলে গেল তার কোলে। ঐন্দ্রী ঘুরে দাঁড়িয়ে মুখোমুখি হলো মাহতীমের। ঐন্দ্রীর দিকে মাহতীমের নজর পড়তেই মেহরিন তার আধো আধো বুলিতে বাবাকে অভিযোগ জানাল, – “ড্যাড! দ্যা গার্ল ইজ নোটিসিং মি!” মেহরিনের অভিযোগে কিছুটা বিব্রত হলো মাহতীম আর ঐন্দ্রীও। ঐন্দ্রীর কিছু বলার পূর্বেই মাহতীম বলল তাকে, – “মাম্মাম! এটা তোমার ভুল ধারণা নিশ্চয়ই। উনি বোধহয় আমাদের পড়সী।” ঐন্দ্রী এবার সৌজন্য বজায় রেখে স্মিত হেসে বলল, – “হ্যাঁ আমি এখানেই থাকি। আসলে ওর সঙ্গে আমার সেদিন জ্যামে গাড়িতে বসে থাকা অবস্থাতে দেখা হয়েছিল।” – “ও, আচ্ছা। তাহলে আপনিই সেই অপরাধী?” – “স্যরি!” মাহতীম হেসে বলল, – “স্যরি। ওর অভিযোগ মোতাবেক বললাম আর কী। আপনার আর ওর ড্রেস সেম হওয়াতে ওর ধারণা আপনি ওকে দেখেই ড্রেসটা কিনেছেন। আর ওর একটা মহা বড় সমস্যা আছে। ওর কোনো পছন্দের জিনিসের কপি অন্য কারো কাছে থাকাটা ও সহ্য করতে পারে না।” – “বুঝেছি। অলওয়েজ ইউনিক চায়।” – “হ্যাঁ তেমনই।” – “আপনারা বোধহয় নতুন? আমিও নতুন। তবে এখানে আসার পর আজই দেখলাম আপনাদের।” – “হ্যাঁ গত পরশু এসেছি।” – “বুঝতে পেরেছি। বাইরে থাকা হয় নিশ্চয়ই?” – “হ্যাঁ। আসলে আমি স্যরি ওর জন্য।” – “আরে সমস্যা নেই। আমার তো ভালোই লাগে ওর রাগগুলো।” – “ধন্যবাদ। আসি তবে? আবার দেখা হবে।” – “জি অবশ্যই। বায়।”
প্রায় দু’দিন মাহি নিজেকে স্বাভাবিক করতে সময় নিলো। এর মাঝে আশফি কোনোভাবেই তার নার্ভাস থাকার কারণ তার থেকে জানতে পারল না। সেদিন বাড়িতে ফেরার পর তার ফোনটাও সে বাইরে হারিয়ে এসেছে। এ বিষয়টি জানার পর আশফির মনের মাঝে খটকা লাগতে শুরু করল। কিন্তু মাহি নিজে না বললে তার পক্ষে মাহির মনের খবর জানা অসম্ভব। আবার সে তাকে ফোর্সও করেনি এ বিষয়ে বেশি। মাহি যেদিন নিজে থেকে বলবে সেদিনের অপেক্ষাতে থাকল সে।সকালে যখন আশফি অফিসের জন্য তৈরি হয় তখন মাহিও দ্রুত তৈরি হয়ে নেয়। তাকে তৈরি হতে দেখে আশফি তাকে জিজ্ঞেস করে, – “অফিস জয়েন করবে না কি?” মাহি শাড়ির আচল ঠিক করে নেওয়ার সময় জবাব দিলো, – “না। কোনো সাধ নেই। তবে দরকার আছে।” – “কী দরকার?” – “না জানলেও চলবে আপনার। আমার দিশানের সঙ্গে দরকার আছে।” – “তো দিশান তো বাড়িতেই।” মাহি আয়নার সামনে থেকে ফিরে এসে আশফির সামনে এসে বলল, – “আমার দিশানের সঙ্গে অফিসে দরকার। অফিস গেলে কোনো সমস্যা?” – “অফিসটা তো আপনারও। আপনি চাইলে সারাদিন সারারাতও থাকতে পারেন। আমার সমস্যা হবে কেন?” মাহি তার কথার কোনো জবাব দিলো না। গায়ে শালটা জড়িয়ে নেওয়ার মুহূর্তে আশফি তাকে বলল, – “দিশান আমার সঙ্গেই যাবে।” – “তো কী সমস্যা? আমিও আপনাদের সঙ্গেই যাব।” – “না ভাবলাম আপনি একাকিভাবে যেতে চান কিনা দিশানের সঙ্গে!” মাহি কোনো জবাব না দিয়ে নিচে চলে গেল। দিশানও তখন নিচে নেমে এসে মাহিকে বলল, – “আমি বারবার বলেছিলাম বাসায় পাঠিয়ে দিতে। কিন্তু অফিসের ঠিকানাতে পাঠিয়ে দিয়েছে।” – “ভালোই করেছে। নয়তো সারপ্রাইজ থাকতো না।” আশফি নিচে নামার মুহূর্তে তাদের দুজনের আলাপ শুনে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, – “কীসের সারপ্রাইজ?” মাহি দ্রুত দিশানকে চোখের ইশারায় চুপ থাকতে বলল। আশফির তা নজর এড়াল না। দিশানকে শুধু হাসতে দেখে আশফি আর কিছু জিজ্ঞেস করল না তাদের। তিনজন অফিসের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ল। অফিসে পৌঁছেই মাহি সোজা চলে গেল দিশানের কেবিনে। আশফি তাকে কিছু বলারও সময়টুকু পেলো না। দিশানকে জিজ্ঞেস করল, – “গল্পটা কী বল তো? দিশান হাসতে হাসতে জবাব দিলো, – “বলা তো বারণ।” – “অদ্ভুত!” আশফি বিরক্তি নিয়ে চলে গেল তার নিজের কেবিনে। দিশান তার নিজের কেবিনে ঢুকতেই মাহি এক গাল হাসি নিয়ে বলল, – “তোমার বন্ধুর দারুণ চয়েজ।” – “আমি নিজেও কিন্তু দেখিনি। আমাকে দেখাও।” মাহি সঙ্গে সঙ্গে গিফ্টটা দেখাল দিশানকে। দিশানেরও খুব পছন্দ হলো গিফ্টটা। – “তো আজই হচ্ছে তবে সেই বিশেষ রাত পালন?” মাহি দিশানের হাতে চাপড় মেরে বসলো। লজ্জাতে কিছুই বলল না সে দিশানকে। দিশান হেসে উঠল। তাকে বলল, – “তো যাও তার রুমে গিয়ে একটু দেখা করে এসো।” – “আচ্ছা আসি তাহলে।”মাহি গিফ্টটা নিজের পার্সের মধ্যে ঢুকিয়ে নিলো। আশফির কেবিনে ঢুকতেই সে দেখল আশফি তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মাহি সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে তাকে বলল, – “আজ আমাকে সময় দিতে হবে।” আশফি ঘুড়ে তাকিয়ে মাহিকে দেখে বলল, – “এখন সম্ভব নয়। রাতে দেখা হচ্ছে আমাদের।” কথাটি বলেই আশফি দ্রুত বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে। মাহি চরম অপমানবোধ করল এতে। কী এমন রাজ্য দখলে তাকে যেতে হলো যে দু’মিনিট সময়ও কথা বলতে পারল না সে তার সঙ্গে! মাহিও দ্রুত তার পিছু নিলো। আশফি গাড়িতে ওঠার মুহূর্তে আশফিকে পেছন থেকে ডেকে উঠল সে। – “কোথায় যাচ্ছেন আপনি?” আশফি মাহির ডাকে থামল না। গাড়িতে উঠে বসলো। তারপর মাহিকে জবাব দিলো, – “দিশানকে বলো তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিতে। রাতে কথা হবে আমাদের।” আশফির হঠাৎ এই তাড়াহুড়া তাও মাহিকে কিছু না জানিয়ে এভাবে বেরিয়ে যাওয়া তার সহ্য হলো না। এতে আরও কৌতুহলের সৃষ্টি হলো তার মাঝে। গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার পূর্বেই সে দুম করেই উঠে এলো গাড়িতে। – “মাহি!” – “আমার কাজ আছে। আমাকে শপিংমল যেতে হবে।” একদম নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল মাহি। আশফি স্বাভাবিকতা বজায় রেখে বলল, – “দিশানকে নিয়ে যাও। আমার জরুরি কাজ আছে। এখনি যেতে হবে।” – “আমাকেও এখনই যেতে হবে। আর দিশান দিয়ার সঙ্গে মিট করতে বের হবে। আমি আপনার সঙ্গেই যাব।” এবার আশফি বিরক্তি নিয়ে বলল, – “মাহি! পাগলামি বন্ধ করো। তোমার নাটকীয় জিদ আমি পরে দেখব। গাড়ি থেকে নামো।” মাহি তার জিদ আর দ্বিগুণ বাড়িয়ে আশফিকে বলল, – “নামব না। আপনি কী এমন জরুরি কাজে যাচ্ছেন যে আমার সঙ্গে শপিং করার সময় আপনার আজ সারাদিনেও হবে না?” মাহির কথার জবাব দেওয়ার পূর্বেই আশফির ফোন বেজে উঠল। ফোন রিসিভ করে ওপাশের ব্যক্তির জবাবে আশফি তাকে বলল, – “যেভাবেই হোক বের হতে যেন না পারে। আমি আসছি। পুলিশ ইনফর্ম করে রাখো দ্রুত।” কথা শেষ করেই আশফি আর কথা বাড়াল না মাহির সঙ্গে। মাহিকে সঙ্গে করেই আশফি একটি বড় হোটেলের সামনে এসে গাড়ি থামাল। মাহিকে বলল, – “গাড়িতে বসে থাকো। নামার চেষ্টাও করবে না।” – “আজব! আপনি কোথায় যাচ্ছেন? আমি কেন বসে থাকব একা একা?” তার কথা আশফির কানে গেল না। গাড়ি থেকে নেমেই সে ছুটে চলে গেল ভেতরে। তার ইনফর্মারের উপদেশ মোতাবেক ওপরে এসে বড় একটি সুইটের সামনে দাঁড়াল আশফি। ইনফর্মার হাবিব আশফিকে ইশারায় বলল দরজার সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে। হাবিব হোটেল সার্ভ বয়ের পরিচয় দিয়ে দরজাতে নক করতে ওপাশ থেকে একজন নারী কণ্ঠে বলল তাকে পরে আসতে। হাবিব জরুরি বলে আবার নক করল। এবার সে দরজাটি খুলতেই আশফি দ্রুত ভেতরে ঢুকে গেল। কিন্তু ভেতরে ঢুকে আশফি অচেনা একটি মেয়েকে দেখে তাকে জিজ্ঞেস করল, – “তনুজা কোথায়?” মেয়েটি ভড়কে গিয়ে আশফিকে জিজ্ঞেস করল, – “আপনি কে?” আশফি তার প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে হাবিবকে বলল, – “টিম রেডি করো নিচে। প্রেসকেও ইনফর্ম করো, হোটেলের সামনে আসতে বলো।” – “ওকে।” হাবিব নিচে চলে আসতেই মেয়েটি দ্রুত দরজা বন্ধ করে দিলো। আশফির কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, – “আপনার আসার কথা ছিল?” আশফি ধমক দিয়ে বলল, – “দরজা বন্ধ করলে কেন? আর তনুজাকে আসতে বলো। ও কোথায়?” মেয়েটি কোনো কথা শুনল না তার। উল্টে আশফিকে আচমকা জাপ্টে ধরল। তারপর বলল, – “ম্যাম আগেই বলেছিল আপনি ভীষণ সুন্দর দেখতে কিন্তু খুব রাগী। আমাকে জাস্ট এক মিনিট সময় দিন। আমি আপনার রাগকে গলিয়ে জল করে দেবো।” সঙ্গে সঙ্গেই মেয়েটি তার পোশাক খুলতে উঠে পড়ে লাগল। আশফি এত সময় বাদে বুঝতে পারল তার সাঙ্ঘাতিক ভুলটা। এটা সম্পূর্ণ তনুজার নতুন একটি পরিকল্পনা আশফির ইমেজ নষ্ট করার। মেয়েটার দিকে আর এক মুহূর্তও তাকাল না আশফি। দরজা খুলে বেরিয়ে যেতে গেলে মেয়েটি ছুটে এসে আশফিকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। তারপর বলল, – “খালি হাতে যেতে পারব না আমি। আমার টাইম কিল করার বিল পেমেন্ট করে যান।” অত্যন্ত রাগে আশফি দিশেহারা হয়ে উঠল। কিন্তু সে মেয়ে বলে তার গায়ে হাত তুলতে পারল না। আর সে এখানে কেবল একজন পেশাদারী। তনুজা তাকে সম্পূর্ণ ব্যবহার করেছে মাত্র। আশফি তাকে ঠেলে চলে আসতে গিয়েও পারল না। মেয়েটি নাছোড়বান্দার মতো তাকে টানাটানি করতে শুরু করল। রুমের বাহিরেও পা ফেলতে পারল না আশফি। এদিকে বাথরুমে কেউ একজন দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আশফির সঙ্গে মেয়েটির জড়িয়ে থাকা অবস্থার ছবিগুলো নিতে থাকল শুধু।মাহি কিছুক্ষণ বসে থেকেই অধৈর্য হয়ে নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। নেমে সে হোটেলের রিসিপশনে আসতেই হাবিবের ফোনে বলা কথা শুনতে পারল। আর জানতে পারল তনুজা এখানেই। খবরটা শুনেই মাহি চমকে উঠল। কারণ তনুজার প্রতি আশফির ভয়ানক রাগ যে কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পারে। হাবিবের মুখ থেকেই সুইটের নাম্বার শুনে সে ছুটে চলে গেল ওপরে। দরজার সামনে আসতেই এক আপত্তিকর পরিস্থির মুখোমুখি হলো সে। দরজাটা হালকা খোলা ছিল। ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই সে দেখতে পায় আশফি আর একটি মেয়ের ধস্তাধস্তি অবস্থা। প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে সে মেয়েটির ওপর। চারপাশ কোনো কিছুই খেয়াল করল না সে। এমনকি আশফির দিকেও তাকাল না সে। মেয়েটির চুলের গোছা মুঠিতে চেপে তাকে টেনে ধরে ঠাস করে কয়েকটা থাপ্পড় বসালো। তার মারের শেষ থাকল না। মাহিকে এমনভাবে দেখে আশফি দ্রুত তাকে টেনে আনল। – “তুমি এখানে এসেছো কেন?” আশফি খেয়াল করল মাহির হাতের মুঠো ভর্তি মেয়েটির মাথার চুল। তার রাগে অস্থির অবস্থা। আশফি তাকে জোর করেও চেপে ধরতে পারছে না। মাহি চেঁচিয়ে বলছে, – “ছাড়ো আমাকে! আমি ওর মাথার একটা চুলও রাখব না!” মেয়েটিকে সে চিল্লিয়ে বলল, – “তোর ওই অপবিত্র ময়লা শরীরে আমার বরকে জড়িয়ে ধরেছিস! কত বড় সাহস তোর! খুন করব তোকে আমি!”মেয়েটি রুমের এক কোণে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ভয়ে। এই ফাঁকে বাথরুমে লুকিয়ে থাকা লোকটি ছবিগুলো তুলতে আরও মজা পেলো। তার মনোবাসনা পত্রিকার হেডলাইন সে এভাবে ছাপাবে, শিল্পপতি আশফি মাহবুব বারিধারার হোটেল সুইটে এক প্রস্টিটিউটের সঙ্গে হাতেনাতে ধরা পড়েছে বউয়ের কাছে। কিন্তু অতি উত্তেজনায় সে দরজাটা বেশিই খুলে ফেলল। মুহূর্তে চোখ পড়ল আশফির সেদিকে। এর মাঝে হাবিব তার টিম সঙ্গে করে চলে এসেছে ওপরে। নিচে প্রেস দাঁড়িয়ে। আশফি সেই রিপোর্টারের কলার চেপে ধরে তাকে কয়েকটা থাপ্পড় বসিয়ে ক্যামেরা কেড়ে নিলো। হাবিবকে বলল, – “এদের থেকেই তনুজার সন্ধান মিলবে। ভালো করে চেপে ধরো।”এরপর আশফি মাহিকে নিয়ে বেরিয়ে এলো হোটেল থেকে। গাড়িতে ওঠার পরও মাহির অগ্নিমূর্তি ভাব দেখে আশফি কিছুটা হতবাক। মাহি যে তাকে নিয়ে এতটা পজেজিভ আর এতটা কনসার্ন, আজকের ঘটনাটা না ঘটলে হয়তোবা জানায় হতো না তার।রাগের চোটে মাহি সিটে বসেও ফুলছে। সিটবেল্টও বাঁধেনি। আশফি তার প্রফুল্লের হাসিটা চেপে রেখে মাহির সিটবেল্ট বেঁধে দিলো। গাড়ি স্টার্ট করে আশফি জিজ্ঞেস করল, – “কোথায় যেন যাবে বলেছিলে? শপিংয়ে না?” মাহি কাটাকাটা জবাব দিলো, – “বাসায় যাব।” – “শপিং করতে চাইলে যে!” – “বললাম না বাসায় যাব!” আশফি কিছু বলতে গেল মাহিকে। কিন্তু সে কপাল কুচকে, চোখদুটো এঁটে বন্ধ করে রেখে চোয়ালজোড়া শক্ত করে ফেলল। আশফি হেসে উঠল তা দেখে। মাহি কোনো কথায় শুনতে চায় না এখন, সেটাই বোঝাল। আশফি আর কোনো কথা বলল না। সরাসরি বাসায় নামিয়ে দিলো মাহিকে। গাড়ি থেকে নেমে সোজা ভেতরে চলে গেল সে। আশফি কয়েকবার ডাকলও তাকে পেছন থেকে। গাড়িতে সে তার পার্সটা ভুলে ফেলে গেছে। আশফি বাধ্য হয়ে নেমে এসে বাসায় ঢুকল। রুমে ঢুকেই দেখল মাহি ক্লোজেট থেকে সেই ওড়নাটা বের করেছে, যেটা আশফির গাড়িতে সে ফেলে গিয়েছিল। মাহি আসার পর আশফি এটার কথা ভুলেও গিয়েছিল।আশফিকে রুমে ঢুকতে দেখে মাহি দরজাটা ঠাস করে বন্ধ করে দিলো। ওড়ানাটা হাতের মধ্যে রেখেই সে আশফিকে বলে উঠল, – “আল্লাহ পাক জানেন কত মেয়ে এভাবে ঢলে পড়েছে তোমার ওপর! ছিঃ! লজ্জাতে আমার নিজেরই মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছিল।” আশফি পার্সটা বিছানার ওপর রেখে বিছানাতে বসে বলল, – “হ্যাঁ এটাতে তুমি ভালো এক্সপার্ট। দেখলাম তো।” আশফির হাসিটা এ মুহূর্তে মাহির গা জ্বলিয়ে দিলো। আশফির দিকে প্রায় তেড়ে এসে বলল, – “খুব ভালো লাগে, না? যখন এভাবে কোনো মেয়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে!” – “লাগে, ভালোই লাগে। মিথ্যা তো আর বলা যায় না। নিজেকে বিশেষ থেকেও বিশেষ কিছু মনে হয়। কিন্তু সত্য কথা হচ্ছে আজকে ভালো লাগেনি। খুবই বাজেভাবে অ্যাসাউল্টেড করার চেষ্টা করা হয়েছে আমাকে।” মাহি ওড়নাটা ধরে দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ। তার রাগের মাত্রা আশফি খুব ভালোভাবেই আন্দাজ করতে পারছে। রাগ হওয়া অবশ্যই স্বাভাবিক। কিন্তু তবুও আশফির খুবই হাসি পাচ্ছে। তার উপর হঠাৎ সেই ওড়নার হদিসও পেয়েছে সে। এ বিষয়ে সে নিশ্চয়ই কোনো প্রশ্ন করবে তাকে। কিন্তু তার মাঝে এতই রাগ কাজ করছে যে হাতে ধরে রাখা ওড়নাটার কথা সে ভুলেই গেছে। আশফি তাকে জিজ্ঞেস করে বসলো, – “এটা কীসের ওড়না? তুমি তো এখন সেলোয়ার-কামিজ পরো না।” মাহির রাগ এবার আরও বাড়ল। সে প্রশ্ন করল, – “তুমি চেনো না?” আশফি একদম অস্বীকার জানাল, – “না তো। আমি কী করে জানব? আমি কি সেলোয়ার-কামিজ পরি?” মাহি আর একটা কথাও বলল না এর বিপরীতে। ওড়নাটা হাতের মধ্যে নিয়ে মুচড়ে ফেলে ছুঁড়ে ফেলল নিচে। তারপর সোজা বাথরুমে ঢুকে চোখে মুখে অনেকক্ষণ যাবৎ পানি ছিটিয়ে বেরিয়ে এলো। আশফি তখন নিচে থেকে ওড়নাটা তুলে নিয়ে বসে আছে হাতে মাহির গিফ্ট বক্সটা ধরে। ওটা খোলার আগেই মাহি দ্রুত ছোঁ মেরে নিয়ে নিলো তার থেকে। – “আপনি আমার পার্সে হাত দিয়েছেন কেন?” – “বাথরুম থেকে আসার পর কী হলো? কিছুক্ষণ আগেও তো তুমিই ছিল। আবার আপনি হলো কেন?” – “ভুল করে হয়ে গিয়েছিল ওটা। তুমি খুব আপনজনের জন্য। আর আপনি আমার আপন কেউ না।” মাহির এই রাগের কারণটিও আশফি জানে। উঠে দাঁড়িয়ে ওড়নাটা মাহির কোমরে জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের কাছে টেনে এনে মৃদুস্বরে বলল, – “কেউ ঝাঁপিয়ে পড়লে তখন আপনজন লাগে, না?” – “ছাড়ুন। আপনার কাজে যান আপনি।” মুখটা গম্ভীর করে বলল মাহি। আশফি ওড়নাটা নাকের কাছে এনে বলল, – “এটার পারফিউমটা মনে আছে তো? বলতে পারো কতদিন আগের এই পারফিউমটা?” – “বাজে কথা বলবেন না। প্রায় দেড় বছরের বেশি এটা আপনার কাছে। আর এখনো এটাতে আমার পারফিউম জড়িয়ে থাকবে?” – “আমি তো এখনো পাচ্ছি।” মাহি তার কথার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ওড়নাটা নাকের কাছে ধরে গন্ধ শুকল। হ্যাঁ, সেই গন্ধটা এখনো আছে। মাহির মনে পড়ল সেদিনই তো সে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে বসেছিল রুমে। মাহির রাগটা এবার কমল। কিছুটা স্বস্তির হাসি আর লজ্জাতে পড়া হাসি তার ঠোঁটে। সে বলল, – “আপনার মনে আছে আমি তখন কী পারফিউম ব্যবহার করতাম?” আশফি ছেড়ে দিলো মাহিকে। জবাব দিলো, – “ভুলে যাব ভাবছি। কারো আপনজন যদি না-ই হতে পারি তো এত কিছু মনে রেখে লাভ কী?” কথাটি বলে আশফি চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলো। বিছানা থেকে গাড়ির চাবিটা তুলে চলে যাওয়ার মুহূর্তেই মাহি তার হাত টেনে ধরল। এরপর সেই গিফ্ট বক্স থেকে হোয়াইট গোল্ডের ওপর ছোট একটি ডায়মন্ড স্টোন দিয়ে ডিজাইনকৃত কাপল রিং বের করল। বড়টা আশফির জন্য আর ছোটটা তার নিজের জন্য। আংটি দুটোর আকর্ষণীয় ব্যাপার হলো একটি হার্টের অর্ধেক আশফির আংটিতে আর বাকি অর্ধেক মাহির আংটিতে। আঙুল দুটো এক করলে হার্টটা পরিপূর্ণ হবে।কিছু না বলেই মাহি আংটিটা পরিয়ে দিলো আশফির আঙুলে। তারপর বলল, – “সিলমোহর। অর্থাৎ ব্যক্তিগতভাবে এই লোকটা শুধুই আমার সম্পদ।” আশফি নাটকীয় সুরে হালকা কেশে উঠল। ঠোঁটে তার মৃদু হাসি। সে জিজ্ঞেস করল, – “এতে লাভ? মানে আমার লাভটা কোথায় আর আপনার লাভটা কোথায়?” – “আমার লাভ তো অনেক। সেটা এমনিতেই জেনে যাবেন।” – “আর আমার? আমার তো কোনো ফায়দা নেই এতে। আমি কেন পরব?” তার কথা শেষ হতেই আশফির কলার টেনে ধরে তাকে খানিকটা নিচু করে তার ওষ্ঠজোড়াতে সেই রাতের দানবের মতো করে হামলে পড়ে চুমু খেয়ে বসলো সে। মাত্র পাঁচ সেকেন্ডের চুমুতে জবাবটা বেশ অসাধারণ লাগল আশফির। তারপর তাকে মাহি বলল, – “এটা ছিল আপনজনের থেকেও কতটা বেশি তা বোঝানোর মাধ্যম।” এটুকু বলে থেমে গেল সে। এরপর বলল, – “আসতে পারো।” আশফি ঠোঁটের বাঁকা হাসি হেসে এগিয়ে এলো মাহির কাছে। তার হাত থেকে দ্বিতীয় আংটিটা নিয়ে মাহির আঙুলে পরিয়ে দেওয়ার মুহূর্তে বলল, – “সিলমোহর। অর্থাৎ ব্যক্তিগতভাবে এই মেয়েটি শুধুই আমার সম্পদ।” এটুকু বলে সে হেসে উঠল। তারপর আবার বলল, – “জালে আটকে পড়লে কিন্তু।” মাহির কানেকানে ফিসফিসিয়ে বলল, – “বাদ বাকি হিসাব রাতে।”……………………………… (চলবে) – Israt Jahan Sobrinভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইল। গল্পের শেষ মুহূর্তে এসে এভাবে পাঠক হারাব আশা করিনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here