জীবনের_ডায়েরি পার্ট: ১৫

0
1611

জীবনের_ডায়েরি পার্ট: ১৫

লেখিকা: সুলতানা তমা

 

–এখন বললে আমার কিছুই করার থাকবে না
–কেন
–জানই তো আম্মু আমাকে কতো কষ্ট করে লেখাপড়া করাচ্ছে, আমি একটা কিছু না করলে সংসার চলবে কিভাবে, বেকার থাকতে তো বিয়ে সম্ভব না
–হুম

দেখতে দেখতে একটা বছর চলে গেলো এতো দিনে শ্রাবণের প্রতি অনেক দূর্বল হয়ে পড়েছি অনেক ভালবাসি ওকে প্রতিদিন কলেজে দেখা হয় ফোনে কথা হয় ভালোবাসা দুষ্টুমি অভিমান ছোট ছোট খুনসুটি সব মিলিয়ে অনেক ভালো কাটলো একটা বছর, আম্মু এখন আর বাসায় তার ফ্রেন্ডদের কে আনে না তবে আমার প্রতি অত্যাচার কমেনি বরং আরো বেড়ে গেছে আর আব্বু তো পৃথিবীর সেরা আব্বুদের মধ্যে একজন

রাতে বারান্দায় দারিয়ে আছি ফোনটা বেজে উঠলো শ্রাবন ফোন দিয়েছে
–হ্যালো
–Happy Birthday লক্ষী বউটা (ও এখন আমাকে সবসময় বউ বলেই ডাকে)
–আরো তো দুদিন বাকি আমার বার্থডের আর এখনি উইশ করছ
–আমার আগে যদি কেউ তোমাকে উইশ করে ফেলে তাই
–পাগল একটা
–জ্বী আপনার জন্য পাগল

আগামীকাল আমার বার্থডে অথচ আব্বু বাসায় নেই আসবে কিনা তাও জানিনা, আচ্ছা আব্বু কি ভুলে গেছেন কাল যে আমার বার্থডে ভুলার তো কথা না আচ্ছা অপেক্ষা করে দেখি আব্বুর মনে আছে কিনা
রাত ১১টা বারান্দায় বসে আছি শ্রাবন ফোন দিলো
–হ্যালো
–ছাদে গিয়ে দেখ ফুল গাছের কাছে তোমার জন্য একটা গিফট আছে
–কি গিফট
–নিয়ে আসো দেখে বইলো কেমন হয়েছে
–ঠিক আছে
এই পাগলটা কে নিয়ে আর পারলাম না, ছাদে গেলাম একটা প্যাকেট খুব সুন্দর উপরে লেখা “আমার পাগলীর জন্য” রোমে এসে প্যাকেট খুললাম একটা নীল রঙের শাড়ি খুব সুন্দর, শ্রাবন ফোন দিল
–হ্যালো
–শাড়ি পছন্দ হয়েছে
–হুম অনেক সুন্দর
–এখন শাড়িটা পরে ছাদে চলে আসো
–কেন
–আমি দেখব শাড়ি পরলে তোমাকে কেমন লাগে
–কিন্তু আমি তো শাড়ি পরতে পারি না
–কোনো ভাবে পেঁচিয়ে চলে আসো আমি ঠিক করে দিব
–তুমি পারো
–হ্যা তোমাকে পরানোর জন্যই শিখেছি
–ঠিক আছে আসছি
–তুমি তো একদমই সাজ না একটু সেজে এসো
–আচ্ছা
ফোন রেখে শাড়ি পরতে শুরু করলাম কোনো ভাবে পেঁচিয়ে পরলাম, চুল গুলা খোপা করলাম চোখে গারো করে কাজল দিলাম ঠোটে হালকা করে গোলাপি লিপস্টিক দিলাম আমার সাজা শেষ আটা ময়দা মাখতে আমার ভালো লাগে না
ফোনের মেসেজ টোন বেজে উঠলো শ্রাবন মেসেজ দিল “আসো না”
রাত ১১:৫০ ফোনটা হাতে নিয়ে ছাদে গেলাম, ছাদের দরজায় যেতেই পায়ের নিচে শাড়ি পরে আমি পরে গেলাম, পরে গিয়েও পরলাম না শ্রাবন ধরে ফেলেছে
–বিয়ের পর শাড়ি পরবা কিভাবে কোমর ভেঙ্গে ফেলবা তো বলেই হাসতে শুরু করলো
–তুমি আছ না এভাবেই ধরে ফেলবা
–আমি কি সবসময় পাশে থাকবো নাকি মহারাণী
–হ্যা থাকবাই তো
–আচ্ছা থাকবো এখন সোজা হয়ে দারাও তোমাকে ভালো করে দেখবো
–নতুন করে দেখার কি আছে
–অনেক কিছু চুপ করে দারাও
–হুম
–অনেক সুন্দর লাগছে চুল খোপা করেছ কেন
–এমনি
–তোমাকে খোলা চুলেই বেশি সুন্দর লাগে বলেই চুল খোলে দিল

ঠিক ১২টা বাজে ও আমার কাছে আসলো আমার দুগালে হাত দিয়ে বললো Many Many Happy Returns Of The Day আমার পাগলীটা
তখন ফোন বেজে উঠলো আব্বু ফোন দিয়েছেন
–হ্যালো আব্বু
–Happy Birthday আম্মু
–তোমার মনে আছে তাহলে
–মায়ের জন্মদিন আর ছেলের মনে থাকবে না তা কি হয়
–মা কে কি জন্মদিনেও দেখতে আসবা না
–অবশ্যই আসবো কিন্তু তোর আম্মুকে বলবি না
–কেন
–পরে বলবো
–ঠিক আছে
আব্বু ফোন রেখে দিলেন, সারা রাত ছাদে বসে ওর কাধে মাথা রেখেই কাটিয়ে দিলাম, ভোরে রোমে এসে ঘুমালাম, সকালে ঘুম থেকে উঠতে অনেক দেরি হয়ে গেলো ১১টার দিকে উঠলাম, ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখি আম্মু বসে আছে আমার দিকে রাগি চোখে থাকিয়ে আছে
–নবাবজাদীর ঘুম ভাঙ্গলো তাহলে
–হুম
–রান্না বসা গিয়ে
–হুম
রান্না শুরু করলাম একটু পর আবার আম্মু আসলো
–কপি বানিয়ে দে
–ভাত প্রায় হয়ে গেছে একটু পর দেই
–কি আমার কপি পরে বানিয়ে দিবি তোর এতো বড় সাহস দাড়া তোর সাহস বের করছি বলেই ভাতের পাতিলে আমার হাত ডুবিয়ে ধরলো, চিৎকার দিয়ে সরে গেলাম

বাহ বাহ (এই কথা শুনে পিছনে থাকালাম)
–আব্বু তুমি
–হুম
–কখন আসছ
–এইতো হাত পুরলি কিভাবে
–ভাতের মাড় পরে হাত পুরে গেছে
–আর কতো মিথ্যে বলবি নিজের চোখেই তো দেখলাম
–হুম
হাত পুরে দিয়েছি বেশ করেছি বলেই আম্মু আমার পুরা হাত চেপে ধরলো এতক্ষণে হাতে পুচকা পরে গেছে আম্মু শক্ত করে চেপে ধরাতে খুব ব্যাথা পেলাম মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠলো চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে আর কিছুই মনে নেই

চোখ খুলে দেখি আমি হাসপাতালে আব্বু মাথার কাছে বসে কাঁদতেছেন আর রিয়া একটু দুরে চেয়ারে বসে কাঁদতেছে
–আব্বু কাঁদছ কেন তোমরা আমার কিছুই হয়নি
–কি হয়েছে তাতো দেখতেই পারছি
তমা রাত হয়ে গেছে প্রায় সাত ঘন্টা পর তোর জ্ঞান ফিরেছে আঙ্কেল সারাদিন কিছুই খাননি কিছু খেয়ে আসতে বল (রিয়া পাশে এসে বসতে বসতে বললো)
–আব্বু যাও কিছু খেয়ে আস
–খিদে নেইরে মা
–আমার খিদে লাগছে তুমি খেয়ে এসো আর রিয়া আর আমার জন্য খাবার নিয়ে এসো
–ঠিক আছে

আব্বু চলে গেলেন, রিয়া আমার পাশে বসে আছে
–রিয়া শ্রাবনকে বলেছিস আমি হাসপাতালে
–ওর ফোন বন্ধ অনেক বার ট্রাই করেছি
–এখন দিয়ে দেখ
–আচ্ছা
–নারে এখনো বন্ধ
–হুম
হঠাৎ আম্মু আসলো সাথে উনার ফ্রেন্ড যে বাসায় আমার দিকে খারাপ দৃষ্টিতে থাকিয়েছিল
–এখন কেমন আছিস মা (আম্মু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে)
–ভালো (খুব হাসি পাচ্ছে উনার জন্য আমি হাসপাতালে আর এখন সবার সামনে ভালোবাসা দেখাচ্ছে)
–ও আমার ফ্রেন্ড রাকিব আমরা একসাথে কলেজে পড়তাম তুই অসুস্থ শুনে দেখতে আসছে
–কেমন আছ মামনি (হারামির বাচ্চা একদিকে মামনি ডাকছে অন্য দিকে আমার দিকে খারাপ দৃষ্টিতে থাকিয়ে আছে)
–ভালো
–তুমি আমাকে রাকিব আঙ্কেল বলেই ডেকো
–ঠিক আছে (মনে মনে ভাবছি তোকে তো রাকিব বেহায়া বলে ডাকবো)

আব্বু চলে আসলেন আমাকে খাইয়ে দিলেন রিয়াও খেল, একটু পর আম্মু চলে গেলেন, আব্বু আর রিয়া আমার কাছে থাকলো সাথে রাকিব বেহায়াটাও থাকলো, আব্বুর সাথে এমন ব্যবহার করছে মনে হচ্ছে ওর মতো ভালো মানুষ দ্বিতীয়টা নেই আর সুযোগ ফেলেই আমার দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে থাকাচ্ছে

সকালে আমাকে রিলিজ করে দেয়া হলো বাসায় চলে আসলাম, শ্রাবণের ফোনটা এখনো বন্ধ জানিনা কোনো বিপদ হলো কিনা……

চলবে?

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে