অভিমান হাজারো পর্বঃ-৬

0
1983

অভিমান হাজারো পর্বঃ-৬
আফসানা মিমি

—“আপনি কি আমাকে ফলো করছেন?”

ভার্সিটি শেষে ক্লান্ত পায়ে বাসায় ফিরছিল আফরা। আজ একাই আসতে হলো। কারণ তার সব বন্ধু বান্ধবীরা অন্যান্য ডিপার্টমেন্টে পড়ে। শুধুমাত্র সে আর অতশীই এক ডিপার্টমেন্টে পড়তো। কিন্তু অতশীর তো এখন বিয়ে হয়ে গেছে তাই সে এখন একা একাই যাতায়াত করে। তার বড় ভাইয়ার সাথেও মাঝে মাঝে যায়। এতোদিন কোন সমস্যা হতো না। কিন্তু আজ হঠাৎ স্পন্দন ভাইয়ার এই বন্ধুটাকে দেখে তার কাছে মনে হচ্ছে ফলো করছে তাকে। লোকটা কেমন করে যেন তাকায় তার দিকে। এ তাকানোর অর্থও তার জানা আছে। কারণ মেয়েরা বুঝতে পারে কোন ছেলে তাদের দিকে কেমন নজরে তাকায়! আর এ লোকটার এমনভাবে তাকানোর মাঝে কেমন একটা মাদকতা কাজ করে। ঘোর লেগে যায় বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে। সেই সাথে লাগে অস্বস্তি। বেশ কিছুদিন আগে স্পন্দন ভাইয়ার সাথে দেখেছিল। উনার বেস্টফ্রেন্ড এই লোকটা। নামটা কি যেন এখন ঠিক মনে আসছে না। তারপর বেশ কয়েকবারই দেখা হয়েছে। শেষবার দেখা হয়েছিল অতশীর বিয়ের দিন। তাই আজকে এভাবে পিছন পিছন আসতে দেখে জিজ্ঞাসা না করে থাকতে পারলো না।

—“কই না তো! আশেপাশে এতো রূপসী মেয়ে থাকতে তোমাকে কেন ফলো করতে যাব?”

কথাটা যেন গায়ে লাগল আফরার। ইনডিরেক্টলি ওকে অসুন্দর বলেছে বদ লোকটা।
—“আজব তো! চেনা নেই জানা নেই হুট করে অচেনা কাউকে কেউ তুমি করে বলে?”

অয়ন খালি গলায় গাইলো
“তুমি আমার কত চেনা সেকি জানো না!”
আফরা অবাক হয়ে গেছে গানের লাইনটা শুনে।
দুষ্টুমির হাসি হেসে অয়ন বললো
—“জড়িয়ে তো আর ধরিনি। আসলে কি বলো তো আমার মনটা না কেউ একজন চুরি করে নিয়ে চলে যাচ্ছে এজন্য তার পিছনে পিছনে যাচ্ছি। গন্তব্যস্থলে গিয়ে দেখবো আমার হৃদয়টাকে সযত্নে রেখে দেয় নাকি আবার রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দেয়। রেখে দিলে তো আলহামদুলিল্লাহ্! আর যদি ফেলে দেয় তাহলে তো আর খোঁজে পাব না। তাই সেখান থেকে আবার কুড়িয়ে নিয়ে তাকে জোর করে দিয়ে চলে আসবো।”
—“আপনি আসলেই একটা ফাজিল। অসভ্য কোথাকার!”
—“আর তুমি যে একটা চোর তার বেলায়?”

লোকটার কথা শুনে মাথায় তিরতির করে রক্ত ওঠে যাচ্ছে আফরার। মন চাচ্ছে দুই গালে ঠাস ঠাস করে চারটি চড় মারতে।

—“তুমি থাপ্পড় দিলে আমি তোমাকে চুমু দিব।”

আজব! মনের কথা শুনে ফেললো নাকি?

—“তুমি যে আমার মনটা চুরি করে নিয়ে বুকের ভিতর বন্দী করে রেখে দিয়েছো তার জন্যই তো তোমার মনের কথাগুলো শুনতে পাচ্ছি। তোমার হৃদয়ের সাথে আমার হৃদয়ের কানেকশন আছে তাই অটোমেটিক তোমার মনের কথাগুলো শুনতে পাচ্ছি কি কি ভাবছো।”

কথাটা শুনে আকাশ থেকে পড়লো আফরা। সত্যিই কি তার মনের সব কথা শুনতে পাচ্ছে লোকটা! আদৌ কি সম্ভব এটা! কেন যেন এবার তার সত্যি সত্যিই রাগ হচ্ছে এই ছেলেটার ওপর।
—“দেখুন মি. হোয়াটএভার…”
—“ওহ হ্যালো..আমি কোন হোয়াটএভার নই, ওকে! আমার একটা খুব সুন্দর নাম আছে। অয়ন চৌধুরী। এই নাম শুনেই মেয়েরা মাথা ঘুরে পড়ে যায়। অবশ্য পড়বে নাই বা কেন? এমন হ্যান্ডসাম ছেলে এ তল্লাটে আর দুটো পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ!”
—“বাসায় আয়না আছে তো!”
—“মানে?” ভেবাচেকা খেয়ে গেল অয়ন। হঠাৎ আয়নার কথা জিজ্ঞাসা করছে কেন!

—“বলছি যে আয়নায় নিজের চেহারা দেখেছেন কখনো? যেই না চেহারা! মেয়েরা নাকি মাথা ঘুরে পড়ে যায়! এমন গাঁজাখুরি কথাবার্তা যেখানে সেখানে বলবেন না। নয়তো পাগল ভেবে লোকজন পাগলা গারদে দিয়ে আসার মতো মহৎ কাজটা অনায়াসেই করে ফেলবে।”

আচমকা এমন ঘটনায় মোটেও প্রস্তুত ছিল না আফরা। অয়ন হেঁচকা টানে এক হাতে আফরার কোমর ধরে নিজের কাছে টেনে নিয়ে আরেক হাতে ওর ঘাড়ের পাশের চুলের ভিতর হাত দিয়ে চোখে চোখ ঘোরলাগা দৃষ্টিতে বললো

—“এই পাগলটাকে পাগলা গারদে না দিয়ে তোমার মনের গারদে জায়গা দিলে কি এমন ক্ষতি হবে গো? দাও না একটু জায়গা! কথা দিচ্ছি চুপটি করে ঘাপটি মেরে বসে থাকবো। একদম জ্বালাতন করবো না। এই তোমার নাকফুলটা ছুঁয়ে কথা দিচ্ছি।”

আফরা টের পাচ্ছে তার সারা শরীর যেন অবশ হয়ে আসছে অয়নের ছোঁয়ায়। ফিসফিস করে কথাটা বলার কারনে তার পুরো দেহ জুড়ে যেন একটা শীতল বাতাস বয়ে গেল। মুখ আর কান থেকে যেন গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। সাথে হাজার মাইল গতির হার্টবিট তো আছেই। আচ্ছা! সামনে থাকা ছেলেটা যদি তার হার্টের বিট করার শব্দটা শুনে ফেলে! কি একটা অবস্থা হবে তখন? কি লজ্জাকর ব্যাপার হবে তখন!

এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share


—“তোমার শরীর খারাপ বলোনি কেন?”

চোখ বন্ধ করে কপালের ওপর বাম হাতটা রেখে চুপটি করে শুয়েছিল অতশী। হঠাৎ স্পন্দনের গলার আওয়াজ পেয়ে চোখ খুলে আস্তে আস্তে ওঠে বসলো। একটু চুপ থেকে নির্বিকার গলায় বললো

—“বললে আর কি হতো?”
—“কি হতো মানে? শরীর অসুস্থ তাই বলে আমাকে জানাবে না তুমি?” কিছুটা অবাক সাথে কিছুটা হতাশও দেখালো স্পন্দনকে।

—“আজকাল আমার খবর নেয়ার প্রয়োজন মনে করে না কেউ। তাই আমিও বলার প্রয়োজন মনে করি না।”
—“এরকম করে কথা বলছো কেন? আমি কি তোমার এতোই পর যে আমাকে কিছু বলার প্রয়োজন মনে করো না!”

শান্ত চোখে স্পন্দনের দিকে তাকিয়ে বললো
—“বিয়ের পর একটাবারও কি আমার খোঁজ নিয়েছো ভালো করে? এই রুমে তুমি ছাড়াও যে জীবন্ত আরেকটা মানুষ বাস করে তা তোমার মাথায় আছে? যে কিনা তোমার বিয়ে করা বউ! নাকি বিয়ে যে করেছো সেটাও মনে নেই!”
—“সেটা তোমার নিজের দোষ। যে যেমন কর্ম করে সে তেমন ফলই ভোগ করে। আর বিশ্বাসঘাতকদের খবর নিয়ে আমি কি করবো? আমাকে মেরে সে তো অন্যকে নিয়ে সুখী হতে যাচ্ছিল।”

স্পন্দনের কথা শুনে একরাশ কান্না দলা পাকিয়ে গলায় এসে থেমেছে।
—“তাহলে অন্যের সাথেই সুখী হতাম। আমাকে তোমার জীবনে শুধুশুধু কেন টেনে এনেছো? কষ্ট দেবার জন্য? একটু কি ভালবাসা পাওয়ার অধিকার নেই আমার? এতোই খারাপ আমি?”
—“তুমি শুধু খারাপই না জঘন্যও।”

কান্নাটা আর আঁটকে রাখতে পারলো না অতশী। ডুকরে কেঁদে ওঠলো।
—“যেহেতু আমি জঘন্য তাই আমার মুখ যাতে আর না দেখতে হয় সেই ব্যবস্থা করো। এভাবে তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে না মেরে একেবারে মেরে ফেলো আমাকে। আমি আর সহ্য করতে পারছি না তোমার অবহেলা। যেখানে ভালবাসা নেই সেখানে আমারও কোন জায়গা নেই।”
—“তোমার মতো মেয়েকে ভালবাসতেও রুচিতে বাধে। কিভাবে পারলে তুমি এমন একটা কাজ করতে?”

কলিজাটা ফেটে যাচ্ছে স্পন্দনের এসব কথা শুনে।
—“তাহলে আমাকে তোমার জীবনে কেন ঠাঁই দিয়েছো? তোমার সুন্দর জীবনটা তছনছ করার জন্য? আল্লাহ্ আমাকে মরন দেয় না কেন? মরে গেলে আর কারো ওপর বোঝা হয়ে থাকতে হতো না। কারো অবহেলার পাত্রী হয়ে দিনাতিপাত করতে হতো না। এর চেয়ে মরন অনেক সুখের। সেখানে অন্তত এমন কষ্ট পেয়ে পেয়ে মরতে হবে না প্রতিনিয়ত।”

অতশীর কথাগুলো মাথায় নিতে পারছে না। তাই সহ্য করতে না পেরে বললো
—“আমার কাছে থাকলে এসব বাজে কথা বলা চলবে না। যদি আর কখনো শুনি তাহলে ঠোঁটজোড়া সেলাই করে ফেলবো।”

অতশী জানে স্পন্দন যা বলে তা সবই তার মুখের কথা। ভালবাসার মানুষের মুখে মরার কথা কেই বা সহ্য করতে পারে? তাই ঠোঁটে একটু দুষ্টুমির হাসি টেনে বললো
—“সেলাই করলে হবে কি করে? তোমার জন্য সেই কতকাল যাবৎ অপেক্ষা করে আছি। তাই তো এ ঠোঁটের অধিকার কাউকেই দেইনি এখন পর্যন্ত। এ ঠোঁটের কুমারীত্ব হরণ না করেই সেলাই করে দিবে?”

স্পন্দন বেশ বুঝতে পারছে অতশী ইচ্ছে করেই এসব বলছে। তাই তাকে আরেকটু কষ্ট দেবার জন্যই বললো
—“আমার ঠোঁট কেটে ফেলে দিব তবুও তোমার মতো বিশ্বাসঘাতিনীর ঠোঁটের ছোঁয়ার দরকার নেই আমার।”

কথাটা যেন কাঁটার মতো বিঁধলো অতশীর কলিজায়। সেইসাথে চোখ দুটো ছলছল করে ওঠলো।
—“খুব শীঘ্রই মরে যাব দেখে নিও। তখন তুমি……”

কথাটা শুনে স্পন্দনের কলিজায় মোচড় মারলো। তাই শেষ করার আগেই জোরে ধমক দিয়ে বললো
—“স্টপ ইট! এতোই মরার শখ থাকলে বিধবার শাড়ী গায়ে জড়িয়ে তারপর যখন ইচ্ছা, যত ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই মরো গে! তখন আমি দেখতে আসবো না। যত্তসব!”

কথাটা বলেই হনহন করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল স্পন্দন। যাওয়ার আগে দরজায় সজোরে একটা লাথি মেরে গেল। আর অতশী নির্বাক হয়ে বসে রইলো। স্পন্দনের লাথি দেওয়ার আওয়াজে কিছুটা কেঁপে ওঠলো ও। সাথে স্পন্দনের কথাটা তার ভিতরটা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়ে গেল।

ভার্সিটি থেকে ফিরে সেই যে রুমে এসে দরজা বন্ধ করে বসে আছে এখনো খুলার নাম নিচ্ছে না আফরা। আজ তার সাথে কি হয়ে গেল এটা? এতোগুলো বসন্ত একলা একা পার করার পর আজ হঠাৎ একটা ছেলে কিনা তাকে অগোছালো করে দিয়ে চলে গেল! কেমন একটা মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে তার। আচ্ছা ভালবাসার অনুভূতি কেমন? দম বন্ধ করা অনুভূতি হয় ভালবাসার মানুষটি কাছে আসলে? সে যখন অয়নের ছোঁয়া পায় তখন সর্বাঙ্গ কেঁপে ওঠেছিল। কয়েকটা হার্টবিট যেন মিস করেছিল। আর যখন কানের কাছে এসে ফিসফিস করে কথাটা বলছিল তখন তার হাত পা যেন অসাড় হয়ে আসছিল। আর শেষে যখন তার কানে অয়নের ঠোঁটের ছোঁয়া পায় তখন সে মর্মে মর্মে মরেই যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল যেন হৃদপিন্ডটা বুক চিরে বেড়িয়ে আসবে যেকোন মুহূর্তে। একটা নাম না জানা মিশ্র অনুভূতি গ্রাস করেছিল তার পুরো দেহমন জুড়ে। এত ভালো লাগছিল কেন তখন? এসব ভেবে ভেবে লজ্জায় কান মুখ গরম হয়ে যাচ্ছে আফরার।

হঠাৎ মোবাইলের কর্কশ আওয়াজে ভাবনার রাজ্য থেকে বেড়িয়ে এলো আফরা। দেখলো অতশী ফোন দিয়েছে। সেদিনের পর আর যোগাযোগ হয়নি দুজনের।
—“কিরে কেমন আছিস অতশী?”
—“আছি রে একরকম। তোর খবর বল।”
—“আমি তো ভালোই আছি। কিন্তু তোর কথা শুনে তো মনে হচ্ছে না যে তুই ভালো আছিস।”
—“না রে ভালোই আছি।”
—“ভাইয়ার সাথে সব ঠিকঠাক তো?”

আফরার কথা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো অতশী। কি বলবে সে এখন? আসলেই কি সব ঠিকঠাক তাদের দুজনের মাঝে?

—“কিরে কথা বলছিস না কেন?”
—“হুম? হ্যা ঠিকঠাকই তো। সমস্যা নেই কোন।”
—“তাহলে তোকে এমন উদাসীন লাগছে কেন?”
—“তেমন কিছু না। তুই একটু আমার কাছে আসতে পারবি?”
—“তোর কিছু হয়নি তো?”
—“না না আমি ঠিকই আছি। আসলে তোদের খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। অরিন তো শ্বশুরবাড়ি সে আসতে পারবে না। তুই আসতে পারবি?”
—“আচ্ছা দেখি।”
—“ঠিক আছে এখন রাখি তাহলে।”

—“কিরে এই অবেলায় কই যাচ্ছিস?”
—“অতশীর সাথে দেখা করতে যাচ্ছি ভাইয়া।”
—“তুই যেতে পারবি নাকি আমি দিয়ে আসবো?”
—“সমস্যা নেই ভাইয়া আমি যেতে পারবো।”
—“আচ্ছা সাবধানে যাস।”
—“ঠিক আছে আসি তাহলে এখন।”

ছাদের এক কর্ণারে বসে কথা বলছিল আফরা আর অতশী। সেই মুহূর্তে অয়ন আর স্পন্দনের আগমন। অয়ন সর্বপ্রথম আফরাকে দেখলো। আফরা তখনো খেয়াল করেনি ওদের। স্পন্দনের কথা শুনে তাকিয়ে দেখে তারা দুজন এসে দাঁড়িয়েছে। আফরার দিকে তাকিয়ে একটা দুষ্টুমির হাসি দিল অয়ন। যেটা আর কেউ না দেখলেও আফরার নজর এড়ালো না। স্পন্দন এসে জিজ্ঞাসা করলো
—“কেমন আছো আফরা?”
—“জ্বী ভাইয়া ভালো। আপনি?”
—“ঐ আছি আরকি একরকম।”

এ কথা শুনে অতশীর দিকে তাকালো আফরা। মাথা নিচু করে বসে আছে সে।
—“ভাইয়া আপনাদের মাঝে সব ঠিকঠাক তো?”
—“কেন দেখে মনে হয় না সব ঠিকঠাক?”
—“উঁহু মনে হচ্ছে না। অতশীর মুখ দেখে মনে হচ্ছে….”
—“কি?”
—“নাহ কিছু না। এটা আপনাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমার এতে নাক না গলানোই উচিৎ।”

—“আমাকে কি কারো চোখে পড়ছে না?” অয়ন আফরার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো
—“এরকম খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছেন। চোখে পড়বে না কেন? তা কেমন আছেন ভাইয়া?”

মুখটা হাসি হাসি করে বললো আফরা। আফরার মুখে এমন কথা শুনে মেজাজ চটে গেল অয়নের। তার ওপর আবার ভাইয়া! তাদের সামনে তো কিছু বলা বা করাও যাবে না। চোখ বড় বড় করে বললো
—“হোয়াট ইজ খাম্বা? আমাকে খাম্বা বললে কেন? এমন হ্যান্ডসাম একটা ছেলেকে তোমার কাছে খাম্বা মনে হওয়ার কারন কি?”
—“আহারে কি আমার হ্যান্ডসাম রে! খাম্বাকে খাম্বা বললে দোষ কোথায়? আর অমন ষাঁড়ের মত চোখ বের করে আছেন কেন? মনে হচ্ছে টুপ বেড়িয়ে আসবে কোটর থেকে।”

মুচকি হেসে বললো আফরা। আমাকে এসব বলা হচ্ছে তাই না? একবার একা পেয়ে নিই। দ্যাখো কিভাবে যে শায়েস্তা করি তোমাকে! মনে মনে বিড়বিড় করছে অয়ন।

—“কি বললে? আমার চোখ ষাঁড়ের মতো? আর তোমার…..”
—“আহ কি ছোটমানুষি শুরু করেছিস অয়ন? থামতো!” মাঝপথে বাগড়া দিল স্পন্দন

—“তোমাকে আমি দেখে নিব।” আঙুল তুলে বললো অয়ন
—“আমি তো আপনার সামনেই বসে আছি। ভালো করে দেখে নেন। এর চেয়ে ভালো সুযোগ পরে আর পাবেন বলে মনে হয় না।” ঠোঁটে দুষ্টুমির হাসি আফরার। অয়নকে রাগাতে বেশ মজা লাগছে তার।

—“তোরা বস আমি কফি করে আনছি।” অতশী বসা থেকে ওঠে বললো

—“তুই বস তো। তোর তো এমনিতেই শরীর খারাপ। কষ্ট করে আবার কফি আনতে হবে না।” আফরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলো

—“আমিও যাচ্ছি। অতশী চলো।” বলেই স্পন্দন আর অতশী নিচে চলে গেল।

আফরা হয়ে গেল একা। অয়ন তার দিকে এগোতে এগোতে বলছে
—“কি যেন বলছিলে তখন?”

গুটিসুটি মেরে মাথা নিচু করে চেয়ারে বসে রইলো আফরা। ‘এই রে! এবার কি হবে? এখন তো আমি একা। কিছু যদি করে টরে বসে? তখন তো খুব ফটফট করেছি। ধুর এতো কথা তখন না বললেই হতো।’ ভাবছে আর ঢোক গিলছে। গলা শুকিয়ে আসছে তার।

তার সামনে এসে চেয়ার টেনে বসে বললো
—“এখন মুখে আওয়াজ নেই কেন মিসেস অয়ন চৌধুরী?”

‘মিসেস অয়ন চৌধুরী’ বাক্যটা শুনে অবাক চোখে তাকায় আফরা। ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমির হাসি অয়নের। এখান থেকে দৌড়ে পালালে বাঁচে আফরা। এদিক সেদিক তাকিয়ে সুযোগ খুঁজছে পালানো যায় কিনা। অয়ন বুঝে ফেলেছে আফরার মনে কি চলছে। যেই ওঠে দৌড় লাগাবে তখনই ডান হাতে হেঁচকা টান অনুভব করে আফরা। তারপর নিজেকে আবিষ্কার করে অয়নের কোলে। দুই হাত দিয়ে কোমরের দুই পাশ পেঁচিয়ে ধরে রেখেছে শক্ত করে। মুখ তুলে দেখে ঘোরলাগা দৃষ্টিতে তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে অয়ন।

—“সত্যিই তো এর চেয়ে তো ভালো সুযোগ পরে আর পাব না, তাইনা? এখন একটু ভালো করে দেখে নিই। যেহেতু সুযোগ পেয়েছি! কি বলো!”

ক্রমান্বয়ে আফরার মুখটা লজ্জায় লাল নীল ধারণ করতে লাগলো। এভাবে পেঁচিয়ে ধরে রাখায় শরীর অবশ হয়ে আসছে যেন। হঠাৎই তার ঠোঁটের উপরের তিলটায় উষ্ণতা অনুভব করে। কেন জানিনা আফরার এই মুহূর্তটায় তার আগের পরিস্থিতির কথা মনে পড়তেই রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে। অয়নের কাছ থেকে এমনটা আশা করেনি সে। চুমু খেয়ে আবার নির্লজ্জের মতো হাসছে। অয়নের কোল থেকে জোর করে ওঠে এসে রক্তচক্ষু হয়ে বললো

—“এতো নির্লজ্জ কেন আপনি? যেখানে সেখানে অসভ্যতামি না করলে চলে না আপনার? মেয়ে মানুষ দেখলেই তাদের ভোগ করতে মন চায় তাই না? ভোগের সামগ্রী মনে করেন আমাদের মতো নিরুপায় মেয়েদের? আপনাদের মতো কিছু ভালোমানুষির মুখোশ পরে থাকা ছেলেদের কারনে মেয়েরা ঘর থেকে নির্ভয়ে বেরুতে পারে না। শান্তিতে থাকতে দিন প্লিজ। অসহায় মেয়েদের ওপর লালসার দৃষ্টি নিক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকুন। জানোয়ারের মতো……”

আর কিছু বলতে পারলো না আফরা। তার আগেই তার গালে কারো হাতের স্পর্শ পায়। খুব জোরেই লেগেছে থাপ্পড়টা। গালটা জ্বলে যাচ্ছে। অয়ন বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে আফরার কথা শুনে। তাকে আফরা এতোটা খারাপ ভাবে সে কল্পনাও করতে পারেনি। সামান্য একটু দুষ্টুমি করার কারনে এমন করে বলতে পারলো? আর কি যেন বলছিল ‘ভোগের সামগ্রী’! ছিঃ এটা বলতে পারলো আফরা? এতো খারাপ তার মন মানসিকতা? আফরার কথাগুলো শুনে মাথার রগগুলো যেন ছিড়ে যাচ্ছিল। তাই সহ্য করতে না পেরে থাপ্পড় বসিয়ে দিল তার নরম গালে।

আফরার কাছ থেকে সরে গিয়ে ছাদের একপাশে গিয়ে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরায় অয়ন। আকাশের দিকে তাকিয়ে সিগারেটে একটা টান দিয়ে ধোঁয়াগুলো শূন্যে ছেড়ে দিল। কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে তার। পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে ভিতরটা। আর আফরা এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে সেখানে।

চলবে……

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে