তুই হবি শুধু আমার ২ পর্ব-১১

0
439

#তুই_হবি_শুধু_আমার (২)
#সাইরাহ্_সীরাত
#পর্ব_১১

প্রায় সপ্তাহখানেক বাদে সারিমের কান্নাকা’টি দেখে রোজ বাধ্য হয়ে ওকে নিয়ে ফালাকদের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলো। ফালাক তখন ঘুমাচ্ছে। মুগ্ধতা বসার ঘরে অয়ন্তির সঙ্গে আড্ডা দিতে ব্যস্ত। সারিম বাড়িতে ঢুকেই অয়ন্তির কাছে ছুটে চলে যায়। আগন্তুকের আগমন লক্ষ করে মুগ্ধতা দরজার দিকে তাকালো। রোজ তখনও মুগ্ধতাকে দেখেনি। সে ওরনার মাথা দিয়ে কপালের ঘামগুলো মুছে মন্থর গতিতে এগিয়ে আসছে। মুগ্ধতা নিজের কর্তনকৃত আঙ্গুলের দিকে তাকিয়ে রোষ ভরা দৃষ্টিপাত নিক্ষেপ করে। রোজ এগিয়ে এসে অয়ন্তি ও সারিমের উদ্দেশ্যে বলল,

-“ওকে রাখো হীরামন। আমি বিকেলে এসে নিয়ে যাবো।”

মুগ্ধতা হেসে বলল, “একি! রোজ তুমি এখানে? ”

রোজের নির্বিকার ভঙ্গিতে দাড়িয়ে জবাব দিল, “ওকে দিতে আসলাম। ”

কথাটা বলে রোজ চলে যেতে লাগলে মুগ্ধতা আটকায় ওকে। রোজ ভ্রু কুঁচকে তাকায়। মুগ্ধতা বলে,

-“চলে যাচ্ছো কেন? চলো তোমাকে পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখাই। বউমনি তোমার বোনকে নিয়ে গেলাম। ”

-“আমার কাজ আছে আপু। আমাকে যেতে হবে। পরে সময় নিয়ে দেখা যাবো। ”

-“তা বললে কি করে হয়? আজ প্রথম আসলে। একটু ঘুরেফিরে, খাওয়াদাওয়া করে তারপর যাও। ”

অয়ন্তির দিকে একনজর তাকিয়ে রোজ সম্মতি দিলো মুগ্ধতার কথায়। মুগ্ধতা রোজকে নিয়ে সবার আগে ফালাকের ঘরে গেলো। রোজ বোধ হয় জানত মুগ্ধতা এমন কিছু করবে।তাই নির্বিকার হেটে চলল। ফালাক বিছানার ওপর উবু হয়ে ঘুমাচ্ছে। পরনে সাদা শার্ট আর কালো ট্রাউজার। মুগ্ধতা রোজকে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে বলে,

-“এই মানুষটা শুধু আমার। যদি ওকে কেড়ে নিতে চাও তাহলেও ওকে পাবে না তুমি। কারন আমি না পেলে ওকে কেউ পাবে না।”

-“তোমাকে উনি ভালোবাসেন না? আমি তো জানি যে উনি আর তুমি গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ড। অন্যের বয়ফ্রেন্ডকে নিজের করার কোনো প্রবৃত্তি আমার নেই।ডোন্ট ওয়ারি”

-“বাসতো। তুমি আসার পর থেকে কেমন জানি বদলে যাচ্ছে। সব দোষ তোমার।”

রোজ কিছু বলল না। মেজাজ তাঁর জলন্ত লাভা হয়ে আছে। কি বলছে তার মানে জানে মেয়েটা?এই মেয়েটা ঠিক ওর বাপের মত স্বার্থপর। নিজের স্বার্থে ঘা লাগলে সবকিছু করতে পারে। ফালাকের ঘুম ভে’ঙে গেছে ততক্ষণে। ফালাক উঠে রোজ ও মুগ্ধতার দিকে একনজর তাকিয়ে বাথরুমে চলে গেল। মুগ্ধতা কিছুটা অবাক হয়ে তাকায়। রোজকে দেখেও ফালাক নির্লিপ্ত? রোজ বলে,

-“তোমার কথা শেষ হলে আমি এবার যেতে পারি? ”

-“তোমাদের মধ্যে সত্যিই কিছু চলছে না? ”

-“না। ”

মুগ্ধতা খানিক খুশি হয়ে চলে গেল। হঠাৎ পিঠে ব্যাথা করে উঠলো রোজের। রোজ কয়েকমুহূর্ত স্তব্ধ দাড়িয়ে চলে যেতে শুরু করলেই ফালাক পেছন থেকে ওর হাত টেনে ধরে। এরপর ওকে দরজার কোনা থেকে ঘরের মধ্যে নিয়ে এসে দরজা লাগিয়ে দিলো। ফালাকের দৃষ্টি ভেজা। তা দেখে রোজের মধ্যে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন পরিলক্ষিত হলো না। ফালাকই বলতে শুরু করে,

-“কেন করছিস এমন? ভুল বুঝে কেন দূরে ঠেলে দিচ্ছিস। বিশ্বাস কর সেদিন আমি না জেনেই ওসব বলেছিলাম। ”

-“করলাম। এবার হাত ছাড়ুন। ”

-“কি হয়েছে তোর? এমন ব্যবহার কেন করছিস? তুই রাগ হ, আমাকে মা’র, যা ইচ্ছে কর। তবুও এভাবে চুপ করে থাকিস না। তোর নিরবতা সহ্য করা যায় না। এই সাত সাতটা দিন রাগ করিস নি, সিয়ামদের সঙ্গেও তালে তাল দিয়েছিস। কেন? কেন করছিস এমন? ”

-“আমিও ভুল করেছি সেজন্য ভুলটা সংশোধন করছি। আপনার ভুল ছিল না। সেটা আমি জেনেছি। তাই এসব মনে রেখে কষ্ট পাবেন না। ”

-“কি জেনেছিস? ”

-“আপনার সাহায্য যেহেতু আমার লাগবে তাই সত্যটা বলা যেতেই পারে।কিন্তু আপনাকেও আমায় কথা দিতে হবে। আমি যা যা বলবো তা শুধু আপনি জানবেন আর কেউ না।”

-“ওকে। ”

-“বাবাই মামনি বেঁচে আছে। ভীরের প্যারেন্টস আর মুগ্ধতার বাবার কাছে। আপনি মুগ্ধতার বাবাকে বিশ্বাস করে বোকামি করেছিলেন ফালাক। এজন্য আপনাকে আমি বোকা বলেছি। মুগ্ধতার বাবা মানে আপনার চাচা মানুষটা নিজেকে যেমন ভালো দেখিয়েছেন উনি আসলে তেমন নয়। আপনি সেদিন লরির নাম্বার চেপে গিয়ে যে ভুলটা করেছিলেন তাতে আমার পুরো জীবনটা শেষ হতে হতে বেঁচেছে। কিন্তু পরে যখন মাথা ঠান্ডা হলো। ছাদে আপনার কথা শুনলাম, দাদাইয়ের কথা, আপনার চ্যালাপ্যালাদের মুখে আপনার বর্ণনা শুনলাম তখন বুঝলাম এখানে আপনার কোনো ভুল নেই। চাচার ওপর অগাধ বিশ্বাস করা ভুল নয়। কিন্তু চাচাতো বোনের পাগলামি সহ্য করে যে পরিস্থিতি তৈরি করেছেন সেটা ভুল। ওই পাগল মেয়ে আপনার গার্লফ্রেন্ড বলে নিজেকে পরিচয় দেয়। আপনি এটার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু বলেন না সেটা ভালো তবে আমাকে নিয়ে যেটা করছে তার জন্য চুপ থাকবো না আমি।”

-“কি করতে চাস? ”

-“এই খেলার সমাপ্তি।আর সহ্য করতে পারছি না আমি। আপনি আমার স্বল্পসময়ের বন্ধু ছিলেন। তাছাড়া আপনার বাবা আমার বাবার বন্ধু সেজন্য রাগ পুষে না রেখে এবার সব অশান্তির পরিসমাপ্তি করা উচিত। এই মেয়েটার সঙ্গেও আমার ঝামেলা নেই, আপনাকে নিয়ে সে যা ভাবে ভাবুক। আপনাদের সম্পর্ক নিয়েও আমার আপত্তি নেই। তবে আপনাদের মাঝে আপনারা আমায় বারবার কেন টানছেন? ”

-“মুগ্ধতা কিছু বলেছে? নেগেটিভ কিছু? তোর খারাপ লেগেছে? একবার বল চাঁদ।”

-“খারাপ তো মানুষের তখন লাগে যখন সত্য বলে জানা শব্দগুলো মিথ্যে প্রমানিত হয়। আপনাকে আমি খারাপ বলে জানতাম এটা ভুল ছিল। আরও যেসব তথ্য জানি তাও বোধ হয় আমার জানা ঠিক হয়নি।”

-“কি জানিস তুই? ”

-“যেটা আমাকে কেউ জানাতে চায়নি।আমি সে সবকিছু জানি। আসছি, আমার কাজ আছে। ”

-“পিয়াল, তুশিব, রামীম, নিহাল, আয়মান কে চাঁদ? ”

-“খুজে বের করুন। আমি কেন বলবো? ”

-“ওরা তোকে ভালোবাসে। তোকে সবাই চায়, কিন্তু তুই কাকে চাস? কার হতে চাস? চাঁদ? ”

-“কারোর না। ”

-“আমি তোকে ভালোবাসি চাঁদ। ”

-“জানি। ”

-“এটাও জেনে রাখ, হাজারটা রোমিও থাকলেও তুই হবি শুধু আমার। তোর মন মস্তিষ্ক সব জুড়ে শুধু আমি থাকবো।”

রোজ বিরক্ত কন্ঠে বলে,
-“প্রেম ভালোবাসায় আমার আগ্রহ কোনোকালেই ছিল না নীরদ। এটা জানো তুমি। তোমাকে আমি বন্ধু ভেবে মনের সব কথা বলতাম। ”

তুমি সম্বোধন করেই নিশ্চুপ হয়ে গেল রোজ। এরপর থেমে থেমে বলতে শুরু করে,
-” আপনার মনে আছে আপনার গায়ের রঙের কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম? বলেছিলেন ‘সবাই বলে শ্বেতাঙ্গ ” আমি সেদিন আপনাকে একটা নাম দিয়েছিলাম। আবেগের প্রথম ধাপে আপনি ছিলেন আমার প্রথম আবেগ। আপনাকে নিয়ে কল্পনার শেষ ছিল না আমার।শুভ্রমানব নামটা আজও আমার হৃদয়ে এক বিশাল অংশ জুড়ে আছে। আপনি আমার, শুধুমাত্র আমার শুভ্রমানব হয়ে সারাজীবন থাকবেন কিন্তু বিয়ে ভালোবাসা আমার জীবনের লক্ষ্য নয়।

আমার জীবনে সারিম আর বাবাই মামনিকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করাই মূল উদ্দেশ্য। জানেন,,আমিও সবার মত স্বাভাবিক একটা জীবন চেয়েছিলাম। সবার মতো আমি নিজেও আমার এই কঠিন রূপ কঠিন জীবন চাইনি। পরিস্থিতি আমায় এমন করেছে। আপনার একটা ভুল আমাকে এমন করে তুলেছে। আমি খু’ন করতে চাই না, র’ক্ত দেখতে চাইনা।আগে পুলিশ,খু’ন, খু’নি দেখলে প্রচন্ড ভয় লাগতো আর এখন? মাছ কা’টার মত মানুষ কা’টি।

কষ্টে আমার বুক ভার হয়ে আসে। কিন্তু নিজের রাগ, ইগোর কারনে কারোর বুকে মাথা রাখার সাহস হয়না। প্রচন্ড জেদি আমি। এটা সত্য কিন্তু আগে এমন ছিলাম না।

খুব সাধারণ একটা মেয়ে ছিলাম যার অনেক রঙিন স্বপ্ন ছিল। একসময় বন্ধুদের সঙ্গে বর বিয়ে নিয়ে গল্পে মেতে থাকা আমি এখন কোনো ছেলের প্রতি আগ্রহ খুজে পাইনা। মনে হয়, আমার জীবনটা অতিস্বল্প। এই স্বল্প জীবনে এত ভারি ভারি দায়িত্ব কর্তব্য, কথা দেওয়া আমার দ্বারা হবে না।আপনাকে না দেখে যতটা আবেগে ভেসেছিলাম, দেখার পর সেটুকুও পাইনি। সত্য বলতে আমার মাঝে অনুভূতি নেই শুভ্রমানব। আমি কাউকে ভালোবাসতে জানি না। পারি না। ভীরের সঙ্গেও প্রথম প্রথম নাটকটা করেছিলাম ওকে দেশে এনে ওর বাবা মাকে শাস্তি দিতে। কিন্তু কি লাভ এতে? আমি ওদের শাস্তি দেবো আর ওদের ছেলেমেয়ে প্রতিশোধের নেশায় মেতে উঠবে,যেমনটা আমি উঠেছিলাম। এভাবে শান্তি আসে না। শান্তি পেতে গেলে একজনকে হারতে হবে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি হারবো। ওদের জিততে দেবো। একবার জিতে গেলে আর কি চাই ওদের? প্রতিশোধের আগুণ দাবানলের থেকেও ভয়ঙ্কর শুভ্রমানব।

সারিম বড় হচ্ছে, হীরামন, দাদাই, এতগুলো পরিবার। সবাই যে ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাবে, শুধুমাত্র আমার জন্য। আমাকে আপনি ভালোবাসেন, আমার পার্ফিউম গুলো রাখেন, ঘ্রাণটা ফেবারিট তো আপনার। তবুও আমাকে নিয়ে কোনো প্রত্যাশা রাখবেন না।আমি জানি বাবাই মামনিকে শেষ করবে না তারা। কারন তারা বাবা মামনিকে কষ্টে দেখতে চায়। তাঁর জন্য ওরা আমাকে মা’রবে। কারন বাবাই মামনির সুখের একমাত্র কারন ছিলাম আমি। কিন্তু সারিম আছে, আমি না থাকলেও ও ঠিক আমার বাবাই মামনিকে দেখে রাখবে। ওকে তেমন শিক্ষাই দিয়েছি আমি। তেমনভাবে গড়েছি। তাছাড়া আপনারা তো আছেন। আমি চাই আমার গল্পটার পূর্ণতা। আমাকে ছাড়া সবাইকে নিয়ে যদি সেটা সম্পূর্ণ হয় তাহলে সেটাই অনেক। আপনি বলেছিলেন আমাকে শারিরীক ও মানসিকভাবে চান। মৃত্যুর আগে আপনার ইচ্ছেটাও পূর্ণ করে যাবো। তবে আপনাকে ওয়াদা করতে হবে যে, ইরফানের কাছ থেকে মামনিদের খোজ জোগাড় করে দেবেন। আমার জন্য এটুকু করতে কোনো আপত্তি নেই তো আপনার? ”

ফালাক রোজকে টেনে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিল। রোজ প্রতিক্রিয়াহীন। দৈহিক কোনো টান বা মানসিক কোনো অনুভূতি জাগলো না। ফালাকের হাত রোজের পিঠের ভাজে পড়তেই রোজ ব্যাথায় নড়ে ওঠে।ফালাক ভড়কে হাতের দিকে তাকালো।কালো জামাটা ভিজে। ঘামে নয়, র’ক্তে। ফালাক উতলা কন্ঠে বলে,

-“তোর কি হয়েছে চাঁদ? র’ক্ত কিসের? ”

-“মুগ্ধতা যেতে যেতে গু’লি করেছে। বাড়ির ভেতরে এমন শত্রুতা নেভানোর কারন বুঝলাম না। পাগল, ছিট ওয়ালা মেয়ে। সম্ভবত বুলেট ধার ঘেসে বেড়িয়ে গেছে। তেমন ব্যাথা লাগছে না বলে পাত্তা দেইনি। এর শাস্তি প্রাপ্য ওর। সেটার কথাই প্রথমদিক থেকে বলছিলাম। ”

-“পাগল তুই? দেখি কোথায় লেগেছে? মুগ্ধতার কথা আপাতত বাদ দে। ওকে আমি পরে দেখে নেবো।”

-“ওর নিশানা ঠিকঠাক না, তাই কাঁধের কিছুটা নিচে লেগেছে। আমি যাওয়ার পথে হসপিটাল হয়ে যাবো। চিন্তা করবেন না ”

-“আমাকে নিজের শরীর বিলিয়ে দিতে হবে না চাঁদ। এই খেলাটার সমাপ্তি আমিও চাই। বিশ্বাসঘা’ত’কতার ফল তারা তিক্তই পাবে। তোর কিছু হবে না, আমাকে তুই ভালোবাসিস না তাইনা? সমস্যা নেই। আমি তোকে জোর করবো না।তবে তোকেও অন্যকারো হতে দেখতে পারবো না। র’ক্তক্ষরণ বাড়ছে। হসপিটালে যেতে যেতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। তোর সমস্যা না থাকলে ড্রেসিং আমি করিয়ে দেই? ”

-“হসপিটালে গেলে মহিলা ডাক্তার না থাকলে পুরুষ ডাক্তারদের দিয়েই ড্রেসিং করাতে হত। সেক্ষেত্রে আপনি করলেও আমার আপত্তি নেই। ”

রোজ বাথরুমে ঢুকে জামা খুলে তোয়ালে পেঁচিয়ে বের হয়। ফালাক ফাস্টএইড বক্স নিয়ে খাটের ওপর বসে আছে। রোজ ফালাকের সামনে গিয়ে বসে। ফালাকের দৃষ্টি রোজের কা’টাদাগযুক্ত শরীরে। কালসিটে দাগে পরিপূর্ন রোজের সর্বাঙ্গ। ফালাক নড়েচড়ে বসে। রোজ হেসে বলে,

-“ভয় পাচ্ছেন নাকি? ভাবছেন ফর্সা সুন্দর চেহারার মেয়েটার শরীরে এত দাগ? এই পর্যন্ত আটটা মিশন কমপ্লিট করেছি। সেখান থেকেই আঘাত পেয়ে পেয়ে শরীরের এই হাল। ব্যাথা পেতে পেতে, আ’ঘাতের স্বাদ পেতে পেতে এখন আমার শরীর শুধু একটা পাথর। যা আমাকে অনিচ্ছায় টেনে নিয়ে যেতে হচ্ছে।দেখলেন তো গুলির আঘাতটাও টের পাইনি। সবসময় শরীরে কোনো না কোনো আঘাত থাকেই। তাই নতুন করে ব্যাথা পাওয়ার অনুভূতি পাইনা। নিন জলদি ড্রেসিং করিয়ে দিন। নতুন একটা কেস নিয়ে বেশ ঝামেলায় আছি।ওটা শেষ করে মামনিদের খোজে বের হতে হবে।বুঝলেন, গোয়েন্দার চাকুরিটাও ছেড়ে দেবো এবার। ”

ফালাক তুলা বের করতে করতে বলে,
-“কষ্টগুলো সব তুই একা পেলি চাঁদ। এর পুরো দোষটাই আমার। সেজন্য তোকে আর কোথাও যেতে দেবো না আমি।তোর বাবাই আর মামনিকে আনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমি নিচ্ছি। তুই বরং এখানেই থাক। তোকে ছাড়া সারিমের চলবে কিভাবে? ছেলেটা তো তাঁর আপিয়া বলতে পাগল। ”

-“শুধু ওর জন্যই চুপ আছি শুভ্রমানব। নাহলে এতদিনে কেউটেগুলোর বিষ তাদের ওপরেই উগড়ে ফেলতাম। শুধু ভেবেছি, আমার কিছু হলে সারিমের কি হবে? সারিম আমার নিজের ভাই নয়, তাতে কি? ও আমার বাবাই মামনির ছোট সন্তান। আমার ভাইয়ের থেকেও বেশি। সবেমাত্র ছেলেটার বয়স সাত বছরে পড়েছে, এত দ্রুত ওকে কোনো ঝামেলায় ফেলতে চাইনা আমি। ওর মেধা ভালো, ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। শুধু আমার জন্য ওর জীবন নষ্ট হবে?বলুন। ”

-“এই কা’টাদাগগুলো কিসের?”

-“ওগুলো, একবার আমাকে অপহরণ করেছিল একটা গ্যাং। ওরাই স্টিলের বড় যে ছু’রি আছে না? সেগুলো দিয়ে আঘাত করেছিলো। তিনদিন বেহুশ ছিলাম। পরে ইফতি আমায় উদ্ধার করে। ইফতি ছেলেটা কিন্তু বেশ মজার। আমি সামনে থাকলে বোকা বিড়াল সেজে থাকে আর না থাকলে বাঘা শের। সমস্যা হচ্ছে ও জয়েন করেছে তিনবছর হলো। আর আমি আছি চারবছর। প্রথম বছর আমি জয়েন করে যে পোস্টে ছিলাম। দুবছর পর তাঁর থেকে পদোন্নতি করেছি। আর ও নতুন এসে জুনিওর পোস্টে চাকুরি করছে। এজন্যই হয়তো সিনিওর হিসেবে বেশি রেসপেক্ট করে।”

-“হয়ে গেছে। যা জামা পড়ে আয়। ”

রোজ উঠে চলে গেল। জামাকাপড় পড়ে বেরিয়ে এসে রোজ হেসে বলল,

-“আমার শরীরের ওপর তো আপনার কোনো আকর্ষন দেখলাম না। আকর্ষন কি কা’টাছে’ড়া দেখে মিটে গেল? নাকি টান’ই ছিলনা ?”

-“আর কত অপমান করবি? ”

-“আচ্ছা আর করবো না। বসুন গল্প করি। অনেকদিন পর মনে হচ্ছে পুরোনো শুভ্রমানবকে পেয়েছি। বুঝলেন, গল্প করার নেশাটা এখনও যায়নি। ”

রোজ নতজানু হয়ে বসলো। ফালাক হেলান দিয়ে বসে।রোজ মৃদু হেসে বলে,

-“পৃথিবিতে এমন কিছু সত্য আছে যা আমাদের পরিবার জানে। কিন্তু আমরা জানি না। তারা আমাদের জানাতে চায়নি, জানতে দেয়নি। তবে তাঁর মধ্যে একটা সত্য আমি জেনেছি। আপনি কি সেটা জানেন?”

-“কোনটা? ”

-“তাঁর মানে জানেন না। আচ্ছা আমি বলছি। আপনার বাবা শুধু বাবাইয়ের বন্ধু নয়। আপনাদের সঙ্গে আমার ও আমাদের আরও একটা সম্পর্ক আছে। সেটা এটার থেকেও বেশি মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ। সেটা কি জানেন?”

-“হেয়ালি করবি না চাঁদ। সরাসরি বল। ” খানিকটা ভীত কন্ঠে বলল।

-“আপনার মা ফারিয়া আর মামা ফারুক আমার বাবাই সাফোয়ান ও চাচ্চু সুলেমানের সৎ ভাইবোন। সম্পর্কে আমি আপনার মামাতো বোন। এবং আপনি আমার ফুপাতো ভাই। দাদা কথাগুলো মৃ’ত্যুর সময় জানিয়ে গিয়েছিলেন। তখন মনে হয় আপনার জন্ম হয়নি, দাদাই হয়েছিল। আপনার বাবার সঙ্গে আমার বাবার বন্ধুত্ব অনেক আগের তাই তারা তিক্ত সম্পর্ক না টেনে বন্ধুত্বের মধুর সম্পর্কই বজায় রেখেছিলেন। বিশ্বাস না হলে বাড়িতে বলে দেখুন। আমি কথাগুলো দুঃসম্পর্কের এক দাদির কাছে শুনেছি যখন সিলেট থেকে সারিমকে নিয়ে ঢাকায় এসেছিলাম তখন।কিন্তু কাউকে এটা বুঝতে দেইনি যে আমি সব জানি। সবাই জানলে কষ্ট পেত।”

-“আমি এটা জানতাম। তবে বুঝিনি তুইও জেনে ফেলবি। ভাই বা অয়ন্তিরা এসব জানে না। ”

-“হুম।আপনি জেনে ফেলবেন সেটা আমিও অনুমান করেছিলাম। কারন আমরা দুজনেই অনেকটা একরকম তবে আপনি আমার প্রতি দূর্বল কিন্তু আমি আপনার প্রতি দূর্বল নই। এটাই মূল পার্থক্য। যাই হোক, আসল কথায় আসি। আপনার ভালোবাসাকে আমি সম্মান করি শুভ্রমানব। তবে আবারও বলছি, আপনাকে কখনও ভালোবাসবো কিনা জানা নেই আমার।

আচ্ছা আমাকে এবার যেতে হবে। আপনি প্লিজ মামনিদের খোঁজটা জেনে রাখবেন। আপনার ক্ষমতাও তো কম না। ওহ আরও একটা প্রশ্ন, কলেজে থাকতেন কেন? আপনার তো মনে হয় আরও তিনচার বছর আগে কলেজের পাট চুকেছে।”

-“বিসিএস দিয়েছি। তোদের কলেজের প্রভাষক পদে জয়েন করবো। ইন্টারভিউয়ের ডেট পড়েছিল সেদিন তাই গিয়েছিলাম। আর তোর পুকুরে পড়ার দিন স্যার ডেকেছিলেন। লাইব্রেরির দিন বই নিতে গিয়েছিলাম।”

-“কি সাংঘাতিক। কলেজের প্রভাষককে থা’প্পর মে’রে বদনাম করে দিলাম নাকি? ভাগ্গিস আপনার চ্যালারা ছিল। তাই ঘটনা তেমন রটেনি। বেস্ট অব লাক টু ইউর নিউ চ্যাপ্টার। গুড বাই। ”

রোজ চলে যেতেই ফালাক বলে ওঠে,
-“ভয়ঙ্কর তথ্যগুলো দেখছি সব তোর জানা চাঁদ।তোকে নিয়ে যে কি করি। শান্ত থাকলে লাই পেয়ে মগডালে উঠিস। আর রেগে গেলে চটে যাস। তবে আপাতত তোর জন্য আমার শান্ত স্বভাবই উপযুক্ত। কারন এসবের মধ্যে তোকে আর জড়াতে দেবো না আমি। তোর শরীরের ক্ষতগুলো মুছে যাবে এবার। তোর কষ্টগুলো মিটে যাবে। তোর রঙিন দুনিয়া তুই আবার ফিরে পাবি। আর তোর শুভ্রমানব ফিরে পাবে তাঁর আহ্লাদি চাঁদকে।”

চলবে?

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে