আমার শাশুড়ি মায়ের কপালটাই যেন আমার হয় (ছোট গল্প)

0
278

#আমার_শাশুড়ি_মায়ের_কপালটাই_যেন #আমার_হয়।

আমার শ্বশুর গত হয়েছেন প্রায় পঁচিশ বছর।আর তারও দশ বছর পর আমার বিয়ে হয়েছে।
কিন্তু আমাদের সংসারে আমার শাশুড়ির কথায় শেষ কথা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কিছু বললে হয়ত ভাবনা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু আমার শাশুড়ির এক একটা কথা আমার শশুরবাড়ির লোকেদের কাছে নির্বাহী আদেশ।বিনা ব্যর্থতায় তা করতে হবে।
কোন ভাবনা চিন্তা নেই, মা বলেছে তো করতে হবে, করতে হবেই,করবেই।
আব্বা মারা যাবার পর আমাদের পরিবার এখনও একসাথে এতটা বছর পরও টিকে আছে শুধু আম্মার জন্য। আমার দাদাশ্বশুর মারা গেছেন আব্বা মারা যাওয়ার আরও পনেরো বছর আগে।তবুও এখন পর্যন্ত আমার ননদের সাথে আমার ফুফু শাশুড়িরা তিথি, পর্ব, ঈদ, পালা,মৌসুম,জালসায় নাইয়োর খেয়ে আসছে আজ অবধি। গত শীতে আমাদের শীতের পিঠার আয়োজন হয়েছে দুশো জনের বেশির।
আম্মার কখনও এই চিন্তাটা করতে হয়না,
ছেলেদের বলব টাকা আছে তো?
আনতে পারবে তো?
তিনি শুধু আমাদের অর্ডার করবেন। শেলী ফোন দাও তো গ্যাদার (ছেলে) কাছে।কিংবা আমার আরেক জা কে বলবে বলাকা, ফোনটা নিয়ে আসো।
মা কী আনতে বলেছে,
কেন আনতে বলেছে এটা কোন বিষয় নয়। মা বলেছে আনতে হবে।
টাকা নেই বাঁকি নিবে।
বাঁকি নেই হাওলাদ করবে।
যেখান থেকে পারবে নিয়ে আসবে।
কোন মেয়েকে কী দিতে হবে।
কোন নাতির জন্য কী কিনতে হবে।
মেয়ে জামাই এলে কী আপ্যায়ন হবে।
কার অসুস্থতায় কত টুকু করতে হবে।
কার বিয়েই কী উপহার যাবে।
সব তার আদেশে হবে। শুধু বলবেন,কাজ ওকে।

আম্মার সত্যিই রাজকপাল।তার সন্তানেরা কখনও মায়ের সেবা নিয়ে ঠেলাঠেলি করেনা।বরং এক ভাই অন্য ভাইদের আগোচরে বলেন মা,তুমি কোন ভাইয়ের থেকে কিছু চাইবে না।যখন যা প্রয়োজন আমাকে বলবে।এভাবে সবাই নিজের থেকে তার দায়িত্ব পালনে উদগ্রীব হয়ে থাকে।আম্মা অসুস্থ হলে কে কত টাকা খরচ করল আমার বিবাহিত জীবনে এমন বৈঠক কোনদিন বসতে দেখিনি।বৃদ্ধ বয়সে চিকিৎসা খরচও নেহাৎ কম নয়।

তবে সন্তানদের অস্থিরতা দেখেছি। আম্মা হঠাৎ অসুস্থ হলো।এক ছেলে নৌকা নিয়ে হাজির।আরেক ছেলে ঘাটে এম্বুলেন্স নিয়ে অপেক্ষা করছে। আরেকজন পাঁচ রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে প্রতিক্ষা রত। ছয়টা ননদ আমার। বড় আপাকে হারিয়েছি চার বছর প্রায়।এখন পাঁচজন। কিন্তু কেউ কারো মুখ চেয়ে বসে থাকেনা। যে যার মত ছুটে চলে আসে।

আমি এসব দেখি আর ভাবি কতটা সৌভাগ্য হলে সন্তানদের এমন নিঃসৃত ভালোবাসা পাওয়া যায়। ভাবি আহ! জীবনের শেষ সময়েও কতটা তৃপ্ত তিনি সন্তানদের প্রতি।সধবা হয়েও কতজনের অশ্রুজলে দিন কাটছে। আম্মার প্রতিটা সন্তানের মধ্যে মানবিক ও নীতিশিক্ষা খুবই বেশি।

সংসার করতে যেয়ে কখনও এদিক সেদিক হয়না তা বলব না।কিন্তু আমার বড় তিন জা কে কোনদিন দেখিনি দায়িত্বে অবহেলা করতে। কখনও কখনও তারা স্বামীকে অনুযোগ করেন না, তা নয়।কিন্তু অভিযোগ ওখানেই শেষ। এ নিয়ে আম্মাকে কিছু বলার স্পর্ধা সন্তানদের নেই।

একবার আম্মা ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হলেন।আমার বাসায় এসেছেন। আমি তো ভয়ে আছি। কোথায়,কখন তার কোন ত্রুটি হয়! ছোট বউ হওয়ার সুবিধায় আমিই সংসারে বেশি ফাঁকিবাজ এবং সুযোগ সন্ধানী।পড়লাম বেকায়দায়। ডক্টর ইনডোস কপি করতে দিলেন।গ্রামের সরল মানুষ আম্মা, ভয় পাচ্ছেন। আম্মা বললেন শেলী তুমি গেলে আমি ভরসা পাব।টেস্টের সময় আম্মা খুব ভয় পাচ্ছিলেন। আমি আম্মাকে সাহস দিলাম। দুহাত দিয়ে আম্মাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বললাম আম্মা আপনার যদি একটুও লাগে আমি সাথে সাথে ডক্টরকে বলব নল বের করে নিতে । শিশুর মত আম্মা আমাকে জড়িয়ে ধরে আছেন।চোখে শঙ্কা আর ভয়।আমি বারবার আশ্বস্ত করছি।পপুলারে টেস্ট হচ্ছে।ডক্টর ছিলেন হালিমুর রশিদ।টেস্ট কমপ্লিট হওয়ার পর স্যার আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন আচ্ছা ম্যাডাম রোগী আপনার কে মা না শাশুড়ি? আমি বললাম শাশুড়ি মা।তখন স্যার তার এসিস্ট্যান্টকে বলছেন দেখেছো, বললাম না শাশুড়ি। এসিস্ট্যান্ট বললেন স্যার আজকের দিনে শাশুড়িকে কেউ এতটা আপন ভাবে এটা তো দূর্লভ। স্যার বললেন ঘন আঁধারের মাঝে একটা আলোকিত বিন্দু সহজেই চোখে পড়ে। স্যারের কথাটা খুব ভালো লেগেছিল আমার।

সন্তানদের অনুগত্যের আরেকটু উদাহরণ দেই। আমাদের বাড়িটা অনেক পুরনো।শুনেছি কোন কোন ঘরের চাল দাদাশ্বশুর কিংবা শশুরের সময়ের। ঘর করাটা বেশ জরুরি। বাবুর আব্বুকে বললাম দুটো রুম করো।আমাদের তো বছরে দুবারের বেশি যাওয়ায় হয়না। বললেন তাই করব।আম্মা শুনে বললেন দুটা রুম না তিনটা করো।আমার মেয়েরা আসে। সাথে সাথে সিদ্ধান্ত চেন্জ।
তারপর বললাম, করছ যখন টিন দিওনা।দশ বছর পর আবার রিপিয়ারিং এর ঝামেলা। বলল এত টাকা খরচ করা সম্ভব নয়।আমিও বুঝলাম করোনার প্যান্ডামিকে
আমাদের বেশ জটিল সময় পার করতে হয়েছে( আলহামদুলিল্লাহ)। আম্মা বললেন আশে পাশে সবাই ছাদ করছে তুমি ছাদ দাও।প্রয়োজনে দু একবছর পরে দাও।সাথে সাথে ডিসিশন চেঞ্জ। পাঁচ ছয় লাখের কাছে ইংশাআল্লহ্ এখন বিশ লাখের আয়োজন শুরু হয়ে গেছে ।

আমি বিষয়গুলো উপভোগ করি।সন্তানদের এমনই হওয়া উচিত।স্ত্রীরা আসবে একেকজন একেক পরিবেশ থেকে।সমস্যা,ফ্যাসাদ হবেই। কিন্তু সন্তান হয়ে আপনার বাবা মায়ের সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য থাকবে সবার ওপরে।
আজকের দিনের বউয়েরা নতুন জীবনে আলাদা থাকতে চায়, শশুর-শাশুড়িকে আলাদা রাখতে চায়। কিন্তু বৃদ্ধ হয়ে সেই বউ ই আবার বৃদ্ধাশ্রমে যেতে ভয় পায়।

প্রকৌশলীর মৃত্যতে আমরা ব্যথিত হচ্ছি।ফেসবুকে অন্যের বাবা মায়ের কষ্ট দেখে আফসোস করছি।কিন্তু নিজের ঘরের মা টাও মানুষ। বাবাটাও আমার প্রিয়জন।
আগে তাদের সুখ-দুঃখের, সীমাহীন ত্যাগের মর্যাদা দিতে হবে। তারপর না হয় অন্যের পিতামাতাকে নিয়ে উপন্যাস লেখা যাবে।

আমিও একদিন বৃদ্ধ হব।আজ আম্মার প্রতি আমার দায় সময় তার প্রতিদান হয়ে সুদে আসলে ফিরিয়ে দেবে।
আমি মুনাফা চাইনা। শুধু আম্মার প্রতি তার সন্তানেরা এবং আমি ছেলের বউ হয়ে যতটুকু করছি ততটুকুই যেন ফিরে পাই।এইটুকুনই আমি চাই।

আমার শাশুড়ি মায়ের কপালটাই যেন আমি পাই।

কুলছুম শেলী

সমাপ্ত।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে