ডুমুরের ফুল ৪২.

0
1907

ডুমুরের ফুল ৪২.

হেম শান্তস্বরেই বলল
– ডিভোর্স হয়ে গেছে।
জাদিদ নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারলোনা।
– ডিভোর্স কীভাবে হলো? তুমি ফান করতেছো না তো?
– নাহ।
– ডিভোর্সের কারণ কী?
– সে কথা রাখো। তোমার কথা বলো।
জাদিদের এখনো নেশারঝোঁক ভালোভাবে কাটেনি। কথাগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে বারবার।
– দেখো হেম, আমার নেশা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। তাই যে প্রশ্ন করছি তার উত্তর ঠিকঠাক ভাবে দাও।
– অনেক বড় স্টোরি জাদিদ।
– একটু বলো। তোমার মতো মেয়েকে বউ হিসেবে পেতে ভাগ্য লাগে। আর তোমাকেই কিনা ডিভোর্স দিয়ে দিল?
– সেটা তোমার কাছে ভাগ্য হতে পারে, মনিরের কাছে না। আর ডিভোর্সটা আমি দিয়েছি। ফিজিক্যালি আর মেন্টালি টর্চার আর সহ্য করতে পারছিলামনা।
– এই নাকি তোমার নানীর সুপুত্র! অদ্ভুত মানুষ তোমার নানী।
– জাদিদ, তোমার এমন অবস্থা কেনো?
– কেমন?

– এইযে নেশা টেশা করো।
– ভালো লাগেনা যখন তখন করি। আর এলকোহল জাতীয় মানে মদই শুধু খাই।
– মিথ্যা বলবা না। তুমি স্মোকও করো।
জাদিদ মুচকি হেসে বলল
– বাহ দারুণ তো। তো আজকাল কী করা হয়?
– পড়াশোনা শুরু করেছি আবার। এইতো আরকিছুই তো নাই করার মতো।
– চা খাওয়ার খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
একটু অপেক্ষা করো আমি রেহানকে বলি দুই কাপ চা নিয়ে আসতে।
হেম কিছুই বলল না। জাদিদ রেহানকে দুই কাপ চা আনতে বলল ফোনে। তারপর হেমের দিকে তাকিয়ে বলল
– তোমার পুচকে কই?
– পুচকে কে?
জাদিদের কথাটা বলতে বাধছে কিন্তু জিজ্ঞেস না করেও শান্তি পাচ্ছেনা। তাই আমতা আমতা করে বলল
– আরে বাচ্চা নাই তোমার?
– না।
– তোমার নাকি তার সমস্যা?
– কারোরই সমস্যা না। তার দেরিতে বাচ্চা নেবার ইচ্ছা ছিলো।
হেমলতার মুখের উপর রোদ এসে পড়েছে। হেম ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবছিলো। জাদিদ হা করে হেমকে দেখছে। এ ঠিক আলাদা একজন মানুষ। একজন বিবাহিত মেয়ের যেমন শরীরে পরিবর্তন আসে ঠিক তেমনই এসেছে। আগের তুলনায় হেলদি হয়েছে। তবে চোখ আর ঠোঁট আগের মতোই রয়ে গেছে।
চুলগুলো আর আগের মতো নেই। কমে গেছে আর রুক্ষ হয়ে গেছে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে। নেশার ঘোরে তলিয়ে যাচ্ছে। এ নেশা এলকোহলের না, এ নেশা অন্যকিছুর।
রেহান দুই কাপ চা দিয়ে গেলো। হেমলতার দিকে একবার তাকালো। তারপর দ্রুত রুম ছেড়ে বের হয়ে গেলো।
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে হেম বলল
– একটা রিকুয়েস্ট করবো, রাখবে?
– না এখন আমরা রিলেশনশিপে নেই যে রিকুয়েস্ট রাখতে হবে।
হেম আহত স্বরে বলল
– সে তো জানি কিন্তু রিকুয়েস্ট টা করার অধিকার তো এখনো আছে?
জাদিদ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল
– না। আমি তো অনেক চেষ্টা করেছিলাম তোমাকে পাবার কিন্তু তুমি কিন্তু তা করোনি।
– আমি প্রতিনিয়ত মেন্টালি টর্চার সহ্য করেছি। শেষ পর্যন্ত কেউই রাজি হলোনা বলে পার্লার থেকে পালিয়ে তোমার বাসায় গেলাম। আমার সেলফোন টা বাসায় রেখে দিয়েছিল। যদি কন্ট্যাক্ট করে তোমার সাথে পালিয়ে যাই। তোমার বাসায় গেলাম তুমি নেই। তোমার সৎ মায়ের মোবাইল দিয়ে ফোন দিলাম। সুইচড অফ, আমি ফোন দিয়েই যাচ্ছি আর ওপাশ থেকে বলছে, সুইচড অফ। জাদিদ আমার কাছে একটা টাকা ছিলোনা যে ঢাকায় আসবো।
হেম নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করলো।
জাদিদ কী বলবে ভেবে পাচ্ছেনা। বাবার উপর রাগ করে মোবাইল অফ করে রেখেছিলো। আর তখন তার সেই অবস্থাও ছিলো না।
জাদিদ থেমে থেমে বলল
– কান্নাকাটি অফ করো। যা হবার তো হয়েই গেছে।
হেম চায়ের কাপ ফেলে দিয়ে জাদিদকে জড়িয়ে ধরলো। জাদিদ ঘটনার আকস্মিকতায় তাল সামলাতে না পেরে বিছানায় পরে গেলো।
হেমকে বাহুডোরে আবদ্ধ করে বলল
– প্লিজ, হেম কান্নাকাটি থামাও। এভাবে কাঁদলে কি আগের মতো সব হয়ে যাবে?
– জাদিদ, বিয়ের পর থেকে শুরু হয়েছে টর্চার। একেতে তোমাকে হারিয়ে ফেলার কষ্ট আর দ্বিতীয়ত মনিরের সাথে শারীরিক সম্পর্কে যাওয়া আর তৃতীয়ত শ্বশুর বাড়ির মানুষের শুধু খুত ধরা। একটা সংসারের কম কাজ থাকে। আমি বিয়ের আগে কিছুই করিনি। তারপরও সেখানে করার চেষ্টা করতাম আর তারা…
– হেম চুপ, একদম চুপ। এভাবে কান্নাকাটি করলে মানুষ জন জানাজানি হয়ে যাবে।

নিজের কষ্ট প্রকাশ করার মতো একজন মানুষ হেম আজকে পেয়েছে। সেই সুযোগ হাত ছাড়া করতে চাইলো না হেম। কান্না থামিয়ে জাদিদকে জড়িয়ে থাকা অবস্থায় একের পর এক কথা বলেই চললো হেম। জাদিদ হেমের গলায় মুখ ডুবিয়ে হুম, হ্যাঁ বলে যাচ্ছে। জাদিদ ভাবতেও পারেনি এভাবে লতাকে পাবে। ভেবেছিলো হেম ঠিকঠাক ভাবে কথাই বলতে চাইবেনা। কিন্তু হলো উল্টোটা। হেমের খোলা চুলে আঙুল চালিয়ে দিতে দিতে জাদিদের নিশ্বাস ভারী হতে শুরু করলো।

জাদিদের ঘুম ভাঙলো ফোনের রিংটোনে। ফোন রিসিভ করতেই শাম্মী ফোনের ওপাশ থেকে বলল
– আর কতক্ষণ লাগবে তোদের? হেমলতার টিম আর কিছু সময় পরে রওনা দিবে ঢাকার উদ্দেশ্যে।
– ও আসছে ১০ মিনিটের মধ্যে মিম্মাকে জানিয়ে দাও।
কথাটা বলেই জাদিদ ফোন কেটে দিল। জাদিদের বাম হাতের উপর গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে হেম। মনে হচ্ছে বহুদিন পরে শান্তিতে ঘুমুচ্ছে। মেঝেতে হেমের পরনের হলুদ কামিজটা লেপ্টে আছে। ওড়নাটা অবশ্য বিছানায়। হেমের নিচের ঠোঁটের এক কোণায় কাটা দাগ চোখে পড়লো জাদিদের। জাদিদ হেসে বিরবির করে বলতে লাগলো
– একটু সফট ভাবে চুমু দিলেও পারতাম। এই অবস্থায় যদি মিম্মা খেয়াল করে বসে। তখন ওর মহাবিপদ হবে। না তা হবেনা। হেম নিজেই কিছু একটা বলে দিবে।
হাত ব্যথ্যায় টনটন করছে। হেমের চুলগুলো ছড়িয়ে আছে ওর ফরশা পিঠ জুড়ে। কম্বলটা ভালোভাবে টেনে হেমকে ঢেকে দিলো জাদিদ। কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে শাম্মীকে ফোন দিলো।
শাম্মী রিসিভ করে বিরক্তি নিয়ে বলল
– ১০ মিনিট পার হয়ে গেছে জাদিদ।
– মিম্মাকে বলে দাও হেম আমাদের সাথে ঢাকায় ফিরবে।
– এটা কীভাবে সম্ভব?
– পরে কথা বলি।
ফোন কেটে দিয়ে জাদিদ হেমকে নিজের বুকের ভেতরে জড়িয়ে ধরলো। হেম তখনও গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। সে জানতেই পারছেনা জাদিদের চিন্তাভাবনা গুলো।

চলবে….

~ Maria Kabir

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে