কনে বদল পার্ট – ৭

0
1101

কনে বদল
পার্ট – ৭
# Taslima Munni

একটা মানুষের চেহারা তার ভেতরের সব সৌন্দর্যকে ম্লান করে দিতে পারে না।
সুন্দরকে চিনতে হয়,জানতে হয়!!
শিখার অবর্তমানে মাহির এটা ভালো ভাবেই উপলব্ধি করতে পারছে।

কিছু উপলব্ধি বড্ড অসময়ে হয়!!
মাহির উপলব্ধি করতে পারছে সে শিখায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
মনের দ্বিধা-দ্বন্ধে এতো দিন মাহির ভেতরে ভেতরে জ্বলে যাচ্ছিলো।
আর কয়েকটা দিন তারপর মাহির ও ফিরে যাবে।

মাহিরের সব কাজ শেষ করে ফিরে আসে।
শিখা মাহিরকে দেখে খুব খুশি হলো।
কিন্তু শিখার অবস্থা দেএ মাহির কষ্ট পেলো।
– কেমন আছো, শিখা?
– আপনি এসেছেন?
– হা।আমি চলে এসেছি। এখন কেমন আছো তুমি?
– আমি ভালো আছি।
শিখা উঠে বসার চেষ্টা করে।
– এই, উঠতে হবে না। শুয়ে থাকো তুমি।
– আমি ঠিক আছি।উঠতে পারবো।
– জানি উঠতে পারবে, কিন্তু উঠার প্রয়োজন নেই।।
মাহির জানে শিখা নিজে বিছানা থেকে উঠতে পারে না, কিন্তু ওকে দেখে উঠার চেষ্টা করছে।
– কিছু খেয়েছো?
– হুম।
এমন সময় ইভা রুমে প্রবেশ করে।
– মাহির,কথা পরে হবে। তুমি আগে ফ্রেশ হয়ে নাও।মা খাবার রেডি করছেন।
মাহির ফ্রেশ হবার জন্য চলে গেলো।

ইভা বিছানার কাছে গিয়ে শিখাকে তুলে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিয়ে এলোমেলো চুল বেঁধে দিলো।
তারপর ঔষধ খাওয়াতে চায়।
– আর ভালো লাগে না। আর ঔষধ দিও না ভাবি।
– কোনো কথা না, চুপচাপ খেয়ে নাও।
– এতো গুলো খেতে কষ্ট হয়।আমি খাবো না।
– দেখো বাচ্চাদের মতো জেদ করে।
ঔষধ না খেলে হবে নাকি?

মাহির এসে দেখলো ইভা ঔষধ খাওয়াতে চেষ্টা করছে কিন্তু শিখা কিছুতেই খেতে চাচ্ছে না।
– ভাবি,আমার কাছে দাও।
মাহির ইভার কাছ থেকে ঔষধ নিয়ে নেয়।
– ঠিক আছে, তুমি খায়িয়ে দাও।আমি আসছি।
ইভা চলে গেলো।
– হা করো।
– খেতে পারবো না। কেন জোর করছেন?
– আমি বলেছি,তাই খেতে হবে।
শিখা আর কথা না বাড়িয়ে আস্তে আস্তে ঔষধ খেয়ে নিলো।

বাড়িতে আসার পরে মাহির যত সময় থাকে শিখার অনেক খেয়াল রাখে।
রাতে মাহির শিখার পাশে বসে আছে।
শিখা চোখ বন্ধ করে আছে। মাহির ভাবলো শিখা ঘুমে। তাই একটা বই নিয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে পড়ছিলো।
শিখা একটু মাহিরের দিকে ফিরে বললো
– আমার মা আর শশীকে একটা খবর দিবেন?
– ঘুমাওনি তুমি? আমি ভাবলাম ঘুমিয়ে পড়েছো।
– মাকে অনেক দেখতে ইচ্ছে করছে। কতদিন দেখিনা মার মুখ।
– আচ্ছা কালই বাবাকে বলবো। তুমি এখন ঘুমাও।
– হুমম। ঘুমাবো।

পরদিন সকালে মাহির সারোয়ার সাহেবকে বললো
– বাবা, শিখার মাকে এখন একটা খবর দেয়া দরকার।
– হা।উনাকে খবর দিয়েছি গতকাল।উনি আজকেই আসবেন।
– তাহলে তো ভালো ই হয়েছে।
– তুমি কি আজ কোথাও বের হবে?
– না বাবা , আজ কোথায় যাবো না।

শিখা অসুস্থ শুনে শিখার মা, শশী,শিখার মামা ছুটে আসেন।
বিয়ে নিয়ে যত কান্ড! তারপর উনারা কখনো এমুখো হতেন কিনা সন্দেহ!
কিন্তু এমন একটা খবর জানার পরে কোনো মা না এসে পারেন না।
– শিখা!
শিখার মা ওর কাছে এসে ওকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন!.
– আপু..
– মা.. শশী! তোমরা এসেছো!
– একি অবস্থা হয়েছে তোর!!
আমাকে কেউ একটা বার বললো না আমার মেয়েটার এই অবস্থা!!
মাগো তোর একি হাল হয়েছে!!
শিখার মা কাঁদতে কাঁদতে অস্থির হয়ে গেছেন।

আফরোজা বেগম আর ইভা উনাদের সান্ত্বনা দিচ্ছে। আফরোজা বেগমে উনাকে নিজের রুমে নিয়ে গেলেন আর ইভা শশীকে।
শিখার মা কেঁদেই চলছে।
আফরোজা বেগম শিখার মাকে বললেন
– আপা! শিখা যে পরিস্থিতিতে এই বাড়িতে এসেছিলো তাতে আমার পক্ষে মেনে নেয়া কঠিন ছিলো তবুও মেনে নিয়েছি।
শিখা আমার ছেলের বউ। ওকে এই অবস্থায় দেখে আমরা কেউ ভালো নেই।
আপনি তো সব শুনেছেন।এখন যদি ওর সামনে এভাবে কান্নাকাটি করেন, তবে মেয়েটার মনের জোর হারিয়ে ফেলবে।ওর সামনে আমরা কিছুই আলোচনা করি না।

– বোন!!… অনেক দয়া আপনাদের। এতো কিছুর পরেও মেয়েটাকে ঠাঁই দিয়েছেন। কিন্তু এই অবস্থায় মেয়েটাকে দেখে কিভাবে শান্ত থাকবো বলুন??
– জানি আপা।কিন্তু তবুও শিখার জন্য নিজেকে সামলে নিন।

শিখার মা ওর পাশে গিয়ে বসে মাথায় হাত রাখলো।
– মা…
– কেমন আছিস রে মা?
– তুমি আমার উপর রাগ করে আছো?
– না মা।রাগ করে থাকবো কেন? একটু রাগ করিনি।
– কত খারাপ ব্যবহার করেছি।
– তুই সুস্থ হয়ে উঠ।দেখবি সব ঠিক হয়ে গেছে।
– মা,…. আমাকে নিয়ে যাবে?
– হা মা। নিয়ে যাবো।তুই যাবিনা আমার সাথে?
শিখা কিছু সময় চুপ থেকে বললো
– আবার একদিন এসে আমাকে নিয়ে যেও।আজকে যাবো না তোমার সাথে। আরেকটু সুস্থ হয়ে যাই।তুমি এসে নিয়ে যেও।
-আচ্ছা মা।

সারোয়ার সাহেব, আফরোজা বেগম আর শিখার মা একসাথে বসে কথা বলছেন।
– ভাই, মেয়েটাকে আমি সাথে নিয়ে যেতে চাই।আপনারা আপত্তি করবেন না।
– ভাবি,বুঝতে পারছি।কিন্তু এই অবস্থায় ওকে নিয়ে গিয়ে আপনি কতটা কি করতে পারবেন জানি না।
আমার মনে হয় এখানে থাকাটাই ভালো হবে।
– শিখা এখন যেতে চাচ্ছে না, কিছু দিন পরে নাকি যাবে। আমি সপ্তাহ খানেক পরে নিয়ে যাবো।
– সে পরে দেখা যাবে।
আপনারা আজকে কোথাও যাচ্ছেন না।দুটো দিন থেকে যাবেন।
– ভাই, কিভাবে…
– হা আপা।দুটো দিন থেকে গেলে শিখার ভালো লাগবে। আপনি আর আপত্তি করবেন না।
সারোয়ার সাহেব আর আফরোজা বেগমের অনুরোধে শিখার মা দুদিন থেকে গেলেন শিখার কাছে।
উনার তো ইচ্ছে করে সারাক্ষণ মেয়ের পাশে থাকতে। কিন্তু মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে এভাবে থাকা! তার উপর বিয়ের বিষয়টা উনার ভালো করেই মনে আছে।
সেই মরমে উনি মরে যাচ্ছেন। তবুও মেয়ের জন্য লাজ লজ্জা, সম্মানের কথা ভুলে তিনি ছুটে এসেছেন।

বসন্ত এসে গেছে । গাছে গাছে নতুন পাতায় আর ফুলের মেলা বসেছে।
শিমুল, পলাশ,কৃষ্ণচূড়ায় ছেয়ে গেছে প্রকৃতি।
মাহিরদের বাসার পাশে বড় বড় কয়েকটি শিমুল গাছ আছে। মাহিরের বেলকনিতে থেকে স্পষ্ট দেখা যায় গাছে যেন আগুন লেগেছে!
শিখা শুয়ে শুয়ে জানালার ফাঁকে একটু একটু দেখে সেই আগুন।
– বসন্ত এসেছে! শিমুল ফুল অনেক সুন্দর।।
– তোমার ভালো লাগে?
– অনেক।
– দেখবে?
– অই যে দেখা যায়।
– আরও দেখাবো।আসো।
মাহির শিখাকে ধরে নিয়ে ব্যালকনিতে বসিয়ে দেয়।
– এবার দেখো তো কেমন?

শিমুল বনে আগুন লেগেছে, পুড়ছে কারো মন!
আর কারো মনে শিখা দাউদাউ করে জ্বলছে!!
শিখা দুচোখ ভরে দেখছে।আহ! এতো সুন্দর কেন সবকিছু!!
চোখে জল এসে যায়।
– এতো সুন্দর বসন্ত আগে কখনো দেখিনি।
মাহির কিছু বলে না, শুধু শুনে যাচ্ছে শিখার কথা।

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here