চাঁদের_আলোয়_জোছনা_ভাঙ্গে পর্ব ৬৫

6
2313

চাঁদের_আলোয়_জোছনা_ভাঙ্গে পর্ব ৬৫
লেখা আশিকা জামান

কমিউনিটি সেন্টারে পৌছাতে পৌছাতে অনন্যার একটু দেরি হয়ে গেল। ততক্ষণে সবাই এসে গেছে। বন্ধুরা এসেই ওঁর খুঁজ করলো। নিনিত রেগে মেগে গাল ফুলিয়ে বসে রইলো।
” আহা, নিনিত! তুই কিন্তু বউ! অমন গাল ফুলিয়ে থাকলে সবাই গাল ফোলা বউ বলবে!”
নেহা, হাসতে হাসতে বলল।

” দেখ অনন্যার কান্ডজ্ঞানহীনতায় আমার মেজাজ খারাপ হচ্ছে। কত করে বললাম একটা রাত সবাই মিলে কাটাই। কথা শুনলে তো!”

” ওঁর দিকটা তো বুঝতে হবে। পরশু ফ্লাইট মনের অবস্থাও নিশ্চয়ই ভালো নেই। এসে যাবে, চিন্তা করিস না।” সাইমুন আশ্বাস দিয়ে বলল।

” কী ব্যাপার জামাই-বউ এখনি এত কিসের কথা!” অনন্যার গলা শুনতে পেয়ে দু’জনেই সামনে তাকায়।
অনন্যা পড়েছে কালো ঝলমলে শিফনের পার্টি শাড়ি। কোমড় ছড়িয়ে যাওয়া চুলগুলো ছেড়েই রেখেছে। কানে ছোট্ট টপ আর গলায় পেন্ডেন্ট। হাতে পাথর খচিত ঘড়ি অপর হাতে মাঝারি আকৃতির বেঙ্গল। খুবই সিম্পল তবে চোখ ফেরানো দায় হয়ে পড়েছে।

” তোকে তো সুন্দর লাগছেরে!” সাইমুন অবাক চোখে তাকিয়ে বলল।
” তুই’তো মানুষ সাংঘাতিক! বিয়ের দিন বউএর সামনে অন্যকারো প্রশংসা করছিস। তওবা পড় নইলে আজ তোর খবরই আছে।” অনন্যা নিনিতের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল।

কথাটা শুনে যেন সাইমুন ভয় পেল। নিনিতের দিকে করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
” সত্যি আঁজ বারোটা বাজাবে নাকি! আমি কিন্তু তেমন কিছু ভেবে অনন্যার প্রশংসা করিনি। তুমিই বলো সুন্দরকে সুন্দর বলা কী অন্যায়!”

” আমি তোমার তেরোট বাজাবো।” কথাটা বলেই নিনিত হাসে। হাসি থামিয়ে অনন্যার দিকে আড়চোখে তাকায়। দুই বান্ধবী আবার একসাথে হেসে উঠে। এদের হাসির বাহারে সাইমুন অসহায় বোধ করতে থাকে।
” দেখ বেকুব’টা কেমন ভয় পেয়ে গেছে৷ অনন্যা তোর প্রশংসা করলে নাকি আমি রিএক্ট করব।” কথাটা বলেই নিনিত আবার হাসে।
সাইমুন বিব্রত ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকে।

★★★★★

” আপনাকে চুজ করতে বলেছি। মেনুকার্ড’টা আমার দিকে ফিরিয়ে দিতে বলিনি।” অনিক বিরস মুখে তাকায়। অন্বেষা আজ শাড়ি পড়ে এসেছে। সাদা শিফনের শাড়ি, পুরো শাড়ি জুড়েই সেল্ফ কাজ রয়েছে। সোনালি ব্লাউজের হাতাটা কনুই এর ঠিক উপরে। কানে বেশ বড়সড় দুল পড়েছে, গলা খালি। দুই হাতেই বেঙল পড়েছে। কোন ভারী সাজসজ্জা নেই মুখে একটা স্নিগ্ধ ভাব রয়েছে। কাজল টানা চোখের পাপড়িগুলো বেশ বড়। ঠোঁটে পীচ কালার লিপিস্টিক পড়েছে, বেশ মানিয়েছে। গোছানো, পরিপাটি লাগছে। অনিক, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে মোহগ্রস্তের মতো। অন্বেষা লজ্জা পাচ্ছে, অস্বস্তিতে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। পরক্ষণেই নিজেকে সামলিয়ে বলল,
” আপনার যা খুশি অর্ডার করোন। আমার কোনকিছুতেই সমস্যা নেই। ইনফ্যাক্ট আমার কিছু খেতেই ইচ্ছে করছে না।”

অনিকের ঘোর কাটে। গলায় কিছুটা জোর এনে বলে, ” তাহলে ডিনারে আসতে রাজী হলেন কেন?”

” না আসলে খুশি হতেন!” অন্বেষা তীক্ষ্ণ চোখে তাকায়।

অনিক ঘাবড়ে যায়। ” না, তা কেন হবে? আপনি আমাকে খুশি করার জন্য এসেছেন বুঝি। আই মিন ইউ হ্যাভ নো ইন্টারেস্ট!”

অন্বেষা চকিত তাকায়। দীর্ঘশ্বাস আছড়ে পড়ে। সেটাকে বাড়তে দেয় না সংগোপনে লুকিয়ে বলল, ” আপনি বুঝবেন না!
মেনু কার্ড’টা দিন আমার পছন্দমতো অর্ডার করি।”
অন্বেষা টেবিল থেকে কার্ডটা তুলে নেয়। ওয়েটারের কাছে কার্ড বুঝিয়ে দিয়ে নিচের দিকে মুখ লুকিয়ে রাখে। অনিকের দিকে তাকানোর সাহস হয় না।
অনিক কিছুক্ষণ নিষ্পলক তাকিয়ে থেকে হঠাৎ অন্যসুরে বলে, ” কই উত্তর দিলেন না যে!”

★★★★★★

কনভোকেশন সেন্টারে কমবয়সী মেয়েদের কোলাহল হঠাৎ করেই বেড়েছে। অনন্যার বিরক্ত লাগছে বসে আছে নিনিতের পাশে। ভীড় ঠ্যালে কয়েকজন অনন্যার পাশ থেকেও উঠে যাচ্ছে। কে যেন এসেছে তার সাথে সেলফি, অটোগ্রাফ নিতেই এত ব্যস্ততা চারপাশে।
” কে এসেছে রে! সুন্দরীদের লাইন লেগে গেছে মনে হচ্ছে। ধূর বিরক্ত লাগছে।” অনন্যা বলল বিরস মুখে।

বন্ধুরা সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। যেন এমন মজার কথা তারা জীবনেও শুনে নি।
” কী ব্যপার হাসছিস কেন সবাই! ভুল কিছু বলেছি কী! দেখ একেকজন যেভাবে চুল টুল, আয়না ধরে মেকাপ ঠেকাপ ঠিক ঠাক করে সামনে আগাচ্ছে! ”
” আর ইউ জেলাস! ডোন্ট ওয়ারি! একটু পর তুই হবি সবার ঈর্ষার কারণ.. ” নেহা মিনমিনিয়ে বলল।

” মানে কী আমি কেন জেলাস হব আর বাকি সবাই আমাকে দেখে কেন জেলাস ফিল করবে। আগা মাথা কিছু বুঝলাম না।” অনন্যার চোখে মুখে কৌতুহোল।

কৌতুহোলি দৃষ্টির অবসান ঘটে অঙ্কনের সাথে নীরব দৃষ্টি বিনিময় হওয়াতে। অনন্যা হাঁ করে তাকিয়ে আছে। ভীড় ঠ্যালে ওঁদের দিকেই এক পা করে এগিয়ে আসছে। বিস্ময় ঘনীভূত হতেই অনন্যা, নিনিতের হাতে চিমটি বসায়। নিনিত মৃদু চিৎকার দিয়ে উঠে বলল,
” আহা! চিমটি দিচ্ছিস কেন? স্বপ্ন নয় বাছা, তুমি জাগ্রত অবস্থায় আমার বিয়ে খেতে এসেছো। আর সামনে তোমার হিরো দাঁড়িয়ে। কাছে যাও নইলে আর ভাগে পাবে না।”

অনন্যা লজ্জা পেয়ে উঠে দাঁড়ায়। ” সরি দোস্ত আমি বুঝতে পারি নাই। তোর লাগছে বুঝি।”

নিনিত মৃদু হাসে কিছু বলে না। ” তোরা বলবি না যে, অঙ্কন আসবে। আর অঙ্কন তো বলবেই না সেটা আমি জানি।”

” বললে কী তোর চমকানো মুখটা দেখতে পেতাম। তোকে এই অবস্থায় দেখে যে সুখটা পেলাম সেটা মিস করতে চাইনি রে!”
সাইমুন অনন্যার দিকে তাকিয়ে বলল।

” কবে যে তোকে এই অবস্থায় দেখব সেই চিন্তা আমার ঘুম আসেনা রে অনন্যা!” নিনিত আরো যোগ করলো।

” এবার গিয়ে সব গুছিয়ে আসি। সামনের ভ্যাকেশনেই ইনশাআল্লাহ সব হবে। তোরা মন খুলে আনন্দ করতে পারবি চিন্তা করিস না।” অনন্যা হঠাৎ মেকি হেসে হেসে বলল। ওঁদিকে ভেতরে ভেতরে কষ্ট হচ্ছে। অঙ্কন কী বুঝে না সে রেগে থাকলে অনন্যার ভালো লাগেনা। চলেই তো যাচ্ছে একটু ভালো করে কথা বললে কী এমন ক্ষতি হয়! মাঝে মাঝে মনে হয় অঙ্কন তাকে বুঝে না। অনন্যা বিষন্ন মুখে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকলো।

★★★★★★

ক্যান্ডেলাইটের মৃদু আলোয় এক ঝলক অন্বেষার মুখের দিকে তাকায়। তেমন কিছুই খাচ্ছে না মেয়েটা কেবল কাটা চাঁমচের টুংটাং শব্দ শোনা যাচ্ছে। খাওয়া থামিয়ে বলল,
” অন্বেষা, খেতে ভালো লাগছে না।”
অন্বেষা চমকে উঠে। অনিক ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ঝুলিয়ে বলল,
” আচ্ছা, জোর করে খেতে হবে না।”

অন্বেষাও সৌজন্য হাসি হাসলো। ” আবার কবে আসবেন?”
” কেন, সামনেই মাসেই আসবো। অনন্যাকে নিয়ে৷ অনেকদিনের শখ অনন্যাকে বিয়ের সাজে দেখব। বাই দ্যা ওয়ে, আপনাদের ওঁখানের খবর বলুন।”

” খবর আর কী! মা বাবা তো ঠিকই আছে। কেবল ভাইয়াই রেগে আছে। জানিনা রাগ পড়েছে কি না। ” কথাটা বলেই অন্বেষা মৃদু হাসলো।

অনিকও সাথে হাসলো। ” অঙ্কন কেন রেগে আছে বুঝলাম না। দুইদিন পর ফ্লাইট এখন এরমধ্যে বিয়ে এটা পসিবল! আত্নীয়স্বজনদের দিকটাও দেখতে হয়। সবাই খ্যাপে যাবে এমনিতেই এঙ্গেইজমেন্টের বিষয়টা নিয়েও সবাই যা কাহিনি করেছে। এরমধ্যে নতুন কাহিনি করার শখ নেই। আন্টি আগে বুঝলে হয়তোবা এতদিনে বিয়ে টিয়ে সব হয়ে যেত। যাই হোক শেষ পর্যন্ত অনন্যাকে বুঝতে পেরেছে যে এটাই অনেক!”

” আপনি বিয়ে করছেন কবে? ” হঠাৎ প্রশ্নটা মুখ ফঁসকে বের হওয়ায় অন্বেষা দ্বিধাগ্রস্থ চোখে তাকায়।

” আমাকে আবার কে বিয়ে করতে যাবে? বুড়ো হয়ে যাচ্ছি দিন দিন কেউ কী আর পছন্দ করবে!”
” আপনি যদি নিজেকে বুড়ো ভাবেন তাহলে বুড়োরা কী ভাববে বলুন তো! আর, কেউ একজন আপনাকে পছন্দ করে বসে আছে আপনি দেখেও দেখছেন না! এটা কী ঠিক!” কথাটা বলেই অন্বেষা চমকে উঠলো। এসব কী বলছে সে কথার প্রেক্ষিতে নিজেই জানে না।

” সেই কেউ একজন’টা আবার আপনি নন’তো!”

অন্বেষা ঘাবড়ে যায়। ভীষণরকম অস্বস্তি বোধ করতে থাকে।
” কী ব্যপার ঘামছেন কেন? ”
অন্বেষা কথা বলে না। অনিক আবার বলল,
” সেই কেউ একজনটা যদি আপনি হোন তাহলে উত্তরটা একরকম হবে আর অন্যকেউ হলে উত্তরটা ভিন্ন হবে। এবার বলুন?”

অন্বেষা হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়। অস্বস্তি হচ্ছে। চোখে চোখ রেখে অনিক তাকে ফিরিয়ে দিবে এটা তার সহ্য হবে না। কেন এসেছিলো সে। চলে যেতে হবে। এক্ষুনি চলে যাবে সে।

” আমি বাসায় যাব।”

” ভয় পেলে আর প্রেমে পড়ে কী লাভ বলুন।”

অন্বেষা ভ্রুকুঁচকে তাকিয়ে বলল, ” মানে!”

” কিছুনা চলুন আপনাকে পৌছে দিয়ে আসি।” অন্বেষা কতক্ষণ গাই গুঁই করলেও পরক্ষণেই রাজি হয়।

কিছুক্ষণ পরেই তুমুল বর্ষন শুরু হয়। গুড়ুম গুড়ুম শব্দে মেঘ ডাকতে থাকে। অন্বেষা সামনের সিটের একপাশে গুটিসুটি মেরে বসে থাকে। হঠাৎ ফোনে ম্যাসেজ টোন বেজে উঠে।
” কেউ কী হাতটা বাড়িয়ে দেবে,
আমি না হয় পরম যত্নে মুঠোয় ভরে নেব।
ভালোবাসি বলুক কিংবা নাইবা বলুক
বৃষ্টিবিলাস করতে কি বা দ্বিধা!
কদম ফুল ফুঁটুক আর নাইবা ফুঁটুক
বলব আমি,
” বাদলা দিনের প্রথম কদম ফুলের ভালোবাসা।”

অন্বেষার চোখেমুখে খুশির ঝিলিক। আলগোছ সে হাতটা বাড়িয়ে দেয়। এরপর নাম না জানা ভালোলাগার আবেশে দু’জন মিশে যায় ঘন বর্ষন আপন করে নিতে।

চলবে…

6 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে