গল্প: বিস্মৃতির অন্তরালে পর্ব – ০৭

0
842

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
গল্প: বিস্মৃতির অন্তরালে পর্ব – ০৭
লেখনীতে: ফাতিমা আক্তার অদ্রি

পরদিন রাতে আমি আর নেহা মিলে টিভি দেখছিলাম। আমি মাঝে মধ্যেই কিছু ভালো ইংলিশ মুভি দেখি। নেহা কিছুক্ষণ পরই তার ঘুম আসছে বলে নিজের রুমে চলে গেলো। আমি একাই একাই দেখছিলাম। তখন হুট করেই নিশান ভাই এসে বলল,’ চা বানাতে পারিস? যদিও তোকে দেখে মনে হয় না তুই কাজ টাজ কিছু পারিস বলে?’

আমার ইচ্ছে হলো নিশানের মাথার উপর পৃথিবীর সমস্ত চায়ের কাপ ভেঙ্গে দিই। যেন সে চা খাওয়ার জন্য চায়ের কাপ-ই না পায়। তারপরও আমি কিছু না বলে চুপ করে রইলাম। সে তড়িঘড়ি করে বলল,’ এক কাপ চা বানিয়ে আমার রুমে দিয়ে যা।’

বলেই সে চলে গেল। আমি তার দিকে মুখ ভেংচিয়ে আবার মুভি দেখায় মনোযোগ দিলাম। রাত ১১:৫০ বেজে গেলো। মুভিটা আমার খুব পছন্দের তাই না দেখে যেতে মন চাইল না । তাই ঠিক করলাম মুভি শেষ হলেই ঘুমোতে যাব। ১২:০০ টার দিকে নিশান আবার হনহন করে হেঁটে ড্রয়িং রুমে এসে আমার সামনের সোফায় বসে একেবারে আমার চোখে চোখ রেখে বলল,’ তোকে চা দিতে বলে গেলাম না?’

আমি খানিক উঁচু কণ্ঠে বললাম,’দেখছ না মুভি দেখছি।’

‘যা এখন বানিয়ে নিয়ে আয়। আমি রুমে গেলাম।’ আদেশ দেবার ভঙ্গিতে বলে সে আবারও চলে গেল।

আমি আবার মুভি দেখায় মনোযোগ দিলাম। ১২:৩০ এর দিকে আবার হাজির হলো সে। এবার তিরিক্ষি মেজাজে বলল,’চা বানাইছিস?’

আমি নিচু কণ্ঠে বললাম,’ ভুলে গেছি। একদম ভুলে গেছি।’

এবার নিশান আমার সামনের সোফাটাতে বসে বাম পায়ের উপর ডান পা তুলে বসল। তারপর তার চিবুকের নিচে হাতের দু আঙ্গুল ঠেকিয়ে বলল,’আচ্ছা তোর নামটা যেন কে রাখছে?’

আমি শান্ত স্বরে বললাম,’হঠাৎ এই প্রশ্ন?’

নিশান ভাই এবার আরো শান্ত হয়ে ঠান্ডা মেজাজে বলল,’বল না । খুব জানতে ইচ্ছে করছে!’

আমি এবার বললাম,’কেন তুমি জানো না? তোমার তো জানার কথা !’

এবার মনে হলো কালবৈশাখীর ঝড় বয়ে যাবে। নিশান ভাই গলা উঁচিয়ে কর্কশ কণ্ঠে বলল,’বেশি কথা বলিস না! বড়দের সাথে মুখে মুখে তর্ক। এত্ত বড় স্পর্ধা তোর।’

আমি চুপচাপ তার এই পরিবর্তন লক্ষ করছিলাম। তারপর আবার নিজে থেকেই বলতে শুরু করল। এবার কণ্ঠ আরো শান্ত করে বলল,’আমার মনে হয় তোর নাম স্মৃতি রাখা একদম ঠিক হয়নি।’

আমি এবার অবাক হয়ে জানতে চাইলাম,’কেন এমন মনে হলো তোমার?’

‘আবার মুখে মুখে কথা! বড়দের সাথে কথা বলার সময় ন্যূনতম রেসপেক্ট কীভাবে দিতে হয় সেটাও জানিস না নাকি?’

‘তুমি এমন কোন মুরব্বি হইছ যে তোমাকে দিন রাত সালাম করতে হবে?’ আমি আমার সোফা থেকে উঠে গিয়ে নিশান ভাইয়ের সামনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললাম।

‘আমাদের মধ্যে কে বড়?’ নিশান ভাই শান্ত স্বরে প্রশ্ন করল।

আমি চট করে উত্তর দিলাম, ‘তুমি?’

‘তাহলে মুরব্বি কে?’

‘তুমি?’ আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল।

‘এজন্যই তো বলি তোর নামটা ঠিকমতো রাখা হয়নি। আমি এই বিষয়টা নিয়ে অনেক ভেবেছি,বুঝলি?’ আমার দিকে তাকিয়ে বলে খানিক থেমে আবার বলল,’সমস্ত ভাবনা চিন্তার পর আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

‘কি সিদ্ধান্ত?’

‘এটাই যে তোর নতুন নাম রাখব আমি।’

‘নতুন নাম?’

‘হ্যাঁ, নতুন নাম। আর আমি তোর নাম রেখেছি বিস্মৃতি । এখন তুই জিজ্ঞেস করতে পারিস কেন বিস্মৃতি রাখলাম?’

‘কেন?’

‘কারণ তুই সব সময় ভুলে যাস! তোকে যে দু’ঘণ্টা আগে চা করে দিতে বললাম। তুই করেছিস? করিসনি! তুই নাকি ভুলে গেছিস। যেহেতু তুই সব সময় ভুলে যাস তাই তোর এই নামকরণ করলাম।’

তারপর সোফা থেকে উঠে আবার বলল,’এখন থেকে তোকে বিস্মৃতি বলেই ডাকব। তাহলেই তোর নামকরণ যথার্থ হবে। এখন কি চা দিবি? নাকি কানের নিচে দেব একটা?’

আমি মনে মনে কঠিন কিছু গালি দিলাম এই চা খোরকে। সারাদিন চা খাইতে থাকে। তাও এর চা খাওয়ার সাধ মিটে না। এই প্রায় মাঝ রাতেও তাকে চা খেতে হবে। তার উপর আমার নতুন নামকরণ করার পর। হঠাৎ আমার মাথায় আসলো যদি চা এর মধ্যেই একটা গণ্ডগোল পাকিয়ে দেই তবে এর চা খাওয়ার সাধ একেবারে মিটে যাবে।

একবার মনে হলো চায়ের সাথে মরিচ মিশিয়ে দেই। তারপর ভাবলাম চিনির সমুদ্র বানিয়ে দেই। কিন্তু একটাতেও সম্মত হতে পারছিলাম না। তারপর ভাবলাম লবণ তো দিতেই পারি। লবণ চা খেয়ে বুঝুক মজা।

আমি এক কাপ চায়ের মধ্যে দু টেবিল চামচ লবণ দিয়ে দিলাম। একটু টেস্ট করতে গিয়েই থু থু করে ফেলে দিলাম। হরিবল টেস্ট! এবার বুঝো নিশান বাবু এতো রাতে স্মৃতিকে দিয়ে চা বানানোর মজা। তাও আবার আমার নাম বিস্মৃতি রাখার পর।

আমি ধীর পায়ে চায়ের কাপ নিয়ে গিয়ে নিশানকে দিলাম। সে একেবারে আয়েশ করে বসে যেই না চায়ের কাপে চুমুক দিলো অমনি থু থু করে ফেলে দিলো।

তারপর কর্কশ কণ্ঠে বলল,’এটা কি চা নাকি লবণের গরম শরবত?’

আমি বললাম,’আমি তো এভাবেই চা বানাই।’

নিশান এবার তিরিক্ষি মেজাজে বলল,’ যা আরো এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে আয়। যতক্ষণ চা’টা ভালো হবে না ততক্ষণ চা বানাতে থাকবি। আর এবার থেকে চা’টা প্রথমে তুই টেস্ট করবি তারপর আমি।বুঝলি?’

আমি বিষণ্ণ মন নিয়ে আবারও কিচেনে গেলাম। এবার মনে মনে ভাবলাম দুনিয়ার সব থেকে ভালো চা’টাই বানাবো। নয়তো এই নিশানের বাচ্চা আমাকে’ই চা বানানোর মেশিন বানিয়ে ফেলবে।

চা খেয়ে নিশান ভাই বলল,’ প্রথমবার ইচ্ছে করে লবণ দিয়েছিলি। তাই না ?’

আমি বললাম,’আমি তখন চিনি ভেবে লবণ দিয়েছিলাম ।’

‘তোর কি মনে হয় আমি ক্লাস ওয়ানের বাচ্চা? যা এবার রুমে যা। এত রাত পর্যন্ত জেগে আছিস কেনো?’

‘তুমিই তো এতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে দিয়ে চা বানালে!’ আমি করুণ স্বরে বললাম।

‘আবার মুখে মুখে কথা! যেতে বললাম যা।’

আমাকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিশান ভাই আবার বলল,’তুই যাবি নাকি মামাকে ফোন দিব?’

আমি বিরস মুখে বললাম,’যাচ্ছি।’

যেতে যেতে আবার সিঁড়ির মাঝখানে থেমে গিয়ে নিশান ভাইকে উদ্দেশ্য করে বললাম,’তুমি খুব খারাপ।সব সময় আমার সাথে এমন করো।’

তারপর দৌড়ে নিজের রুমে চলে এলাম। রুমে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিলাম। তারপর ইচ্ছেমতো কান্না করলাম। আমার বিছানার বালিশটাই কেবল আমার সঙ্গ দিল। কারও উপর রাগ হলে তাকে কিছু করতে না পারলে আমার প্রচণ্ড রাগ হয়। তখন ইচ্ছেমতো কান্না করা ছাড়া আর কোনো অপশন থাকে না।

চলবে…ইন শা আল্লাহ্

আগের পর্বের লিংক:

এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share