ডুমুরের ফুল ২৭.

0
1476

ডুমুরের ফুল ২৭.

ইমরান মোল্লা মা’কে ফিরিয়ে আনার জন্য নগরকান্দার ফুলসুতী গ্রামে হাজির হলেন। বৃদ্ধা ছেলেকে দেখে আবেগে আপ্লূত হয়ে কাঁদতে শুরু করলেন। আশেপাশের বাড়ির মুরব্বিরা বৃদ্ধার আশেপাশে জটলা পাকিয়ে নানান কথা বলতে শুরু করলেন। ইমরান মোল্লা মা’কে থামানোর চেষ্টা করতে লাগলেন কিন্তু কিছুতেই থামছেন। তার একটাই কথা বিয়ে করতে হবে। আর ইমরান মোল্লা করবেন না। গ্রামের আত্মীয়দের চাপে পড়ে ইমরান মোল্লা রাজি হলেন বিয়ে করতে। তবে এখন করবেন না। প্রস্তুতি ছাড়া এভাবে বিয়ে করবেননা। জাদিদকে সাথে নিয়ে বিয়ে করবেন। একটা মাত্র ছেলে তার। ছেলেটার মতামতও দরকার। মা ছাড়া ছেলেটাকে কোনোভাবেই আনার কষ্ট দিতে পারবেননা তিনি। এদিকে তার মাও তাকে ছাড়ছেন না । বৃদ্ধা প্রথমে রাজি না হলেও পরে মেনে নিলেন।
ইমরান মোল্লার ছোটো মামা ইলিয়াস তাকে এক রাত থেকে যেতে বললেন। মামাদের মধ্যে এই একজনই জীবিত আছেন। তার কথা ফেলতে পারেননা। গ্রামের বাড়িতে শহর থেকে আত্নীয়রা বেড়াতে আসলেই পিঠা বানানোর ধুম পড়ে যায়। ইমরান মোল্লার মামা বাড়িতেও তাই শুরু হয়েছে। ছোট বাচ্চা গুলো নতুন মানুষটার আশপাশ দিয়ে ঘুরঘুর করতে লাগলো। কয়েকজন তো চিমটি কেটে দুষ্টু হাসি দিয়ে দৌঁড়ে দূরে সড়ে যাচ্ছিলো আবার কাছে এসে আবারও….

বৃদ্ধা ইলিয়াসের সাথে ফিসফিস করে কথা বলছেন। প্রসঙ্গ – ইমরান মোল্লার বিয়ে। দুই বাড়ি পরে টুকু মিয়ার বাড়ি। তার মেজো মেয়েটা আইবুড়ো হয়ে ঘরে বসে আছে। বিয়ে হয়না। এই মেয়েকে যদি আনা যায় তাহলে ঘরের ন্যাওটা হয়ে থাকবে।
ইলিয়াস খানিক বিরক্ত হয়ে বললেন
– আফা, আপনের কি মাথা খারাপ?
– ক্যান? আমি খারাফ কিছু কইছি?
– অই মাইয়া হইলো অলক্ষ্ণী। সাত গ্রাম শুইদ্ধা জানে। কেউই বিয়া করতে চায়না। আর আফনে হ্যারে নিবার চান?
– এই কারণেই তো নিমু। যাতে সংসারের প্রতি মায়া আসে। আগের জনের তো ছিলো উড়ুক্কুর মন।
– ইমরানের ছোটো একটা ছাওয়াল আছে। হ্যারে যদি…..
– ছোটো কোথায়? এহনি বিয়া দিলে হ্যারও বাচ্চা হয়া যাবেনে।

হেমলতা ছাদে অন্যমনষ্ক হয়ে বসে আছে।তার ক্লাসমেটরা অনেকেই কোচিং-এ ভর্তি হয়েছে। সবাই কোমড় বেঁধে লেগেছে এডমিশন টেস্টের জন্য। আর সে একাই এভাবে ঘরে বসে বসে বুড়ি হচ্ছে। নানীর যে কী হলো হুট করে ভেবে পায়না। নানী একটা মোবাইলও কিনে দিচ্ছেনা। এভাবে থাকা যায়। বাবাও আসা বন্ধ করে দিয়েছে। মিম্মার মোবাইল দিয়ে কথা বলা যেতো কিন্তু লাঈলি বানু পিছু ছাড়লোই না। একদম আঠার মতো চিপকে ছিলো।

মোবাইলে স্ক্রিনে মায়ের কনট্যাক্ট নাম্বার দেখে অবাক হলো জাদিদ। সে তো বিশ্বাসই করতে পারছেনা তার মা ফোন করেছে!
জাদিদ একবার ভাবলো ফোন রিসিভ করবেনা। পরোক্ষণে কী ভেবে যেন রিসিভ করলো।
– হ্যালো
– হ্যালো ওল্ড ম্যান।
– বলো।
– কেমন আছো বাবা?
– ভালো৷
– মন খারাপ মনে হচ্ছে তোমার?
– না।
– বুঝতে পেরেছি বাবা। আমি অনেক ব্যস্ত ছিলাম তাই তোমার কোনো খোঁজ আমি নিতে পারিনি।
– হঠাৎ ফোন করলে, কোনো প্রয়োজন?
জাদিদের মা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন
– প্রয়োজন ছাড়া ফোন দিতে পারিনা?
– অবশ্যই পারো কিন্তু দাও তো না।
– ঢাকায় কোচিং- এ নাকি ফরিদপুরে?
– ঢাকায়
– পড়াশোনা কেমন চলছে?
– ভালো।
– একটা জরুরি কথা বলতে চাচ্ছি। তুমি পজিটিভলি নিবা আশা করি।
– বলো।
– আমি আবার বিয়ে করেছি।
জাদিদ নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছেনা। সত্যিই তার মা বিয়ে করেছে? জাদিদকে চুপ করে থাকতে দেখে জাদিদের মা বললেন
– বিয়েটা ঘরোয়া ভাবে করেছি বলেই তোমাকে ইনভাইট করতে পারিনি। কষ্ট পেয়ো না ওল্ড ম্যান।
– আমার পরীক্ষা ছিলো আসতেও পারতাম না।
– জ্যাক বলেছিলো দেশে এসে তোমাকে সারপ্রাইজ দেয়ার কথা কিন্তু আমাদের সময় হচ্ছে না।
– ওহ।
মায়ের নতুন স্বামীর নাম জ্যাক সেটা বুঝতে বাকি রইলোনা।
– তুমি মন খারাপ করলে বাবা?
– সেটা যদি ভাবতেই তাহলে আমাকে নিয়ে থাকতে।
ছেলের মুখে কঠিন কথা শুনে বেশ অবাক হলেন। জাদিদ কখনোই এভাবে কথা বলেনা।
– তুমি পছন্দ করোনি আমার বিয়ে করাটা?
– আমার পছন্দ অপছন্দের খবর তোমরা দুজনে কখনো রেখেছো? সেপারেশনের আগে একটা বারও ভাবোনি আমার কী হবে! নিজেদের সুখ, আনন্দের কথা ভেবেছো। তোমার চেয়ে তো বাবা ভালো। সে আমার জন্যই বিয়ে করছেনা।
– ওল্ড ম্যান, এভাবে মায়ের সাথে কথা বলেনা।
– তুমি আমার মা না৷ জন্ম দিলেই মা হওয়া যায়না।
– বাবু এসব কথা কেনো বলছো?
– আমার আগেই বলার দরকার ছিলো। আমাকে আর ফোন করবেনা। আজকে থেকে জাদিদ নামে কেউই তোমার নেই।
– বাবু এভাবে বলেনা।
জাদিদের মা কাঁদতে লাগলেন।
জাদিদ ফোন কেটে দিলো। রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে মেঝের উপর শরীরের সব শক্তি দিয়ে মোবাইল আছাড় দিলো।
সাথে সাথেই কয়েক টুকরায় ভেঙ্গে গেলো এন্ড্রয়েড মোবাইল!
জাদিদের সবকিছু ভেঙে ফেলতে ইচ্ছা করছে। বেডের পাশের ছোট্ট টেবিলের উপর রাখা পানির জগটার উপর দ্বিতীয় দফা রাগ ঝাড়লো। মাথার দুপাশে ফেটে যাচ্ছে ব্যথায়। কেউই তাকে ভালোবাসেনা। মা, বাবা কেউই না। হেমলতাও বাসেনা, বাসলে যোগাযোগ করার উপায় খুঁজে কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও ফোন দিতো। অন্ততপক্ষে একটা এসএমএস তো দিতে পারতো।
কেউই ভালোবাসে না তাকে। তাহলে সে কেনো বোকার মতো বাসবে? সেও আজকে থেকে ভালোবাসবে না কাউকে। মনে মনে পণ করলো জাদিদ।

চলবে…..

” লেখিকা মারিয়া কবির এর সকল লেখা দ্রুত পেতে অবশ্যই এ্যাড হোন তার ফেসবুক পেইজ ‘Maria Kabir -মারিয়া কবির’(এখানে পেইজ লিংক) এর সাথে।

২০২০ বই মেলায় প্রকাশ পেতে যাচ্ছে মারিয়া কবির এর প্রথম উপন্যাস ‘যেখানে সীমান্ত তোমার আমার’।
মারিয়া কবির এর নতুন সব গল্প উপন্যাস পেতে আমাদের।সাথেই থাকুন।
ধন্যবাদ।

~ Maria Kabir

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here