একটি হুজুগে সিদ্ধান্ত

0
567

অনার্স শেষ বর্ষ শেষ হওয়ার আগেই বাসা থেকে এক প্রকার জোর করেই আমাকে বিয়ে দেয়া হয়। মেয়েদের নাকি পড়ালেখার সময়ে বিয়ে না দিয়ে দিলে পরে ভালো পাত্র পাওয়া যায়না। পাত্র প্রবাসী, তিন কূলে তেমন কেউ নেই। কাজেই আমার সুখের কমতি হবেনা। ঝামেলা করার কেউ নেই পরিবারে। সমস্যা একটাই পাত্র টেনেটুনে বি এ পাস। কিন্তু যেহেতু বিদেশে থাকে প্রচুর টাকা পয়সা আছে, এতো পড়ালেখা দিয়ে হবেই বা কি? আর কবে না কবে আমাকে বিদেশ নিয়ে যেতে পারে এই সুযোগে আমার পড়াটাও শেষ হয়ে যাবে।

বেশ ধুমধামের সাথেই হেলাল আর আমার বিয়ে হয়। অনেক অনেক নতুন কাপড় আর গয়নাগাটি দেয় সে আমাকে। বিয়ের দু সপ্তাহের মাথায় মালয়েশিয়া চলে যাওয়ার সময় আমার নামে ব্যাংক একাউন্ট করে বেশ কিছু টাকা রেখে আমাকে সব বুঝিয়ে দিয়ে যায়। যেহেতু ওর এক ফুপু ছাড়া তেমন আপন কেউ নেই আর আমিও পড়াশোনা করছি তাই আমার বাবা মায়ের কাছে থাকাটাই সাব্যস্ত হয়। আমার বাবার সংসার মোটামুটি স্বচ্ছল হলেও এতো উপহার আর টাকা শুধু আমার এরকম কখনোই আগে হয়নি। না পাওয়া মানুষ হুট করে অনেক কিছু পেয়ে গেলে খেই হারিয়ে ফেলা খুব স্বাভাবিক। আমিও খেই হারিয়ে ফেললাম। বন্ধুবান্ধবদের সাথে দেদারসে টাকা ওড়ানো সহ, দুদিন পরপর এতো এতো শপিং। বাবা মায়ের ঘরে থাকাকালীন সব অপূর্ণ শখ মিটিয়ে ফেলার চেষ্টায় ব্যাংকের গচ্ছিত টাকা শেষ হতে দুমাসও সময় লাগেনা। হেলাল জানামাত্রই আবার টাকা পাঠায়। দুদিন থেমে থাকলেও আবারো আমার উড়নচন্ডি খরচ শুরু হয়। আসলে টাকা খরচের নেশাটাই বোধহয় এমন।

বিয়ের দুসপ্তাহের মাথায় ওর চলে যাওয়া, তারপর থেকে শুধু ফোনে যোগাযোগে কেমন আছো, ভালো আছো জাতীয় কিছু কথা ছাড়া ওর ব্যাপারে আর তেমন কোন আগ্রহ আমার কেন যেন তৈরী হয়নি। এমনকি ওর টাকা প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে দেদারসে খরচ করতে গিয়েও আমার মনে কখনো কোন অপরাধবোধ আসেনি। বোধহয় নিজে কখনো কামাই করতে হয়নি দেখে, নয়তো সবার মুখে শোনা কথা, স্বামীর টাকাতো আমারই টাকা। দিনে দিনে হেলাল আমার কাছে হয়ে ওঠে একটা টাকার গাছ মাত্র। আমি এমনকি কখনো জানতেও চাইনি ও কি কাজ করে, কতোটা কষ্ট করে। এমন করেই কেটে যায় বছর খানেক।

একদিন হঠাৎ হেলাল জানায় তার কাজে কি যেন ঝামেলা হচ্ছে। তাকে হয়তো দেশে চলে আসতে হবে। আমার কাছে পাঠানো টাকার হিসেব চায় ভদ্রভাবেই। বলে, ‘ তোমার হাতখরচের চেয়েতো আমি বেশী টাকাই পাঠিয়েছি। আমি ফিরে আসলে বাসা ভাড়া করে কয়েক মাস চলতে পারবো নিশ্চয়ই, শিলা?’ আমি তখন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠি। কারণ আমি সেদিন টাকা চাইবো ভেবেছিলাম। ‘ তুমি আমাকে সন্দেহ করো? টাকার খোঁটা দিচ্ছো? হিসাব চাইছো টাকার?’ ইত্যাকার যা না তা বলে ফোন রেখে দেই। অদ্ভুত হলেও সত্যি আমার বাসার মানুষজনও আমার সাথে তাল মেলায়। বুঝিবা হেলালের টাকায় পাওয়া সচ্ছলতার রেশ ফুরিয়ে যাওয়া তারাও মানতে পারেনি। আমার পরিবারের কথা ছিল তাদের মাস্টার্স পড়ুয়া মেয়েকে হেলালের মতো কম পড়াশোনা জানা ছেলের কাছে বিয়ে দিয়েছে তাই কত না? এক কথা দু কথা একান ওকান হয়ে কথার পিঠে কথা বসে ঝগড়া শুধু বাড়তেই থাকে। হেলালের পাঠানো টাকার কোন যথাযথ হিসাব যে আমার আসলেই ছিল না। ফলাফল রাগের মাথায় হেলালকে দেখে নিবে বলে ডিভোর্স পেপারে সাইনও করিয়ে নেয় আমার পরিবার।

ঘটনার জের সামলাতে হেলাল এসেছিল দেশে। আমাকে বোঝানোর অনেক চেষ্টা করেছে। তার অবস্থান এবং সব কারণও ব্যাখ্যা করেছে। কিন্তু দুসপ্তাহ সংসার আর শুধু ফোনে কাটানো কিছু সময়ের মানুষের চেয়ে আমার পরিবারের পক্ষে যাওয়াই আমার সমীচিন মনে হয়।
কথায় বলে লোকে যদি তার ভবিষ্যত দেখতে পেতো তবে অনেক ভেবেচিন্তে জীবনের সিদ্ধান্তগুলো নিত। হেলালের সাথে সম্পর্ক চালিয়ে গেলে আমি কতোটা সুখে থাকতাম জানিনা কিন্তু সম্পর্ক ভেঙে দিয়ে জীবনের যে দুর্দিন আমি ডেকে আনি তা আগে বুঝলে বরং ওর কাছে মাফ চেয়ে নেয়াটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমত্তার আর মানবিকতার হতো। আমিতো আসলেই ওর কষ্টার্জিত অর্থের যথেচ্ছ নয়ছয় করেছি।

প্রথম কিছুদিন সবাই খুব বললো এইতো মাস্টার্স শেষ হলে ভালো চাকুরী পেয়ে যাবি, কারো দিকে তাকিয়ে চলতে হবেনা। কিন্তু দিন যত এগুতে লাগলো মাস্টার্স শেষ হতে হতে আমার স্বপ্নের রং যেন বিবর্ণ হতে লাগলো। এতো মানুষ চাকুরীর চেষ্টায় রত সেখানে আমার সেকেন্ড ক্লাস রেজাল্টে কি চাকুরী পাবো? মফস্বল থেকে ঢাকা যেয়ে যে কোথাও ইন্টারভিউ পরীক্ষা দেবো সে সুযোগও নেই। কোথায় থাকবো, কার কাছে থাকবো? তার ওপর সমাজে ডিভোর্সী মেয়েদের যে লোকে অন্য চোখে দেখে সেটাও যে ততদিনে বুঝতে শুরু করেছি। এতোদিন যে পরিবারের মানুষজন পাশে ছিল তারাও বলতে লাগলো খামোখা অবুঝের মতো হেলালের টাকা নষ্ট করেছি আমি, ডিভোর্স না দিলেও তো হতো। সব দোষ আমার। ভাইয়ের বৌয়েরাও তাতে তাল দেয়। দেবে না ই বা কেন ওরাই বা আমাকে কতদিন ওদের সংসারে রাখবে?

বাড়ির পাশের একটা স্কুলে চাকুরী শুরু করেছি নামমাত্র বেতনে। নিজের হাত খরচটুকু অন্তত চলে তাতে। সারা সকাল ঘরের সব কাজ করে নিজের চাকুরীতে যাই আবার ফিরে এসে ঘরের কাজ করে শুতে শুতে গভীর রাত। একটা ডিভোর্স, লোকের কথায় একটা হুজুগে সিদ্ধান্ত আমার জীবনটাকে যেন পুরোপুরি মূল্যহীন করে দিয়েছে। হেলালের শেষদিন কথা বলার সময়ের দীর্ঘশ্বাসটুকু যেন আমার জীবনের দুঃস্বপ্ন হয়ে রোজ রাতে বিদ্রুপ করে যায়। বাড়ির সবচেয়ে খারাপ রুমে কাটানো নির্ঘুম রাতগুলো বড় কর্কশ ভাবে জানিয়ে দেয় জীবনের কোন সিদ্ধান্তই হুজুগে নিতে হয়না। কখনো কখনো অপর পক্ষকেও সুযোগ দিতে হয়।

ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে