আনন্দচারিনী

0
2362

আরেক বার ভেবে দেখ!
এক মাসের বেতনের চেয়ে বেশি পাবে।১৫,০০০ পাবে। ব্যাপারটা আমি তুমিতে সীমাবদ্ধ থাকবে।কেউ জানবে না!!!
কথা গুলো সিনিয়র স্টাফ লাবিব ভাই গার্মেন্টস কর্মী নিরুর উদ্দেশ্যে বললেন।কাঠঠোকরার ঠোঁটের মত অন্তর্ঘাত করল নিরুর অন্তরে। মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিল নিরু। জানাবেন না কেন? অন্তত ভাবীকে জানালে দোষের কিছুই দেখি না আমি! নিতুর সরীসৃপের মত শান্ত চাহনি আর বলার নির্বিকার ভঙ্গি দেখে থতমত খেলেন লাবিব ভাই। নিঃশব্দে চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলেন।ভ্রু কুঁচকে নিজের কাজে হাত চালাল নিরু।

নিরু! অনামিকা আক্তার নিরু। রহমান সাহেবের বড় মেয়ে।মেজো মেয়ে নীরা আর ছোট মেয়ে নিপা।তিন মেয়েকে নিয়ে রহমানের সংসার।পুএ সন্তানের আশায় বুক বেধে নিপাকে জন্ম দিতে গিয়ে জাহানারা আক্তারের রক্তের ক্ষরন হয়।সময়মত রক্তের অভাবে মারা যান জাহানারা আক্তার ও রক্ত যোগাড় করতে ব্লাড ব্যাংকে পৌঁছানোর সময় সড়ক দুর্ঘটনায় এক পা হাড়ান পুলিশ কনস্টেবল রহমান সাহেব।ফলে চাকুরী হারাতে হয় তাকে। পদ্মার ধস নামে রহমানের সংসারে। মাতৃ মৃত্যুর শোক আর পঙ্গু বাবা ও অপাপ্ত দুই বোনের ভার কাধে নিয়ে জীবন যুদ্ধে পরাজিত সৈনিকের মতো আকাশ পানে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।বাস্তবতার চরম কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে ফলবান বৃক্ষের মত নুইয়ে পড়ে যায় সংসারের ভারে। ভার্সিটি পড়ে কলেজের লেকচারার সপ্নকে মনের মধ্যে মাটি চাপা দিয়ে দেয়। সদ্য ইন্টারমিডিয়েট পাশ করা সতেরো বছরের নিরু হন্যে হয়ে চাকুরী খুঁজে বেড়ায়। প্রতিবেশী মহিলাদের সাথে যোগ দিল গার্মেন্টসে। গার্মেন্টসে চাকুরী করার সময় নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাকে। কখনো চিৎকার করে প্রতিবাদ করেছে কখনো কখনো দুচোখে চির সহিষ্ণু ভাব নিয়ে নির্বিকার চিত্তে তাকিয়ে ছিল। দেখতে দেখতে চার বছর পার হয়ে গেল।নীরা এস.এস.সি পরিক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে। ছোট্ট নিপা চার বছরে পা দিল। নিপার আধবুলি বলার ভঙ্গি আর নেচে নেচে চলা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়।আজ নিপার জন্মদিন।

“কিরে নিরু বাসায় যাবি না?” রহিমা আপার কথাই অতীতের রোমন্থন থেকে ফিরে এল নিরু। হকচকিয়ে গিয়ে উওর দিল হ্যা,চল আপা।বাম হাতে টিফিন ক্যারিয়ার আর ডান হাতে ছোট পার্টস ব্যাগ নিয়ে মাথায় আধ হাত ঘোমটা দিয়ে বের হয়ে গেল গার্মেন্টস থেকে।
রহিমা আপা নিরুদের প্রতিবেশী।সে প্রত্যেকদিন তার সাথে আসা যাওয়া করে। রহিমা আপার স্বামী পিকআপ ভ্যান চালক।সব সময় কাজ না থাকায় স্বামীর আর্থিক সমস্যা মিটাতে নিরুর সাথে কাজ করে সে। তাদের এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে মেয়েরা উভয়েই মিরপুরের বস্তির পাশের আয়ডিয়াল স্কুলে ক্লাস টু পড়ে।
নিতুর বাসা থেকে গার্মেন্টসের দুরুত্ব আধা মাইল হওয়ায় পায়ে হেঁটে বাসায় যায়। বাড়ি ফেরার পথে রাস্তার পাশে কনফেকশনারির দোকান থেকে জমানো টাকা দিয়ে ছোট্ট একটি জন্মদিন কেক ও একটা মোমবাতি কিনে নেয়।সাথে করে কিছু ডেইরী মিল্ক চকোলেট নেয়। চকোলেট নিপার কাছে খুব প্রিয়। দেখতে দেখতে নিরু বাসার সামনের গলিতে এসে পড়ে।একটু দূরে থেকে সে রংচটা টিনসেড দোতলা বাড়িটা দেখতে পায়। দোতলায় ভাড়া থাকে নিরুর পরিবার। দুই রুম ও একটা ছোট্ট রান্নার ঘর আছে।একটা রুমে নিতুর বাবা ও নিপা থাকে।অন্যটায় নিরু ও নীরা।গলি পেরিয়ে বস্তির মধ্যে দিয়ে হেঁটে বাসার সামনে এসে পড়ে এবং কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলার দরজার কাছে গিয়ে দরজাটা নক করে। দুই তিনবার নক হতে দড়জা খুলে যায়।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে