তুমি রবে ৪০

1
1847
তুমি রবে ৪০ . . “মিথ্যারও মহত্ত্ব আছে। হাজার হাজার মানুষকে পাগল বানিয়ে দিতে পারে মিথ্যার মোহ।” মানিক বন্দোপাধ্যায়ের এই উক্তিটি আজ বারবার মনে পড়ছে আশফির। মিথ্যাকে আশ্রয় দিয়েছিল সেই আগে। কিন্তু কেন দিয়েছিল তা কি আর বুঝতে পারল সেই মেয়েটা? – “আমি কি তাকে একবার ফোন করে ধন্যবাদ বলব?” ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ উঠিয়ে আশফি দিশানের দিকে তাকাল। রুমে ঢুকেছে সে মাত্র। ভাইয়ের কাছে এসে বসলো। সে আবার বলল, – “বললাম তাকে ফোন করে তোমার বদলে আমি বলল ধন্যবাদ?” – “ধন্যবাদ বলতে হবে কেন? সে কি ধন্যবাদ দেওয়ার মতো কিছু করে গেছে?” – “না আসলে আমি বুঝতে পারছি না তুমি তার উপর ক্ষেপে আছো না সন্তুষ্ট আছো? যে অনুভূতিময় দৃষ্টি নিয়ে দেখছো ছবিগুলো!” কথাটি বলে দিশান একটু উঁকি দিতে গেল তার ফোনের দিকে। আশফি ফোনটা দূরে এনে বাধ সেধে শীতল দৃষ্টিতে তাকাল দিশানের দিকে। – “তুই কি দেখেছিস এটা?” – “কোনটা ভিডিও না কি ফটোগুলো?” – “ও তাহলে দুটোই দেখেছো?” – “ভিডিও দেখলে কি আর ফটো দেখা লাগে।” হাসতে হাসতে বলল দিশান। আশফি ফোনে ছবিগুলো দেখতে দেখতে বলল, – “খু্ব বেশি করে ফেলেছে সে।” কথার মাঝে হীরা এসে দাঁড়াল দরজার সামনে। খানিকটা গম্ভীর কণ্ঠে আশফির দিকে তাকিয়ে বলল, – “দাদা ডাকছেন। রাজকার্য উদ্ধার হলে আসেন।” দাদীবুর ডাক শুনে এই মুহূর্তে ছোট সময়ের কিছু স্মৃতি মনে পড়ে গেল দিশান আর আশফির। দু’ভাই মিলে বা যে কোনো এক ভাই যখন বাইরে থেকে কোনো দুষ্টুমিকর কাজ করে বাড়ি ফিরতো আর তার অভিযোগ আসতো তাদের দাদার কাছেই। দাদা বাড়িতে ফেরার পর ঠিক এভাবেই তাদের দাদীবু এসে ওদের ডেকে নিয়ে যেতেন। ব্যাপারটা মনে পড়তেই দিশান হেসে উঠল। বলল, – “প্রায় আঠারো-বিশ বছর পর।” আশফি হাসতে না পারলেও কিন্তু তার মুখের ভাবটাও অনেকটা হাসি হাসি। হীরা চিল্লিয়ে বলে উঠল দিশানকে, – “খিক খিক করে হাসছিস কেন তুই? তোকেও ডেকেছেন।” – “আমাকেও!” হীরা কোনো উত্তর না দিয়ে চলে গেলেন। দিশান উঠে দাঁড়িয়ে বলল, – “মারবে-ধরবে না কি?” – “আঠারো-বিশ বছর আগে যখন খেলাম না আজও খাওয়ার সম্ভাবনা নেই। চল।” . পাশাপাশি দুজন বসে আছে সোফাতে। আবরার স্তম্ভিত হয়ে চুপচাপ বিছানার ওপর পা তুলে বসে আছেন সেই গম্ভীর মুখে। হীরা তখন রুমের বাইরে৷ হঠাৎ আবরার উঠে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন৷ এবার কিছুটা চমকে গেল ওরা দুই ভাই। বকাঝকা এতগুলো বছরে যতবার করেছে তাদের তিনি, কোনোবারই রুমের দরজা আটকাননি। তাদের পাশের সোফায় এসে বসলেন আবরার। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে আশফিকে বললেন, – “এতই যদি ভালো লাগতো তবে ঐন্দ্রীকে কেন আংটি পরিয়ে এলি? না কি গাছেরও খাওয়ার শখ ছিল আর তলারও।” এবার আশফি বলল, – “এত খারাপ চিন্তাভাবনা আমার কোনোদিনও ছিল না দাদা।” চেঁচিয়ে বললেন আবরার, – “তাহলে কি তুই ওকে…?” – “কখনোই না। আমি তাকে সেদিন রাতে জোর করে রাখিনি। সে নিজের ইচ্ছাতে ছিল।” – “আর যে ফোর্সগুলো দেখতে পেলাম ছবিতে? সেগুলো কি বানোয়াট?” আশফি দৃষ্টি নত করে রাখলো। আবরার আরও একবার ছিঃ! ছিঃ! বলে উঠলেন। – “একই ঘটনার রিপিট হতে যাচ্ছে আবার। কী পাপ করেছিলাম আমি? নিজের ছেলের বেলাতেও যা ভোগ করতে হলো আর আজ নাতির বেলাতেও।” প্রচন্ড দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখ আবরারের। দাদার এ অবস্থা দেখে আশফির রাগটা ক্রমশ বাড়তেই আছে মাহির প্রতি। – “ওই মেয়েটার কী হবে একটু বল তো তোরা? আর এই যে এই পরিবারের সম্মানটা কোথায় নামবে আজ?” দিশান আশফি দুজনেই নীরব। – “শত্রুটা মূলত কার? মাহির না কি তোর?” – “আমার কোনো শত্রুতা নেই কারো সঙ্গে?” – “শত্রুতা না থাকলে পত্রিকার নিউজগুলো এমনি এমনি ছেপেছে, না?” চেঁচিয়ে উঠলেন আবরার। আশফি বলল, – “আমি বলছি তো। এখানে আমার কোনো শত্রু নেই। যদি আমার থাকতো তাহলে ভিডিও বা ছবিগুলো আমাকে সেন্ড করা হতো।” – “মেনেই নিলাম শত্রু মাহির ক্ষতি করার জন্যই করেছে কাজটা। তাহলে সে আগে থেকেই তোদের দুজনকে ফলো করে আসছে।” – “হয়তো।” – “তুই আর ঐন্দ্রী তার বাড়ি বয়ে গিয়েও তাকে পরিবারের সামনে অপমান করে এসেছিস। আর এখন কী করলি? তাকে একবারে পঁচা পানিতে চুবিয়ে উঠালি। পরিবার ছাড়া হলো সে, এখন তো সমাজ ছাড়াও হতে বেশি সময় লাগবে না। যে এই ছবিগুলো ওকে দিয়েছে সে ওকে পাবলিকের সামনে কতটা নিচে নামাবে তা নিশ্চয় বুঝতে পারছিস তোরা। আমার তো ইচ্ছা করছে তোকে নিজে হাতে পুলিশের কাছে গিয়ে তুলে দিই। কারণ ওর ওপর তোর ক্ষোভটা আমি ভালোভাবেই জানি। মানে এতগুলো বছর এত কষ্ট করে মানুষ করলাম! তাও যদি সেই বাপের মতোই হবি তাহলে এত কষ্ট কেন করলাম? আর ওই মেয়েটারই বক কী হবে? ওর দাদু তো শুনেছি কিছুদিন যাবৎ খুবই অসুস্থ। তার উপর নাতির এসব। ও তো কখন যেন মরে যাবে স্ট্রোক করে৷”
আবরার কতক্ষণ মাথা চেপে ধরে বসে রইলেন। এরপর নাতিদের আদেশ করলেন চলে যাওয়ার জন্য। আরও কত সময় রুমের মধ্যে পায়চারী করে অবশেষে হীরাকে ডাকলেন। হীরা আসতেই তাঁকে বললেন, – “আমার মাথা ঘুরছে। একটু আমার পাশে বসো।” আবরার বিছানায় হেলে বসতেই হীরা দ্রুত তাঁর পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। প্রেশার খুব বেড়ে গেছে নিশ্চয়। হীরা তাকে দ্রুত প্রেশারের ওষুধ খাইয়ে দিয়ে বললেন, – “একটু শোও তো তুমি। এত টেনশন করো না।” আবরার তার কোনো কথার উত্তর না দিয়ে মাহিকে কল করলেন। মাহি ফোনটা রিসিভ করেই সালাম জানালো তাকে। – “তুমি ঠিক আছো তো দাদু?” – “জি দাদ আমি ঠিক আছি। আপনি ভালো আছেন?” – “আর ভালো! বলছিলাম তোমার বাসায় কি এখনো…” – “আমি জানি না দাদা।” – “আচ্ছা কাল একবার তোমাকে আর আলহাজকে আমার সঙ্গে দেখা করতে হবে।” – “দাদু খুব অসুস্থ৷ এগুলো জানলে ওনার কী হবে আমি ভাবতে পারছি না।” – “তার থেকেও বড় ভাবনা তোমাকে নিয়ে। আমি কথা বলেছিলাম আশফির সঙ্গে। আমি তার মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছি সে এখানে কত বড় অপরাধী। আর একদিন না একদিন তো জানবেই তারা। বরং বাইরে থেকে জানতে পারলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় বেশি। আশফি আমার নাতি বলে তার অপরাধ আমি ক্ষমার চোখে দেখে তোমার জীবন নষ্ট করব না। পেছন থেকে কে এই কাজগুলো করছে তা জানার ব্যবস্থাও আমি করছি।” . প্রচন্ড কাঁদতে ইচ্ছা করছে মাহির। কিন্তু কেন যেন সে কোনোভাবেই কাঁদতে পারছে না। এমনটা তো সে কোনোদিনও চায়নি। আজ নিজের সম্মান ফিরিয়ে আনতে গিয়ে তাকে আরও বড় সম্মান মানুষের সামনে প্রকাশ করতে হলো। এ কোনো প্রতিশোধ নেওয়ার লড়াই ছিল না। ছিল নিজের যোগ্য সম্মান ফিরিয়ে আনার লড়াই। আর সেখানে আজ সেই মূল্যবান সম্পদকেই তার বলি দিতে হলো। – “রেজিগনেশন তাহলে সত্যিই পাঠিয়ে দিয়েছিস?” মাহি চোখ দুটো বন্ধ করে বসেছিল। সংক্ষেপে শুধু মাথা ওপর নিচ করে তার প্রশ্নের উত্তর জানাল। – “মাথা যন্ত্রণা করছে খুব? মাথা কি একটু টিপে দেবো আমি?” মাহি দিয়ার কথার উত্তর না দিয়ে বলল, – “তোর মনে আছে ছোটবেলায় বইয়ে এমন একটা কথা পড়েছিলাম। স্বাস্থ্য হারিয়ে ফেললেও এক সময় তা ফিরে পাওয়া যায়। কিন্তু সম্মান হারিয়ে ফেললে তা কোনোদিনও ফিরে আসে না। তবে কি আমিও আর কোনোদিন আমার প্রাপ্য সম্মানটুকু ফিরে পাবো না? তবে এতকিছু তাহলে কেন করলাম? বড্ড বোকামি করে ফেলেছি রে। দাদু, বাবা একবার এগুলো শুনলে তাদের কী হবে জানিস?” – “তুই কোনো ভুল করিসনি মাহি। আশফি তোর থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে প্রচন্ড অপমানিত হয়েছিল। তার শোধ নিতে সে যা ক্ষতি করেছে তোর সেখানে ওর ক্ষতিটুকু তুচ্ছ। একজন মেয়ের শরীরে কাঁদা লাগলে আমাদের সমাজ মেয়েদের যেভাবে বিচার করে আর যে চোখে দেখে, সেইভাবে কখনো কোনো ছেলেকে বিচার করা হয় না। একজন মেয়ে কোনোভাবে তার ভার্জিনিটি হারালে সে হয় ধর্ষিতা আর নয়তোবা নষ্টা মেয়ে উপাধি পায়। কিন্তু কই? একজন ছেলে তার ভার্জিনিটি হারালে তাকে তো ধর্ষিত বলা হয় না বা তাকে কখনো নষ্টা ছেলে বলা হয় না! জানি এই একটা জায়গাতেই আজীবন নারী পুরুষের ভেদাভেদ থেকে যাবে৷ কিন্তু তুই যা করেছিস তা ছিল আশফির প্রাপ্য।” – “ওর দাদা ফোন করেছিলেন।” – “কী বললেন?” – “আসলে আমি যেভাবে শুরু থেকে শেষ অবধি বলেছি ওনাকে তাতে ওনার মনের অবস্থা করুণ। কারণ উনি তো এটাই জানেন যে কেউ একজন আমার ক্ষতি করার জন্যই এসব ফটো, ভিডিও গোপনে তুলে আমাকে ব্ল্যাকমেল করছে। এই ভিডিওটা যদি সে সবার কাছে ছড়িয়ে দেয় তবে তো আমার দাদু, বাবা, মা আত্মহত্যা করবেই সঙ্গে আমাকেও করতে হবে। এখন উনি হয়তো কোনো সমাধানে আসতে চাচ্ছেন। সেই ব্যক্তিকে খুঁজে বের করবেন।” – “এটাই সমাধান? আর ওনার নাতি যে জোর করে তোকে ধরে রেখেছিল তা দেখার পর নাতির কী বিচার করবেন?” – “জানি না। কাল দাদুকেও আসতে বলবেন। কী সমাধান করবেন তা উনিই জানেন। তবে আমি যে সমাধানের জন্য এত বড় ত্যাগ করলাম তা না হলেও এখন আমার আফসোস নেই। আমি ভাবছি শুধু দাদুর কথা। মানুষটার কী হবে? এর মাঝে তো আবার সোম ভাই নতুন নাটক শুরু করেছে। বাড়িতে এসে নাকি বলেছে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে। আমাকেই বিয়ে করবে সে।” দিয়া চেঁচিয়ে উঠে বলল, – “থাপড়িয়ে ওর গাল লাল করতে ইচ্ছা করছে আমার। সেদিন যদি ও তোর সাপোর্টে একটা কথাও বলতো তাহলে তোর বাড়ি থেকে কোনোদিনও তোকে বের হতে হতো না। আমি তোকে একটা কথা ক্লিয়ার করে বলছি মাহি। তোর জীবনে মানায় না ওকে। কোনো পিছুটান রাখবি না তুই ওর প্রতি।” – “না বলে দিয়েছি মা’কে।” মাহি টেবিলের উপর মাথাটা ফেলে চুপচাপ বসে রইল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই প্রকাশ করতে পারলো না সে। . . পরের দিন বিকাল চারটায় মাহি এসে আসলো আশফির বাড়িতে। লন সাইডে এসে বসেছে সে। তার আসার খবর পেয়েই আবরার চলে এলেন। এরপরই আলহাজও এসে পৌঁছালেন। দুই বন্ধু কিছু আলাপ- সালাপ বাদে আবরার আশফিকে ডেকে পাঠালেন। আশফি আসার পরই কথা শুরু হলো। কথা শুরু করল আবরার। সে প্রথমেই তুলে ধরল আশফির মাহিকে পছন্দ করার ব্যাপারটা। গতকাল রাতে আবরার আবার তাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। আশফির মুখ থেকেই সে শুরু থেকে গতকালকের ঘটনা অবধি সব শুনেছেন। আশফিকে মাহি প্রত্যাখ্যান করেছিল সেটাও বলল আবরার। অফিসে মাহির এন্ট্রিতে একজন সবসময় ছিল। আর সে হচ্ছে হৃদয়। সেই মাহি আর আশফিকে চোখে চোখে রেখে মাহির নামে স্ক্যান্ডেল ছড়ানোর জন্য আশফি আর মাহির কথপোকথনের মুহূর্তে তাদের বিভিন্নভাবে ছবি নিয়ে তা ঐন্দ্রীকে পাঠায়। ঐন্দ্রী এতে প্রচন্ড রেগে যায়। এ নিয়ে ঐন্দ্রী মাহির মুখোমুখি হয়ে কিছু কথা বলতে চায় মাহিকে। আশফিও রাগের মাথায় ঐন্দ্রীকে মাহির বাসা অবধি নিয়ে আসে। কিন্তু মাহি এখানে পুরোপুরি সরল সেটাই আলহাজকে বলা হয়। আলহাজ সব শুনে কিছুক্ষণ চুপ থাকেন। এরপর বলেন, – “এত কিছু ছিল এর মাঝে! অনেক বড় বোঝা নামালি রে আমার বুকের ওপর থেকে। একজনকে হারিয়েছি বহুদিন আগেই। ভেবেছিলাম মাহি যাতে এমন ভুল না করে তাই আরও বেশি আগলে আগলে রেখেছি ওকে। ওর থেকে পাওয়া ধাক্কাটা আমি সামলে উঠতে পারছিলাম না একদমই।” আবরার, মাহি, আশফি তিনজনই ফ্যাকাসে মুখ করে বসে আছেন। এর পরের ঘটনা কী করে ব্যাখ্যা দেবে আবরার সেটাই ভেবে পাচ্ছেন না তিনি। মাত্র এ ক’দিনেই আলহাজের বৃদ্ধ শরীর আরও ভেঙে গেছে। কে জানে এই ঘটনা জানার পর তার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে! এসব ভাবতে ভাবতে আবরার বলেই ফেললেন তাঁকে। মাহির চোখে তখন পানি টলমল করছে। মাটিতে তার দৃষ্টি থাকলেও সে বুঝতে পারছে আশফির দৃষ্টি তার ওপর গেঁথে আছে তখন থেকে। নাতির এত বড় বিপদ এ শোনার পর আলহাজ পুরোপুরি নীরব হয়ে গেলেন। আবরার তাঁর কাছে নাতির জন্য ক্ষমা ভিক্ষা চাইলেন। আর এর পিছে হৃদয় নয় রয়েছে অন্য কেউ, যাকে আবরার খুব দ্রুতই সন্ধান করবেন বলে শান্তনা দিলেন আলহাজকে। মাহি খুব শক্ত করে দাদুর হাতটা ধরে বসে আছে। তার দাদু কোনো কথায় বলছে না। আজকে আশফি আবরারের নাতি না হলে হয়তো এই ক্ষমা সে কোনোদিনও দান করতেন না তাঁকে। কিন্তু নাতির এত বড় সর্বনাশ সে কী করে সহ্য করবে? মানুষের সামনে কী করে চলবে সে আর তাঁর পরিবার? নাতিটার জীবন কি এখানেই শেষ হয়ে যাবে? সোম তো মাহিকে বিচার করে আবার ফিরে এসেছে। যখন সেও দেখবে এসব তখন তো সেও আর ফিরে তাকাবে না। – “ভাই আমি জানি এর কোনো ক্ষমা নেই। কিন্তু আমি চাইছি একটা সমাধানে আসতে। কী করলে আমার পরিবারের সম্মান আর তোর পরিবারের সম্মান, মাহির জীবন সব ঠিক থাকবে তা ভাবার জন্যই তোকে ডেকেছি।” এত সময় বাদে আলহাজ কেমন ভাঙা কণ্ঠে বললেন, – “তোর ক্ষতিটা কে পুষিয়ে দেবে রে দাদু? তোকে সবাই কী চোখে দেখবে?” এটুকু বলেই আলহাজ উঠে দাঁড়ালেন। মাহিকে বললেন, – “আমাকে বাড়ি নিয়ে চল। আমি আর এখানে বসে থাকতে পারছি না।” আবরার বেশ ভালোভাবে বুঝতে পারলেন আজ থেকে তাঁর এই বন্ধুটির সাথে সারাজীবনের জন্য সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল। হয়তো তাঁর নাতিকেও তিনি কোনোদিনও ক্ষমা করতে পারবেন না। আজ তাঁর নাতির জীবন আবার সুন্দরভাবে গুছিয়ে দেওয়া যাবে। হয়তো ঐন্দ্রীর বদলে অন্য কেউ আসবে তার জীবনে। কিন্তু এখানে দুটো সরল মেয়ের জীবন পাল্টে যেতে পারে। ঐন্দ্রীকে সেদিন যে অবস্থাতে দেখেছিলেন তিনি তাতে মিনহাজও কোনোদিন মাফ করবে না আশফিকে। আর সব থেকে বড় ক্ষতিটা হলো মাহির। তাঁর তো এখন ইচ্ছা করছে নিজের নাতিটাকে ইচ্ছা মতো পেটাতে। আবরার উঠে দাঁড়িয়ে বলল, – “আমার কিছু কথা শোন ভাই। একটু বস।” আলহাজ তাঁর কোনো কথা শুনলেন না। নাতনির হাত ধরে সামনে এগোতে থাকলেন। হঠাৎ এর মধ্যেই আলহাজের মাথা ঘুরে উঠে। আশফি কিছুটা কাছে ছিল বিধায় সে দৌঁড়ে গিয়ে তাঁর পড়ে যাওয়ার আগেই ধরে ফেলে। তাঁকে বসিয়ে বেশ কিছুক্ষণ বাতাস করল মাহি। প্রচুর পরিমাণে ঘামছে তাঁর শরীর। মাহির কান্না যেন এবার বাঁধ ভাঙার মতো। ঘন্টাখানেক হওয়ার পূর্বেই আশফি ডক্টর ডেকে আনে। এর মাঝে আশফি আর মাহির ঘৃণার দৃষ্টি ফেলে তার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। . অনেক ভাবনা চিন্তার পর আবরার সিদ্ধান্ত নেয় মাহিকেই তিনি তাঁর নাতবউয়ের স্থান দেবেন। এমনকি মাহির দাদুকেও তা জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। এ সিদ্ধান্ত শোনার পর হীরা বললেন, – “আবারও কিন্তু তুমি একই ভুল করছো।” – “কোনো ভুল নয়। তোমার নাতি তো তাকে পছন্দ করতোই।” – “হ্যাঁ করতো। কিন্তু তাদের মাঝে যা হয়ে গেছে এরপর কে কতটুকু কাকে গ্রহণ করতে পারবে তা কি জানো? একবার জিজ্ঞেস করে দেখতে জোজোকে।” – “কেন জিজ্ঞেস করব?” – “কেন করবে না? মাহবুবের জীবনে যা ঘটেছে যদি ওর জীবনেও তাই হয়? তুমি মানো বা না মানো। আমি মনে করি পরের ভালো করতে গিয়ে তুমি নিজের ছেলের ভালো দেখোনি। আমি জোজোর বেলাতে তা করতে পারব না। ও যদি মাহিকে বিয়ে করতে রাজি হয় তবেই হবে। আশা না হয় ছিল গ্রামের সাধারণ, অশিক্ষিত একটা মেয়ে। মাহি তো তা নয়। সে নিজের জীবন সুন্দরভাবে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেতেও পারে।” – “হীরা। নিজেদের ভালোটাই দেখলে? আর যদি না পায় সেই সুযোগ? সম্মানের কাছে গ্রামের মেয়ে আর শহরের মেয়ে বলে কিছু নেই। কারণ সম্মান গেলে সে গ্রামেরই হোক বা শহরের হোক তা উভয়েরই যায়। আমি তো এখানে আরও একজনের কথা ভাবছি।” একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবরার বললেন, – “ঠিক আছে ডেকে পাঠাও তোমার নাতিকে। দেখি সে কী বলে?” . আশফি রুমে এসে দেখল সেখানে সে বাদে সবাই উপস্থিত। সে বসার আগেই আবরার জিজ্ঞেস করলেন, – “তোমার সাথে কথা বলতেও এখন আমার অসহ্য লাগছে। তবুও বলতে তো হবে। আমি ভেবেছি এ সপ্তাহের মাঝেই তোমার বিয়ে হবে মাহির সাথে। কিন্তু সেখানে তোমার সম্মতি থাকা জরুরি।” আশফি ফুঁসে উঠে বলল, – “কখনোই না। আমি ওকে কোনোদিনও বিয়ে করব না।” দিশান বসে নখ কামড়াতে ব্যস্ত ছিল। আশফির উত্তর শুনে তার দাঁতের কামড় বসে গেল আঙুলে। বিস্ময়ে সে মৃদুস্বরে বলে উঠল, – “সত্যি!” তবে কারো কানে সে কথা না পৌঁছালেও আশফির কানে ঠিকই পৌঁছালো। আবরার জিজ্ঞেস করলেন, – “সমস্যা কোথায়? তুমি না কি তাকে প্রস্তাব দিয়েছিলে? এখন কেন চাইছো না?” – “ভুল করেছিলাম। আমার সাথে ওর যায় না। আর ওর সাথেও আমার যায় না। এটাই কারণ। এর বেশি কিছু আর বলতে পারব না।” আশফি গটগট করে চলে গেল ওপরে। দিশানও কিছুক্ষণ পর উঠে গেল। আশফির রুমে ঢুকতেই আশফি তাকে দেখে হাতের কাছে পেপাড় পেয়ে সেটা তার গায়ে ছুঁড়ে মারল। দিশান হাসতে হাসতে পেপাড়টা ক্যাচ করে এসে বিছানায় শুয়ে হাসতে থাকল। এর পরের দিন আশফি অফিসে এসে হাতে পেলো মাহির পদত্যাগ পত্র। কিন্তু তাতে তার কোনো আলাদা ভাবমূর্তি প্রকাশ পেলো না। নিজের কাজে মনোযোগ হলো সে। বারবার হাতের সময় দেখছে সে। এর মাঝেই একদম ঝড়ের মতো এসে ঢুকল মাহি আশফির কেবিনে। আশফি তাকে দেখে রেগে গিয়ে শুধু বলল, – “অসভ্যতামির একটা লিমিট থাকা উচিত।” মাহি দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিয়ে ব্যাগ থেকে ছুরি বের করে আশফির চেয়ারটা সোজা তার দিকে ঘুরিয়ে তার গলায় আটকে ধরল। আশফি যেন পুরো স্তব্ধ তার এই নতুন রূপে। – “কী বলেছেন? কোনোদিনও আমাকে বিয়ে করবেন না। আমাকে আপনার সাথে যায় না?” আশফি ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করল, – “কে বলেছে তোমাকে?” মাহি চেঁচানো কণ্ঠে বলল, – “শুনেছি আমি। দিয়ার থেকে সব শুনেছি দিশান যা যা বলেছে। একা রুমে ফাঁকা পেয়ে বুকের ভেতর চেপে ধরে চুমু খেতে পারেন খুব। শুধু বিয়েতে সমস্যা। আমি মাহি বলছি, বিয়ে আমি আপনাকে কাউকে করতে দেবো না যদি এই দেশেই বিয়ে করতে চান। আপনার চরিত্রের ফুল সার্টিফিকেট শো করব সব জায়গায়।” – “মাহি ছুরিটা নামাও। যে কোনো সময় লেগে যেতে পারে।” – “লাগার জন্যই তো ধরেছি। এই বিয়েতে মত না দিলে আমি এই ছবি আরও সুন্দর করে এডিট করে বিশেষ বিশেষ স্থানে দেবো।” – “তাতে তোমার সম্মান খুব বাড়বে?” – “যার একবার সম্মান যায় তার দ্বিতীয়বার যাওয়ার আর ভয় থাকে না। আমার সত্যিই আর কোনো ভয় নেই এই সম্মান নিয়ে। তবে আবরার সাহেবের আছে, তাঁর নাতির আছে।” – “মাহি প্লিজ ছুরিটা নামাও। আমার গলায় লাগছে। আর আমি তোমাকে বিয়ে করব না বলেছি তো করব না। ওই ফটো আর ভিডিও তুমি এক্ষণি ডিলিট করবে।” ছুরিটা আরও বেশি শক্ত করে ধরে বলল মাহি, – “করব না। আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আগে সোশ্যাল মিডিয়াতে দেবো। আর এরপর ঠিক এই গলার মধ্যেই এটা ঢুকিয়ে তারপর বের হবো এখান থেকে।” – “রিফিউজড করেছিলে তুমি আমাকে। তাহলে এখন কেন এত উঠে পড়ে লাগছো?” – “মিডল ক্লাস মেয়েদের সম্মান কী আর ওরা একবার সম্মান খোয়ালে কী করতে পারে সেটাই দেখাবো। আমার পরিবার এখন কতটা দুর্দশার মাঝে আছে আমাকে নিয়ে তা কেবল আমিই জানি। তাদের এই দুর্দশার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য করব। আমাকে আজীবন ঘরে বসিয়ে রেখে কষ্টে ধুঁকে ধুঁকে তারা মরবে তবুও কোনোদিনও কারো হাতে পায়ে ধরে তাদের মেয়েকে কারোর ঘাড়ে গছিয়ে দেবে না। আমি লাস্ট টাইম বলছি। বিয়েতে মত না দিলে আল্লাহর কসম এই ভিডিও আপলোড করতেও আমার হাত কাঁপবে না। তাই বলছি, এখনি ফোন দিন আপনার দাদাকে। আর বলুন আপনি আমাকেই বিয়েটা করতে চান।” আশফি মাহির চেহারা আর তার কথা শুনেই বুঝে গেল এখন ঠিক কতটা অস্বাভাবিক অবস্থার মাঝে মাহি। আর এ অবস্থায় সত্যিই সে সবকিছু তুচ্ছ করে এই ভিডিও অবধি আপলোড করে বসবে। তাই আশফি চুপচাপ ছুরিটা গলাতে থাকা অবস্থাতেই তার দাদাকে ফোন করে জানাল সে এই বিয়েতে রাজি। …………………………….. (চলবে) – Israt Jahan Sobrin প্রচন্ড এলোমেলো মাথা নিয়ে লিখেছি। ভুলসমূহ ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

1 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে