আমি তুমিতেই আসক্ত পর্ব-০৫

0
631

#আমি_তুমিতেই_আসক্ত।
#পর্ব_৫
#সুমাইয়া মনি।

পড়া শেষ করতে নবনীর সন্ধ্যা গড়িয়ে যায়। মাগরিবের আজান পড়ে। নামাজ শেষ করেই বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে খিদের চটে জোরে জোরে চিৎকার করছে। এই এক মারাত্মক জঘন্যতম বাজে স্বভাব তার। খিদে পেলেই আম্মু আম্মু ডেকে বাড়ি মাথায় ওঠাবে। এখনও তেমনটিই করছে সে।

-“আম্মু গো আম্মু,খাবার দেও নয়তো আমি মরে গেলাম। গেলাম কিন্তু মরে। গেলাম….।” বলেই জোরে টান দিয়ে ওঠলো।

নিলুফা বেগম রেগে তেড়ে রুমে ঢুকে আস্তেধীরে বলে,
-“আস্তে কথা বল। মানুষজন আছে। ”

নবনীতা ওঠে বসে কপাল কুঁচকে বলল,
-“পুরো বাড়ি জুড়ে তুমি,আমি,নিয়ান ছাড়া আর কেউ নেই। আব্বু আসবে সেই রাতে। তাহলে মানুষজন কোথায় পেলে?”

-“নিভ্র এসেছে। একটু আগে।”

চট করে দাঁড়িয়ে যায় নবীন। চোখ জোড়া রসগোল্লার মতো বড়ো আঁকার ধারণ করেছে। মুখে হাত রেখে হাঁপাতে শুরু করে। একদিকে খুশির ঠেলায়,আরেক দিকে লজ্জায়। বলে,
-“ও আল্লাহ,এ কি করলাম আমি। এ কি বললাম। মানসম্মান সব শেষ।”

-” তোর আবার মানসম্মান আছে।”

-“না নেই….।” রেগে বলে।

-“তাহলে চিল্লা বেশি করে, মানসম্মান তো নেই তোর।” মুখ বাঁকিয়ে বললেন।

-“আম্মু!” রেগে জোরে বলে।

-“চুপ থাক। তোর কা কা থামাতে এসেছি। কিচেনে নুডলস রাখা আছে, গিয়ে খেয়ে নে।”

-“তার আগে বলো নিভ্র স্যার আমাদের বাড়িতে কেন এসেছে?”

-“ধন্যবাদ জানাতে। এই দু দিন তাকে খাবার দিয়েছিলাম,তার জন্য নিজে মন থেকে ধন্যবাদ জানাতে এসেছে।”

-“আর?”

-“এখন নিয়ানের সঙ্গে কথা বলছে।”

-“আর?”

-“তোর কল্লাডা।” দাঁতে দাঁত চেপে বলেন নিলুফা বেগম।

-“রাগছো কেন?”

-“আমি গেলাম।”

-“শোনো আম্মু…?” তিনি আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালেন না। রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।

নবনী লজ্জায় নক কাঁটতে আরম্ভ করেছে। ভেবেই খারাপ লাগছে নিভ্র স্যার থাকাকালীন এত জোরে খিদের চটে চিৎকার করেছে। কী ভেবেছে ওর বিষয়। লজ্জায় মরি মরি অবস্থা তার। কয়েক সেকেন্ড যেতেই নবনী রুমের দরজার দিকে উঁকি মেরে ড্রইংরুমের পরিস্থিতি দেখতে লাগল। এপাশ ফিরে বসেছিল নিভ্র। যার দরুণ নিভ্রর মাথা ও অর্ধেক পিঠ ব্যতীত আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। এদিকে খিদের যন্ত্রণায় পেটের ইঁদুর গুলো রীতিমতো যুদ্ধ আরম্ভ করে দিয়েছে। নাহ! কিচেনে যেতে হবে। এক কাজে দুই কাজ করবে। প্রথম কাজ নুডলস খাবে। দ্বিতীয় কাজ নিভ্রকেও দেখতে পাবে। ভাবা শেষ। তো দেরি কিসের? লজ্জাসংকোচ ফেলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চুল ঠিকঠাক করে, তারপর গায়ের ওড়না টেনে রুম থেকে বের হয়। এমন ভেজা বেড়ালের মতো বেরিয়েছে যেন ভাঁজা মাছ উল্টে খেতে হয় কিভাবে, সেটা সে জানে না।

নিভ্র নবনীর দিকে তাকায়নি। নিলুফা বেগমের সঙ্গে কথা বলায় ব্যস্ত। নবনী আড়চোখে একবার তাকিয়ে কিচেনে আসে। একটি বাটিতে নুডলস রাখা ছিল। সেটি সঙ্গে করে নিয়ে এসে টেবিলে বসে। মাথা নিচু করে খাচ্ছে। খাওয়ার মাঝে আড়চোখে কয়েকবার যে নিভ্রর দিকে তাকিয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। নিভ্র তার নজর স্বাভাবিক রেখেই নিলুফা বেগমের সঙ্গে কথায় মগ্ন ছিল। নবনী এক সময় ভাবে। এই লোকটা মানুষ নাকি রোবট। না আছে রস,না আছে কস। কাঠ কাঠিন্য একজন লোক। জীবনে কখনো ভালোমতো হেসেছে কি-না সন্দেহ। না আর সহ্য হচ্ছে না। নবনীর বাটিতে নুডলস প্রায় শেষ। তাঁদের কথার মাঝে পথে নবনী জোরে বলে ওঠলো,
-“আম্মু আরো নুডলস দেও।”

নিভ্র সহ নিলুফা, নিয়ানের নজর এবার নবনীর ওপর। নবনী কিছুটা ইতস্তত বোধ করে। এমন জোরে ডাকার কারণে তাঁদের কথপোকথন থেমে গেছে এটা ভেবে নবনী কিছুটা হলেও খুশি হয়। এতক্ষণে তাঁদের নজর তার ওপরে পড়েছে।
নাহলে এতক্ষণ তারা বুঝতেও পারেনি যে একজন অসহায় মেয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে নুডলস খাচ্ছিল। নিলুফা বেগমের মেজাজ চড়ে বসে। নজর নিয়ানের দিকে তাক করে বলে,
-“নিয়ান আমার খুন্তিটা রান্না ঘর থেকে এনে দিতে পারবি বাবা?”

খুন্তির কথা শুনেই নবনী চটজলদি দাঁড়িয়ে যায়। চোখ পিটপিট করে বলে,
-“থাক তোমার দিতে হবে না। আমি নিজেই নুডলস নিয়ে আসছি।” বলেই নবনী হনহনিয়ে চলে যায়। নিভ্র স্মিত হাসে। মা-মেয়ের এমন কাণ্ড দেখে কেউ না হেসে থাকতে পারবে বলে মন হচ্ছে না।
আরো কিছুক্ষণ কথা বলে নিভ্র বিদায় নিয়ে চলে যায়। নবনী ওর মায়ের সামনে কোমড়ে হাত রেখে রেগেমেগে বলে,
-“নিভ্র স্যারের সামনে তুমি আমাকে অপমান করেছো। এর বদলা আমি নেবোই।”

-“কিভাবে?”

-“তোমার খুন্তি ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে।” বলেই এক মুহূর্ত দেরি করে না। দ্রুত রুমে এসে ঠাস শব্দ তুলে দরজা লাগিয়ে দেয়।

নিলুফা বেগম রাগ নিয়ে দরজার থাপ্পড় দিয়ে বলে,
-“ডিনার করতে বাহিরে আসবি না নাকি? তখন ধরব তোকে। আমার খুন্তি ফেলে দেওয়া…।”

-“খাব না। অলরেডি পেট ফুল নুডলস খেয়ে।”

রাগে ফোঁসফোঁস করে ওঠে সে। এই মেয়ে সব সময় তার থেকে এক ধাপ আগে আগে চলে।
-“শয়তান মেয়ে।” ভেংচি কেটে বলেই চলে যান।
______________
সকালে…

নবনী তার পাশের জানলাটা খুলে উঁকি মেরে নিভ্রর বারান্দার দিকে তাকায়। নবনীর এই জানালাটা কখনোই খোলা হয়না। খোলা হয়না বলতে, এই জানালাটা নবনীর একদমই পছন্দ নয়। খোলা রাখবে সেটা তো আরো চায় না। কিন্তু নবনী আজ শুধু নিভ্রর জন্যই জানালা খুলেছে। ওঁকে দেখার জন্য। এখন থেকে সব সময় খোলা রাখবে বলে মন স্থির করে।
একটু পরেই নিভ্র তার পোষা কুকুর টমিকে নিয়ে বারান্দায় আসে। কালো রঙের গেঞ্জি ও ট্রাউজার পরিধান, হাতে কফির মগ আর অন্য হাতে একটি লাল রঙের ফাইল। মনোযোগ সহকারে দেখতে আর কফি খাচ্ছে নিভ্র।

নবনী জানালার এক পাশ হয়ে দাঁড়ায়। যাতে ওঁকে নিভ্র দেখতে না পায়। রেলিঙের উপরদিকটায় ঝুঁকে তীক্ষ্ণ নজরে ফাইলটি দেখছে সে। এদিকে যে তাকে অন্য কেউ দেখছে সেটা তার মালুম নেই। নবনী নিভ্রকে দেখে দেখে মুচকি মুচকি হাসে। হঠাৎ নিভ্র নবনীর জানালার পানে তাকায়। সেটা বুঝতে পেরে পাশে সরে দাঁড়ান নবনী। বুকের মধ্যে হাত দিয়ে চোখ পিটপিট করে নিঃশ্বাস ফেলছে। মনে হয় একটুর জন্য দেখেনি। মিনিট কয়েক পর উঁকি দিয়ে দেখে নিভ্র সেখানে নেই। এক মুহূর্তেই নবনীর মন কিছুটা খারাপ হয়ে যায়। তবে এই ভেবে সে আনন্দিত প্রতিদিন সকালে তাকে দেখতে পাবে। রেডি হয়ে নেয় কলেজের জন্য।

বারোটার দিকে নবনী,মায়া একটি কফিশপে এসে বসে। মায়া কফি অর্ডার করে আর নবনী জুস। পাইপ দিয়ে সেই তখন থেকে দুষ্টুমি করে চলেছে।অবশ্য এর কারণও আছে।
মায়া মূলত কফিশপে নিয়ে এসেছে নবনীর কাছ থেকে সত্যি কথা বের করার জন্য। যেটা কাল বহুবার জিজ্ঞেস করেও উত্তর মিলেনি। আজও জিজ্ঞেস করে করে হাঁপিয়ে ওঠেছে। কিন্তু নবনী মায়ার কথায় পাত্তা না দিয়ে পাইপ দ্বারা জুসের গ্লাসের মধ্যে ফু দিয়ে সময় নষ্ট করছে। যাতে আজান পড়তেই চলে যেতে পারে বাড়িতে। মায়া এবার ভীষণ ক্ষেপে যায়। রেগে বলে,
-“তাহলে তুই বলবি না তাই না।”

-“বলতে পারি। তবে একটা শর্ত আছে।”

-“শর্ত কিসের?”

-“রাজি থাকিলে শাহাদাত আঙ্গুল ধর,না থাকিলে মধ্য আঙ্গুল ধর।” বলে আঙ্গুল দু’টি মায়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে নাচাতে থাকে।

রাগে ফুঁসছে মায়া। সত্যি কথা বলতে গেলেও আজকাল শর্তের মুখোমুখি হতে হয় সেটা জানা ছিল না। মায়া তার হাত মুঠো বদ্ধ করে নবনীর শাহাদাত আঙ্গুলের উপর জোরে কিল দিয়ে বলে “রাজি।”

-“আহহ! এভাবে বলতে হয় নাকি।” বলেই আঙ্গুল ঝাড়াতে থাকে নবনী।

-“এবার বল।”

-“কি বলব যেন?” না জানার ভান ধরে বলে।

মায়া রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই নবনী বলে ওঠে,
-“ও হ্যাঁ। আমি আসলে নিভ্র স্যারকে পছন্দ করি। শুধু পছন্দ নয় ভালোবাসি।” কিছুটা লজ্জা ভঙ্গিতে বলে।

-“আরে লজ্জা রে! কবে থেকে শুনি?”

-“ভালোবাসা কখন হয় বলা যায় না। তবে খুব ভালোবাসি। বলতে গেলে আমি তার প্রতি আসক্ত!”

মায়া কপালে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে নেয়। ইন্টার ফাস্ট ইয়ার পড়ুয়া মেয়ে কি-না একজন পুলিশ অফিসারের প্রেমে আসক্ত। ভাবা যায়! অবশ্য এটা কমন ব্যাপার। তবে মায়ার কাছে কিছুটা জটিল মনে হচ্ছে। নবনী জুস সবটুকু খেয়ে মায়ার হাত ধরে টেনে উঠিয়ে বলে,
-“এবার চল আমার শর্ত রাখবি।”

-“কিন্তু যাব কোথায়?”

নবনী উত্তর দেয় না। টেনে নিয়ে আসে কফিশপের বাহিরে।
____________
-“ব্রো একটা প্রশ্ন করি?” ফোনে গেমস খেলার মধ্যেই আপনকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় আদি।

আপন সরু নিশ্বাস ত্যাগ করে বলে,
-“জীনটাই প্রশ্ন হয়ে ঝুলে আছে। তুই আর কি প্রশ্ন করবি। করে ফেল।”

-“তোর জীবনের প্রশ্নটাই আমি জানতে চাই।” ফোনের দিকে তাকিয়ে বলে।

এতক্ষণে আপন বইয়ের পাতা থেকে নজর সরিয়ে আদির দিকে তাকায়। কপাল কিঞ্চিৎ ভাঁজ করে বলে,
-“জীবনের প্রশ্ন মানে?”

-“নাটক আমি দেখি না, তেমন নাটক করা একদম পছন্দ করি না। সত্যিটা জানতে চাই। তুই কি বিয়েতে রাজি আছিস?”

-“অবশ্যই!” জোর করে ঠোঁটে হাসি টেনে বলে আপন।

আদি চোখ তুলে আপনের দিকে তাকায়। বলে,
-“মানুষের ফোস করা হাসি আর ফোস করে কথা বলার মধ্যে পার্থক্য আছে। যেটা এখন তুই আমার সামনে দেখাচ্ছিস এবং বলছিস।”

-“তমন কিছু না ভাই। ব্যস! একটু টেনশন আছি।”

-“কিসের টেনশন?”

-“ঐ…” বাকি কথা বলার আগে ফোন বেজে ওঠে আপনের। তনুজা কল দিয়েছে।

-“ভাবি? ”

-“নাহ! তোর হবু ভাবি তনুজা। তুই বোস, কথা বলে আসছি।”

-“হুম।”

-“আর হ্যাঁ! আমি বিয়েতে সত্যিই রাজি আছি। এই বিষয় নিয়ে আমাকে নেক্সট টাইম প্রশ্ন করিস না।” বলেই ওঠে চলে যায়।
আদি কিছুক্ষণ আপনের পানে চেয়ে থেকে গেম খেলতে মন দেয়।
.
.
.
#চলবে?

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে