গল্প: বিস্মৃতির অন্তরালে পর্ব – ০৬

0
1278

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
গল্প: বিস্মৃতির অন্তরালে পর্ব – ০৬
লেখনীতে: ফাতিমা আক্তার অদ্রি

সেই ঘটনার বেশ কিছুদিন পর আমি বাগানে হাঁটছিলাম। আমার হাতে একটা উপন্যাসের বই। আমি বরাবরই উপন্যাস পড়তে খুব ভালোবাসি। আর বাগানে বা ছাদে হেঁটে হেঁটে পড়তে আমার খুব ভালো লাগে। ইংরেজ লেখকদের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় হলেন চার্লস ডিকেন্স। তার লেখা সবগুলো উপন্যাস’ই আমার খুব পছন্দের । এখন আমার হাতে আছে ড্যাভিড কপারফিল্ড।

নেহা এসেই আমার পাশে দাঁড়িয়ে বলল,’স্মৃতিপু তোমার কি উপন্যাস পড়তে খুব ভালো লাগে?’

আমি মুচকি হেসে বললাম, ‘হুম,খুব।’

তারপর নেহাকে প্রশ্ন করলাম,’তুমি পড়েছ ডিকেন্সের উপন্যাস?’

‘না স্মৃতিপু। আমার ডিকেন্সের উপন্যাস তেমন পড়া হয়নি। একটা মাত্র উপন্যাস পড়েছি।’

‘কোনটা পড়েছ?’

‘এ টেইল অব টু সিটিস .’

নেহা আমার হাত থেকে বইটা নিয়ে দেখতে দেখতে আবার বলতে শুরু করলো,’তবে আমি শেক্সপিয়ারের নাটকগুলো বেশি পছন্দ করি। শেক্সপিয়রের নাটকগুলোর মধ্যে যেগুলো পড়েছি তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে
টুয়েলফথ নাইট, এজ ইউ লাইক ইট, দ্যা টেম্পেস্ট আর রোমিও জুলিয়েট ।’

‘বাব্বাহ্। এই বয়সেই এত্ত বই পড়ে ফেলেছ?’

নেহা সহাস্যে বলল,’সব ক্রেডিট কিন্তু ভাইয়ার । ভাইয়া’ই আমাকে বলে শুধু পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। সাহিত্য সম্পর্কে জানতে হবে। তাহলেই জ্ঞান সমৃদ্ধ হবে। আরো কত্ত যে লেকচার দেয়! তুমি যদি শুনতে….!’
এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share


‘কই আমাকে তো একবারও এরকম জ্ঞান সমৃদ্ধ করার লেকচার দেয় না। আমার সাথে শুধুই ঝগড়া করে। মাঝে মাঝে মনে হয় সে ঝগড়ার উপর পি.এইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেছে।’ আমি মনে মনে বললাম।

ভাবনার সুতো ছিন্ন হতেই দেখলাম নেহা বকবক করেই যাচ্ছে। নেহা বলছে, ‘ভাইয়ার তো বইয়ের বিশাল কালেকশন আছে। সেই সুবাদে আমার নিজেরও পড়া হয়ে যায় । তুমি বোধহয় ভাইয়ার স্টাডি রুমটা দেখনি। ভাইয়ার রুমেও ছোটখাটো কালেকশন আছে।’

‘তাহলে তো দেখতে হয়!’ আমি আগ্রহী সুরে বললাম।

‘ঠিক আছে । আমিই তাহলে ভাইয়াকে বলে দিব যাতে তোমাকে স্টাডিতে নিয়ে যায় ।’ নেহা উৎফুল্ল হয়ে বলল।

‘নাআআআ! নিশান ভাইকে বলতে হবে না।’ আমি ঘাবড়ে গিয়ে বললাম।

‘কেন, স্মৃতিপু?’ নেহা অবাক হয়ে জানতে চাইল।

‘এমনিই!’ আমি কিঞ্চিত হাসার চেষ্টা করলাম।

‘ওকে। বলব না।’

আমি মনে মনে বললাম যখন মি: চটাং পটাং থাকবে না । তখনি আমি চুপি চুপি গিয়ে তার বইয়ের কালেকশন দেখে আসব। মনে মনে ঠিক করালাম আজই যাব তার রুমে। অন্য কোনো একদিন যাব স্টাডিতে।

আমি মনে মনে ঠিক করলাম এখন থেকে আর নিশান ভাইকে ভাই বলে ডাকব না । নিশান বলেই ডাকব। এত্ত সম্মান দিতে পারব না। মাত্র চার বছরেরই তো বড়। চার বছরের বড় আর এমন কি! অবশ্য আমি এটাও জানি যে নিশান বলে সামনাসামনি ডাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বললে তো আমার গর্দান যাবে!

নিশানের বের হওয়ার অপেক্ষায় আছি। আজ কেনো যে এই নিশানটা এত দেরি করছে কে জানে! এখানে আসছি পর্যন্ত তার রুমটা পর্যন্ত দেখতে পারি নাই আমি। সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়। ভয়ের চোটে আমি তার রুমের আশেপাশেও যাই না। কিন্তু আজ যাবই। বই এর কথা শুনেছি। এবার কি আর নিজেকে আটকে রাখতে পারি।

একটু পর রুম থেকে গাড়ি স্টার্ট দেয়ার শব্দ শুনলাম। তাই আর দেরি না করেই নিশানের রুমের দিকে দিলাম ছুট। রুমে ঢুকে তো আমি চূড়ান্ত পর্যায়ের অবাক হয়ে গেলাম।

এত্ত সুন্দর করে সাজানো রুমটা। পুরো দেয়ালটা জুরে গ্রাম্য পাহাড়ি অঞ্চলের আর্ট করা। তাতে রয়েছে একটা বাঁশঝাড়, ঘরবাড়ি, নদী যা পাহাড় বেয়ে নিচে সমতলে পতিত হয়েছে। এক ঝাঁক পাখি উড়ে যাচ্ছে। দুজন পাহাড়ি এলাকার মানুষের ছবিও আঁকা রয়েছে। তবে তাদের মুখ দৃশ্যমান নয়। পিছনের দিক থেকে আঁকা । বড় বড় পাথর। একদম যেনো আমি আমার রাঙ্গামাটিকে খুঁজে পাচ্ছি এই ছবিটাতে। সত্যি হারিয়ে গেলাম ছবিটার মধ্যে । আমি দেয়ালে হাত দিয়ে স্পর্শ করছি। আমার মনে হচ্ছিল যেন আমার নিজ জেলাকে অনুভব করছি প্রতিটা স্পর্শে।

দেয়ালের দক্ষিণ অংশ জুরে একটা বড় সাইজের ছবি ঝোলানো আছে। ছবিটাতে একটা ছেলে একটা মেয়ের চুল টেনে দিচ্ছে। আমি খেয়াল করে দেখলাম মেয়েটা আমি নিজেই। আর ছেলেটা হলো নিশান ভাই ।
আমি খুব অবাক হলাম এই ছবিটা নিশান ভাই এতদিন সংরক্ষণ করে রেখে দিয়েছে! আমার সাথে সাথেই মনে পড়ে গেলো ছোটোবেলার সেই ঘটনার কথা।

ছোটোবেলায় নিশান ভাইয়া অতি দুষ্ট ছিল। এখনও কি কম! আর আমার সাথে যেন ছিল তার এক অঘোষিত শত্রুতা। মাঝে মাঝেই নিজে দোষ করে চাপিয়ে দিত আমার ঘাড়ে । কথায় আছে না ‘উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে’। তারপর বাবার কাছ থেকে শুনতে হতো বকার ঝুড়ি । কত বকাই না খেয়েছি বাবার কাছ থেকে অথচ দোষ করতো নিশানের বাচ্চা নিশান। আমাকে বকা খাওয়ানোর মধ্যে সে এক ধরনের মজা পেত। কারণ বকা খাওয়ানোর পর পরই আবার আমার সামনে এসে আমার চুল টেনে দিয়ে বলতো,’কি ! কেমন দিলাম রে? খুব মজা ছিলো।তাই না?’

আমার তখন ইচ্ছা করতো তার চুলগুলো ইচ্ছেমতো টেনে দিই । এলোমেলো করে দিই সবগুলো চুল। কারণ এই চুলগুলোই ছিল তার সব থেকে বড় দুর্বলতা । অতি চুল প্রীতি যাকে বলে! কিন্তু আফসোস! আমি সেটাও করতে পারতাম না। তার নাগালই পেতাম না। তাই মাঝে মাঝে রাহাত ভাইয়ার মাধ্যমে শোধ নিতাম। রাহাত ভাই ছিল আমার সেভিয়ার। রাহাত ভাই আমার মামাতো ভাই। আমাকে অনেক বেশি আদর করে। যখন এই নিশানের বাচ্চার উপর প্রচণ্ড পরিমাণ রাগ হতো তখন রাহাত ভাইয়ার কাছে গিয়ে নালিশ করতাম। রাহাত ভাই এসেই নিশানের চুলগুলো এলোমেলো করে দিতো। আমি তখন এক পৈশাচিক আনন্দ অনুভব করতাম!

এমনই একদিন আমি গিয়েছিলাম রাহাত ভাইকে নালিশ করতে। রাহাত ভাইয়ার হাতে ছিল ক্যামেরা । আর তিনি নিশানের চুলগুলো এলোমেলো করে দেবার পর সে আমার উপর প্রতিশোধ নেবার জন্য আমার চুল টেনে দিয়েছিল। আর রাহাত ভাই ওই সুযোগে ক্যামেরায় দিলেন ক্লিক।

এখনো খুব জীবন্ত মনে হয় সবগুলো স্মৃতি । সময়ের ব্যবধানে অনেকগুলো বছর স্মৃতির পাতা থেকে মুছে গিয়েছিল। মুছে গিয়েছিল তোমার নাম ও তুমি। এমনটাই ভাবনা ছিল আমার। অথচ আমি কতই না ভুল ছিলাম। এখনো জীবন্ত সমস্ত স্মৃতি । তুমিও জীবন্ত । কিন্তু আজও তুমি ওই ঘাড়ত্যাড়াই রয়ে গেলে ।

আমি আমাদের ছবিটা হাত দিয়ে স্পর্শ করতে করতে ভাবছি নিশান ভাইটা এমন কেন? আচ্ছা কী হয় একটু ভালো করে কথা বললে? খুব কী কষ্ট হয় এতে তোমার? ইগো হার্ট হয়? এত্ত ইগো কেন তোমার? তোমার বউ কিন্তু বিয়ের পর দিনই পালাবে এত ইগো দেখালে?

তারপর নিজের মাথায় নিজেই চাটা মেরে বললাম,’আরে ধুর! আমিও কি সব ভাবছি! বউয়ের সাথে কি আর ইগো দেখাবে!’

‘এখানে কি করছিস? আমার ছবির সামনে কি? জীবনে কি কোনোদিন ছবি দেখিস নাই?’

আমি নিশান ভাইয়ার কথা শুনে থতমত খেয়ে কোনোরকমে পিছন ফিরে দাঁড়াই । দেখি নিশান ভাই আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। তার বলা কথাগুলো নিয়ে চিন্তা করার সময় এখন নেই । আমার ভাবনাতে এখন একটাই চিন্তা যেভাবে হোক এর সামনে থেকে পালাতে হবে। আমি যেই না দৌঁড় দিব ভাবছিলাম অমনি নিশান ভাই আমার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করার মতো করে বলল,’ কি দেখছিলি এমন করে?’

আমার নিশ্বাস বন্ধ হবার জোগাড় তখন। এত্ত কাছে এসে কথা বলতে হয়! দূর থেকেও তো কথা বলা যায়, নাকি! আমি কোনোরকমে বললাম,’ছবি দেখছিলাম ।’

নিশান ভাই এবার আমার সামনে থেকে কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে বলল,’ফর ইওর কাইন্ড ইনফরমেশন, আই নো ভেরি ওয়েল হোয়াট ইট ইজ!’

‘আমি কখন বললাম যে আপনি জানেন না?’

‘পারমিশন না নিয়ে আমার ঘরে আসলি কেন?’ নিশান ভাই ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন করল।

আমি কপালে দু আঙ্গুল ঠেকিয়ে মনে করার ভঙ্গিতে বললাম,’পারমিশন! শব্দটা পরিচিত মনে হচ্ছে! কিন্তু একদমই মনে করতে পারছি না।’

তারপর নিশান ভাইয়ের কাছে গিয়ে বললাম,’এটা কি খাওয়া যায় এমন কিছু?’

নিশান ভাই আমার দিকে পূর্ণদৃষ্টি দিলো । দৃষ্টি দেখে মনে হলো পারলে আমাকে গিলে খায় ।আমি এক মুহূর্ত ও দাঁড়ালাম না। বেরিয়ে গেলাম ।তারপর আবার ফিরে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে বললাম,’ তোমার বই এর কালেকশন দেখতে এসেছিলাম । কিন্তু এসে তার থেকেও অনেক বেশি দামি কিছু দেখলাম।’

চলবে…ইন শা আল্লাহ্

এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share