গল্প: সুখপাখি ৩য় পর্ব

0
3003

গল্প: সুখপাখি ৩য় পর্ব
লেখকঃ আলভী আহম্মেদ

..
রোদেলার চিঠিটা আজমান বুক পকেটে রেখে হাটতে শুরু
করলো। উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাটছে আজমান। এমন সময়
কলিগের কল..
: হ্যালো ভাই কই আপনি?
: আশেপাশেই আছি। কেন?
: না মানে,, আকাশের অবস্থা তো ভালো না। তাড়াতাড়ি
আসেন।
: আসছি।
কাকভেজা হয়ে বাসায় ফিরেছে আজমান। রোদেলার
দেওয়া চিঠিটা বুক পকেটে লেপ্টে আছে। চিঠিটা খুব
যত্ন করে বের করলো আজমান। নিজের কাপড় পাল্টে
বারান্দায় এসে দাড়ালো সে। হাতে সিগারেট। আজ
জীবন যুদ্ধে হেরে গেছে সে। আজ মনে হচ্ছে নিজের
কাছে হেরে গেছে সে।
রোদেলার বুবু মানে তামান্না সুলতানা আমার প্রাক্তন।
আমার জীবনের প্রথম প্রেম। প্রথম ভালো লাগা। তখন
ভালোবাসা বলতে শুধু বুঝতাম তামান্নার হাতের ঐ
তিলটা। এই তিলটার প্রেমে পড়েছিলাম আমি। প্রথম
যেদিন ওকে প্রপোজ করেছিলাম, তখন সবার আগে
বলেছিলাম, আমি প্রতিদিন তোমার আঙ্গুলের তিলটায়
আমার ঠোট ছোয়াতে চাই। তুমি কি আমাকে সেই
অধিকারটা দিবে? ঐ দিন তামান্না আমার প্রশ্নের
কোনো জবাব দেয় নি। এর প্রতিউত্তরে সে শুধু মুচকি
হেসেছিলো। আর আমি সেই হাসিতেই আমার
ভালোবাসা খুজে পেয়েছিলাম।
সবকিছু ভালোই যাচ্ছিলো। প্রতিদিন কুয়াশা ভেজা
সকালে শীতে কাপতে কাঁপতে ওর কোচিং এর সামনে
গিয়ে দাড়িয়ে থাকতাম শুধু ওকে একবার দেখবো বলে।
মাঝরাতে গিয়ে হাজির হতাম ওর বাসায় ওর তিলটার
স্পর্শ পাওয়ার জন্য। বাসার সামনে গিয়ে যখন বলতাম,
তিলাবতি আমার খুব পিপাসা পেয়েছে। আর তামান্না
বলতো, যাও উঠে পানি খাও। আর আমি বলতাম, আমি তো
তোমার বাসার সামনে দাড়িয়ে আছি। তামান্না বলে
উঠতো, আরে পাগল রাত তিনটা বাজে। এখন কেনো
আসছো?
আমি বলতাম, বলেছি তো পিপাসা পেয়েছে।
তামান্না : কিন্তু এতো রাতে আমি পানি খাওয়াবো কি
করে?
আমি: আমি কি বলেছি? আমার পানি পিপাসা পেয়েছে?
: তাহলে?
: তোমাকে দেখার জন্য আমি আকুল হয়ে আছি। আমি
তোমার তিলটাকে স্পর্শ করতে চাই।
এর উত্তরে আমি শুধু ওর নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পেতাম।
এতটা ভালোবাসা হঠাৎ করে কেমনে হারিয়ে
গিয়েছিলো এর উত্তর আমার জানা নেই। একদিন রাতে
যখন তামান্না জানালা খুলেছিলো আমার জন্য, ঐ দিনই
আমরা ওর ভাইয়ের কাছে ধরা খাই। তারপর থেকে
যোগাযোগ বন্ধ। একদম বন্ধ করে দিয়েছিলো যোগাযোগ।
কতো রাত যে ছটফট করে কাটিয়েছি এর কোনো হিসেব
ছিলো না আমার কাছে। তারপর হঠাৎ ই একদিন তামান্না
লুকিয়ে কল দিয়ে বললো, আমাকে অন্য জায়গয় বিয়ে
দিয়ে দিবে। তুমি কিছু করো।
তারপর মায়ের পা ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলাম, মা
আমি তামান্না কে ছাড়া বাচতে পারবো না।
বাবাকে সরাসরি কিছু বলার সাহস ছিলো না আমার।।
আমার কান্না দেখে মা ই সবটা বাবাকে
জানিয়েছিলো। আমার বড় ভাই তখনও বিয়ে করে নি।
আমি পড়ি ক্লাস টেনে। বাবা কি করে যাবে আমার
বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে?
কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাবা গিয়েছিলো তামান্নাদের
বাসায়। তামান্নার বাবা প্রচন্ড অপমান করে তাড়িয়ে
দিয়েছিলো আমার বাবাকে। বাবাকে বলেছিলো,
আমার মেয়ের জন্য কতো ডাক্তার ইন্জিনিয়ার লাইন ধরে
আছে। আর আপনি আসছেন আপনার ভন্ড ছেলের সাথে
আমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে? লজ্জা করে না আপনার।
ঐ দিন নিজেকে খুব ছোট মনে হয়েছিলো। বাবাকে
দেখেছিলাম রুমে বসে চোখের পানি ফেলতে।
কয়েকদিন পর আবারও তামান্নার সাথে আমার
যোগাযোগ হয়েছিল। আমি স্বাভাবিক ভাবেই কথা
বলেছিলাম। আবার আমাদের প্রতিদিন যোগাযোগ হতে
শুরু করলো। আমাদের সম্পর্ক টা স্বাভাবিক হলো কিন্তু
আমি আমার বাবার অপমানটা হাজার বার চেষ্টা করেও
ভুলতে পারলাম না। এসএসসি পরীক্ষার পর তামান্নাকে
বললাম চলো পালিয়ে যাই। তামান্না প্রথমে রাজি না
হলেও কিছুক্ষণ পর ঠিকই রাজি হয়েছিল। পরের দিন
স্টেশনে দেখা করার কথা ছিলো আমাদের। কিন্তু না।
আমি আসি নি। সারাদিন তামান্না অপেক্ষা করেছিলো
আমার জন্য তারপর বিকালবেলা তার বাসায় ফিরে
গিয়েছিলো। এলাকার সবাই যখন তামান্নার বাবাকে
দেখে উপহাস করেছিলো ঐ দিন আমি পৈশাচিক হাসি
হেসেছিলাম।
তারপর আমি ঢাকায় চলে আসলাম। তামান্না এতো কিছুর
পরও আমার সাথে যোগাযোগ করেছিলো, আর বলেছিলো
এখন তো প্রতিশোধ নেয়া শেষ। এখন আমরা আমাদের
রিলেশন টা আবার কন্টিনিও করি। আমি পরিষ্কার
জানিয়ে দিয়েছিলাম তা আর সম্ভব না। কিন্তু তামান্না
তবু বার বার ফিরতে চেয়েছিলো আমার জীবনে, আমি
গ্রহন করতে পারি নি ওকে। আমি আবার নতুন করে
ভালোবাসতে পারে নি ওকে। শুধু ওকে অবহেলায় করে
গিয়েছি। তারপর নিজের সীমটা চেঞ্জ করে যোগাযোগ
করার রাস্তাটাই বন্ধ করে দিলাম। তারপর আমি মা
বাবাকে নিয়ে ঢাকায় সেটেল্ট হই। আর তামান্নার
চাপ্টার চিরদিনের জন্য ক্লোজ হয়ে যাই।
তামান্না আর আমাদের সম্পর্ক শেষ প্রায় নয় বছর। আজ
আমি প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু আফসোস বুকের বা পাশে আজও
কাউকে জায়গা দিতে পারি নি। ভালোবাসাটা মরে
গিয়েছিলো আমার জীবনে।
সামনের মাসে আমার বিয়ে। বাবা মা সমন্ধ করে বিয়ে
ঠিক করেছে আমার। আমি হ্যা কিংবা না কোনোটাই
বলি নি। এই নয় বছরে আমি ঘৃনা করার জন্যও তামান্না কে
মনে করি নি। একবারের জন্যও না। ওর জন্য আমার কোনো
করুনাও হতো না।
বাবা বলেছিলেন, মেয়েটার কোনো দোষ নাই।
মেয়েটারে কষ্ট দিস না।
আমি ঐ দিন বলেছিলাম, মা আমার জীবনে কোনোদিন
কোনো মেয়ে ছিলো না। আর যদি থেকেও থাকে তাহলে
আজকের পর থেকে আমি ভুলে গিয়েছি। সো তোমারাও
ভুলে যাও।
এগুলা ভাবতে ভাবতেই আজমানের চোখটা ভিজে
গেলো। কেন ভিজছে সে জানে না। কি করা উচিত তাও
সে জানে না। তামান্নার অসহায়ের মতো আর্তনাত শুনেও
আজমানের মনে ওর জন্য এতোটুকু করুনাি জন্মায় নি।
তাহলে আজ কি রোদেলার লেখা এলোমেলো চিঠিটা
আবার জন্য দিবে ভালোবাসার? আবারও কি পিপাসা
জাগবে হাতের তিলে ঠোট ছোয়াবার? নাকি রোদেলার
শেষ ইচ্ছাটা চিঠিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
চলবে..

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে