তুই হবি শুধু আমার ২ পর্ব-১৩

0
372

#তুই_হবি_শুধু_আমার (২)💙
#সাইরাহ্_সীরাত
#পর্ব_১৩

কেসটা ক্লোজড করে বাড়িতে ফিরছিলো রোজ। নির্জন রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের আলোই সঙ্গী। রাত প্রায় দুইটা। দূরে একটা চায়ের দোকান থেকে হলদেটে জ্যোতি এসে পড়ছে পিচঢালা রাস্তায়। আজ গাড়িটা ইফতির সঙ্গেই পাঠিয়ে দিয়েছে। ইফতির ছেলেটা অসুস্থ, ওকে নিয়ে হসপিটালে যাওয়া, ছুটোছুটি গাড়ি ছাড়া সম্ভব না। বেশ কিছুসময় হয়েছে রোজ টের পাচ্ছে ওকে কেউ ফলো করছে।পায়ের অস্পষ্ট আওয়াজও কানে ভেসে আসছে। কিন্তু আশেপাশে তাকিয়েও কাউকে খুজে পেল না সে। চৌরাস্তার সামনে আসতেই রোজ হুট করে টের পেল ওর খুব কাছাকাছি চলে এসেছে তারা। রোজ কোমরে গুজে রাখা গানটা বের করে ট্রিগার প্রেস করল। ততক্ষণে চারপাঁচটা হাত এসে পড়লো ওর ওপর। মুখে রুমাল চেপে ধরতেই রোজ ক্লোরোফমের ঘ্রাণ পেল। চোখ দুটো বুজে আসলো মুহূর্তেই। মনে মনে বলল,

-“আ’ই ওয়াজ ওয়েটিং ফর ইট।”

🍁🍁🍁

ইরফানের নতুন প্রেজেক্ট সাঁজেক ভ্যালির পাশেই একটি রিসোর্ট নিয়ে। ফালাকের অনুমান আনসারী সাহেব ও রেণুকে ওখানেই রাখা হয়েছে। অর্ধনির্মিত রিসোর্টটি একদম ফাঁকা। দু একজন পাহারাদার রাখা হয়েছে তারাও রাতের খাবার খেতে চলে গেছে। এই সুযোগটা কাজে লাগালো ফালাক। ভেতরে ঢুকে সে পর্যবেক্ষণ করলো পুরো রিসোর্ট। গ্রাউন্ডফ্লোরের ঘরটা তালাবন্ধ। ফালাক গান বের করে সাইলেন্সার লাগিয়ে তালায় শ্যুট করতেই তালা ভেঙে যায়। ফালাক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দ্রুত ঘরটায় ঢুকে পড়লো। বিধ্বস্ত রেণু ও আনসারী সাহেব এককোনায় ঘুমাচ্ছেন। চেহারার রঙ ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে। ফালাক নিজের লোকদের ডেকে ওনাদের বাইরে বের করে আনে। ঠিক সেসময় ওর ফোনে সিয়ামের কল আসে। ফালাক ফোন রিসিভ করে কানে ধরে বের হতে হতে বলল,

-“বল। ওদিকের কি অবস্থা? চাঁদ বাড়িতে পৌঁছেছে? ”

-“ভাই আমি বাড়ির সামনেই ছিলাম। তিনটা বাজার পর যখন ভাবি আসলো না। তখন ভাবির ইউনিটের দিকেও গেলাম। দারোয়ান বলল, ভাবি দেড়টার পর পরই বের হয়েছে। সারা রাস্তা, এলাকা তন্ন তন্ন করে খুজেছে সবাই। ভাবি কোথাও নেই। আর ভাবি নাকি রেজিগনেশন লেটারও জমা দিয়েছেন। তার মানে কোনো কেসের জন্য তিনি যাননি। ”

ফালাক ফোন কেটে দেওয়ালে ঘু’সি দিলো। রোজের এই বদঅভ্যাস জীবনেও যাবে না সেটা ফালাকের বোঝা উচিত ছিল। দুপুরের ঘটনাগুলো বলার সময় তো রোজ একবারও বলল না চাকরিটা আজই ছাড়ছে। এই মেয়ে ওর ধারণার বাইরের সাব্জেক্ট। ফালাক রাগে কিড়মিড় করে উঠলো। দাঁতে দাঁত ঘসে বলল,

-“এটা ঠিক করলি না চাঁদ। তোর জন্য, শুধুমাত্র তোর জন্য আমি আজকেই তোর বাবা মাকে উদ্ধার করতে বেরিয়েছি। আর তুই? এটা বুঝলি না, আমি এতদিন এতবছর কেন চুপ ছিলাম? তুই বড্ড খারাপ চাঁদ। বড্ড খারাপ।”

ফালাক দ্রুতই রওনা দিল ঢাকার উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে ইরফানের দু’চামচাকেও শ্যুট করল।যাতে আনসারী সাহেবদের মুক্ত হবার খবর ইরফান বা তাঁর কোনো চ্যালার কানে না যায়।

🍁🍁🍁

রোজের সামনে ইরফান দাড়িয়ে। হাতে কিছু কাগজপত্র আর কলম।রোজ ইরফানকে দেখে অগোচরে স্মিত হাসে। সোহানাও সকাল সকাল চলে এসেছে। রোজের দৃষ্টিনত হয়। কিছুক্ষণ পূর্বের কথোপকথন কানে এখনও বেজে চলেছে। আনসারী সাহেবের কোটি টাকা আছে? কই রোজ তো জানে না, ওর বাবার এত টাকা। কিসের টাকা? কোথাকার টাকা? রোজের নামে দলিল করা সব টাকাগুলোর হদিশ এরা কোথায় পেল? কিন্তু সোহানার পরের কথাগুলো শুনে সবটা পরিষ্কার হলো। আনসারী সাহেবের নামেই দাদা নিজের যাবতীয় সম্পত্তি লিখে দিয়েছিলেন।সুলেমান চাচ্চু, ফারিয়া বা ফারুক কাউকে সম্পত্তি তো দূরে একটা পয়সাও দেননি। কিন্তু কেন? দাদা এমন কেন করেছিল? তিন ছেলেমেয়ের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কারন কি? আর আনসারী সাহেবইবা ওনার এত প্রিয় কেন? রোজের কৌতুহল বাড়ছে। কিছু একটা তো ছিল দাদার মনে। কিন্তু কি সেটা? আর সেই টাকাগুলো রোজের নামেইবা কেন দলিল করলেন আনসারী সাহেব? আনসারী সাহেব ন্যায়পরায়ণ মানুষ তিনি তো চাইলেই নিজের ভাইবোনকে ভাগ করে দিতে পারতেন। তিনি সেটা না করে শুধু রোজকে দিলেন?

রোজের হাতের বাঁধন প্রায় খুলে গেছে। রোজ চাইলেই নিজেকে মুক্ত করতে পারবে। কিন্তু না, এখন মুক্ত হয়ে গেলে ইরফানের পরিকল্পনা জানা যাবে না।তাই নেশার ঘোরে থাকার ভান করেই পড়ে রইলো রোজ। ইরফানের কিছু চামচা এসে কয়েকঘা দিয়ে ক্ষান্ত হলো। ব্যাথায় রোজের শরীর টনটন করছে। গতকালই বুলেট ঢুকলো আর আজ সেখানেই লাঠির আঘা’ত। কিছু সময় পর ইরফান নিজে এসে রোজকে জাগানোর জন্য রোজের মুখের ওপর পানি ঢালে। রোজ পিটপিট করে তাকায়। ইরফান কাগজটা এগিয়ে দিয়ে বলে,

-“খুব কষ্ট হচ্ছে তাইনা মা? এখানে পরপর তিনটা সাইন করে দাও। তোমাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। ”

রোজ ব্যাথায় গোঙালো। হাত তোলার মত অবস্থা নেই এটাও বোঝালো। ইরফান বিরক্ত কন্ঠে বলল,

-“সোনার ডিমপাড়া হাঁসটার যত্ন নিতে বলেছিলাম। আধ ম’রা বানিয়েছে কে? এখন সাইন করতে না পারলে তাদের কবরে পাঠাবো আমি। ”

ইরফানের লোকগুলো ভেতরে চলে আসে। চেহারায় চিন্তার ছাঁপ। ইরফান ভ্রু কুঁচকে বলে,

-“কি হয়েছে? ”

-“মুগ্ধতা ম্যাডামকে খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফালাক মনে হয় ডেকেছিলো। ওর কাছে যাওয়ার পর ফেরেনি। সিয়ামকে ধরেছিলাম, মুখ খুলছে না। ”

-“জাহান্নামের যাক! একটা মেয়ে গেলে কিছু হবেনা। ”

রোজ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। কেমন বাবা এটা? কিভাবে কথা বলছে। একটা মেয়ে গেলে কিছু হবে না মানে? এর আরও ছেলে-মেয়ে আছে নাকি? রোজের মনে পড়লো ইরফানের অতিত ঘাটতে গিয়ে ওর প্রেমিকাদের লিস্ট পেয়েছিলো। সেখানে একজনের সঙ্গে বেশ মাখামাখি ভাব ছিল। বর্তমানে সে ভারতে। তাঁর দুটো ছেলে আছে। কিন্তু স্বামীর খোজ নেই।রোজের চোখ লাল হয়ে আসে। এরা কত নিকৃষ্ট। এদের উচিত শিক্ষা দিয়েছে আনসারী সাহেব ও রেণু। এদের আরও শাস্তি দেওয়া উচিত। সেটা রোজ দেবে। আগে আনসারী সাহেব ও রেণু ছাড়া পাক। মুগ্ধতাদের ব্যাপারে যখন উনি এতটা উদাসিন। ওনার যখন আরও বউবাচ্চা আছে, তাদের সঙ্গে ভালো আছেন। তাহলে ওনার ভালোথাকার যথাযথ ব্যবস্থা রোজ নিজে করবে। নরকের কীটকে নরকেই পাঠাবে। ভাবতে ভাবতেই রোজের এটাও মনে পড়লো ওনার সেই ছেলেদের মধ্যে একজন অভিনেতা। জল তাহলে এতদূর গড়িয়েছে। ওখান থেকেই হয়তো সোহানার সাথে তাঁর পরিচয়। অঙ্কগুলো মিলে যেতেই রোজ তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সাইন করা তো দূরে একফোটা কালিও সে কাগজের ওপর ফেলবে না। তাতে এরা যা করার করে নিক। কিন্তু চ্যালাদের শেষের কথাটা শুনে রোজের চেহারা চকচক করে উঠলো। ঠোঁটে ফুটলো অদৃশ্য হাসির রেখা।

-“আনসারী ও রেণুকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে ফালাক। ”

ইরফান রেগে ছেলেটার কলার চেপে ধরে অদ্ভুতভাবে গোঙিয়ে উঠলেন। ছেলেটার কাধ ঝাঁকিয়ে বললেন,

-“কি বললি? ফালাক? ফালাক ওই জায়গার খোঁজ পেলো কি করে? কে বলেছে? ”

-“মুগ্ধতা ম্যাডাম সাবু ভাইয়ের কাছে জিজ্ঞেস করেছিল ভাই বলে দিয়েছে রাঙামাটিতে নতুন প্রজেক্ট হচ্ছে। বোধ হয় ফালাক মুগ্ধতা ম্যাডামের থেকে জেনে নিয়ে..”

ইরফান ছেলেটাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে রোজের দিকে তাকালেন। রোজ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। ইরফান রেগে সবাইকে রোজের ওপর নজর রাখতে বলে চলে গেলেন। দরজা বন্ধ হতেই রোজ চোখ মেলে তাকায়। ফালাক ওর দেওয়া কথা এত দ্রুত রাখবে তা অকল্পনীয় ছিলো। রোজ মৃদু হেসে বলে,

-“রোজ ঋণ রাখে না। সেদিন ছাদে রোজ যেটা বলেছিল সেটা সত্য ছিল ফালাক। আপনার এই ঋণও আমি রাখবো না। এই ঋণ রোজ আপনাকে আপনার চাঁদকে ফিরিয়ে দিয়ে শোধ করবে। শুভ্রমানব তাঁর চাঁদকে পাবে। সম্পূর্ণ রূপে, সম্পূর্ণভাবে। আমি ফিরবো। ”

🍁🍁🍁

বিকেলের দিকে ইরফান ও সোহানা আবার আসলেন। রোজ তখন ঘুমে ঢুলছে। কিন্তু মস্তিষ্কে ওনাদের বাক্য আসতেই রোজের শ্রবণেন্দ্রিয় তীক্ষ্ণ হলো। সোহানা বেশ রেগে বলছেন,

-“তুমি তোমার কথা রাখতে পারছো না ইরফান। কথা ছিল রোজ,রেণু ম’রবে। আর তুমি সাফোয়ানকে আমার হাতে তুলে দেবে। কোথায় সাফোয়ান? কোথায় রেণু? টাকা তো কম নাওনি। তোমার ছেলেরাও কম টাকা পায়নি। তাহলে কাজের কাজটা কি হলো? ”

-“ফালাককে ঠিক এটা সেটা বোঝানো যাবে।ওকে নিয়ে চিন্তা করো না। রোজ সাইনটা একবার করুক। কোটি কোটি টাকার সম্পত্তিগুলো আমার হোক। তারপর রেণু রোজের লা’শ আমি তোমার সামনে এনে ফেলবো। কিন্তু সাফোয়ানকে নিয়ে এই বুড়ো বয়সে কি করবে? তোমার স্বামী সংসার ছেলে। ওদের নিয়ে থাকো। ”

-“সাফোয়ান আমার জেদ ইরফান। আমাকে প্রত্যাখ্যান করে ও আমার ইগোহার্ট করেছে। কি ছিল না আমার? টাকা, গাড়ি, বাড়ি, রূপ, যৌবন। তবুও রেণুর মত এক ফকিন্নির বাচ্চাকে ভালোবেসেছে। আমাকে অপমান করেছে। আমি নিজের অপমান এত সহজে ভুলবো? আর বর সংসার কে চেয়েছিল? ভীরের বাবা আমাকে টাকার জন্য, একটা নিশ্চিত জীবনের জন্য বিয়ে করেছিল। তাকে সেটা দিয়েছি আমি। ওকে বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় টাকা-বাড়ি-গাড়ি দিয়ে বিদায় করা যাবে। ভীরকে সামলানো যেত, কিন্তু সেও সাফোয়ানের মত দুটাকার একটা মেয়ে বিয়ে করে আমার পুরোনো ক্ষতে পুনরায় আঘা’ত করেছে। মেয়েটাকে দু-চক্ষে দেখতে পারিনা আমি। ওটার ব্যবস্থা করলে ভীর কিছুদিন মানসিক চাপে ভুগে ঠিক হয়ে যাবে। ততদিনে ভীরের বাপটাকে মে’রে ফেলবো যেভাবে শশুড়টাকে মে’রেছিলাম। আর তারপর? রোজরা না থাকলে সাফোনয়ানকে হাত করে ভীরের নতুন বাবা বানাতে বাড়তি কোনো চাপ থাকবে না। ভীরও স্বাচ্ছন্দ্যে তাকে গ্রহণ করবে। ”

-“সালাম নিও আপা। বি’ষের চেয়েও বি’ষা’ক্ত তুমি। এই টাইপের মহিলা আমি জীবনে দেখিনি। কবেকার প্রেম এখনও টিকিয়ে রেখেছ। এতগুলো খু’ন করাচ্ছো এক বুড়োর জন্য? ”

-“আমার প্রতিশোধ এটা। আর রোজ আমার ব্যাপারে জানে। যে কোনো সময় ও ভীরকে এসব বলে দিতে পারে। তাই তোমাকে বলেছিলাম ওকে দ্রুত তুলে আনতে।এবার নিজের কাজ মিটিয়ে ওকে শে’ষ করো।”

রোজ নিজের খোঁপার ভেতরে গুজে রাখা মাইক্রফোন সামনের থাই গ্লাসে দেখে ফিচেল হাসে। এত খারাপ মহিলা রোজ এই প্রথম দেখলো। এদের দুজনকে না মে’রে রোজ যাবে না। এদের মত কীটের শাস্তি একমাত্র মৃত্যু। রোজ নিশ্চিন্তে একটা লম্বাঘুমের উদ্দেশ্যে চোখ বন্ধ করলো। মনটা আজ বেশ প্রসন্ন, বাবাই মামনি ফিরে এসেছে যে।

চলবে?

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে