তুই এতো স্বার্থপর কেন রে?

0
787

-তুই এতো স্বার্থপর কেন রে?

– স্বার্থপরতার কি দেখলি?

– পরীক্ষার হলে তুই আমারে তোর খাতাটা একটু দেখতে দিলেই তো আমি পরীক্ষাটা ভাল দিতাম।

– পরীক্ষা হচ্ছে আমরা কি শিখেছি তার প্রমাণ দেয়া। তুই যেটা শিখিসনি সেটা তোর লিখতে যাওয়ার দরকার কি?

– বুঝছি। আর বড় বড় বুলি ছাড়িস্ না। পরীক্ষা হচ্ছে নাম্বার পাওয়ার খেলা। যে বেশি নাম্বার পাবে সে ভাল ছাত্র আর যে কম নাম্বার পাবে সে খারাপ ছাত্র। আমার বেশি নাম্বারের দরকার ছিল না, পাশ করা নিয়েই টানাটানি। তোর পাশে বসছিলাম যে তোর খাতা দেখে কিছু লেখতে পারলে পাশটা করে যেতাম।

– পাশেরজনের খাতা দেখা এবং দেখানো দুটোই নকল। আমি নকল করি না, বন্ধুদেরকেও নকল করতে দেব না।

– ভাল ছাত্র হয়েছিস বলে খুব নীতিবাক্য আউরাচ্ছিস্! বন্ধুর বিপদে সাহায্য না করলে সে আবার কিসের বন্ধু। তোর চেয়ে ভাল তো এই শিহাব। ও পুরো খাতা খুলে দেখাইসে। এর কাছ থেকে কিছু শিখিস্।

ক্লাস এইটের ফাইনাল পরীক্ষার পর বন্ধু সুজনের সাথে এরকম উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছিল ফাইনালে ওকে অংক দেখাইনি বলে। আমি কাউকেই আমার পরীক্ষার খাতা দেখতে দিতাম না। এই নিয়ে স্কুলে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। আমি শিক্ষকের সন্তান। ছোটবেলা থেকেই আমাদের মধ্যে ইথিকস্ বিষয়টা গভীরভাবে ঢুকে গেছে। আমি জানি, পরীক্ষার হলে বন্ধুকে দেখানো আমাদের দেশে একধরনের সামাজিকতা। কিন্ত সামাজিকতার জন্য আমার ইথিকসকে আমি ছাড়তে পারিনি কখনো।

ক্লাস এইটে সেই ঘটনার পর শিহাব আর সুজন হরিহর আত্মা হয়ে উঠল। শিহাব ভাল ছেলে আর ভালছাত্র ছিল আর সুজন ফাঁকিবাজ। কিন্ত পরীক্ষায় বিভিন্নভাবে নকল করে ও লিখত। নকল কমন না পড়লে শিহাবের খাতা ওর জন্য উন্মুক্ত থাকত। এভাবে এসএসসিতে বেশ ভাল রেজাল্টও করল ও। এসএসসির পর আমি ঢাকায় চলে আসলাম, ওদের সাথেও আর যোগাযোগ ছিল না, গ্রামে গেলে দেখা হতো। পরে ওরাও পড়াশোনার জন্য চট্টগ্রামে চলে গেল। দুজনেই আর্কিটেক্ট হয়েছে। আমি পড়াশোনা করলাম আইন বিষয়ে। ব্যারিস্টারি শেষ করে ঢাকাতেই প্র্যাকটিস করি, কিছুটা নামডাকও হয়েছে। সেখানেই একদিন এক ভদ্রমহিলা আসলেন একটি কেস নিয়ে।

– আমার নাম শবনম। আপনার স্কুলফ্রেন্ড শিহাবের স্ত্রী আমি।

– সালাম ভাবী। বহুবছর শিহাবের সাথে দেখা নেই। কেমন আছে ও?

– জেলে আছে।

– কি বলছেন? কি করেছে ও?

– ও কিছু করেনি, ফাঁসানো হয়েছে। সেই ব্যাপারে কথা বলার জন্যই ও আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছে।

– ভাবী, ঘটনাটা খুলে বলুন।

– শিহাবের একটা আর্কিটেকচারাল ফার্ম আছে। বেশকিছুদিন যাবৎ বেশ বড় বড় প্রজেক্ট ওর হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। সেটা স্বাভাবিক, হতেই পারে। কিন্ত একদিন ওর হাতছাড়া হয়ে যাওয়া একটা প্রজেক্টে ঘটনাচক্রে গিয়ে ও অবাক হয়ে গেল, ওর করা ডিজাইন হুবুহু ফলো হচ্ছে। ও সাথে সাথে প্রতিষ্ঠানের মালিকের সাথে দেখা করল। মালিক জানাল, যে প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে কম টাকা কোট করেছে, কাজটা তাকেই দেয়া হয়েছে, ডিজাইন নিয়ে তারা কিছু জানে না।

– তারপর?

– শিহাব জানতে পারল সেটা আপনাদের আরেক বন্ধু সুজনের ফার্ম। দুজনে প্রায়ই শিহাবের অফিসে আড্ডা দেয়, শিহাব ওর সব ডিজাইনই সুজনকে দেখায়, ডিসকাশন করে। ওর ব্যাপারটা বুঝতে আর বাকি রইল না। ব্যাপারটা আরও কষ্টকর হয়ে উঠল যখন ও জানতে পারল ওর হাতছাড়া হওয়া সব প্রজেক্টই সুজনের ফার্মের কাছে গেছে। রাগে পাগল হয়ে ও সুজনের অফিসে গেল। দুজনের বাকবিতণ্ডা এমন পর্যায়ে চলে গেল যে একপর্যায়ে এক্সিডেন্টালি টেবিলে রাখা এন্টিকাটারে সুজনের হাত কেটে রক্ত বের হয়ে গেল। এই অবস্হাতেই শিহাব সুজনের অফিস থেকে চলে আসল।

– তারপরদিনই বাসায় পুলিশ এসে ওকে ধরে নিয়ে গেল। এটেম্পট টু মার্ডার কেস, সুজনের করা। স্বাক্ষী সুজনের অফিসের কর্মচারীরা। খুব জটিল কেস হয়ে গেছে ভাইয়া। আপনিই আমাদের শেষ ভরসা। আমার দুইটা ছোট ছোট বাচ্চা…

বলেই কাঁদতে থাকলেন শবনম। আইন পেশায় আছি, বিভিন্ন ধরনের কেস পাই কিন্ত নিজের দুই বন্ধুর কাহিনী শুনে হজম করতে সময় লাগল।

ইথিকস্ ছোটবেলা থেকেই প্র্যাকটিস করতে হয়।ইথিকস্ ভেঙ্গে পরীক্ষার খাতা দেখানোর যেই ভুল শিহাব শুরু করেছিল স্কুলে সেই ভুলের খেসারত প্রফেশনালি তাকে তো দিতেই হচ্ছে, দিতে হচ্ছে তার পরিবারকেও।আমি শিহাবদের প্রবলেম সলভ্ করে দেব, কিন্ত সুজনদেরকে ইথিকস্ প্র্যাকটিস করাব কিভাবে?

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে