গল্প: বিস্মৃতির অন্তরালে পর্ব – ০৫

0
892

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
গল্প: বিস্মৃতির অন্তরালে পর্ব – ০৫
লেখনীতে: ফাতিমা আক্তার অদ্রি

বাবা রাঙ্গামাটি চলে গেলেন পরদিন রাতে। বাসে করেই গেলেন। পৌঁছেই আমাকে ফোন দিয়েছেন। কিছুক্ষণ পর আযান দিল। আমি নামায পড়েই ছাদে চলে গেলাম। ভোরের নির্মল হাওয়াতে সত্যিই মন প্রাণ জুড়িয়ে যায় । আমি দুই হাত প্রসারিত করে লম্বা শ্বাস নিচ্ছিলাম। মাথায় টোকা পড়াতে আমি দু’হাত নিচে নামিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে ফিরে দেখি নিশান ভাই দাঁড়িয়ে আছে। সে বলল,’এটা কি কোনো ব্যায়াম হলো? ব্যায়াম করার এত শখ তোর আমাকে বলবি না?’

‘এটা ব্যায়াম তোমাকে কে বলল? আর আমার ব্যায়াম করার শখ হলে আমি সেটা তোমাকে কেন জানাব?’

‘তা জানাবি কেনো? আর এখন কি তোর লেজ একটাই? আগে তো সবসময় দুই লেজ নিয়ে ঘুরতি সারাক্ষণ।’ নিশান ভাই আমার চুলের দিকে ইঙ্গিত করে বলল।

আমি আমার চুলের বেণী করা দেখে বুঝতে পারছি সে আমাকে ক্ষেপাতে চাইছে। তাই আমি আমার নিজের রাগ কোনো রকম নিয়ন্ত্রণ করে বললাম,’আমার এখন একটা লেজ’ই ভালো লাগে । গরুর ও তো একটাই লেজ। আমার একটা হলে তো তোমার কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়!’

‘তা তোমার কি দুটো লেজ? মানে তুমি কি দুটো লেজ রাখতে পছন্দ করো?’

‘আমার এত্ত সুন্দর চুলকে তুই গরুর লেজের সাথে তুলনা করছিস! তোর এত বড় স্পর্ধা!’ নিশান ভাই তেঁতে গিয়ে বলল।

‘এটাকে কি স্পর্ধা বলে ? আমি তো শুধু জানতে চাইলাম।’ আমি অসহায় মুখ করে বললাম।

‘তাছাড়া তোমার চুলকেই কবে গরুর লেজের সাথে তুলনা করলাম? এত ছোট ছোট চুলকে কি আমি লেজ বলতে পারি?’ আমি ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন করলাম ।

‘তুই খুব বেয়াদব হয়ে গেছিস।’

‘সত্যিই কি তাই?’

‘আবার বড়দের মুখে মুখে তর্ক!’

‘তুমি কিন্তু আমার থেকে অতটাও বড় না।’ হাতের চারটা আঙ্গুল দেখিয়ে বললাম,’মাত্র চার বছরের বড়। এই রকম চারটা বছরকে আমি তো গণাতেই ধরি না।’

নিশান ভাই আমার কথা শুনে বিকট এক হুংকার দিয়ে বলল, ‘কানের নিচে দেব একটা! যা ভাগ এখান থেকে। তোর গণনার কেউ ধার ধারে না। জেনে রাখ সেটা।’

আমি এবার সহজে দমবার পাত্রী নই। তাই বললাম,’ তা তুমি দিতেই পারো। আমি কিছুই মনে করব না। চারটা বছর আগে যে ধরায় অবতীর্ণ হয়েছ তার তো কিছু এডভানটেজ তোমার পাওয়া দরকার। তাই না?’

আমি ছাদে আর দাঁড়ালাম না। দ্রুত বেগে নেমে আসলাম। মনে হলো দম বন্ধ করেই নিশান ভাইকে কথাগুলো বলে ফেলেছি । রুমে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিলাম। আমি এবার জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছি। মনে হলো অনেক বড় কোনো যুদ্ধ করে এসেছি। তারপরও শান্তি । যুদ্ধে তো শেষমেশ আমিই জিতলাম।

_____________________

রাতে খাবার খেতে বসলাম। আমাকে উদ্দেশ্য করে ফুফু বললেন, ‘স্মৃতি তোকে তো একটা কথা বলা হয়নি।’

আমি ফুফুর দিকে মুখ তুলে তাকালাম । ফুফু আবার বলা শুরু করলেন, ‘তোর সাথে তো ইমরানের পরিচয় হয়েছে। আজ দুপুরের দিকে ইমরান আর ইমরানের আম্মু এসেছিল। তুই তো ঘুমাচ্ছিলি। তাই আর তোকে ডাকিনি। তুই ইমরানের সাথে কোচিং যেতে পারবি। আমিও নিশ্চিন্তে থাকতে পারব। ছেলেটাও খুব ভালো। চাইলে তোরা দুজন মিলে গ্রুপ স্টাডিও করতে পারিস ।’

আমি ফুফুর কথায় মাথা নাড়লাম। ফুফু আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। রাতের খাবার শেষে আমি নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। একটু পর দরজায় দরাম দরাম শব্দ শুনে আমি উঠে দরজা খুলে দেখি নেহা দাঁড়িয়ে । আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম,’কী হয়েছে ? এভাবে দরজা ধাক্কা দিচ্ছিস কেন?’

নেহা বলল,’স্মৃতিপু, চলো না আজ ছাদে যাই। আজ কিন্তু আকাশে তারার মেলা। তোমার খুব ভালো লাগবে।’

‘আমার খুব ঘুম পাচ্ছে রে। তুই যা । আমি পারব না যেতে।’ আমি হামি তুলতে তুলতে বললাম।

নেহা আমার ডান হাত ধরে কপট রাগ দেখিয়ে বলল, ‘স্মৃতিপু ,চল না। আমি কিন্তু খুব রাগ করব।’

আমার চোখ ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে । অগত্যা যেতে হলো। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতেই গীটারের টুং টাং শব্দ কানে আসছিল। তৎক্ষনাত আমি সচকিত হয়ে গেলাম। চোখ থেকে ঘুম পালাল। আমি নেহার হাত ছেড়ে দিয়ে বললাম,’ওখানে রামগরুড়ের ছানাটা আছে ।আমি যাব না।’

‘রামগরুড়ের ছানা আবার কে?’

আমি তৎক্ষনাত জিভে কামড় দিয়ে বসলাম। মনে মনে বললাম, ‘এই যাহ! নেহার সামনেই বলে ফেললাম। এখন যে কী হবে!’

তারপরও আমি কথা কাটিয়ে বললাম, ‘ বিড়ালের কথা বলছি। আমার বিড়াল একদম ভালো লাগে না। তাই বিড়ালের এই নামকরণ করেছি।’

‘ওহ্!তাই বলো। আমি ভাবলাম আবার নিশান ভাইকেই না এই নাম দিয়েছ। তবে জান স্মৃতিপু , ভাইয়া এটা শুনলে তোমাকে একেবারে খতম করে দিবে।’ নেহা তার ডান হাতটা গলার কাছে নিয়ে দেখাল।

আমি মনে মনে বললাম, ‘হুহ! আমাকে খতম করবে ওই নিশান! দেখি তার সাহস কত! আজ তাকে সামনাসামনিই বলব রামগরুড়ের ছানা।’

ছাদে উঠে আমি একেবারেই থ মেরে গেলাম। মনে হলো কারো বার্থ ডে আয়োজন করা হয়েছে। আমি মনে মনে ভাবলাম আজ কি রামগরুড়ের ছানার জন্মদিন না কি কুম্ভকর্ণের জন্মদিন?

আমি নিজের কৌতূহল দমিয়ে রাখতে পারলাম না। তাই শেষমেশ জিজ্ঞেস করে বসলাম,’ আজ কি কারো বার্থ ডে?’

আমার কথা মুখ থেকে বের হতে দেরি নেই সাথে সাথে জনাব চটা পটাং তেড়ে আসলো আমার দিকে। বলল,’হু, জন্মদিন। তাতে তোর কি সমস্যা?’

আমি বললাম,’বাহ্ রে! আমার কেনো সমস্যা হতে যাবে?’

তারপর নিশান ভাই আমার কাছ থেকে খানিক পিছনে গিয়ে নেহার পাশে দাঁড়িয়ে বলল,’আচ্ছা তোর যখন এতই জানতে ইচ্ছে করছে তখন বলেই ফেলি। কি বলিস নেহা?’

‘হ্যাঁ, ভাইয়া বলে দাও।’ নেহা বলল।
এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share


‘আমাদের বাসায় একটা বিড়ালের বাচ্চা দেখেছিস না? আজ ওর জন্মদিন। যে সব সময় ম্যাঁও ম্যাঁও করে আমার কান ঝালাপালা করে দেই তার। চিনতে পারছিস?’

আমি অবাক হয়ে বললাম,’আপনারা বিড়ালের জন্মদিনও পালন করেন?’

‘হু ,করি! আমরা কি আর তোর মতো কিপ্টে রানি নাকি?’ নিশান ভাই তার পরনের শার্টের কলারটা একটু উঁচিয়ে বলল।

আমি এবার অবাকের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে জানতে চাইলাম,’আমি কিপ্টে রানি! কীভাবে?’

‘আমার মনে হয় কি তুই ছোটোবেলায় হরলিকস্ খাস নাই। বাদাম খাস নাই। তাই তোর ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বড্ড বেশি।’

‘কেমনে খাব আমি? তুমিই তো সব কেড়ে খেয়ে নিতে। মনে নেই?’ আমি সরু চোখে নিশান ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম।

নেহা আমাদের দুজনের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে মিটি মিটি হাসছে। ওর হাসি দেখে আমার খুব রাগ লাগছিল। আমাকে কেন জোর করে আনতে গেলো সে! এখন দেখো তার মহারাজা ভাই আমাকে যাচ্ছেতাই বলে যাচ্ছে ! আমি রাগে ছাদ থেকে নেমে যাব এমন মুহূর্তে ডং ডং করে শব্দ করে বেজে উঠল। ঘড়ির কাঁটা জানান দিচ্ছে রাত বারোটা বাজার। তখনই পিছন থেকে নিশান ভাই আর নেহার যৌথ কণ্ঠে শুনতে পেলাম ,

হ্যাপি বার্থডে টু ইউ..
হ্যাপি বার্থডে টু স্মৃতি …
হ্যাপি বার্থডে টু ইউ ।

নিশান ভাই তৎক্ষনাত আমার সামনে এসে দাঁড়াল । তারপর একদম কাছে এসে আমার নাকটা ধরে বলল,’হ্যাপি বার্থডে বিড়ালের বাচ্চা।’

আমি মুহূর্তেই থমকে গেলাম। কি! আমার বার্থডে! আমার একটুও মনে ছিলো না। আমি তৎক্ষনাত পিছনে ঘুরে দাঁড়াই । নেহা এসে আমার হাত ধরে যেখানে কেক রাখা হয়েছে সেখানে নিয়ে গেলো । আমি প্রচণ্ড অবাক হয়ে গেলাম। এরা দুই ভাই বোন মিলে আমার জন্মদিন পালন করার জন্য এত আয়োজন করেছে! আমার চোখের কোণে জল জমে টলটল করছে। আমার থমকানো অবস্থা দেখে নিশান ভাই আমাকে ধমক দিয়ে বলল,’ তুই কি কান্না করে পুকুর বানাবি? সেই পুকুরে আমি গোসল করব ভাবছিস? যদি ভেবে থাকিস তবে খুব ভুল করছিস। আমি নোনা জলে গোসল করা একদম পছন্দ করি না।’

তারপর নেহার দিকে তাকিয়ে বলল,’নেহা তুই কি পছন্দ করিস?’

নেহাও সাথে সাথে মাথা দুলিয়ে বলল,’একদম না। নোনা জলেও কেউ গোসল করতে পছন্দ করে নাকি আবার!’

আমি ওদের কথা শুনে এবার হেসে ফেললাম । কেক কেটে প্রথমে নেহাকে খাইয়ে দিলাম। সেও আমাকে খাইয়ে দিল। এবার রামগরুড়ের ছানার পালা! তাকে কেক খাওয়াতে যাচ্ছি তখন সে বলল,’ কী রে কিপ্টা রানি! কেকের টুকরা বড় থেকে নে।’

আমি বড় থেকে একটা টুকরা কেটে নিলাম। তারপর তাকে খাওয়াতে গেলে সে আমার আঙ্গুলটাতেই কামড় বসিয়ে দিলো। ভ্যাম্পায়ার সমতুল্য দাঁতের কামড়। আমি উফ্ বলে চিৎকার দিলে নেহা জানতে চায়ল কী হয়েছে। তখন জনাব ভ্যাম্পায়ার বলল,’ আরেহ্ বলিস না। কিপ্টা রানি আমার খাওয়া দেখে সহ্য করতে পারছে না।’

আমি বড় বড় চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম । কেমন অবলীলায় মিথ্যা বলে যাচ্ছে রামগরুড়ের ছানাটা! এরই মধ্যে সে আমার হাত থেকে কেকটা নিয়ে আমার পুরো মুখে, চুলে মেখে দিল। তারপর অবশিষ্টটুকু আমার মুখে পুরে দিলো।

তারপর আমার কানের কাছে তার মুখটা এনে ফিসফিসিয়ে বলল,’ কী! পছন্দ হয়েছে আমাদের বিড়াল ছানাটার বার্থ ডে?’ এটা বলেই সে আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে চলে গেল।

আমার তখন রাগে মাথা দপদপ করে জ্বলছে। এই রাতের বেলা আমাকে গোসল করতে হবে। কেন? কেন? কেন এমন করে সে আমার সাথে? আমি কি ক্ষতি করছি তার? এমন নিষ্ঠুর কেন সে? একটু সহানুভূতি কেন দেখায় না ? কেন ? কেন?

তখন আমার সমস্ত চিন্তাজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে একটা মাত্র গান। সেই গানটা হলো,

মানুষ মানুষের জন্য,
জীবন জীবনের জন্য ।
একটু সহানুভূতি কি
মানুষ পেতে পারে না?
ও বন্ধু !

আমি ঠিক করলাম আজ সারারাত এই গানটাই শুনব। আর কিছুই শুনব না। শুধুই এই গান!

চলবে…ইন শা আল্লাহ্

আগের পর্বের লিংক:

https://www.facebook.com/groups/golpopoka/permalink/944812309282822/