আমি তুমিতেই আসক্ত পর্ব-০২

0
743

#আমি_তুমিতেই_আসক্ত।
#পর্ব_২
#সুমাইয়া_মনি।

অনবরত কলিং বেল বেজে চলেছে। গেট খোলার শাড়া শব্দ পাচ্ছে না নবনী৷ বিরক্তিতে অতিষ্ঠ সে। চোখেমুখে ভেসে বেড়াচ্ছে তীব্র রাগ। এতবার কলিং বেল বাজানোর পরও দরজা খুলছে না দেখে এবার হাত দিয়ে জোরে জোর আঘাত করতে লাগলো দরজায়। অন্যদিকে খুন্তি হাতে নিলুফা বেগম তার ছোট ছেলেকে বকাঝকা করছে। তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ুয়া নিয়ান মাথা নত করে মায়ের বকা শুনে যাচ্ছে। বাংলা সাবজেক্টে ফেল করেছে নিয়ান। তাই পেপার হাতে নিয়ে ছেলেকে বকছেন তিনি। কলিং বেলের শব্দ ঠিকিই শুনতে পেয়েছে নিলুফা বেগম। কিন্তু সে মাঝপথে বকুনি ছেড়ে যেতে চাইছে না। এই প্রান্তে যে নবনী রেগেমেগে আগুনের ফুলকিতে পরিনত হচ্ছে, সেদিনে কোনো আন্দাজ নেই তার। শেষে সে নিজেই বিরক্ত হয়ে যায় এভাবে দরজা ধাক্কানো ও কলিং বেলের শব্দ শুনে। রুম ছেড়ে ড্রইংরুমে এসে দরজা খুলে দেয়। নবনী হুড়মুড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করেই তার কক্ষে চলে আসে। নিলুফা বেগম জানত এই মুহূর্তে তার মেয়েই আসবে। কিন্তু মেয়ের এমন আচরণ দেখে সে কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছে নিশ্চয় কিছু একটা ঘটিয়ে এসেছে। আর নয়তো দরজা দেরিতে খোলার কারণে রেগে গেছে। দরজা লাগিয়ে সে তার মেয়ের রুমের দিকে পা বাড়ায়।

নবনী রুমে এসেই সাইট ব্যাগ পাশে ছুড়ে ফেলে ফুল ভলিউমে পাখা চালিয়ে দেয়। রাগ,প্রচুর রাগ হচ্ছে তার। থানা থেকে বেরিয়ে খুশির সঙ্গে দেখা করে আচ্ছা মতো ঝুড়িঝুড়ি বকা দিয়েছে সে। অথচ খুশির এখানে কোনো দোষই ছিল না। ঝাড়ির পর্ব শেষ করে সে চলে আসে বাসায়। বাসায় এসে মেজাজ আরো খারাপ হয়ে যায়। নবনীর বেশি রাগ হলে চুপ করে বসে থাকে। কারো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে না তার। তাই তখন কিছু না বলেই রুমে চলে এসেছে। নিলুফা বেগম হাতে পরিক্ষার পেপার সহ রুমে প্রবেশ করে নবনীর সামনে তুলে ধরে কপাট কন্ঠে বলে,
-“দেখ তোর ভাই এবারো বাংলাতে লাড্ডু পেয়েছে। কঠিন সাবজেক্ট রেখে বাংলাতেই ফের করে বসে আছে।”

নবনী একবার ওর আম্মুর দিকে তাকিয়ে বিরক্ত প্রকাশ করল। মুখ ঘুরিয়ে নিল অন্যদিকে। নিলুফা বেগম চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছেন,
-“সামান্য ছাগল রচনা পারে না। এই ছেলেকে নিয়ে আমি কি করব বল। সে ছাগলকে পরিক্ষার খাতায় ছাগা লিখেছে। কী গুনধর ছেলে আমার।”

নবনী এবারও কোনো কথা বলে না। বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে রেখেছে সে। ভুলে না হয় ছাগলের জাগায় ছাগা লিখেছে, এতে এতো চিল্লাপাল্লার কি আছে। পরবর্তীতে না হয় ঠিক মতো লিখবে। কে বুঝাবে তাকে এ কথা। নিলুফা বেগম নবনীর হাতে পেপারটি ধরিয়ে দিয়ে বলে,
-“নে তোর ভাইয়ের ছাগল রচনাটি একটু পড়। পড়ে দেখ সে কেমন সুন্দর লিখেছে।”

নবনী পেপারটি হাতে নিয়ে বিরক্ত হওয়া শর্তেও ছাগল রচনার উপর নজর বুলায়। চোখ পিটপিট করে জোরে জোরে পড়তে আরম্ভ করে,
-“ছাগা আমরা পাগা। ছাগা ঘাস খায়। ছাগা দুধ দেয়। ছাগার দু’টি পা,দু’টি কান,দু’টি চোখ ও একটি মুখ আছে। ছাগল হামবা,হামবা করে ডাকে….” এতটুকু পড়ে হাসিতে লুটোপুটি খাওয়ার জোগাড় নবনীর। নিলুফা বেগম আরো ক্ষেপে যায়।
দাঁত কিড়মিড় করে বলেন,
-“বেশি করে হেসে নে। ছাগলের ডানটা ঠিক মতো লিখতে পারে না। সে নাকি ভবিষ্যত উজ্জ্বল করবে।”

নবনীর হাসি কিছুতেই থামছে না। একবার চিৎ হয়ে,আরেকবার কাত হয়ে হেসে যাচ্ছে।

-“হইছে থাম এবার।”

নবনী হেসে হেসে বলে,
-“ভাই তোকে নোবেল দেওয়া উচিত। শেষে কিনা ছাগা হামবা হামবা করে ডাকে। ” বলেই ফের হেসে কুটিকুটি।

-“একজন টেনেটুনে পাশ করে সবে কলেজে ওঠেছে। আরেকজন লাড্ডু নিয়ে ঘরে আসছে। যেমন বোন,তার তেমন ভাই। দু’জনই এক।” রেগে বলেন।

-“আম্মু, আমি মোটেও টেনেটুনে পাশ করিনি। আমি…ধুর! তোমার সঙ্গে তর্কে যাবই না।” হাসি থামিয়ে কিছুটা রাগী কন্ঠে বলে।

-“পারলে তো যাবি। আজ থেকে নিয়ানকে তুই পড়াবি। এটা আমার প্রথম এবং শেষ কথা।”

নবনীর মুখ চুপসে যায়। সে ফেসে যেতে চলেছে। নিয়ানকে পড়ানো মানে অর্ধ যুদ্ধ! ঠান্ডা রিয়াকশনে ওঠে কাপড়চোপড় হাতে নিয়ে বাথরুম গিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়। নিলুফা বেগম নবনীর এমন ভাবসাব দেখে সুবিধাজনক লাগছে না দেখে দরজায় শব্দ করে ফের বলে,
-“মনে থাকে যেন,নিয়ানকে তুই পড়াবি।”

-“পারবো না। ওর জন্য নতুন স্যার রেখে দেও।” জোরে জোরে বলে নবীন।

-“একবার বাহিরে এসে বল দেখি কথাটা।”

-“তোমার হাতে খুন্তি দেখেই ভেতরে এসে বলেছি।” বলেই হেসে ফেলে নবনী।

-“বাহিরে তো আসবি নাকি?”

-“ততক্ষণে তুমি চলে যাবে,সেটা আমি জানি।”

-“ফাজিল মেয়ে।” কন্ঠে রাগ নিয়ে কথাটা বলে চলে যায় সে।

আধাঘন্টা বাদে নবনী বাথরুম থেকে বের হয়। আর তখনি নিলুফা বেগম একটি টিফিন বাটি নিয়ে উদয় হয়। কপাল কুঁচকে ফেলে নবনী। নিলুফা বেগম নবনীর চাহনি দেখে বলে,
-“এই বাটিটা সামনের বাড়িতে দিয়ে আয়। ”

-“সেই বাড়িতে তো কেউ থাকে না। তাহলে কি ভূতেদের দিয়ে আসবো?”

-“নাহ! বাড়ির মালিকের বড়ো ছেলে কাল এসেছে। এখন থেকে ছেলেটি এই বাড়িতে থাকবে।”

টেরা চোখে তাকিয়ে বলে নবনী,
-“মানব সেবা শুরু করেছো নাকি।”

-“বেশি কথা বলিস। ছেলেটি পুলিশের চাকরি করে। আমাদের কলোনিতে একজন পুলিশ অফিসার এসেছে। ভেবে দেখ, বিষয়টা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কলোনিতে কোনো সমস্যা হলেই,আমরা তার কাছে সাহায্য চাইতে যেতে পারবো।”

-“এই জন্য তার সাথে ভাবসাব করবে খাবার দিয়ে।”

-“আসলেই তুই বেশি কথা বলিস। ছেলেটি একা থাকে এখানে। কি খায়,রান্না করেছে কিনা আদৌও জানা নেই। যদি আমাদের ঘর থেকে একটু খাবার দিয়ে আসি, তাহলে কি এমন সমস্যা হবে। তুমি বেশি কথা বলিস না৷ গিয়ে খাবারটা দিয়ে আয়৷ তাড়াতাড়ি যা।”

-“এতই যখন দরদাতা, তাহলে তুমিই যাও। নয়তো তোমার ছেলেকে পাঠাও। ”

-“যাবি কি-না।” চোখ রাঙ্গিয়ে বলে।

-“যাচ্ছি!” বলেই মাথার টাওয়াল খুলে বিছানার ওপর ছুঁড়ে মারে। টিফিন বাটি হাতে নিয়ে বিরক্ত সহকারে বাড়ি থেকে বের হয়৷
টিফিন বাটির দিকে একবার তীক্ষ্ণ নজর ফেলে হাঁটতে আরম্ভ করল। গেট থেকে বের হয়ে পাশের বাড়ির গেটের সামনে এসে দাঁড়াল। অদ্ভুত ব্যাপার! পুলিশ অফিসার হয়েও গেটের সামনে একজন সিকিউরিটি গার্ড রাখেনি। কেমন পুলিশ?
এসব ভাবনা ছুঁড়ে ফেলে নবনী লোহার দরজাটি ধাক্কা দেয়। ক্যাচক্যাচ শব্দ হয়ে দরজা খুলে যায়। ভেতরে প্রবেশ করে সে।

সাদা রঙের বাড়িটি। এক পাশে কিছু ফুলের বাগান। কিছু ফুল ফুটে আছে গাছে। নবনী স্বাভাবিক ভাবে হেঁটে দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। কলিং বেল বাজাতে চাইলে দরজা খোলা দেখতে পায়। হালকা দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে ফেলে। এক নজরে পর্যবেক্ষণ করে নেয় ঘরটির চারদিক। প্রথমে ড্রইংরুম। তার পাশে তিনটি রুম দেখা যাচ্ছে। ড্রইংরমটি বেশ সুন্দর গুছানো। নবনীর নজর পড়ে প্রথম রুমটির দিকে। বিব্রত বোধ করছে। একে তো কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। তার ওপর ভাবছে কি বলে তাকে ডাক দিবে, বুঝতে পারছে না।
মনের জড়তা কাটিয়ে প্রথম রুমটির দিকে পা বাড়ায়।
‘কেউ আছেন বলে’ দরজা খুলতেই একটি কালো রঙের কুকুর ঘেউঘেউ করে ওঠে। সম্ভবত কুকুরটি সেই ঘরে আগে থেকেই উপস্থিত ছিল। অপরিচিত কন্ঠের স্বর শুনে কুকুরটি ঘেউঘেউ করতে আরম্ভ করে। নবনী ভয়তে হকচকিয়ে লাফিয়ে উঠে। জোরে চিৎকার দিয়ে বাড়ি থেকে বের হতে নিলেই কারো গায়ের সঙ্গে মাথায় ধাক্কা লেগে এক দু ইঞ্চি দূরে সরে যায়। যেন মনে হয়েছে কোনো ইটের চাকা। হালকা ব্যথাও পেয়েছে মাথায়। নবনী মাথা তুলে সদ্য আগত ব্যক্তিকে দেখে থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকে। এ যে আর কেউ নয়। সকালের সেই নতুন ওসি নিভ্র।

নিভ্রর তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া নেই নবনীকে দেখে। যেন সে আগে থেকেই যানত নবনী এখানে আসবে। কিন্তু নবনীর চোখ বেরিয়ে আসার জোগাড় হয়েছে। কুকুরটি এখনো ঘেউঘেউ করে যাচ্ছে সেটা এখন আর কান অবধি পৌঁছাছে না তার। নিভ্র শান্ত চোখে তাকিয়ে আছি নবনীর দিকে। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে নবনীর অবাক জড়িত ফেইস। নিভ্র কয়েক সেকেন্ড চেয়ে থেকে তার কুকুরটির দিকে ইশারা করে বাহিরে যেতে বলে। কুকুরটি নিভ্রর সংকেত বুঝতে পেরে চুপ হয়ে হেঁটে বাহিরে চলে যায়। নিভ্র আবারও নজর তাক করে নবনীর দিকে। নবনীর অবাক মুখখানি এখনো আগের ন্যায় স্থির । সরু চোখে নবনীকে পর্যবেক্ষণ করে নিভ্র।
গায়ে গোলাপি রঙের থ্রিপিস । ভেজা চুল কোমড় পর্যন্ত ছেঁয়ে আছে। চুল থেকে টুপটাপ পানি ঝড়ছে। চোখেমুখে এখনো তার বিস্ময়। হাতে তার টিফিন বাটি। পর্যবেক্ষণ শেষ করে নিভ্র নরম স্বরে নবনীর উদ্দেশ্যে বলে,
-“এখানে কেন এসেছো?”

নবনী নিভ্রর কথা শুনে ভাবনার জনত থেকে বেরিয়ে আসে। এতক্ষণ সে ভাবছিল, নিভ্র এখানে কি করছে? তাহলে এটাই কি তার বাড়ি। আরো অনেক কিছু। নবনী চট করে মাথা নিচু করে কোমল স্বরে বলে,
-“আমি আপনার বাসার সামনের বাড়িতে থাকি।”

-“তো?” ছোট করে উত্তর দেয় নিভ্র।

-“আম্মু আপনার জন্য খাবার পাঠিয়েছে। এটা দিতে এসেছিলাম আপনাকে।” মাথা নত রেখেই টিফিনের বাটি এগিয়ে দেয় নিভ্রর দিকে।

নিভ্র হাতে নেয়। সোফায় গিয়ে বসে বলে,
-“তুমি এখন যেতে পারো।”

নবনী নিভ্রর কথা শুনে কিছুটা ক্ষোভ নিয়ে তাকায়৷ খাবার দিতে এসেছে,ভদ্রতার খাতিরে বসতে না বলে, যেতে বলছে। এ কেমন লোক? নবনী ভাবনা কাঁটিয়ে চলে যাওয়া ধরলে নিভ্র পিছন থেকে ডাক দেয়।
-“শোনো।”

নবনী থেমে গিয়ে দৃষ্টি নত রেখে ঘুরে দাঁড়ায়। নিভ্র উৎসুক কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
-“তোমার নাম কী?”

-“নবনীতা নূর। সবাই নবনী বলে ডাকে।” ধীরে কন্ঠে উত্তর দেয়।

-“আচ্ছা। আন্টিকে গিয়ে আমার তরফ থেকে ধন্যবাদ বলে দিও। যাও!”

নবনী মাথা দুলিয়ে হ্যাঁ সম্মতি দিয়ে বের হয়। মেইন গেট থেকে বেরিয়ে বুকে হাত রেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। যেন এতক্ষণ নিশ্বার বুকের ভেতরে কোথায়ও আটকে ছিল। চলে আসে বাসায়। নিলুফা বেগমকে নিভ্রর কথাটা বলে। তারপর নিজের রুমে এসে নিভ্র কথা মায়াকে ফোন দিয়ে বলতে আরম্ভ করে।
____________________
পরের দিন সকালে….

বিরতিহীন ফোন বেজে চলেছে নবনীর। বেঘোরে ঘুমুচ্ছে সে। ফোন ধরার হেল দোল নেই তার। এক পর্যায়ে ফোনের শব্দ তীব্রভাবে কানে এসে লাগে। কোনো মতে চোখ মেলে তাকায়। বিছানা হাতড়িয়ে ফোন পীক করে কানে দেয়। অপর পাশ থেকে জোরে চিৎকারের আওয়াজ শুনে নবনী ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে ফোন কান থেকে বিছানার উপর ফেলে দেয়। আকস্মিকতায় চোখ কচলিয়ে তাকায় সে। বোঝার চেষ্টা করছে ফোনের অপর পাশ থেকে চিৎকার দেওয়া ব্যক্তিটি কে ছিল? কেন এত জোরেই বা সে চিৎকার দিল? এভাবে চিৎকার দেওয়ার কারণ কি ছিল?
.
.
.
#চলবে?

কার্টেসী ছাড়া কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে