অহেতুক অমাবস্যা – পর্ব ১ (বিরক্তির একটি দিন)

"এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে। আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি সাপ্তাহে জিতে নিন বই সামগ্রী উপহার। আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এখানে ক্লিক করুন "

#অহেতুক_অমাবস্যা
পর্ব ১ – (বিরক্তির একটি দিন)
লেখা : শঙ্খিনী

মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে কচ্ছপের গতিতে। এই ফ্যান চালিয়ে রাখা আর বন্ধ করে রাখার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। শুধু শুধু বিল উঠছে। উঠুক! বিল তো অফিস থেকেই দিতে হবে। এই ভ্যাপসা গরমে ধীর গতিতে ফ্যান ঘোরার কারণে গরমটা কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে। এর পেছনে কোনো সায়েন্স আছে না-কি? নিশ্চয়ই আছে।

জাহানারার খুব শখ ছিল সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করার। কিন্তু বাবা পরিষ্কার গলায় বলে দিয়েছিলেন, “সায়েন্স নিয়ে কী করবা? ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়া মাইয়ামানুষের কাম?”। কাজের কোনো ধর্ম নেই, নেই কোনো জাত। পুরুষমানুষ যে কাজ করতে পারে, মেয়েমানুষ তা করতে পারবে না কেন? – এই কথা বাবাকে কে বোঝায়? তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই কমার্স নিয়ে লেখাপড়া করে জাহানারা।

জাহানারার কেবিনটা বিশাল। তবে শুধু তার কেবিন বললে ভুল হবে। জাহানারা এবং অর্থ, দু’জন কাজ করে এই কেবিনে। কেবিনের দু’প্রান্তে দুটো ডেস্ক। ল্যাপটপে কী যেন কাজ করছে অর্থ। ফ্যান ঘুরছে না, এ নিয়ে বিন্দুমাত্র বিরক্তি নেই ছেলেটার মধ্যে।

জাহানারা বিরক্ত গলায় বলল, “এই অর্থ! ফ্যানটা তো এখনো ঠিক করলো না!”
অর্থ ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই বলল, “কোনোদিন করবেও না। আমাদের মতো কর্মচারীদের যে ফ্যান দেওয়া হয়েছে, এই তো অনেক।”
“এটা কোনো কথা হলো! আমরা সারাদিন এত কাজ করি আর আমাদের ফ্যানটাই নষ্ট। আর ওদিকে ম্যানেজার সাহেব কোনো কাজ না করে এসির হওয়া খাচ্ছেন।
অর্থ চুপ করে রইলো।
“জানেন অর্থ, আমার মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে, বাসা থেকে একটা ফ্যান খুলে এনে এখানে লাগিয়ে দেই।”
“বাবাহ্! আপনার বাসায় তাহলে নিশ্চয়ই অনেক ফ্যান।”
জাহানারা লজ্জিত ভঙ্গিমায় বলল, “না, না। অনেক ফ্যান আসবে না কোত্থেকে? ওই আমার মা এখন আর একা ঘরে থাকতে পারে না। বয়স হয়ে গেছে তো, ভয় পায়। তাই আমার সঙ্গে আমার ঘরে থাকে। তার ঘরের ফ্যানটা তো বন্ধই পড়ে থাকে, এজন্য বললাম আর কী!”
“কী অদ্ভুত না? একই জীবনে একবার বাবা-মা আমাদের অবলম্বন হয় আর একবার আমরা তাদের।”
“অদ্ভুত হোক আর যে ভূতই হোক, আসল কথা হলো মাথার ওপরের ফ্যান ঘুরছে না। এই অসহ্য গরমের মধ্যে মাথাটা আরও গরম হয়ে যাচ্ছে।”
“আপনি পিয়নকে বলে দেখুন তো, কিছু করতে পারে কিনা।”
“একদিন আর দুদিন বলেছি! গত সাতদিন ধরে বাসায় ফেরার সময়ে ফ্যানের কথাটা বলছি। প্রত্যেকদিন দাঁত কেলিয়ে বলে, কোনো টেনশন নিয়েন না আপা। ফ্যান ঠিক হয়ে যাবে।”

নাম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বান্দা হাজির। পিয়ন মতিন মিয়া কেবিনের দরজা খুলে উঁকি মারল। এই লোকের একটাই দোষ, যেকোনো কোথায় নিজের বত্রিশ দাঁত বের করে হাসে।

হাসতে হাসতেই বললেন, “আপা, ম্যানেজার সাহেব আপনেরে বোলায়।”
জাহানারা বিরক্ত গলায় বলল, “কেন?”
“আমি কেমনে বলুম?”
“আচ্ছা যান, আমি আসছি।”

জাহানারা বিরক্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালো। অর্থ এবার তাকালো তার দিকে। সারাজীবনই মেয়েটার চোখেমুখে বিচিত্র এক ক্লান্তির ছাপ, চোখের নিচে কালি। চুলগুলো কোমর ছাড়িয়ে গেছে কিন্তু তার কোনো যত্ন নেই। কম বয়সী একটা মেয়ের চোখে এত মোটা ফ্রেমের চশমার ব্যাপারটা ঠিক হজম করা যাচ্ছে না।

জাহানারা ম্যানেজার সাহেবের কেবিনে ঢুকল। কেবিন তো নয়, এ যেন এক শান্তির নীড়। হিমশীতল এসির হওয়ায় হাত পা জমে যাওয়ার মতো একটা অবস্থা। তবুও জাহানারার ভালো লাগছে।

ম্যানেজার সাহেব শুকনো গলায় বললেন, “মিস জাহানারা, বসুন।”
জাহনারা বসতে বসতে বলল, “স্যার কিছু বলবেন?”
“বলবো, বলার জন্যেই তো ডেকেছি। খেজুরে আলাপ করার মতো কোনো শখ তো আমার নেই।”

রাগে জাহানারার গা জ্বলে যাচ্ছে। এই লোকটাকে কোনো কালেই পছন্দ ছিল না তার। দু মিনিট পর পর একজন কর্মচারীকে ডেকে পাঠান এবং তাকে কাজ দেন। এত সহজ একটা কাজের জন্যে লোকটার ঘরে এসি দেওয়া হয়েছে। কোনো মানে হয় না!

“মিস জাহানারা?”
“জি?”
“গতকাল আমার এক বন্ধুর আপনার কাছে গিয়েছিল। নতুন চেকবইয়ের ব্যাপারে। আপনি তাকে নতুন চেকবই দেননি। কেন?”
“কারণ তার আগের চেকবইটা শেষ হয়নি।”
“শেষ হতে হবে না। আপনি এক কাজ করুন, তাকে নতুন একটা চেকবই দিয়ে দিন। আজ দুপুরের পর সে আবার আসবে।”
“কিন্তু স্যার…”
“কোনো কিন্তু শুনতে চাচ্ছি না মিস জনাহারা। বুঝতেই তো পারছেন, বন্ধুকে কথা দিয়ে ফেলেছি।”

দ্বিতীয় দফায় গা জ্বলে উঠলো জাহানারার। তোকে কথা দিতে বলছে কে?

জাহানারা নিজের কেবিনে ফিরে এলো। এখন তার মুখ হাসিখুশি। চেহারা থেকে ক্লান্তির ছাপটাও অনেক অংশে কমে গেছে।

জাহানারা হাসিখুশি গলায় বলল, “অর্থ, কাজ হয়ে গেছে!”
“কোন কাজ?”
“ফ্যানের কাজ। মতিন মিয়াকে ধরে এমন ঝাড়ি মেরেছি, যে কাজ হয়ে গেছে। দশ মিনিটের মধ্যে লোক পাঠাচ্ছে।”
“বাহ্! ভালোই হলো তাহলে।”
“চলুন ততক্ষণে ক্যান্টিন থেকে চা খেয়ে আসি।”

জাহানারা এবং অর্থ সমবয়সী। বয়সে দু এক মাসের পার্থক্যও নেই। অর্থের জন্ম পঁচানব্বই সালে মার্চ মাসের চৌদ্দ তারিখে, আর জাহানারার উনিশ তারিখে। দু’জনের মধ্যে এই আপনা-আপনির আনুষ্ঠানিকতাটা না থাকেলই পারে। মাঝে মাঝে জাহানারার বলতে ইচ্ছে করে, “শুনুন অর্থ, আপনি এখন আমাকে তুমি করে ডাকবেন। পারবেন না?”। কিন্তু চক্ষুলজ্জার ভয়ে বলতে পারে না।

এমনিতেই অফিসের একদল মনে করে, তারা প্রেম করছে। যা ইচ্ছা মনে করুক! এসব লোকেদের কাজই হলো মনে করা।

ক্যান্টিনে এসে অর্থ শান্ত গলায় বলল, “দুধ চা না রং চা?”
“চা খেতে ইচ্ছা করছে না অর্থ। কোক খাবো।”

কিছুক্ষণের মধ্যেই হাতে দুটো কোকের ক্যান নিয়ে এসে গেল অর্থ। সে নিজেও তাহলে চা খাবে না। আচ্ছা চা খেতে এসে কোক খাওয়ার ব্যাপারটা কি সে আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল না-কি জাহানারার দেখাদেখি তারও কোক খেতে ইচ্ছে হলো? কে জানে!

জাহানারা কোকের ক্যানে চুমুক দিতে দিতে বলল, “আপনার ভাইয়ের খবর কী?”
“কোন ভাই?”
“কোন ভাই মানে? আপনার তো একটাই ভাই। ওইযে গতবছর আমেরিকায় পড়তে চলে গেল যে জন।”
“ওহ্ অনুপ! নিউ ইয়র্কে গিয়ে ফ্রডের পাল্লায় পড়েছে।”
“সে কী! তারপর?”
“তারপর বাঁচার কোনো রাস্তা না পেয়ে নিজেও ফ্রড হয়ে গেছে।”
“হ্যাঁ?”
“হ্যাঁ। এখন নিজেও পড়াশোনার কথা বলে দেশ থেকে লোকজন ধরে নিয়ে যাচ্ছে।”

জাহানারা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অর্থের দিকে। অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় ঠাট্টা করার অভ্যাস আছে ছেলেটার।

“ঠাট্টা করছেন?”
“ঠাট্টা ভাবলে ঠাট্টা, আবার সত্যি ভাবলে সত্যি।”
জাহানারা বলল, “আচ্ছা এসব কথা বাদ দিন। আপনার বাসার সবাই ভালো আছে?”
“বাসায় কেউ নেই।”
“কেউ নেই মানে?”
“বাবা-মা, বোন সবাই ব্যাগপত্র গুছিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে গেছে?”
“কবে?”
“গত সপ্তাহে।”
“ফিরে আসবে কবে?”
“আপাতত ফিরে আসার কোনো পরিকল্পনা নেই।”
“ওমা, কেন?”
“তাদের শহর ভালো লাগে না।”
“এত বড়ো একটা বাড়িতে আপনি একা একা থাকতে পারছেন?”
“পারছি। একা একা থাকতে আমার ভালোই লাগে।”
“খাওয়া-দাওয়ায় কোনো অসুবিধা হচ্ছে না?”
“না। বাড়ির সামনের একটা হোটেল ঠিক করে রেখেছি। ওরাই প্রতিদিন তিনবেলা খাবার দিয়ে যাচ্ছে।”
“বাহ্, আপনার বুদ্ধি ভালো।”
“থ্যাংক য়্যু। আচ্ছা আপনার মায়ের সমস্যাটা ঠিক হয়েছে?”
“অর্থ, আমার মায়ের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। একবার মাথা খারাপ হয়ে গেলে সেটা আর ঠিক হয় না।”
“এটা আপনার কথা না ডাক্তারদের কথা?”
“আমার কথা। ডাক্তারদের সবথেকে বড়ো গুন হলো, তারা কখনো আশা ছেড়ে দেয় না।”
“উন্নত চিকিৎসার চেষ্টা করছেন না?”
“না।”
“কেন?”
“আমার মা বয়স্ক মানুষ। আর যে কদিন বাঁচবে, এই সমস্যা নিয়েই বাঁচুক। আর তাছাড়া উন্নত চিকিৎসা মানেই তো, বিদেশে নিয়ে যাওয়া, অপারেশন। এত টাকা-পয়সা আমাদের কোথায়?”
“আপনার বাবা কিছু রেখে যাননি?”
“আমার বাবা শুধু আমাদের দু’জনকেই রেখে গেছে। আর তাছাড়া তেমন কোনো আহামরি বেতনও পাই না যে, মায়ের চিকিৎসার জন্যে টাকা জমাবো।”
অর্থ চুপ করে রইলো।
জাহানারা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বলল, “আপনার আর চিন্তা কী? নিজেদের বাড়ি, বাসাভাড়ার কোনো ঝামেলাই নেই।”
অর্থ প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্যে বলল, “ম্যানেজার সাহেবের বদলি হচ্ছে, শুনেছেন?”
“তাই না-কি? কোথায় বদলি হচ্ছে?”
“চিটাগংয়ের ব্রাঞ্চে।”
“ভালো হয়েছে। জানেনই তো, ম্যানেজার সাহেবকে দুচোখে দেখতে পারি না আমি।”
“নতুন ম্যানেজার কিন্তু আমাদের মধ্যে থেকেই বাছাই করা হবে।”
“ওমা, সত্যি?”
“হুঁ।”
“আমি খুব খুশি হবো, যদি আপনাকে নতুন ম্যানেজার করা হয়।”
“আমাকে নতুন ম্যানেজার করলে খুশি হবেন? আর যদি আপনাকে নতুন ম্যানেজার করা হয়?”
“আমাকে নতুন ম্যানেজার করা হবে না।”
“এত আত্মবিশ্বাস নিয়ে কী করে বলছেন?”
“বলছি কারণ, আমার কাজের প্রতি কোনো ভালোবাসা নেই। মাস শেষে টাকা পাই, তাই কাজ করে যাই।”
“আমার আছে কাজের প্রতি ভালোবাসা?”
“আছে। সেটা আমি আপনার চোখে দেখতে পেয়েছি।”
“জীবনটা সিনেমা না জাহানারা। মানুষের চোখে ভালোবাসা দেখা যায় না।”
জাহানারা বিড়বিড় করে বলল, “ভালোবাসা দিয়ে দেখলেই যায়।”
“কী বললেন?”
“না, না কিছু না। আচ্ছা আপনার কী মনে হয়? নতুন ম্যানেজার কাকে করা হবে?”
“সম্ভবত মিজান ভাইকে।”
“পৃথিবীর সবথেকে বিরক্তিকর মানুষগুলোকেই ম্যানেজার হতে হবে, এমন কোনো নিয়ম আছে না-কি?”

অর্থ হাসল। মানুষটা সচরাচর হাসে না। কিন্তু যতবারই হাসে, মায়ায় পড়ে যায় জাহানারা।

বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা সাতটা বেজে গেল। জাহানারা কলিংবেল চাপল। যদিও কলিংবেল চেপে লাভ নেই, তার মা দরজা খুলতে আসবেন না। হ্যান্ডব্যাগ থেকে চাবি বের করে দরজা খুলল সে।

পুরো ঘর অন্ধকার। সন্ধ্যাবেলায় অন্ধকার ঘরে একটা ভূতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। জাহানারা বসার ঘরের বাতি জ্বালানো। তার মা শিউলি বেগম শান্ত ভঙ্গিমায় সোফার ওপর বসে আছেন।

যদিও ওগুলোকে সোফা বলা ঠিক হবে না। বলা উচিত গদিওয়ালা বেতের চেয়ার। গতবছর শীতকালে ফার্নিচারের দোকানের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল জাহানারা। বাইরে থেকে দেখেই চেয়ারগুলো পছন্দ হয়ে গেল তার।

দোকানের ভেতরে ঢুকে জাহানারা বলল, “এই চেয়ারটা কত?”
দোকানদার শুকনো গলায় বলল, “সেট আপা। চারটার সেট।”
“সেট কত?”
দোকানদার তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, “সাড়ে তিন।”

তাচ্ছিল্যের স্বরে বলার কারণ হলো, জাহানারার মতো তরুণী মেয়েরা কখনো কিনতে আসে না। এরা দোকানে আসে, দাম-টাম জিজ্ঞেস করে, চলে যায়। কিন্তু দোকানদারকে অবাক করে দিয়ে জাহারানা সত্যি সত্যিই চেয়ারের সেটটা কিনে ফেলল।

জাহানারা মায়ের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল, “মা! বাতি নিভিয়ে রেখেছিলে কেন?”
শিউলি বেগম বললেন, “ভয় করে রে মা।”
“বাতি জ্বালালে ভয় লাগে? কীসের ভয়?”
“বলতে পারি না।”
জাহানারা মায়ের পাশে বসতে বসতে বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে, বলতে হবে না। সারাদিন কী কী করলে, তাই বলো।”
“তেমন কিছু না। দুপুর বেলা শেফালী আসছিল। আমার সাথে ভাত খাইলো, মাথায় তেল দিয়ে দিলো।”
“মা, কতবার বলেছি শেফালী আসতে পারে না। সব তোমার কল্পনা।”
“কল্পনা না রে মা। এই দেখ, আমার মাথায় তেল!”

জাহানারা খেয়াল করলো, আসলেই তার মায়ের চুলে একগাদা তেল। শিউলি বেগম নিজেই নিজের মাথায় তেল দিয়ে, শেফালীর নামে চালিয়ে দিচ্ছে। ব্যাপারটা জাহানারার খুব ভালো করে জানা। তবুও কোনো এক অদৃশ্য ভয় আঁকড়ে ধরল তাকে।

শেফালী জাহানারার ছোটো বোন। দু’জনের বয়সের পার্থক্য খুব একটা বেশি না। সেবার জাহানারা ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেবে। শেফালী তখন পড়ে ক্লাস নাইনে।

একদিন রাতে শেফালী তার কাছে এসে বলে, “আপা, কাল থেকে আমি আর স্কুলে যাবো না।”
জাহানারা অবাক গলায় বলে, “স্কুলে যাবি না কেন?”
“ইংলিশ স্যার আমার গায়ে হাত দেয়।”
“মানে কী? মারে?”
“মারে না, হাত দেয়। প্রতিদিন ক্লাস শেষে আমাকে স্টাফ রুমে নিয়ে যায়, পড়া বোঝাতে। বোঝানোর ফাঁকেই…”
“কী বলছিস এসব! তুই ভুল ভাবছিস। উনি তোর বাবার মতো। উনি এসব করতে পারে না-কি?”
“ভুল ভাবছি না আপা।”
“দেখ শেফালী, তুই যে ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার জন্য এসব বলছিস, তা আমি খুব ভালো করে জানি। খবরদার! গুরুজনদের নামে আজেবাজে কথা বলবি না।”

স্নেহের স্পর্শ এবং খারাপের স্পর্শের মধ্যে পার্থক্য একজন কিশোরী খুব ভালো করেই জানে, বুঝতে পারে। শেফালীও পেরেছিল।

কিন্তু ব্যাপারটা শুধু খারাপ স্পর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে একটা কথা ছিলো। ব্যাপারটা যে ধর্ষণ পর্যন্ত গড়িয়ে যাবে, বেচারি নিজেও বুঝতে পারেনি। পারেনি বলেই হয়তো গড়িয়ে যাওয়ার পর, লজ্জায় তার পক্ষে আর বেঁচে থাকা সম্ভব হয়নি।

দুহাজার ছয় সালের, বারোই ফেব্রুয়ারি নিজের ঘর থেকে শেফালীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়।

শেফালীর মৃত্যুর পর থেকেই প্রকাশ পেতে শুরু করে শিউলি বেগমের মাথা খারাপের লক্ষণ। প্রায় প্রতিদিন দুপুর বেলা বা দুপুরের পর শেফালী আসে তার কাছে। একসঙ্গে ভাত খায়, গল্প করে।

এটা নিতান্তই মায়ের কল্পনা। তবে এমনও তো হতে পারে, শেফালী সত্যি সত্যিই তার কাছে আসে। মেয়েরা তো আবার কখনোই মায়ের সঙ্গ ছাড়তে পারে না।

(চলবে)

শঙ্খি নী
শঙ্খি নীhttps://www.golpopoka.com
গল্প বলতে ভালোবাসি

Related Articles

আঁধার পর্ব-১৩ | ১৮+ এলার্ট

আঁধার ১৩. ( ১৮+ এলার্ট ) ঘুটঘুটে অন্ধকারে পড়ে আছি আমি। অন্ধকারের ঘনত্ব এতো বেশি হতে পারে জানা ছিলো না আমার। এতো অন্ধকারে চোখ...

আঁধার পর্ব-১২

আঁধার ১২. " রান্না ভালো হয়নি? " প্রশ্নটা না করে পারলাম না। " হ্যাঁ, ভালো হয়েছে। আমি নিজেও এতো ভালো রান্না করতে পারিনা। বিয়ের...

আঁধার পর্ব- ১১

আঁধার ১১. " তুমি ঠিক এভাবে নিয়ম করে হাসলে আমি তোমার প্রেমে পড়তে বাধ্য হবো। " মুখ ফসকে কথাটা টুক করে বের হয়ে গেল। সাথে...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -
- Advertisement -

Latest Articles

আঁধার পর্ব-১৩ | ১৮+ এলার্ট

0
আঁধার ১৩. ( ১৮+ এলার্ট ) ঘুটঘুটে অন্ধকারে পড়ে আছি আমি। অন্ধকারের ঘনত্ব এতো বেশি হতে পারে জানা ছিলো না আমার। এতো অন্ধকারে চোখ...
error: ©গল্পপোকা ডট কম