শেষ নিঃশ্বাস পর্বঃ২

0
768

গল্পঃশেষ নিঃশ্বাস পর্বঃ২

আবির আমাকে ডাকলো….
–নীলা……
আমি সাথে সাথে থেমে গেলাম..কষ্ট আর একটু আশার খুশি মিশ্রিত অনুভুতি কাজ করছিলো মনের ভেতর..ঠোঁট মুখ কাপছিলো ভীষণ..
আমি পেছন ঘুরবো ঘুরবো করতেই আবির আস্তে গলায় বলে উঠলো–
“তুমি একা যেতে পারবে?নাকি এগিয়ে দিবো…??”

কথাটা শুনে আমার মনে অভিমানের ঝর বয়ে গেলো মুহুর্তেই..আবির আমাকে ঠেকিয়ে আমার যন্ত্রণা টা বুঝতে চায়না,আমার জীবনের কালো সময়টা শুনতে চায়না..
আমি তীব্র কষ্টের মাঝেও ঠোঁটের মাঝে একেবারে ছোট করে হাসি দিলাম..
কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠলাম–
“নাহ…লাগবে না..আমি একাই…আমি একাই যেতে পারবো….”

বলেই আমি নিজেকে শক্ত করে, বোধ হয় এক নিঃশ্বাসে আবিরকে পেছনে ফেলে চলে এলাম..
খুব ইচ্ছে করছিলো পেছন ফিরে একবার আবিরের মুখটা দেখতে..কিন্তু ওকে দেখলে নিজেকে সামলাতে পারবো না,এই ভয়ে নিজেকে খুব করে আটকে রেখেছিলাম..কোন রকমে একটা রিকশা ডেকে আমি আমাদের বাসার সামনে এসে পৌছোলাম..যতটুকু সময় আমি রিকশাতে ছিল,
চারপাশে কোন কিছুই আমার চোখে বাধেনি..
আমি যেন দুনিয়াতে থেকেও ছিলাম না….

আস্তে আস্তে বাসার ভেতর ঢুকে পড়লাম..
মা দরজা খুলতে না খুলতেই দেখি,মায়ের মুখে উচ্ছ্বাস মাখা হাসি..খুব আলতো করে আমার গায়ে হাত দিয়ে বললো–
“কই ছিলি মা,তুই এতোক্ষণ???”

আমি বললাম–
–ঘরে ঢুকে বলি,মা???
মা আমার গায়ের ওড়নাটা খুব যত্ন করে আমার মাথায় তুলে দিয়ে,আস্তে করে আমার কানের কাছে এসে বললো–
–আবিরের মা আর বাবা এসেছে আমাদের বাসায় কিছুক্ষণ আগে..আস্তে আস্তে ঘরে আয় মা…..

 

আমি মায়ের কথা শুনে চমকে উঠলাম..
বিশ্বাস করতে পারছিলাম না..কোন কথা না বলে চুপ করেই ঘরের ভেতর ঢুকে হালকা উঁকি দিয়ে দেখি
সত্যিই আবিরের বাবা মা আমাদের ড্রয়িং রুমে বসে হাসি মুখে গল্প করছেন আমার বাবার সাথে..
আমি খুব দ্রুত পায়ে হেঁটে আমার ঘরে চলে গেলাম..

কেন এসেছেন ওনারা..
আবির কি জানে??আমাদের মাঝে হয়তো আর কিছু নেই, ওনারা তো জানেন না..আমি কি করবো..???হাজার প্রশ্ন আসলো মনের ভেতর মুহুর্তেই..সবার ভুল হচ্ছে..
আমার জীবনে আসা কালো রাত,শুধু আমি আর আবিরই জানি..একথা যে কাউকে বলার নয়..
আমার কি করা উচিত ভাবতে ভাবতে আমি আবিরকে ফোন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম..
অনেক সংকোচ বোধ হচ্ছিলো,তবুও ফোন দিতেই হবে আমাকে…

ফোন দিতে না দিতেই দেখি আবিরের ফোন বন্ধ…
আমার ভীষণ কষ্ট হলো..মনে হলো যেন,তীর বিঁধেছে ভেতরটাতে..।কয়েকবার ফোন দিলাম..বারবার ফোন বন্ধই আসলো…আবির আমার সাথে আর কথা বলতে চায়না হয়তো,সেই কারণেই ফোন বন্ধ করে রেখেছে…
আছড়ে পড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে ভীষণ..
আমি কোন অন্যায় করিনি,আমার সাথে অন্যায় হয়েছে..অথচ সব শাস্তি আমিই পাচ্ছি..আমার ভালোবাসার মানুষ টাও আমাকে ভুল বুঝে……

হঠাৎ দরজায় মায়ের কড়া নড়লো…
মা খুশিতে আমার কষ্টভরা মুখটা দেখতে পারলো না..তড়িঘড়ি করে এসে বললো–
–তোর বেগুণি রঙের শাড়িটা পরে নে মা জলদি..আমি গহনা বের করে এনে দিচ্ছি..
আবিরের বাবা তোকে ডাকছে…..

যে সুখের দিনটা একদিন জীবনে আসবে বলে এতোটা দিন ধৈর্য্য ধরে কষ্ট করে থাকলাম..
সেই দিন টা আমার জীবনের সব টুকু সুখ শেষ করে আসলো..কেঁদে উঠলাম ডুকরে..মা সাথে সাথে পরম মমতায় আমাকে জড়িয়ে ধরলো…কষ্ট টা যদি মাকে বলে দিতে পারতাম…

মা আমাকে ছেড়ে জলদি শাড়ি পরে নিতে বলে গহনা আনতে গেলো..আমি আবিরকে আবারো ফোন দিলাম..ফোন বন্ধ..আমার সবাইকে বলে দিতে ইচ্ছে করছে,আমাদের মাঝে আর কিছু নেই..
কিন্তু সেটা আবিরই বলুক..শেষ ওর কাছ থেকে হয়েছে..নিথর দেহের মত করে বিছানা থেকে উঠে,শাড়ি বের করে কোনরকম শাড়িটা পরে নিলাম..মা এসে গহনা দিয়ে গেলো..

আমি কেন জানি পরতে পারলাম না..
অগোছালোভাবেই একটু গোছালো দেখানোর চেষ্টা করে অনুভুতিহীনের মতন আস্তে আস্তে গেলাম ড্রয়িং রুমে…গিয়ে সালাম দিলাম সবাইকে…
আমাকে দেখে আমার মা ইশারা করলো..
বুঝতে পারলাম,গহনার জন্য…
আমি চোখ ফিরিয়ে নিলাম..যার সব শেষ হয়ে গিয়েছে,তার আবার গহনা..আবির ওর বাবা মাকে বলার সময় পায়নি,তাই জন্য এগুলো সব মিথ্যে…

আমাকে দেখেই আবিরের মা এসে জড়িয়ে ধরলো..
আমি মুখে হাসি রাখলাম,পুতুলের মতন..
উনি বললেন–
“তোমার চোখ-মুখ এমন দেখাচ্ছে কেন,মা??শরীর খারাপ নাকি??নাহলে এতো সুন্দর বউ আমাদের..”

আমি কষ্টের একটু হাসি দিলাম..
আমার মা উত্তর দিলেন-
“হুম..আপা..মেয়েটা গত একমাস যাবৎ একটু অসুস্থ মতই..চিন্তা করার অবশ্য কিছু নেই..”

আবিরের মা,আমাকে মায়া ভরে তাকিয়ে আবিরের বাবার দিকে এগিয়ে নিয়ে গেলো..
আমি উনার কাছে যেতেই উনি আমার হাত ধরলেন.
একটু মনোযোগ দিয়ে দেখে বললেন,
“ঘরের লক্ষী হবে তো,মা আমাদের..?”

আমার চোখে পানি চলে এলো..দম আটকে আসছিলো কান্না..ঠিক সেই মুহুর্তে আবিরের ফোন এলো ওর মায়ের কাছে..আমার বুকের ভেতর ধক করে উঠলো..সবাই উনার দিকে খেয়াল করলো..
উনি শক খাওয়ার মতন আওয়াজ করে
উঠে দাঁড়ালেন.উনার চোখ মুখ শক্ত দেখাচ্ছিলো।।

চলবে….

গল্পঃশেষ নিঃশ্বাস (২)
লেখাঃআফসানা জামান তুলতুলি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here