ওয়াদা

0
70

হাসপাতালের কেবিনের গ্লাসের বাইরে দিয়ে নীলার দিকে তাকিয়ে আছে আরাফ ।

কি নিষ্পাপ ওর চেহারাটা! যেন একটা ঘুমন্ত পরী ঘুমিয়ে আছে ।

গতকালও‌ মেয়েটা খুব ভালোই ছিল । ওর ৮ দিনের মেয়েকে কোলে নিয়ে ওর সাথে কি মিষ্টি করে কথা বলছিলো । সাথে ওর মুখে লেগে ছিল মিষ্টি হাসি ।

হঠাৎ-ই যে কি থেকে কি হয়ে গেলো !

নীলা আর আরাফের মেয়ে আমায়রা আমার কোলে । ঘুমিয়ে আছে মেয়েটা । জেগে থাকলে হয়তো মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য কান্না করতো ।

ওকে কোলে নিয়েই আমি পেছন থেকে গিয়ে আরাফের কাঁধে হাত রাখলাম । আরাফ তাকালো না । ছলছল চোখ নিয়ে এখনো ও তাকিয়ে আছে নীলার দিকে ।

আট বছর হলো আমাদের ফ্রেন্ডশিপ। আমরা খুব ভালো বেস্ট ফ্রেন্ড । আরাফের সুখের সব মুহুর্তের সময়ে যেমন আমি ওর পাশে থাকি । তেমনি ওর সব কষ্টের মুহুর্তেও আমি পাশে থাকি ওর ।

কিন্তু আজ ওর দুঃখের, ওর এই কঠিন সময়ে ওকে স্বান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষা কিংবা কোনো শব্দ আমি খুঁজে পাচ্ছি না । নীলাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে আরাফ,, নীলাও আরাফকে অননেক ভালোবাসে । আমি বুঝতে পারছি আরাফের মনের অবস্থা এখন কেমন । নিজের ভালোবাসার মানুষকে এমন একটা অবস্থায় দেখা কতোটা কষ্টের আমি বুঝতে পারি ।

আরাফ শুধু আমার বেস্ট ফ্রেন্ডই না । আমার ভালোবাসার মানুষ ।

আরাফ-নীলা দুজনেই জানে এই‌ কথা ।

আমি যখন প্রথম আরাফকে আমার মনের কথা জানালাম, তখনই আমি জানতে পারলাম নীলা আর ওর সম্পর্কের কথা । কিছুদিন আগেই ওদের সম্পর্কটা শুরু হওয়ায়, তখনো আমাকে সে কথা জানায়নি আরাফ । সেদিন রাতে বালিশে মুখ গুঁজে অনেক কেঁদে ছিলাম আমি । আমি তো সেদিন ভেবে নিয়ে ছিলাম, আরাফের সাথে আমার ফ্রেন্ডশিপটাও বুঝি নষ্ট হয়ে যাবে । কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে আরাফ পরের দিন আমার সাথে অনেক স্বাভাবিক ব্যবহার করলো । তখন এতো কষ্টের মাঝেও‌ আনন্দে আমার চোখ ছলছল করছিলো । আরাফকে আমি ভালোবাসার মানুষ হিসেবে পাশে না পেলেও, বেস্ট ফ্রেন্ড হিসেবে তো পাশে পাবো ! এটাই আমার কাছে অনেক ছিলো ।

এরপর একদিন ও আমাকে নীলার সাথে ফেইস টু ফেইস দেখা করালো । সেদিন ওকে দেখে আমার প্রচণ্ড হিংসা হচ্ছিলো । কিন্তু ওর আমার প্রতি সুন্দর ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করে দিলো । আমিও ওকে তারপর থেকে নিজের ছোটো বোনের মতোই‌ আগলে রেখেছি ।

কিন্তু আজ আমি আমার ছোটো বোনটার এই অবস্থায় কিছুই করতে পারছি না ।

মেয়েটা ব্লাড ক্যান্সারের লাস্ট স্টেজে ! অথচ সে আমাদের কাউকেই কিছু বলেনি । আরাফকেও না ! ও খুব কষ্ট পাবে তাই ! মেয়েটা একাই কষ্ট সহ্য করে এসেছে এতোগুলো দিন !

আজ ডাক্তারের কাছ থেকেই জানতে পারলাম, যখন নীলা ৫ মাসের প্রেগনেন্ট ছিল তখন একবার চেকআপ করাতে এসেছিলো । তখন আরাফের ফোন আসায় ও অন্য রুমে গেলে নীলা ডাক্তারে কাছ থেকে জানতে পারে ওর ব্লাড ক্যান্সারের কথা ।

ডাক্তার বলেছিলো বাচ্চাটকে বাঁচানো গেলেও নীলাকে বাঁচানো যাবে না । আর বাচ্চাটাকেও বাঁচাতে পারবে কি না সন্দেহ ।

নীলা ডাক্তারকে বলেছিলো ওর যা ইচ্ছে তাই হোক তবুও‌ বাচ্চাটাকে যেনো বাঁচায় । আরাফ যে ওর বাচ্চাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন বুনে রেখেছে !

অনেকক্ষণ এভাবেই দাঁড়িয়ে নীরবতা কাটার পর আরাফ নিজের চোখের পানি মুছে পেছনে তাকালো । ওর চোখে পানি দেখে‌ আমার চোখের পানিও যে বেরিয়ে আসতে চাইছে !

আরাফ আমায়রাকে কোলে নিয়ে ওর কপালে আলতো করে একটা চুমু খেলো ।

তারপর বললো,,,

– নেহা !

– হুম ?

– আমার নীলার কিছু হবে না তো !!

আমি হাত দিয়ে ওর মুখ চেপে ধরলাম । বললাম,,,

– এমন কথা ভুলেও মুখে আনবে না । আমাদের নীলার কিচ্ছু হবে না । কিচ্ছু না !

ছলছল চোখে আরাফ এক দীর্ঘশ্বাস গোপন করলো ।

পেছনে তাকিয়ে দেখলাম আংকেল-আনটি মানে আরাফের বাবা-মা এবং বাবা আর মা মানে নীলার বাবা-মা বসে বসে এখনো নিঃশব্দে কেঁদে যাচ্ছেন ।

নীলার বাবা-মা আমাকে নিজের মেয়ের মতো আদর করেন । তাই তো আমাকে তাদের আংকেল-আনটি ভুলেও ডাকতে দেন না ।

খুব ছোটোবেলায় আমি আমার নিজের মা-বাবাকে হারিয়েছি তাই‌ তাদের মা-বাবা ডাকার সুযোগ আমিও হাতছাড়া করিনি ।

হঠাৎ ডাক্তার এসে বললেন নীলার জ্ঞান ফিরেছে ।

আরাফ গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলো,,,

– ডাক্তার, আমি কি নীলার সাথে দেখা করতে পারি ?

– হ্যাঁ, তবে উনি প্রথমেই নিজের বাবা-মা এবং শ্বশুর-শ্বাশুড়ির সাথে দেখা করতে চান ।

আরাফ দমে গেলো । মেয়েটা এমন কেনো !! আরাফ নিশ্চয়ই ভাবছে, ওর সাথে আগে দেখা করলে কি এমন হতো !?

তবুও নিজের কথা নিজের মনেই চেপে রাখলো ও ।

আংকেল-আন্টি আর বাবা-মা কেবিনের ভেতরে গেলেন ।

দীর্ঘ আধ ঘণ্টা পর তারা বের হলেন । বের হওয়ার সাথেই বাবা আর আংকেল দুজনে মিলে কোথায় যেন চলে গেলেন ।

মা এসে আমাদের বললেন,,,

– নীলা তোকে আর আরাফকে ডেকেছে । সাথে আমায়রাকেও নিয়ে যেতে বলেছে ।

মায়ের বলতে দেরি কিন্তু আরাফের ভেতরে যেতে দেরি হলো না ।

আমিও আমায়রাকে কোলে নিয়ে ভেতরে যেতেই দেখলাম আরাফ গিয়ে নীলাকে জড়িয়ে ধরে আছে । খুব শক্ত করে । আর শুধু চোখের পানি ফেলছে ।

আমি এসব দেখে চলে যেতে নিতেই নীলা আমাকে ডাকলো ।

– নেহা আপু!?

উফ! মেয়েটার কণ্ঠটা কি করুণ শোনাচ্ছে !

আমাকে নীলা ওর হাতের ইশারায় ওর ডান পাশে যেতে বললো । আমি গেলাম সেখানে ।

আরাফ নীলাকে সেভাবেই জড়িয়ে ধরে কাঁদছে তো কাঁদছেই । নীলা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,,,

– ধুর পাগল ছেলে ! এভাবে কেউ কাঁদে নাকি !?

– নীলা, তুমি চলো এখান থেকে । তোমাকে এভাবে দেখতে আমার কষ্ট হচ্ছে । চলো তোমাকে বাসায় নিয়ে যাই । চলো ।

– কেনো এমন পাগলামি করছো বলো তো!? আর এভাবে বোকাদের মতো কাঁদছো কেনো !?

– নীলা কথা বলো না । প্লিজ.. চলো আমার সাথে । এই ডাক্তাররা সবাই পঁচা । ওরা বলছে তোমাকে নাকি বাঁচানো সম্ভব না । মিথ্যা বলছে ওরা । আমি তোমাকে বাঁচাবো । কেউ তোমাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না । কেউ না ।

– এভাবে কেঁদো না প্লিজ । তোমার কান্না আমার সহ্য হয় না । তোমাকে কাঁদতে দেখলে আমার খুব কষ্ট হয় ।

নীলাও এবার কেঁদে দিলো ।

আমার চোখ দিয়েও অনবরত পানি ঝরছে ।

– চলো না , নীলা । আমরা বাসায় চলে যাই ।

– হুম, নিয়ে যেয়ো আমাকে বাসায় । আমার মৃতদেহ নিয়ে যেয়ো ।

আরাফ নীলাকে ছেড়ে ওর দু’হাত দিয়ে নীলার দুই বাহু ধরে বললো,,,

– কি বললা তুমি !? বডড বেশি বোঝো, তাই‌না? তোমার কিছুই হবে না । তুমি আমার কাছেই থাকবে । আমি তোমাকে কোথাও যেতে দিবো না । তোমার কিচ্ছু হতে দিব না আমি । একদমই হতে দিব না ।

– পাগলামি করো না প্লিজ ।

নীলা এরপর আমাকে ডাকলো,,,

– নেহা আপু?

– হুম !?

– আমায়রাকে একটু আমার কোলে দাও ।

আমি আমায়রাকে নীলার কোলে দিলাম । মেয়েটা একটু‌ আগেই জেগে গেছে ।

নীলা ওকে কোলে নিয়ে ওর কপালে একটা আলতো করে চুমু খেলো । বললো,,,

– ওলে আমার সোনা ! ঘুম ভেঙে গেছে বুঝি !

এটা বলেই নীলা আমায়রাকে প্রাণ ভরে চুমু‌ খেতে লাগলো ।

আমায়রা এক মিষ্টি হাসি দিলো ।

ওর হাসি দেখে নীলা ওকে বুকে জড়িয়ে নিলো । বললো,,,

– এভাবে হেসে আমাকে লোভ দেখাচ্ছিস কেনো!? তোর এই হাসিকে উপেক্ষা করে তো আমাকে চলেই যেতে হবে ।

নীলার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসছে । কাঁদছে ও ।

আরাফ বললো,,,

– নীলা, তুমি আবার এসব বলা শুরু করলে !? এই আমায়রা, তোর আম্মুকে কিছু বল না ! তোর আম্মু আমাদের ছেড়ে চলে যেতে কেনো চাইছে !?

– শোনো তোমাদের একটা জরুরি কথা বলবো! বলতে পারো তোমাদের কাছে এটা আমার অনুরোধ ! কথা দাও তোমরা আমার শেষ অনুরোধটা রাখবে !?

আমি আর আরাফ দুজনেই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,,,

– কী !?

নীলা আমার দিকে ফিরে বললো,,,

– জানো, নেহা আপু ! আমি একদিন নিজেই নিজেকে ওয়াদা করেছিলাম যে , যদি কখনো পারি তাহলে আমি অবশ্যই তোমার সেই সুখগুলো ফিরিয়ে দিবো যেগুলো আমি আমার অধিকারের জন্য তোমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছি ! আজ সেই সময়টা হয়ে গেছে ।

আমি নীলার কথাটা শুনে অবাক হয়ে গিয়েছি । পুরোপুরিভাবে না বুঝলেও আমি কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছি নীলা কি বলতে চাইছে ।

আরাফ নীলাকে জিজ্ঞেস করলো,,,

– কি বলতে চাইছো নীলা তুমি?

– আমার ভাগ্যটা খুব খারাপ নিজের মেয়েটাকে বেশিদিন আমার মাতৃত্বের স্নেহ দিতে পারলাম না । তবে আমার কোনো চিন্তা নেই । আমার পুচকি আমায়রাকে তার মায়ের স্নেহ দেওয়ার জন্য তুমি তো আছোই, নেহা আপু ! আমি চলে যাওয়ার আগে আমার এই ছোট্ট মেয়েটার দায়িত্ব তোমায় দিয়ে যেতে চাই । নেহা আপু? ওকে কখনো বুঝতে দিও না যে তুমি ওর আসল মা নও ।

আমি খুব অবাক‌ হয়ে নীলার দিকে তাকালাম ।

তারপর নীলা আরাফের দিকে তাকিয়ে আবার বললো,,,

– আর আমি এটাও জানি , না না , আমি এটা বিশ্বাস করি যে এই পাগলটাকে আমার পরে তুমিই‌ খেয়াল‌ রাখতে পারবে ! যত্নে রাখতে পারবে ! আমি আজ আমার এই পাগলটাকে তোমার হাতে তুলে দিতে চাই । ওর খেয়াল রেখো তুমি !? আর ও যেন আমার স্মৃতি মনে করে কষ্ট না পায় সেদিকেও খেয়াল রেখো । আর ওর মনে আমার জায়গা দখল করে তোমার জন্য জায়গা করে নিও‌। আর হ্যাঁ, ওকে প্রচুর ভালোবেসো । যেমনটা এখন বাসো, তার চেয়েও‌ বেশি ভালোবেসো । কেমন ? ওয়াদা করো আমাকে !?

আরাফ‌ চেঁচিয়ে উঠলো নীলার এ কথা শুনে ।

– নীলাআআ.. কি শুরু করেছো তুমি? মহান সাজতে চাইছো? মহান !? তুমি জানো না !? আমার পক্ষে তোমাকে রেখে অন্য কাউকে মেনে নেওয়া সম্ভব না !? বিয়ে তো দূরেই থাক ।

– আমাকে রেখে কেনো করতে যাবে !? আমি তো একটু পর চলেই‌ যাবো এই দুনিয়া ছেড়ে !?

– তুমি আমাকে রাগিয়ো না নীলা .. প্লিজ !
!
– আরে বোকা রাগাচ্ছি কই!? এই‌ শুনো না .. তুমি আমার এই শেষ ইচ্ছাটা রাখবে না !? অন্তত আমায়রার কথা ভাবো !

– আমায়রাকে নেহা দেখে রাখবে, তার জন্য বিয়ে করার কি আছে ?

– আছে , দরকার আছে !

এবার আমি বললাম,,,

– নীলা এটা তোর কেমন অনুরোধ বল তো!? তুই কি পাগল হয়ে গেছিস !? দেখ তুই টেনশোন করিস না । আমি আমায়রাকে দেখে রাখবো ! কিন্তু আরাফকে কেনো বিয়ে করতে হবে বল তো !? আর তোর কিচ্ছু হবে না দেখিস ।

– কেনো বোকার মতো কথা বলছো আপু !? তোমরা সবাই‌ জানো আমি আর বেশিক্ষণ বাঁচবো না ! ওয়াদা করো না আমাকে প্লিজ ..!!

নীলা ওর হাতটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিল ।

খুব কষ্ট হলেও আমি কান্না চেপে ওর হাতে হাত রেখে বললাম,,,

– হুম ওয়াদা করলাম !

হঠাৎ আংকেল-আনটি বাবা-মা তাদের সাথে দু’জন লোককে নিয়ে কেবিনে প্রবেশ করলেন ।

তাদের দেখে নীলা বললো,,,

– ঐ তো কাজি এসে গেছে ! এবার তোমরা প্লিজ রাজি হয়ে যাও‌।

আরাফ চুপ‌ হয়ে আছে । কিছু বলছে না ।

– আরাফ চুপ‌ হয়ে আছো কেন? প্লিজ রাজি হয়ে যাও !? বিয়েটা করে নাও না প্লিজ !

অনেকক্ষণ আরাফকে জোরাজুরি করলো নীলা । কিন্তু আরাফ এখনো চুপ করে মাথাটা নিচু করে বসে আছে নীলার পাশে নীলার বাম হাতটা ধরে ।

কাজি আরাফকে কবুল বলতে বললেন । কিন্তু আরাফ কিছু বলছেই না ।

নীলা এবার কিছুটা ধমকের সুরেই‌ বললো,,,

– আরাফ কবুল বলো !

আরাফ একবার ‌নীলার দিকে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে কবুল বললো ।

আরাফের পর কাজি আমার কাছে এসে কবুল বলতে বললেন । আমি অসহায়ভাবে নীলার দিকে তাকালাম । কিন্তু নীলা বললো,,,

– কি হলো আপু!? বলো !

আমি আর না পেরে কবুল বললাম ।

বিয়ে পরানো শেষে রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করার সময় আরাফ আর আমার দুজনেরই হাত কাঁপছিলো ।

সাইন করার পর লোক দুটো চলে গেলো ।

নীলার চোখে-মুখে সাফল্যের ঝিলিক ।

আমি বললাম ,,,

– এটা তুমি কেন করলে নীলা !?

নীলা কিছু বললো না । শুধু এক ম্লান হাসি দিলো । তারপর আরাফকে বললো,,,

– আমাকে শেষবারের মতো একবার জড়িয়ে ধরবে প্লিজ !?

আরাফ করুণ দৃষ্টিতে নীলার দিকে তাকালো ।

তারপর আর সাতপাঁচ না ভেবে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো নীলাকে ।

– নেহা আপু !? প্লিজ কিছু মনে করো না ! তোমার সদ্য বিবাহিত স্বামীকে আমি শেষবারের মতো একবার জড়িয়ে ধরলাম !?

মেয়েটা কি পাগল !? নিজের স্বামীকে জড়িয়ে ধরতে আমার কাছে অনুমতি চাইছে !?

নীলার‌ কোলে আমায়রা । আরাফ আমায়রাকে সহ নীলাকে জাপটে ধরে আছে ।

আরাফ এমনভাবে নীলাকে জড়িয়ে আছে যেন একটু হালকা করলেই নীলা পালিয়ে যাবে ।

এখানে উপস্থিত সবার চোখে পানি । আমিও কেঁদে যাচ্ছি অনবরত ।

নীলা আর আরাফ দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে । কান্না যেন থামছেই না কারোর ।

হঠাৎ-ই আমায়রা জোরে কেঁদে উঠলো ।

ওর এমন কান্না শুনে সবাই ঘাবড়ে গেলো ।

আরাফ নীলাকে ছেড়ে দিতেই‌ নীলা পড়ে যাওয়ার আগেই‌ আরাফ ধরে ফেললো ।

আমি গিয়ে আমায়রাকে কোলে তুলে নিলাম ।

আরাফ দেখলো নীলা কথা বলছে না । চুপ হয়ে আছে । নড়ছেও না একটুও ।

– নীলা !? কি হলো তোমার !? চুপ‌ হয়ে গেলে কেনো!? কথা বলো !? এই‌!? এই নীলা !? কি হলো!? চোখ খুলো !? চোখ খুলোছো না কেনো!? এই !? নীলা !?

নীলার কোনো সাড়াশব্দ নেই । সবাই বুঝতে পারলাম,, নীলা আর নেই !

আরাফ জোরে চিৎকার দিলো ।

– নীলাআআআআ……..

আমি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম ! আমায়রাও‌ কাঁদছে ! মেয়েটা কি কোনো অলৌকিক মাধ্যমে বুঝতে পেরেছে‌ ওর জন্মদাত্রী মা আর নেই !? হয়তো তাই !

আন্টি আর মা দুজনেই সেন্সলেস হয়ে পড়েছেন । বাবা আর আংকেল তাদের দুজনকে সামলাচ্ছেন ।

এদিকে‌ আরাফ পাগলের মতো নীলাকে ডাকছে ! আর অনবরত কেঁদে যাচ্ছে ।

ওর এই কষ্ট আমি সহ্য করতে পারছি না । কেনো আল্লাহ !? কেনো!? কেড়ে নিলে কেনো নীলাকে আমাদের থেকে !?

২ বছর পর…

আজ আমায়রা ২ বছরে পা রেখেছে ।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের উজ্জ্বল তারাটার দিকে তাকিয়ে আছি আমি । এই তারাটাকে আমি আর আরাফ নীলা মনে করে ওর সাথে কথা বলি । আজও ওর সাথে কথা বলার জন্যেই‌ বারান্দায় এসেছি ।

নীলা !? তোমাকে কথা দিয়েছিলাম আমি আমায়রা আর আরাফকে আমার ভালোবাসা স্নেহ দিয়ে আগলে রাখবো । আমি আমার কথা রেখেছি ।

তুমি বলেছিলে না ! আমি যেন আরাফের মনে তোমার জায়গা দখল করে নিতে পারি ! আমি তোমার সেই কথাও‌ রেখেছি । আমি আরাফের ভালোবাসার মানুষ হিসেবে ওর হৃদয়ে জায়গা দখল করে নিতে পেরেছি । তবে তোমার জায়গা দখল করে নয় । নিজের জন্য আলাদা করে আমি ওর হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছি ।

তুমি‌ বলেছিলে ! আরাফ যাতে তোমার স্মৃতি মনে করে কষ্ট না পায়, সেই‌ ব্যবস্থা করতে । আমি তাও‌ করেছি । এখন আরাফ তোমার কথা মনে করে তোমার স্মৃতি হাতরে কষ্ট পায় না , বরং সীমাহিন আনন্দ পায় !

এসব কথা বলছিলাম নীলার তারার সাথে । হঠাৎ মনে হলো নিচে কেউ‌ আমার জামা ধরে টানছে । নিচে তাকিয়ে দেখি আমায়রা ওর ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা মুখে নিয়ে বাম হাত দিয়ে আমার জামা ধরে টানছে ।

আমি ওর দিকে তাকাতেই ও আঙুলটা মুখ থেকে বের করে আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি এক হাসি দিলো ।

আমায়রার হাসিটা একদম নীলার মতো ! মেয়েটা একদম নীলার মতো হয়েছে ! এখন মনে হচ্ছে যেন ছোট্টো নীলা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে ।

আমি নিচে আমায়রার সামনে হাঁটু গেড়ে বসলাম । ওর গাল দুটো টেনে দিয়ে বললাম,,,

– আমার পুচকি আমায়রাটা এত্তো কিউট কেনো!?

আমায়রা ওর দুটো নরম তুলতুলে হাত দিয়ে আমার দুই গাল টেনে বললো,,,

– আমাল মাম্মামতা অনেক কিউত , তাই আমিও‌ অনেক কিউত !

– ওলে আমার সোনা রে ! থাক এতো পাম দিতে হবে না !

– মাম্মাম, তুমি কি গালিল চাকা যে আমি তোমাকে পাম দিবো ?

– পাকনা বুড়ি একটা ! ( একদম নীলার মতো ) আচ্ছা এখন আমার গালে একটা কিসসি দাও তো !

– এমা না ! আমি তোমাকে কিসসি দিলে পাপা আমাকে সতীন বলবে !

মেয়েটা বলে কি !?

– আমায়রা, তুমি তো দেখছি খুব পেকে গেছো ! দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা !

বলেই ওকে ধরতে যাবো তার আগেই ও পালিয়ে গেলো ।

ও যাওয়ার পর আারাফ হাসতে হাসতে বারান্দায় ঢুকলো ।

– কি হলো !? তুমি আবার হাসছো কেনো !?

– হাসবো না !? আমাদের পুচকি সোনাটা তো‌ বেশ পেকে গেছে ।

– তুমি শুনেছো সব !?

– হুম , আমায়রা দৌঁড়ে যাচ্ছিলো । আমি জিজ্ঞেস করলাম কেনো দৌড়াচ্ছে ! তখনই ও ঘটনাটা বললো ।

– ভালো ।

বলেই অন্যপাশে ঘুরলাম ।

আরাফ এসে আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো । ও আমার চুলে মুখ গুঁজে দিলো । তারপর আমার ঘাড়ে গভীর চুমু খেলো । আমি‌ ওর প্রতিটা স্পর্শে কেঁপে উঠলাম ।

সত্যি নীলা ওর নিজের প্রতি যে ওয়াদা করেছে সেটা রেখেছে ।

আরাফ আমাকে ওর দিকে ফিরিয়ে ইশারায় ওর ঠোঁটে চুমু দিতে বললো ।

আমি তাতে লজ্জা পেয়ে মুখটা অন্যদিকে করলাম ।

আরাফ আমাকে ছেড়ে দিয়ে গাল ফুলিয়ে অন্যদিকে ঘুরলো ।

আমি ওর এমন কাণ্ডে মুচকি হাসলাম । বললাম,,,

– সত্যিই নীলা ঠিকই বলতো ! তোমাকে রাগলে গরিলার মতোই লাগে !

আরাফ হেসে দিলো । তারপর নীলার ঐ তারার দিকে তাকালো ।

আমি ওর পাশে গিয়ে ওর বাহু ধরে ওর কাঁধে মাথা রেখে দাঁড়ালাম ।

কিছুক্ষণ এভাবেই থাকার পর বললাম,,,

– আর আট দিন পর তো নীলার মৃত্যুবার্ষিকি ।

– হুম ।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে ও বললো,,,

– জানো নেহা! আমার প্রতি নীলার কোনো অভিযোগ ছিল না । শুধু একটা অভিযোগ ছাড়া !

– কি অভিযোগ. ?

– ও বলতো.. আমি নাকি ওকে, ওর মনকে বুঝতে পারিনা ! ঠিকই বলতো নীলা ! নাহলে ওর এতো বড় একটা অসুখ হয়েছিলো, অথচ আমি বুঝতেই পারলাম না !

আরাফ চুপ হয়ে গেল আবার । আমার মনে হলো আরাফ যেন এক দীর্ঘশ্বাস গোপন করলো ।

আজ নীলার মারা যাওয়ার ২ বছর কামপ্লিট হলো ।

এখন আমি, আরাফ আর আমায়রা নীলার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আছি ।

আমি আরাফের বাহু ধরে ওর পাশেই আমায়রাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি ।

আমায়রা জানে এটা ওর খালামণির কবর ।

নীলা হয়তো আজ আমাদের দেখে খুব খুশি !

মনে মনে নীলার কবরের দিকে তাকিয়ে নীলাকে উদ্দেশ্য করে বললাম,,,

– আমি করেছি নীলা ! তোমাকে দেওয়া ওয়াদা আমি পালন করেছি !

[সমাপ্ত]

গল্প – ওয়াদা
লেখিকা – মাঈশা ইসলাম নীলা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here