কৃষ্ণকলি পর্ব- ০৪

0
1973

কৃষ্ণকলি
পর্ব- ০৪
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

জি, আপনার বোধ হয় আর কোনো কষ্ট করতে হবে না। সুইটি এখন থেকে আমার সাথে’ই যেতে পারবে। বাঁধনের দিকে তাকিয়ে কথা’টা বলছিলাম আমি।
– সেই জন্য’ই তো বললাম ভালো’ই হলো।
মৃদু হেসে বাঁধনের জবাব।
“আচ্ছা, আসি আন্টি। আসসালামু আলাইকুম।”
বাঁধনের মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছিলাম। একমিনিট দাঁড়ান, আমিও অফিসে যাব। কথাটা বলে আমায় থামালো বাঁধন। বাঁধন ওর মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল।
বাঁধনের পাশের সিটে চুপচাপ বসে আছি এই আমি। গাড়ি চলছে। কিন্তু গাড়ি মুখে’ই কোনো কথা নেই। দুজনে’ই নিরব।
-তারপর???
কলেজ থেকে ফিরবেন কখন? নিরবতা ভেঙে বাঁধনের প্রশ্ন।
– ফিরব কখন সেটা তো জানি না। তবে ৩টা ২০পর্যন্ত কলেজ টাইম। সামনের দিকে তাকিয়ে বাঁধনের প্রশ্নের জবাব দিলাম আমি। বাঁধন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল-
” তাহলে তো মনে হয় আমার সাথে ফিরতে পারবেন। আমিও অফিস থেকে চলে আসব ৪টার দিকে। ততক্ষণে আপনার নিশ্চয় অফিশিয়াল কাজ সব শেষ হয়ে যাবে???
-হুম, শেষ হয়ে যাবে। প্রতিউত্তরে আমার জবাব।

তারপর বাকি রাস্তা আর কোনো কথায় হয়নি। বাঁধন আমাকে কোনো প্রশ্ন করেনি আর আমিও কোনো কথা বলার সুযোগ পায়নি।

গাড়ি থেকে নামার সময়_
” এই! সাবধানে, সাবধানে!!!
গাড়ি আসছে….”
বাঁধনের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট হাসি দিয়ে বললাম-
আসি তাহলে….
বাঁধন আমার দিকে তাকিয়ে বলল-
” অপেক্ষা করব ৪টার সময় এখানে।”

বাঁধনের থেকে বিদায় নিয়ে কলেজ গেইট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলাম।
আমার প্রথম ক্লাস ইন্টার প্রথম বর্ষের ছাত্রীদের ফিজিক্স সকাল ১০টায়, দ্বিতীয় ক্লাস ২য় বর্ষের ছাত্রীদের ফিজিক্স দুপুর ১২টা ৪০মিনিটে। ১টা ২০মিনিটে আমার ক্লাস শেষ। তারপর আমার পুরো অবসর। অফিসিয়াল কাজ সেরেও ২টা কিংবা আড়াইটার ভিতর কলেজ থেকে বের হওয়া যাবে, আর ছাত্রীদের প্রাইভেট কিংবা কোচিং করালে তাহলে সেটা অন্য কথা। সেদিন ক্লাস+অফিসিয়াললি কাজ সেরেও দেখলাম ঘড়িতে মাত্র ২টা বেজে ২০মিনিট।

অন্য কোনো কাজ না থাকায় বের হয়ে গেলাম কলেজ থেকে। কলেজ গেইটে গিয়ে অটোতে উঠব কি না সেই দ্বিধাদ্বন্ধে পরে গেলাম। বাঁধন তো বলেছিল ৪টায় বাসায় ফিরবে, ততক্ষণ কি আমি অপেক্ষা করব?
মাত্র তো আড়াইটা বাজে।
না, থাক।
আমি বরং বাসায় চলে যায়।
এই বলে বাসায় চলে যাচ্ছিলাম।পিছন থেকে একটা গাড়ি এসে আমার সামনে থামল। গাড়ির কাছাকাছি যেতে’ই দেখলাম বাঁধন বসে।।
আপনি? এ সময়?
আপনার না ৪টার আসার কথা? অবাক হয়ে বাঁধনকে প্রশ্ন করলাম।
~ আমারও তো একই প্রশ্ন মিস কৃষ্ণকলি!
আপনি এ সময় এখানে???

বাঁধনের প্রশ্নোত্তরে বললাম,
আমার দুইটা ক্লাস। সেটা ১টা ২০পর্যন্ত’ই। অফিসিয়াল কাজও তেমন ছিল না। তাই টিফিন করে সোজা চলে আসলাম।

আমার অফিসে এখন লাঞ্চটাইম চলে। অসুস্থ্যতার অজুহাত দেখিয়ে বস মামার থেকে ছুটি নিয়ে চলে আসলাম। হেসে হেসে বাঁধনের জবাব।
– বস মামা? সেটা আবার কেমন ডাক? আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলাম বাঁধনকে।

বস মামা মানে বস আমার মামা হয়। আপন মামা। বাবার অনুপস্থিতিতে ঐ মামায় বাবার কোম্পানির দেখাশুনার দায়িত্বে আছেন।
– আংকেল? আংকেল কোথায়??? বাঁধনের দিকে তাকিয়ে বাঁধনকে প্রশ্নটা করলাম।

বাঁধন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল__
বাবা?!!!
বাবা হারিয়ে গেছে।
আমাদের রেখে দুর অজানায় পালিয়ে গেছে।
বাঁধনের কথা শুনে হচ্ছিল আমার ভিতরটা শেষ হয়ে যাচ্ছে, ভেঙে চূরমার হয়ে যাচ্ছে। কোনো কথা না বলে বাঁধনের পাশের সিটে গিয়ে বসলাম, ছোট্ট করে বললাম “স্যরি”।
বাঁধন মনে হয় আমার এই স্যরি’টা আশা করে নি। তাই তো আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে বলল-
” Sorry?!!! But Why?”
আমি জানতাম না আংকেল নেই। জানলে এভাবে আপনাকে কষ্ট’টা মনে করিয়ে দিতাম না। আমি আবারও বলছি স্যরি…..
আর আল্লাহ ওনাকে শান্তিতে রাখুক সেই দোয়ায় করি। ভেজা গলায় কথাগুলো বললাম।
এদিকে বাঁধনের অবাক হওয়ার মাত্রা’টা যেন বেড়ে’ই চলছে উত্তরোত্তর। বাঁধন অবাক হওয়ার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেল। আর তাই তো আমার দিকে তাকিয়ে অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করল-
” নেই মানে? What do you mean?”
চোখের জলটুকু মুছলাম। করুণ চোখে বাঁধনের দিকে তাকালাম। তারপর_
” আমি সত্যি’ই দুঃখিত। আমি জানতাম না আংকেল আর এ পৃথিবীতে নেই। আর যখন জানতে পারলাম তখন মনে হলো আংকেলের মৃত্যুর কথা মনে করিয়ে দিয়ে আমি আপনাকে অনেকটা কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। এই জন্য I am sorry….”
আচমকা বাঁধন stopped, stopped বলে চেঁচিয়ে উঠল। আমি ভয়ে কেঁপে উঠলাম। কিন্তু এভাবে চেঁচানোর মানে’টা বুঝতে পারলাম না। কিছুক্ষণ পর বলল, আমার বাবা হারিয়ে গেছে দুর অজানায়,তার মানে এই নয় আমার বাবা আর বেঁচে নেই। আমার বাবা বেঁচে আছে। ওনাকে বেঁচে থাকতে’ই হবে। আমাদের ভালোবাসার টানে ওনাকে একদিন ফিরে আসতেই হবে। তা পৃথিবীর যে প্রান্তে’ই হোক না কেন। এটুকু বলে বাঁধন চুপ হয়ে গেল। আমিও কোনো কথা বাড়ালাম না। তাই আমিও চুপ করে আছি। কিন্তু কৌতূহলী মনকে কিছুতেই শান্তনা দিতে পারছি না। পারছিলাম না একটা হিসেব মিলাতে। হিসেবটা মিলানোর জন্য আমার বাঁধনের হেল্প দরকার। কিন্তু এই মুহূর্তে ওকে এ সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস না করাই ভালো। আর তাই চুপ করে আছি।

মিনিট দশেক এভাবে একই স্থানে গাড়ির ভেতর ২জন চুপ করে বসে ছিলাম। নিরবতা ভাঙে বাঁধন। সামনের দিকে তাকিয়েই বলতে থাকে_
” বাবা ছিলেন ভিষন ছটফটে এবং দুরন্ত স্বভাবের। সারাক্ষণ কাঁধে গিটার নিয়ে ঘুরে বেড়ানো’ই ছিল ওনার স্বভাব। দুরন্ত এবং চঞ্চল বাবা ছিলেন স্বাধীনচেতা আর মুক্তমননের অধিকারী। কোনো ধরাবাধা নিয়ম ওনি পছন্দ করতেন না। আর তাইতো লেখাপড়া শেষ করে দাদার ব্যবসায়ে যোগ না দিয়ে একটা এফএমে আর.জে হিসেবে জয়েন করলেন। সেই রেডিওর পোগ্রামের মাধ্যমে’ই আমার বাবা অসংখ্য দুঃখী মানুষের দুঃখ দুর করে দিয়েছেন। অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে আমার বাবা হয়ে গেলেন সকলের প্রিয় একজন ব্যক্তিত্ব। দিনে কাঁধে গিটার নিয়ে বন্ধুদের সাথে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ানো আর রাত্রে রেডিওতে মানুষের লাইফ সাপোর্ট দেওয়া। এটুকুই ছিল বাবার কাজ। বাবার জীবন যেন এটুকুতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু না!!!
বাবার জীবন এটুকুতেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
বাবার জীবনে আরো একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। সেটা ছিল ‘সংসার’। কিন্তু বাবার হাবভাব দেখে মনে হতো সংসারের প্রতি যেন ওনার কোনো দায়িত্ব’ই নেই। বাবা মাকে একদম’ই সময় দিত না। দিত না বললে ভুল হবে, আসলে বাবার সময় হতো না। মা সব দেখেও চুপ করে ছিল। ভাবত পরে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সুইটি জন্ম নেওয়ার পরেও যখন বাবার চালচলনে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না, তখন আমার মা মুখ খুলে। বাবাকে এই নিয়ে কথা বলে। দাদাও বাবাকে বকাঝকা করত। মায়ের বকবকানি, দাদার বকাঝকা আমার বাবার ব্যক্তিত্বে বোধ হয় আঘাত হানে। তাই তো একদিন ভোরে ব্যাগপত্র গুছিয়ে বাবা বাসা থেকে চলে যায়। বাবা চলে যান বলে গেছেন। কিন্তু কোথায় চলে গেছে সেটা বলে যান’নি। আমার মা আজও বিশ্বাস করে বাবা আসবে। ওনাকে আসতে’ই হবে।

চলবে…..

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে