আমরা

0
845
শান্তিনগর কাচা বাজারে হঠাৎ নাহারের সাথে দেখা হয়ে গেল। প্রায় তিন যুগ পর দেখা তারপরও ওকে আমার চিনতে আসবিধা হল না।সেই মুখ সেই টানা চোখ আমরা বন্ধুরা ওকে বলতাম টিভির সেই যুগের নায়িকা প্রিসিলা পারভিন। নাহার তখন দুইটা ব্যাগ ভর্তি বাজার সদাই সহ রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল হয়তবা রিকশা খুঁজছিল । আমি দূর থেকেই ওকে ডাকলাম নাহার !এই এই নাহার!
আমার ডাক শুনে ও এদিক ওদিক তাকিয়ে ওর নাম ধরে ডাকের উৎস খুঁজতে লাগলো ।আমি তখনও কিছু দূরে ওর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে হাত নেড়ে ডাকলাম এবার সে আমার দিকে তাকালো।আমি ততক্ষনে ওর কাছাকাছি চলে এসেছি । তুই নাহার না? আমি দেখলাম ও কিছুক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে থাকল । এর পরের ঘটনা বলাইবাহুল্য । রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়েই আমরা দুই বন্ধু পরস্পর কে জড়িয়ে ধরে আছি ।নাহার শুধু হেচকি তুলে বলতে লাগলো ফরিদা তুই সত্যি আমার ফরিদা! রাস্তার মাঝখানে দুই বন্ধু সমান তালে কেঁদেই চলেছি । নাহার আমি আর রাশেদা ছিলাম এস এস সি ৭৮ সালের ব্যাচ। আমাদের বালিকা বিদ্যালয়ে আমরা ছিলাম এক আত্মা। অনেকেই আমাদের নাম দিয়েছিল চার্লিস এঞ্জেল । স্কুলের পুকুর পাড়ের খেজুর গাছের নিচে টিফিনের সময় আমাদের আড্ডা চলত। আমাদের তিন জনার বাসা ছিল শহরের তিন পাড়ায় । রমজানের সময়এক মাস স্কুল ছুটি হলে আমরা খুশির বদলে দুঃখী হয়ে যেতাম । সেই জন্যে আমরা করতাম কি! চিঠি লিখতাম ।
একবার রাশেদার বড় বোনের বিয়েতে আমরা এক ই রকমের জামা বানিয়েছিলাম । নাহার ছিল আমাদের তিন জনার মধ্যে সব থেকে সাহসী ।এস এস সির রেজাল্ট হওয়ার আগেই নাহারের বিয়ে হয়ে যায় । নাহারের বিয়ে হওয়ার পর আমাদের একটা ডানা যেন ভেঙ্গে গেল । বিয়ের প্রথম প্রথম বাবার বাড়ি এলেই আমাদের দেখা হত। ও তখন শুধু ওর বরের গল্প করত। আমরা দেখতাম আনন্দে ওর গাল চিকচিক করছে। ধীরে ধীরে ওর বাবার বাড়ি আসা কমে যায় সংসার নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়ে তাছাড়া ওর বাবা মা মারা যাওয়াতেও এমনটা হয়েছিল । আর রাশেদা ছিল ভিতুর ডিম তেলাপোকা দেখলেও লাফ দিত। প্রাকটিক্যাল ক্লাসে ব্যাঙ কাটতে গিয়ে ফিট হয়ে পড়ে গিয়েছিল । রাশেদার বাবার বদলির চাকরি ছিল ওরা বদলি হয়ে পঞ্চগড়ে চলে গিয়েছিল তখন আমরা এইচ এস সি পাশ করে ফেলেছি । আমি ভর্তি হলাম রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে ।রাশেদা চলে গেল পঞ্চগড় হায় মাঝে হল ছাড়াছাড়ি গেলেম কে কোথায় ! নাহার কে দেখে কত কথা মনে পড়ে যাচ্ছে । সেদিন নাহার আমাকে অনেকটা জোর করে ওর শান্তিবাগের বাড়িতে নিয়ে গেল । রাস্তায় রিক্সায় বসেই নাহার আমাকে বলল রাশেদার সাথে ওর যোগাযোগ আছে । ভিতুর ডিম রাশেদা একটা স্কুলের প্রন্সিপ্যাল ।ওর স্বামীর সাথে অনেক বছর আগেই ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে । একটাই মেয়ে স্বামীর সাথে দুবাই থাকে । প্রায় পনের কুড়ি মিনিট পর আমাদের রিক্সা এসে থামে একটা তিন তলা বাড়ির সামনে । নাহার সিঁড়ি দিয়ে এই ভারী বাজারের ব্যাগ দুটো হাঁপাতে টেনে তুলতে লাগলো । আমি অনেকবার হাত থেকে নিয়ে গিয়েও ও নিতে দিলনা । ফরিদার বাসায় পৌঁছে দরজা খোলার সাথে সাথে প্রথমে যে কথাটা আমার কানে এলো তা হল কি ব্যাপার আম্মা গেছেন সেই কোন সকালে এতক্ষন রাস্তায় কি করলেন? এতটুকু বাজার করতে এতক্ষন সময় লাগে ? রান্নাবান্না কখন করবেন ? বাসায় বুয়া নাই জানেন না? হুট করে নাহারের পিছনে আমাকে দেখেই সেই কন্ঠ থেমে গেল । লুবনা এ হচ্ছে আমার বান্ধবী ফরিদা ।অনেক দিন পর দেখা ।তাই সাথে করে আনলাম । ফরিদা এ হচ্ছে আমার ছেলে রাসেলের বউ লুবনা ।নাহার আমার সাথে ওর ছেলের বৌয়ের পরিচয় করিয়ে দেয় । আমি ভিতরে এসে বসি । খুব সাদামাটা ভাবে সাজানো । নাহারের দুই নাতি নাতনী এসে দাদি বলে নাহার কে জড়িয়ে ধরে । আমাকে বসিয়ে রেখে নাহার ভিতরে চলে গেল আর আমি সোফায় বসেই শুনতে পেলাম লুবনার চাপা কণ্ঠস্বর নাহারের ইচ্ছে আমাকে দুপুরের খাবার খাইয়ে তারপর পাঠাবে কিন্তু লুবনার কথা দুপুরের খাবারের দরকার কি! চা বিস্কুটেই যথেষ্ট । আমি দেখলাম এতে নাহারের ই হার হল ,ও মন মরা হয়ে আমার পাশে এসে বসলো । আমি সেদিন কিছু না খেয়েই বিদায় নিলাম ওদের বললাম আমার তাড়া আছে আরেকদিন আসব । নাহারের কাছে আমার বাসার ঠিকানা আর ফোন নাম্বার রেখে এলাম । সাথে করে আনলাম রাশেদার ঠিকানা ।
আমি বাংলাদেশে এসেছি আজ থেকে দেড় বছর আগে । দীর্ঘকাল ফ্লোরিডায় স্বামী আর ছেলে মেয়ে নিয়ে আমার বসবাস ছিল । ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেল। তাঁদের বিয়ে থা দিলাম । শরিফ মানে আমার স্বামী হুট করে হার্ট ফেল করল আর আমি হয়ে গেলাম একা। ছেলেমেয়েরা যে যার মত সবাই ব্যাস্ত। সেই সময় আমাকে একটা সময় ওল্ড হোমে রাখার প্লান হচ্ছিল । আমি ছেলে মেয়েকে বললাম দেশে চলে যাব ।মরলে দেশেই অথচ যে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি ইচ্ছে করলেই ভাল চাকরি করতে পারতাম । আমার স্বামীর এক কথা ছিল বাচ্চাদের মানুষ কর । আমাদের কিসের অভাব । আমি এখন বাসাবোতে একাই একটা বাসায় ভাড়া থাকি ।ভাই , ভাসুর তাঁদের ছেলে মেয়েরা মাঝে মাঝে আসে । জুলেখা সকালে এসে ঘরের সব কাজ করে দিয়ে যায় । বাসায় ফিরে আমি রাশেদাকে কল করি । পারলে ও উড়ে তক্ষনি চলে আসে । এর পর আমাদের তিন জনার কয়েকবার দেখা হয়েছে । আমরা আড্ডায় মেতে উঠেছি সেই ছেলেবেলার মত । একদিন ভোর বেলা নাহার এসে হাজির ।চোখ মুখ ফুলে একাকার । বোঝা যাচ্ছে অনেক কেঁদেছে ।আমি ওর হাত ধরে বিছানায় এনে শুইয়ে দেই । মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলি ”নাহার এখন কিছু শুনব না তুই ঘুমা” নাহার সেই যে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গেল উঠল দুপুর গড়িয়ে বিকেল বেলা । ”কি রে ঘুম হল” আমি হাসতে হাসতে বলি । এই ফাঁকে আমি রাশেদাকে ফোন করে ডেকে এনেছি । তিন বন্ধু এক সাথে ছাদে বসে বিকেল দেখি এক সাথে চা খাই । রাতে এক সাথে বসে বাংলা সিনেমা দেখি । ফরিদা তুই তোর এই বাসায় আমাকে থাকতে দিবি ? আমার হাত চেপে ধরে নাহার । কি বলিস দেব না মানে তোর যত দিন ইচ্ছে থাক । আমি আর ঐ বাড়ীতে ফিরে যাবনা । লুবনা কথায় কথায় আমাকে খাওয়ার খোটা দেয়। জানিস বাড়ির সব কাজ আমি করি । ছেলেটা আমার গাধা হয়েছে। ভাল মন্দ ঠিক বেঠিক কিছুই দেখেনা ।বউ যা বলে তাই । নাতি নাতনী দুটার জন্যে জান টা পোড়ায় । আমাকে ছাড়া ওরা কিছুই বোঝেনা । এবার আমি বুকে পাথর বেঁধেছি । নাহার কাঁদতে থাকে । আমি ওকে কাঁদতে দেই । আমি ভাবি এই সেই নাহার যে আমাদের মধ্যে সব থেকে সাহসি ছিল । সেই যুগে রাস্তায় ছেলেদের সাথে তর্ক করত ।একবার একটা ছেলেকে সেন্ডেল ছুঁড়ে মেরেছিল । রাশেদাকে দেখে খুব ভাল লাগে সেই ভিতুর ডিম একটা স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল। আমি দুই জনকেই বলি তোরা আমার সাথে থাক । আমরা আবার সেই সব দিনের মত হাত ধরাধরি করে এক সাথে চলব । দুই জন ই মহা খুশি। এক কথায় রাজি । নাহার তো বলেইছে সে আর ফিরে যাবেনা ছেলের সংসারে । দুই দিন পর ভোর বেলায় উঠে দেখি নাহার বারান্দায় বসে কান্নাকাটি করছে। আমি পায়েপায়ে এগিয়ে যাই । কি হয়েছে রে ? আমি জিজ্ঞাসা করি বাড়ির জন্যে মন কেমন করছে । নাতি নাতনী দুটা আমাকে ছাড়া কিচ্ছু বোঝেনা । এই দুই দিন আমাকে না দেখে না জানি ওর বাবা মাকে কত বিরক্ত করছে । বলেই নাহার বাচ্চাদের মত চোখ মুছতে থাকে । কিন্তু তোর ছেলে তো তোর কোন খোঁজ করল না । আমি বলে উঠি আমি দেখলাম আমার কথায় নাহার কর্ণপাত করল না । বারাবার আমাকে বলতে লাগলো আমি যেন ওর ছেলেকে ফোন করে ওকে এসে নিয়ে যেতে বলি । সংসারের মায়া বড় অন্যরকম। সেদিন ই নাহার ওর ছেলের সাথে এক মুখ আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরে গেল । তারও দুই দিন পর রাশেদাও চলে গেল । স্কুলের কি একটা জরুরি মিটিং যেতে হবে। ও অবশ্য বলে গেল মাঝে মাঝে এসে আমার সাথে থাকবে । অতএব দিন শেষে আমি সেই একা ।একাকী জীবন আমার । গাছপালা ধুলো বালি ইট পাথর আঁকড়ে ধরে আমি বাঁচার জন্যে হাসপাশ করি । আমিও হয়ত একদিন নাহারের মত ফিরে যেতে চাইব আমার সন্তানদের মাঝে । আমি নাহার রাশেদার মত অনেকেই হয়ত জীবনের সরল অঙ্ক এভাবেই মেলানোর গতিপথ খুঁজে ফেরে

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে