চাঁদের_আলোয়_জোছনা_ভাঙ্গে পর্ব -৫৮

0
855

চাঁদের_আলোয়_জোছনা_ভাঙ্গে পর্ব -৫৮
লেখা- আশিকা জামান

দীশা, মুখ আমষেটে করে বসে আছে। ক্ষণে ক্ষণে চোখ মেলে অনন্যা আর সাইমুনের দিকে আড়ঁচোখে দেখছে। কেমন যেন অস্বস্তিতে গাঁ গুলিয়ে উঠছে।

গোটা পরিবেশটাই শান্ত। অনন্যা পিনপতন নীরবতা উপেক্ষা করে নিজেই বলল,
-” দীশা, তুই কি অখুশি আমাদের দেখে।”

-” নাহ্।” দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোজাসাপ্টা উত্তর।

-” দেখ বন্ধুদের মধ্যে ঝামেলা থাকা কি ভালো! মিটমাট করে নেওয়াটাই তো বেটার! আমি চাই ইনফ্যাক্ট সবাই চায় তোর আর সাইমুনের দূরত্বটা কাটুক।”

-” কই আমার’তো সাইমুনের সাথে কোন ঝামেলা নাই।” দিশা বলল পরক্ষনেই সাইমুনের দিকে তাকিয়ে শুধোল,” কি রে আমাদের মাঝে কোন ঝামেলা-টামেলা আছে নাকি’রে!” হঠাৎ অস্বাভাবিক ভাবে হেসে উঠে সে।

সাইমুন স্তিমিত চোখে তাকিয়ে খেই হারিয়ে ফেলে। কি বলবে ভাষ খুঁজে পেলনা। দিশার এই হেয়ালি মোটেও সুবিধার নয়।

-” দিশা, নিনিত বিয়েতে রাজি হচ্ছেনা।” অনন্যা কিছুক্ষণ চুপ থেকে শান্ত গলায় বলল।

-” কেন! প্রেম করতে পারছে এখন বিয়ে করতে কী সমস্যা! ফাজলামো নাকি!” সাথে সাথেই উত্তর দেয় দিশা। পরক্ষণেই ভ্রু কুঁচকে বলল,
-“এখন কী আমাকে ওরে রাজি করাতে হবে। এইজন্যই তোরা আসছিস তাইনা!”

-” হ্যাঁ, যদি বলি এইজন্যেই আসছি। কারণ নিনিত তোকে কষ্ট দিয়ে আমাকে বিয়ে করতে পারবে না। সে তোকে ভালোবাসে দীশা! যেটা তুই কোনদিনও বুঝবি না। অন্ধরা কখনও বুঝেনা।” সাইমুন একদমে কথাটা বলেই থামল। রাগে তার গাঁ জ্বলে যাচ্ছে। তবে সব সময় মাথা গরম করলেই সব কাজ হাসিল করা যায় না!

দীশা তীক্ষ্ণ চোখে তাকায় সাইমুনের দিকে। কষ্টরা দলা-পাকিয়ে গলার কাছাকাছি এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। না পারছে গিলতে না পারছে সহ্য করতে। হুট করে অনন্যা এসে ওঁর কাধ জড়িয়ে ধরে। অনন্যার চোখেমুখেও বেদনার ছাঁপ স্পষ্ট।

” দিশা, তুই চাস-না সাইমুন নিনিত ভালো থাক। ওঁরা যদি দু’জনকে নিয়ে দু’জন হ্যাপি থাকে তাহলে বন্ধু হিসেবে তোর কী দূরে সরে যাওয়া উচিৎ। ভালোবাসার মানুষটা ভালো থাকুক। যার সাথেই থাকুক না কেন দিনশেষে ভালো থাকুক। এটাই প্রার্থনা হওয়া উচিৎ। প্লিজ সাইমুনের কথায় কিছু মনে করিস না। প্লিজ দীশা আর-একবার কি তুই সেই আগের দীশা হতে পারিস না!”

দীশা অনন্যার বুকের মাখে ডুঁকরে কেঁদে উঠল। মনে মনে নিশ্চিন্ত হয় এবার সমস্যার সমাধান হবে।

★★★★★★

অঙ্কন ফিরেই লম্বা একটা ঘুম দিয়েছিল উঠতে উঠতে পরদিন বেশ বেলা! এরমাঝে অনীলা ছেলেকে আর কিছুই বললেন না। যা বলার বললেন বিকেলে। ছেলে তখন তৈরী হচ্ছিলো হয়তো কোথায় যাবে! তবুও সেই মুহুর্তেই অনীলা প্রসঙ্গটা তুললেন।

অঙ্কন জুতার ফিতা বাঁধতে বাঁধতে কথাগুলো শুনল তবে কোন টু,টা শব্দ করলো না। এবং আশ্চর্যজনকভাবে কথার মাঝখানে উঠে চলে গেল। যারপরনাই অনীলা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকল। ঠিক এই ধরনের বেয়াদবি অঙ্কন জীবনেও করেনি। আজ করল তবে সেটা অনন্যার জন্য। মাথাটা কেমন যেন চক্কর দিয়ে উঠল। অন্বেষাকে গলা চড়িয়ে ডাকল,
” আইসব্যাগ নিয়ে আয়। ভালো করে মাথায় চেপে ধর, অন্বেষা! মাথা কিন্তু গরম হয়ে গেছে।”
অন্বেষা কিংকর্তব্য বিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার ফলে আবার কয়েকদফা ঝারি খেল।

” আমার হয়েছে যত জ্বালা। ইচ্ছে করে অনীহার মতো কারো সাথে পালিয়ে যাই। ধুর ভাইয়া আর অনীহা যাই করুক সব বকা এখন আমার খেতে হয়। কবে যে আসবে শুভদিন…”
অন্বেষা বিড়বিড় করতে করতে ঘর থেকে বের হয়ে যায়।

★★★★★★★

সারাদিন প্রচন্ড মাথাব্যথা ছিল। তারউপর দু’দিন হয় বেচারার খবর নেই। মাথায় সেই টেনশনও ঘুরপাক খাচ্ছে। তাই দিশা’র বাসা থেকে ফিরেই গোসলে ঢুকেছিল। এবার মনে হয় কিছুটা ভালো লাগছে।
ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় দাঁড়িয়ে চুল মুছছিলো আর বিক্ষিপ্ত মনে ভাবছিলো কিছু এলোমেলো ভাবনা। হেয়ার ড্রায়ারটা আনমনে তুলে নেয়।ঠিক তখনি কারো পায়ের শব্দে হয়। শব্দটা পরিচিত এক সেকেন্ডের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়ায় সে। চোখেমুখে খেলে যায় বিদ্যুৎ-এর ঝিলিক। বেশ চমকে গেছে অস্ফুটে সুর বের হয়, -” কবে ফিরেছো! ”

অঙ্কন উত্তর না দিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে অনন্যাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। ভরাট শরীর, লম্বাটে মুখ,সরল চোখ তার কালো কুচকুচে মনি, মুখে মানানসই লম্বাটে খাড়া নাক রক্তজবার ন্যায় পাতলা দু’ঠোঁট সহ সবকিছু। এই মুহুর্তে তার খুব রাগ হওয়ার কথা কিন্তু কিচ্ছু হচ্ছেনা।

” কি হলো! কিছু বলছোনা কেন? দু’দিন হয় কোন খবর নাই।”

-“ভেবেছিলাম সারপ্রাইজ দিব কিন্তু নিজেই সারপ্রাইজড!”

অনন্যা হঠাৎ চমকে গেল। কিঞ্চিৎ ভয় পেল। অন্যসবার মতো এবার অঙ্কনও তাকে ভুল বুঝবে! কেউ তাকে বুঝেনা, বুঝতে চায়না। এই অপ্রিয় সত্যিটা আবিষ্কার করার সাথে সাথে ভেতরটা চাপা অভিমানে গুড়িঁয়ে গেল। পরক্ষণেই মনে হলো সামনে বসা এই মানুষটা ভুল বুঝলে ও সইতে পারবেনা। আকুলিবিকুলি করে অনন্যার ভেতরের আরেক-সত্বা বলে উঠল,
-” অঙ্কন, বিশ্বাস করো। আমি তোমার কাছে কিছু লুকাতে চাইনি। আমি তোমাকে ছাড়া…
বিশ্বাস করো তোমাকে ছেড়ে…..”

অনন্যা কথা শেষ করতে পারেনি। তার পূর্বেই কম্পমান ঠোঁটের উপর চেপে বসে অঙ্কনের তর্জনি। চোখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে থাকে সে।

-” আমি কোন এক্সপ্লেনেশন চাইনি। আমি জানি তুমি কেন গোটা ব্যাপারটাই আমার থেকে ইভেন সবার থেকেই লুকিয়েছ। আমি তোমাকে আজ কোন প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে আসিনি। অহেতুক উতলা হইওনা। আমার অনন্যাকে এটুকু বুঝার ক্ষমতা আল্লাহ বোধ হয় আমাকে দিয়েছেন।”

অনন্যার দু’চোখ ফেটে জল গড়িয়ে পড়ে। লুটিয়ে পড়ে অঙ্কনের বুকে। আজ সে আটকাবেনা। কাঁদুক মেয়েটা প্রাণভরে কাঁদুক।

” ভালোবাসা ভালো তবে অন্ধ ভালোবাসা ধ্বংস ডেকে আনে। আমি চাই আমার ভালোবাসা তোমার শক্তি হয়ে উঠুক, দূর্বলতা নয়। তুমি সূর্যমুখীর মতো প্রস্ফুটিত হও। বোকা বোকা অনন্যাকে আমি দেখতে চাই-ন। দূর্বলতা একদিন তোমার অস্তিত্বকে আস্তে আস্তে বিলীন করে দিবে সেদিন আফসোস হবে নিত্যসঙ্গী। আমি তোমার হেরে যাওয়া মুখটা সহ্য করতে পারবনা। আশা করি আমি বুঝাতে পেরেছি।”

অঙ্কনের সোজাসাপ্টা কথায় অনন্যা ধাতস্থ হয়। বাঁ হাতের উলটো পিঠে জল মুছে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলল, ” আন্টি কিছুতেই মানবে না।”

” ননসেন্সের মতো কথা বলবেনা। উই আর ম্যারিড, গট ইট! এখানে কারো মানা না মানায় যায় আসেনা। যেহেতু বিয়ে করার আগে কারো কথা ভাবা হয়নি। সেহেতু এই মুহুর্তে এইসব ভাবা জাস্ট বোকামো!
না মানতে চাইলে সত্যিটা সামনে আসবে৷ ” অঙ্কন মুহুর্তেই তেতে উঠে।

“পারবনা। আমি বাবাকে কষ্ট দিতে পারবনা।” অনন্যা নিচু স্বরে বলল।

” অনন্যা, আমার সবচেয়ে খারাপ লেগেছে তুমি মা’কে ফোন করে বলেছো যে, মা যা বলবে তুমি তাতেই রাজি। তখন তোমার মনে হয়নি তুমি তোমার বাবাকে কষ্ট দিচ্ছ। তুমি এইটা করলে কী করে!”

অনন্যা চমকে তাকায়। এই কথাটা অঙ্কনের জানার কথা নয় ইভেন কারো জানার কথা নয়। সে-যে আন্টিকে কথা দিয়েছে সেই কথার কী হবে!

” কী হলো কথা বলছো না কেন?”

অনন্যা একরাশ দ্বিধা নিয়ে তাকায়। কী হবে! কী করবে? পরিণতি ভাবতে বসলেই মাথায় যন্ত্রণা হয়।

দ্বিধাগ্রস্ত অনন্যার মুখ দু’হাত পানপাতার মত করে তুলে নেয় অঙ্কন। অনন্যার চোখের ভাষা বুঝা তার কাছে দূর্ভেদ্য নয়।
-” অনন্যা, তাকাও আমার চোখের দিকে। তাকাও!”

অনন্যা চকিতে তাকায়। চোখেমুখে তখনো রাজ্যের আশঙ্কা ভয়।

অঙ্কন বলেই চলল,
-” আমার চোখে কী দেখতে পাও। ভালোবাসা দেখতে পাচ্ছ, বিশ্বাস, ভরসা, আস্থা দেখতে পাচ্ছ না! ”

অনন্যা মাথা ঝুঁকিয়ে হ্যাঁ বোধক ইঙ্গিত করতেই অঙ্কন আবার বলল, ” তোমার কাউকে কষ্ট দিতে হবেনা। আজকের পর থেকে তুমি কেবল নিজেকে নিয়ে ভাববে কোন পিছুটান মাথায় রাখবেনা। কেবল সামনে এগিয়ে যাবে। এরজন্য যা করার প্রয়োজন আমি করব। আর তুমি মা’কে নিয়ে ভেবোনা! আমি বুঝাব। হয়তো একদিন, দুইদিন, এক মাস, তিনমাস না হয় ছয়মাস উনি বুঝবেন এইটুকু বিশ্বাস তুমি আমার উপর রাখো৷ আর তোমার অঙ্কন তোমার ছিল তোমার-ই থাকবে।”

অনন্যা ছলছল চোখে তাকায়। প্রশস্ত ললাটে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিয়ে পরম নির্ভরতায় পিঠে হাত রাখে অঙ্কন। মুহুর্তেই অঙ্কনের উষ্ণ বুকে ঠাঁই হয় অনন্যার।

চলবে….

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে