তুমি রবে ১

0
3049
তুমি রবে ১।। . . চোখের নিমিষেই মানুষটা হারিয়ে গেল না কি? না দেখার ভুল ছিল? দেখার ভুল হওয়া সম্ভব নয়। নিজের জন্মদাত্রীকে কেউ ভুল চিনতে পারে? আশফি ঠিকই দেখেছে। মানুষটা ওর মা-ই ছিল। শপিংমলের সেকেন্ড ফ্লোর থেকে থার্ড ফ্লোরে গেল সে। চারপাশের দোকানগুলোতেও খুব ভালোভাবে খুঁজল। কিন্তু দেখা মিলল না। এরপর ফোর্থ ফ্লোরে গেল। সেখানেও খুঁজতে খুঁজতে হয়রান আশফি। হঠাৎ করে সেই মানুষটাই ওর সামনে থেকে আবার চলে গেল। আশফির চোখে চোখ পড়তেই সে কোনো একটা ট্রায়ালরুমে ঢুকে গেল। আশফি এবার দ্রুত সেদিকে ছুটল। জায়গাটাতে সব মহিলাদের গিজগিজ। কিন্তু সেদিকে আশফির কোনো তোয়াক্কা নেই। বহু বছর পর সে এই মানুষটাকে চোখের সামনে দেখল। তাকে না খুঁজেই কী করে চলে যায় সে? ঠিক চার নাম্বার ট্রায়ালরুমে সে ঢুকেছিল। আশফির তা চোখ এড়ায়নি। হন্তদন্ত হয়ে সেই রুমে ঢুকে পড়ল সে। একজন অপরিচিত মেয়েকে জামা পরিবর্তন করা অবস্থায় দেখে আশফি একদম ভড়কে গেল। মেয়েটি আশফির দিকে ভালো করে না তাকিয়েই চিৎকার করতে গেল। আর চিৎকার দেওয়ার সেই মুহূর্তে আশফি তার মুখ চেপে ধরে বলল, – “ম্যাম প্লিজ চিল্লাবেন না। একজনকে খুঁজতে খুঁজতে আমি ভুলবশত এখানে ঢুকে পড়েছি। তাছাড়া আমার কোনো খারাপ মতলব নেই।” মেয়েটি ভয়ে চোখদুটো বন্ধ করেই মুখ থেকে আশফির হাত সরানোর চেষ্টাতে ব্যস্ত তখন। আশফির কোনো কথায় সে কানে তুলল না। রীতিমতো তার কণ্ঠ থেকে গোঙানির আওয়াজের মত আওয়াজ হতে থাকল। আশফি তখনো নিজেকে ইনোসেন্ট প্রমাণ করতে ব্যস্ত। এক পর্যায়ে মেয়েটি অতিরীক্ত ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে ঢলে পড়ল আশফির বুকে। একদমই হতবুদ্ধি অবস্থা আশফির। একে তো সে মেয়েদের ট্রায়ালরুমে, তার উপর মেয়েটি অর্ধ খোলা পোশাকে অজ্ঞান হয়ে তার বুকে। এর চেয়ে বড় মসিবত আর কী হতে পারে? আশফি তাকে খুব সাবধানে ফ্লোরে শুইয়ে দিয়ে আরও সাবধানে রুম থেকে বেরিয়ে এলো। এই মুহূর্তে তার জ্ঞান ফেরানো মানে পাবলিকের মার খেয়ে গোরস্থান যাওয়া। যদিও তার নসিব খুব ভালো। না হলে ট্রায়ালরুমে ঢোকাকালীনও কেউ তাকে লক্ষ্য করল না আর বেরুনোকালীনও না । শপিংমল থেকে বেরিয়ে সোজা গাড়িতে উঠে চলে গেল সে। .
– “বুঝতে পারছি না কী বলে শান্তনা দেবো তোকে। এতগুলো মানুষের মাঝে একটা ছেলে মেয়েদের ট্রায়ালরুমে ঢুকে পড়ল আর আমরা সেটা কেউ খেয়ালই করলাম না!” – “থাক চাচি, আর কথা বলো না তোমরা। আমার তো ওই ছেলের থেকেও তোমাদের ওপর রাগ হচ্ছে বেশি। এতটায় মগ্ন হয়ে জামা দেখছিলে তোমরা যে আস্ত একটা ছেলে আমার রুমে ঢুকে পড়ল আর তা তোমাদের কারো চোখেই পড়ল না! কতটা অবিশ্বাস্যকর!” মাহি বসার ঘর ছেড়ে রাগ করে উঠে এলো নিজের ঘরে। বিছানাতে বসতেই ফোনটা বেজে উঠল। – “বলো।” – “ফোন তুলছিলি না কেন?” – “বসার রুমে ছিলাম।” – “শপিং হলো?” – “হ্যাঁ, খুব হলো।” – “যা কিনেছিস তার মধ্যে থেকে যে কোনো একটা পরে ছাদে আয়।” – “ছাদে কেন?” – “আসার পরই জানতে পারবি।” – “আচ্ছা।” একটা হোয়াইট স্যালোয়ার স্যুট পরে মাহি ঘর থেকে বের হলো। তাকে দেখে বড় ভাবী নীলা জিজ্ঞেস করল, – “আমাদের দেখাতে এলি না কি?” – “এত সাধ নেই তোমাদের দেখানোর। সোম ভাই কল করেছিল। বলল ছাদে যেতে।” – “এই রাত আটটার সময়?” – “হ্যাঁ, তার এই রাত আটটার সময়ই আমাকে দেখার ইচ্ছা হয়েছে।” মাহি সোজা ছাদে চলে এলো। সেখানে এসে হতবাক সে। সোম ছাদে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল তার জন্য। অদ্ভুতভাবে সোমও সাদা শার্ট পড়ে এসেছে। মাহিকে সাদা স্যালোয়ার কামিজে দেখে বেশ প্রশস্তভাবে তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। মাহি তাকে বলল, – “আমি তো ভেবেছি তুমি নিচে আছ।” – “বোকা নাকি! নিচে থাকলে তোকে তো বেলকনিতেই আসতে বলতাম।” – “ও তাই তো। কেন ডেকেছো?” মাহির প্রশ্নটা শুনে সোমের গা জ্বলে উঠল। বিরক্তির ভাবটা তার চেহারাতেও ফুটে উঠল। মাহিও সেটা ঠিকই লক্ষ্য করল। কিন্তু সে বুঝতে পারল না কী এমন বিরক্তিকর প্রশ্ন করেছে সে। সোম ক্ষিপ্তভাবে বলল, – “কেন ডাকতে পারি তুই বুঝিস না?” মাহির খুব কাছে এগিয়ে এসে বলল সোম। আর তার চাহনিতেও খুব আকুলতা। কীসের আকুলতা তা মাহি আন্দাজ করতেই বুকের বাঁ দিকটাতে কেমন ধাক্কা অনুভব করল সে। সঙ্গে সঙ্গে সোমের দৃষ্টি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তা নিচে নামাল। সোম মাহির আরও কাছে এসে তাকে আদুরে কণ্ঠে বলল, – “তুই বড় কবে হবি বল তো?” মাহি মিনমিনিয়ে বলল, – “আমি তো বড়ই।” – “কচু বড়। শুধু হাতে, পায়ে, শরীরে বড় হয়েছিস। বুদ্ধিতে নবডঙ্কা।” মাহির মুখটা সোম তার দু হাতের মাঝে তুলে নিলো। তারপর বলল, – “আমার চোখের দিকে তাকাস না কেন তুই?” – “তুমি কীভাবে যেন তাকাও। আমার কেমন যেন লাগে।” – “এই কেমন লাগাটাকে একটু স্বাভাবিক করে দেবো?” মাহি সোমের চোখে দৃষ্টি মেলে বলল, – “কীভাবে?” প্রশ্নটা শুনে সোম মৃদু হাসল। তারপর তার ওষ্ঠজোড়া ধীরে ধীরে মাহির ওষ্ঠ পানে এগিয়ে আনতেই মাহি ছিটকে দূরে সরে এলো। সোমের দিকে একবার তাকিয়ে দৌঁড়ে ছাদ থেকে নেমে গেল সে। সোম তাকে বাঁধা দিলো না। এমন ঘটনার সঙ্গে সোম অভ্যস্ত। কিন্তু কখনো সে তা নিয়ে মাহিকে চাপ সৃষ্টি করে না। কারণ সে জানে, মাহি বিয়ের পূর্বে অন্তত কোনোভাবেই সোমের কাছে ধরা দেবে না। সেদিন মাহি ওভাবে চলে যাওয়ার পর প্রায় পাঁচদিন সোমের সঙ্গে সে আর দেখা করেনি। সোম বাসায় এলেও মাহি তার সামনে যায়নি। এমন করেই প্রায় পাঁচদিন সোমকে এড়িয়ে চলল মাহি। . এক কাপ কফি আর একটা সিগারেট ধরিয়ে আশফি বেলকনিতে আসলো। কফির মগটা রেলিং এর ওপর রেখে ডিভানের ওপর বসে আরাম করে সিগারেট টানতে শুরু করল। রুমে লাউড ভলিউমে গান চলছে। একবার আকাশ পানে তাকাল সে। কেমন গম্ভীর ভাব হয়ে আছে আকাশটা। কখন যেন ঝপাং করেই বর্ষণের ধারা বইবে। আবহাওয়াটা মন্দ নয়। সাঁঝের গম্ভীর আকাশ, নিচে ব্যস্ত শহর আর একাকি আশফি সিগারেট আর কফি হাতে। এমন আবহাওয়া তার ভালোই লাগে। এ সময়ে একজন গল্প করার মতো সঙ্গী হলেও খুব একটা মন্দ হতো না। তবে লাইফ পার্টনার হিসেবে নয়। শুধু গল্প করার জন্যই সঙ্গী হলে যথেষ্ট। তার এই একঘেয়েমিপূর্ণ জীবনে কোনো রমণী এনে সংসারের জালে নিজেকে আটকাতে জীবনটাকে আরও বেশি একঘেয়েমি করার কোনো ইচ্ছাই তার নেই। টুপ করে একটা মেসেজ টোন বেজে উঠল তার ফোনে। মেসেজটা ওপেন করার পূর্বে বার্তা প্রেরণকারীর নামটা দেখে আর ওপেন করতে ইচ্ছে হলো না বার্তাটা। কিন্তু ওপাশ থেকে বার্তা প্রেরণকারী তার প্রতিউত্তর না পেয়ে ডিরেক্ট কল করে বসল। কলটা রিসিভ না হওয়া অবধি যখন সেটা অনবরত বাজতেই থাকল তখন আশফি রিসিভ করল। ওপাশ থেকে এক মিষ্টভাষী কন্যা বলে উঠল, – “টার্গেট ছিল, যদি অষ্টমবাবের মাথায় কল পিক না করো তবে সোজা তোমার অ্যাপার্টমেন্ট এসে হাজির হবো।” আশফি সিগারেটটা একবার টেনে বলল, – “ভাগ্যিস রিসিভ করেছিলাম।” ওপাশের মিষ্টভাষী কন্যাটি বলল, – “এত বেশি বিরক্তি এই ঐন্দ্রীকে ঘিরে?” – “কোনো বিরক্তি নয়। তোমাকে সুযোগ দিচ্ছি।” – “কিসের সুযোগ?” – “নিজের জীবনটাকে সুদর্শন আর সুচরিত্রবান কোনো পুরুষের সাথে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছি।” ঐন্দ্রী তখন বলল, – “তোমার সাথে এখন আর কথা বলা যাবে না। কারণ তুমি এখন যা বলবে তা শুনে আমার মাথা বিগড়ে যাবে। আমি এখন এত সুন্দর সন্ধ্যার সময়টা মাথা বিগড়িয়ে নষ্ট করতে চাই না। দেখা হবে, বাই।” ফোনটা কাটতে আশফি যেন স্বস্তি ফিরে পেল। . দিয়ার চোখ থেকে চশমাটা খুলে সেটা বেলকনির রেলিং এর ওপর রাখল মাহি। ওর হাত থেকে বইটাও কেড়ে নিলো। দিয়া কপাল কুচকে তাকালে মাহি বলল, – “শোন, তোর কি মনে হয় আমি সত্যি সত্যি গ্রুপ স্টাডি করতে এসেছি আজ?” দিয়া বেশ গম্ভীর কণ্ঠে বলল, – “মাহি! ঠিক করে বল কী হয়েছে? বিকালে হঠাৎ করে এসে এমনভাবে পড়লি যেন ক’দিন পড়তে না পেরে তোর দম বন্ধ হয়ে আসছে।” – “আজ সন্ধ্যায় সোম ভাইয়ের মা আর বোন আসবে।” – “হ্যাঁ, তাতে কী?” – “আমাকে দেখতে আসবে। এমনিতেই সোম ভাই সবসময় কানের কাছে প্যাচপ্যাচ করে এই বলে, ‘চল পাগলি বিয়ে করে ফেলি।’ আর তার উপর সোম ভাইয়ের মা আর বোন যদি আমাকে দেখে পছন্দ করে নেয় তবে বিয়ে নিশ্চিত। মা আর বাবা তো এক পায়ে খাড়া।” – “বুঝলাম। আর এই যে তুই না বলে চলে এলি তার কী হবে?” – “আমার গুলুমুলু দাদু আছে তো। দাদু সামলে নেবে। দাদুকে বলে এসেছি।” – “এই মানুষটার জন্যই এত কিছু করতে পারছিস তুই।” – “আসলেই।” চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে রেলিং ঘেষে দাঁড়াল মাহি। হঠাৎ করে আকাশটা কালো হয়ে হালকা বৃষ্টি নামতে শুরু করেছে। রেলিংটা ফাঁকা থাকার দরুন বৃষ্টির পানি ছোঁয়ার জন্য মাহি হাতটা বাড়াল। আচমকা হাতে গরম কিছু অনুভব করে হাত দ্রুত সরিয়ে নিলো। হাতের ওপর অর্ধেক জ্বলন্ত সিগারেট। দিয়া সেটা দেখে রেলিং এর কাছে এসে উপরের দিকে মাথা উঁচিয়ে তাকাল। একটা ছেলের হাত দেখতে পেয়ে দিয়া মাহিকে বলল, – “কত বড় বদমাইশ ভাবা যায়! সিগারেট খেয়ে তা নিচে ফেলছে।” মাহি সিগারেটটা হাতে নিয়েই দাঁড়িয়ে থাকল। দিয়া ওকে বলল, – “একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে নয় তলার বেলকনিতে। মেয়ে মানুষের হাত দেখে ইচ্ছে করে ফেলেছে নিশ্চয়।” – “এটা কী ধরনের ফাজলামি?” – “নিশ্চয় ব্যাচেলর হবে। আর যদি ম্যারিড হয় তো ওই লোকের বউয়ের বেডে আজ তার জায়গা হবে না। ওপরে চল আমার সাথে।” – “দিহানকে একা রেখে?” – “না। ওকেও নিয়ে যাব।” . ছোট ভাই দিহানকে সঙ্গে নিয়ে দিয়া আর মাহি নয় তলায় এসে পৌঁছাল। অনেক্ষণ ধরে বেল বাজানোর পর দরজাটা খোলা হলো। লম্বায় ছয় ফুটের বেশি বেশ সবলদেহী একজন সুদর্শন পুরুষ তাদের সামনে দাঁড়িয়ে। ফিট বডিওয়ালা একজন ছেলেকে খোলা শরীরে দেখা মানে মাহির কাছে সেটা বেশ লজ্জাকর বিষয়। তার কাছে ব্যাপারটা এমন, একজন সুশ্রী ও আর্দশ নারী যেমন কোনো পরপুরুষের সামনে ওড়না ছাড়া দাঁড়াতে পারে না ঠিক তেমনই একজন পুরুষেরও উচিত তার লোমবিশিষ্টি বা লোমহীন, প্রশস্ত বা অপ্রশস্ত বুক তার শার্টের নিচে ঢেকে রাখা। আর তার উপর যদি তার বডি ফিটনেস নজরকাড়া হয় তবে তার একদমই খোলা শরীরে থাকা উচিত নয় কোনো নারীর সম্মুখে।…………………………….. (চলবে) – Israt Jahan Sobrin

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here