চশমা

0
2007

#চশমা
লেখনীতে:জান্নাতুল ফেরদৌস মীম

সমস্ত রুম ফুল দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে। বিছানার মাঝ খানে অনেক গুলো গোলাপের পাপড়ি দিয়ে লাভ শেপ করা। তার ঠিক পাশেই বসে আছে অনিতা। মনে হচ্ছে একটা গোলাপের রাজ্যের মাঝ খানে ফুলেদের রাণী বসে আছে। লাল টুকটুকে একটা বেনারসি পরনে, মাথায় আধ ঘোমটা দেয়া। শরীরে বিভিন্ন অলংকার যেনো অনিতা’র সৌন্দর্যকে আরো বহু গুন বাড়িয়ে দিয়েছে। আর সেই সৌন্দর্য কে মুগ্ধ হয়ে দেখছে আদনান।তার কাছে মনে হচ্ছে আজ এই ফুল বাগানের সমস্ত ফুলের সাথে ফুলের রাণীর মালিকানা টা’ও শুধু তার।

আদনান বিছানায় অনিতার পাশে বসলো।কিছুক্ষন বিমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো অনিতা’র দিকে।তারপর চোখ থেকে চশমাটা খুলে বেড সাইট টেবিলে রাখলো।চশমা টা খোলার সাথে সাথে চারপাশের সব কিছু অনেকটা ঝাপসা হয়ে গেলো। আদনান চশমা ছাড়া ভালোভাবে দেখতে পারে না।চশমা ছাড়া চোখের সামনে সব কিছু ঘোলাটে লাগে তার কাছে।

আদনান কিছুক্ষন এক দৃষ্টিতে ঘোলা চোখে তাকিয়ে আছে বেড সাইট টেবিলে রাখা চশমা টার দিকে। এই চশমা’র জন্য তার জীবনে কত কিছু ঘটে গেছে। আপন মনেই ভাবতে লাগলো সেগুলো আদনান।

ইউনিভার্সিটি তে তখন ৩য় বর্ষে পড়ে আদনান। বায়োলজি ডিপার্টমেন্ট এর যে এতো প্যারা, তা সাবজেক্ট নেয়ার আগে ভাবেই নি সে।রাত জেগে প্রেক্টিকেল, এসাইনমেন্ট করা,প্রতিদিনের লেকচার গুলো দেখা সব মিলিয়ে এখন বোরিং লাগে তার কাছে।তার মাঝে আছে তো এক চশমা। চোখ থেকে খুলে ফেললেই সব অন্ধকার ।

একদিন ঘুম ভেঙে বিছানায় শুয়ে থেকেই পাশে হাত বাড়িয়ে চশমা টা খুঁজছিলো আদনান।খুঁজে না পেয়ে জোড়ে জোড়ে মা কে ডেকে বললো,
– মা…. ও মা, আমার চশমা টা কোথায়..?

ছেলের ডাক পেয়ে পাশের রুম থেকে আদনানের মা এসে বললো,
-ওই তো কি, তোর বালিশের পাশেই তো চশমাটা রাখা।এই বলে হাত বাড়িয়ে চশমাটা নিয়ে ছেলের হাতে দিলেন তিনি।
প্রায় বেশির ভাগ সময়ই এমন পরিস্থিতিতে পরতে হয় আদনানের। ঘুম থেকে উঠে চশমা পায় না সে।তার পর মা এসে চশমা খুঁজে দিয়ে যায় তাকে।

উঠে ফ্রেস হয়ে নাস্তা করে ভার্সাটির উদ্দেশ্যে বের হলো আদনান।
একটা অটো করে যাচ্ছিলো সে।হঠাৎ চোখ প্রচন্ড চুলকানোর ফলে চশমা টা খুলে পাশে রেখে সে চোখ চুলকাচ্ছিলো। এমন সময় অটো টা ব্রেক চেপে ধরলো। ব্রেক চেপে গাড়িটা ঝাকুনি খাওয়াতে আদনানের চশমা টা নিচে পড়ে গেলো।আদনান ঝাপসা চোখে হাত বাড়িয়ে চশমা টা খুঁজতে লাগলো।
একটু পরই একটা মেয়েলী কন্ঠে বললো,
– ”আপনার চশমা।”
আদনান মেয়েটার হাত থেকে চশমাটা নিয়ে চোখে পড়ে নিলো।এতোক্ষন সে লক্ষ্য করে নি তার পাশে একটা সুন্দরী মেয়ে বসে ছিলো। আদনার মেয়েটির উদ্দেশ্যে বললো,
– ধন্যবাদ আপনাকে। আসলে আমি চশমা ছাড়া তেমন ভালো ভাবে দেখতে পারি না।সে কারনেই একটু সমস্যা হয়।
-জ্বি বুঝতে পেরেছি।
ভার্সিটির সামনে আদনান অটো থেকে নামার সময় দেখলো মেয়েটিও তার সাথেই নামছে। আদনান জিঙ্গেস করলো,
– আপনি কি আমাদের ইউনিভার্সিটি তেই পড়েন?
-জ্বি।
-কোন সাবজেক্ট ?
-আমি বি.বি.এ করছি। আপনি..?
– বায়োলজি নিয়ে অনার্স করছি।তৃতীয় বর্ষ।
-ওহ আচ্ছা। আজ আসি তাহলে।

মেয়েটি একটি হাসি দিয়ে চলে গেলো।আদনান ও তার ডিপার্টমেন্ট এর দিকে চললো।

আদনান ক্যাম্পাসের মাঠে গিয়ে দেখলো এক পাশে গোল হয়ে তার ফ্রেন্ডরা বসে আছে।আদনান কে দেখা মাত্রই কয়েক জন এক সাথে বলে উঠলে,
– এই তো আমাদের কানা বাবা চলে আসছে।
আদনান হাসি মাখা মুখ নিয়ে বন্ধুদের পাশে গিয়ে বসলো। সে কখনো এসব কথা শুনে রাগ করে না। বরং ভালো করেই জানে বন্ধুরা এসব মজা করেই বলে তাকে, আর ফ্রেন্ডদের সাথে একটু মজা করাই যায়।

কিছু দিন পর,
ক্লাস শেষ করে আদনান ক্লাস রুম থেকে বের হচ্ছিলো। এমন সময়, একজনের সাথে ধাক্কা লেগে তার চশমা টা পরে যাচ্ছিলো।মেয়েটা বলে উঠলো,
– এই… এই.. আপনার চশমা।
আদনান সাথে সাথে চশমাটায় হাত দিয়ে তা ঠিক করে নিলো।

তাকিয়ে দেখলো সেদিনের মেয়েটি।আদনান একটা হাসি দিয়ে বললো,
-আপনি!
– জ্বি। আমার এক ফ্রেন্ড আপনাদের ডিপার্টমেন্ট এ আছে।তার কাছেই এসেছিলাম।
– তাই ! কোন ফ্রেন্ড ? নাম কি…?
মেয়েটি কেমন যেনো নার্ভাস হয়ে গিয়েছে।কি বলবে বুঝতে পারলো না।
আদনান মুচকি হাসি দিয়ে বললো,
-ইটস ওকে। নার্ভাস হতে হবে না।আমি আদনান। আপনি..?
– আমি অনিতা।
– বাহ! আমাদের নামের মাঝেও অনেক মিল আছে।তাছাড়া দুদিন দেখা হলো। আর এই দু’দিনই আমার চশমার সাথে আপনার স্মৃতি জড়িয়ে গেলো।
আদনানের কথা শুনে অনিতার নার্ভাসনেস টা বেড়ে যায়। সে এখানে আদনানের সাথে দেখা করার জন্যই এসেছিলো। সেদিন অটো তে দেখা হওয়ার পর থেকে অনিতার মাথায় এই ছেলেটি ঘুরঘুর করছে।তারপর থেকে সে ভার্সিটিতে ছেলেটিকে প্রায়ই লক্ষ্য করছিলো।
ছেলেটির কথা বলার ধরন, তার হাসি, বার বার চোখে হাত দিয়ে চশমা ঠিক করা সব কিছুই অনিতা কে পাগল করে দিচ্ছিলো।

অনিতা কি বলবে ভেবে না পেয়ে বললো,
– সাবধানে চলাচল করবেন।চশমা ভেঙে গেলে আপনার পথ চলার সাথী হয়ে তো কেউ দাড়িয়ে থাকবে না।

কথা শেষ করেই অনিতা দৌড়ে বের হয়ে গেলো সেখান থেকে।আদনান তাকিয়ে দেখছে অনিতার চলে যাওয়ার দিকে।মেয়েটা কে ! তারমনে এভাবে দোলা লাগিয়ে চলে গেলো।

দেখতে দেখতে তাদের অনার্স কমপ্লিট হয়ে যায়।
আদনান একটা জব করে।সেদিনের পর থেকে অনিতা নামের মেয়েটির সাথে তার আর দেখা হয় নি। জীবনের ব্যস্ততা বেড়েছে। আদনানও তার মতো ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ কমে যায়।খুব কাছের কিছু বন্ধুদের সাথে শুধু মাঝে মাঝে কথা হয়।

প্রায় অনেক গুলো দিন পর এক বন্ধুর বিয়েতে গিয়েছে আদনান।
পুরোনো অনেক ফ্রেন্ডদের সাথে দেখা হয়েছে।সবাই মিলে আড্ডা দিচ্ছিলো।এমন সময় একটা বাচ্চা মেয়ে দৌড় দিয়ে যাওয়ার সময় আদনানের সাথে ধাক্কা লাগে।
আদনান চোখের চশমাটা ঠিক করে মেয়েটার দিকে তাকায়।

কিছুক্ষন পর মেয়েটা আবার ফিরে এসে আদনানের হাতে একটা চিরকুট দিলো।আদনান চিরকুট টা নিয়ে বললো,
– কি এটা , কে দিয়েছে ?
– একটা আন্টি আপনাকে দিতে বলেছে।

আদনান চিরকুট টা হাতে নিয়ে পড়তে লাগলো।

”এখনো সাবধানে চলাচল করেন না? চশমা ভেঙে গেলে হাত ধরে কে নিয়ে যাবে..?

আপনার চশমা না পরার কারন আমি হতে চাই।ততোদিন না হয় চশমা পরেই আমাকে খুঁজুন।খুঁজে পাওয়ার পর কথা দিচ্ছি, বাকিটা জীবন হাত ধরে আমিই নিয়ে যাবো।”

আদনান চিরকুট টা পড়ার পর একটা বড় নিশ্বাস ছাড়লো।ঠোঁটের কোনে তার অজান্তেই একটা হাসির রেখা ফুঁটে উঠেছে। সে বুঝে গেছে মেয়েটা কে। এতো গুলো বছর পর বুকের মাঝে ঢেউ তুলে চলে যাওয়া মেয়েটার সন্ধান এবার যে তাকে করতেই হবে।

কল্পনার জগত থেকে বেরিয়ে এলো আদনান। চশমার গ্লাস থেকে নজর সরিয়ে অনিতার হাত দুটো নিজের হাতের মাঝে বন্দি করে নিয়ে বললো,

” সারা জীবন আমার চশমা ছাড়া পথ চলার সঙ্গী হবে..?”

(সমাপ্ত)

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে