অবুঝ_বউ পার্ট: ২০/অন্তিম পর্ব

0
1162

অবুঝ_বউ

পার্ট: ২০/অন্তিম পর্ব

লেখিকা: সুলতানা তমা

আর মাত্র আধা ঘন্টা তারপর সোহাগীর থেকে অনেক দূরে চলে যাবো আর কখনো ফিরে আসবো না, সোহাগী জিসানকে নিয়ে ভালো থাকবে আমি নাহয় ওর স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকবো
মাথাটা খুব যন্ত্রণা করছে তাই কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকলাম, হঠাৎ মনে হলো আমার পাশের চেয়ারে কেউ এসে বসেছে চোখ খুলে পাশে তাকাতেই চমকে উঠলাম সোহাগী এখানে কিভাবে আসলো তাও আবার সেই কালো শাড়ি এই মেয়ে তো আমাকে পাগল বানিয়ে ছাড়বে, অনেকক্ষণ ধরে সোহাগীর কথা ভাবছি তো তাই হয়তো ভুলে ওকে এখানে দেখছি এইটা ভেবে আবার চোখ বন্ধ করে ফেললাম
–এখন আমাকে চোখে দেখ না বুঝি (সোহাগীর কন্ঠ শুনে আবার চমকে উঠে ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম)
–ওই কি হলো
–উফফফ এভাবে কেউ চিমটি দেয়
–তাহলে কি করবো তুমি তো বিশ্বাস করছ না আমি যে এখানে এসেছি তাই চিমটি দিয়ে বুঝিয়ে দিলাম সত্যি আমি এসেছি
–কেন এসেছ
–হানিমোনে যাবো
–তাহলে জিসান কোথায় আর পিচ্ছি মেয়ে তুমি হানিমোনের কি বুঝ
–ওই আমাকে পিচ্ছি বলবা না আমি বড় হয়ে গেছি আর এতো জিসান জিসান করোনা তো জিসান এখন হসপিটালের বেডে আরামে ঘুমাচ্ছে
–মানে
–অবাক হওয়ার কিছু নেই সাথে তোমার মৌরিও শান্তিতে হসপিটালের বেডে ঘুমাচ্ছে
–কি বলছ এসব এই সত্যি করে বলতো এসবের মানে কি আর তুমি জিসানের কাছে না গিয়ে এখানে এসেছ কেন
–শুনবা
–হুম বল
–তাহলে শুনো, তুমি বাসা থেকে বেড়নোর পর আমিও বের হই, আমি তোমাদের পিছনের গাড়িতেই ছিলাম মৌরি যখন তোমাকে থাপ্পড় দিয়েছিল আমি দূর থেকে দেখেছি জানো আমার খুব কষ্ট হয়েছিল কিন্তু তারচেয়ে বেশি অবাক হয়েছিলাম তুমি ওকে কিছু না বলাতে তখন বুঝতে পারি তুমি আমার কাছ থেকে অনেক কষ্ট পেয়েছ তাই মন খারাপ বলে মৌরিকে কিছু বলনি তারপর
–তারপর কি বল
–তারপর তোমরা ওখান থেকে চলে আসার পর মৌরির কাছে জিসান আসে আমি আড়াল থেকে ওদের সব কথা শুনেছি কিন্তু তোমাকে বলব না
–কেন
–আগে বল আমাকে তোমার সাথে নিয়ে যাবা আর ওখানে গিয়ে বেশি দিন থাকবা না হানিমোন করে চলে আসবা
–উফফফ ঠিক আছে বল
–আসলে সবকিছু জিসান আর মৌরি তোমার উপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য করেছে আমি না বুঝে বোকার মতো জিসানকে বিশ্বাস করেছিলাম
–তুমি যে বললে তোমরা আগামীকাল বিয়ে করবে
–জিসান মৌরিকে বলেছে আমাকে বিয়ে করে কয়েকদিন রেখে ছেড়ে চলে যাবে এই কথা শুনেই তো আমি তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে যাই, অনেক ভেবে দেখেছি আসলে তুমি আমাকে সত্যি ভালোবাস আর আমি তোমাকে ভালোবাসি
–তুমি আমাকে ভালোবাস
–কেন বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি
–চেঁচাচ্ছ কেন এইটা বাসা না এয়ারপোর্ট
–হুম
–এবার বল ওরা হসপিটালে কেন
–এইটা জানার জন্য এতো পাগল হয়ে আছ কেন মৌরিকে ভালোবাস নাকি শুনো একদম অন্য মেয়ের দিকে নজর দিবা না চোখ উপড়ে তুলে ফেলব
–তুমি পিচ্ছি বউ থেকে গুন্ডি বউ হইলা কবে
–কি আমি গুন্ডি
–না না তুমি লক্ষী বউ এবার বাকি কাহিনী বল
–আমাকে পাগলের মতো দৌড়ে বাসায় যেতে দেখে আব্বু আম্মু সবাই জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে আমি সবকিছু বলে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছি তারপর….
–তারপর কি কান্না করছ কেন
–আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম ডিভোর্স পেপারের কথা মনে পড়তেই কিন্তু আমার মন বলছিল তুমি আমাকে ডিভোর্স দিতেই পারো না তাই আমি সারা রুম তন্নতন্ন করে খুঁজি আর ডিভোর্স পেপার টেবিলের ড্রয়ার থেকে পাই সাথে ছোট্র একটা চিরকুট “পিচ্ছি বউ আমি তোমাকে সত্যি অনেক অনেক অনেক বেশি ভালোবাসি তাই সাইনটা করতে পারলাম না”
–তুমি তো সাইন করেই দিয়েছিলে
–সরি
–হুম তারপর বলো
–আমি তোমার সেই ছোট্র চিরকুটটা বুকে জরিয়ে ধরে অনেক কান্না করেছিলাম তখন মুমু আপু এসে বললো ফ্লাইটের আরো দুঘন্টা বাকি আছে চাইলে তোমার কাছে ফিরে আসতে পারবো
–তারপর তুমি আমার কাছে চলে এসেছ
–হুম আসার আগে একটা কাজ সেরে এসেছি
–কি কাজ
–আব্বুর সাথে প্ল্যান করে টাকা দিয়ে মাস্তান ভাড়া করে জিসান আর মৌরিকে পিটিয়ে হসপিটালে পাঠিয়ে এসেছি
–কি বলছ এসব
–কেন তোমার কষ্ট হচ্ছে নাকি আমার তো বেশ মজা লেগেছে যখন জিসানকে পিটাচ্ছিল
–সত্যি
–হ্যাঁ কষ্ট তো হয়েছিল যখন মৌরি তোমাকে থাপ্পড় দিয়েছিল (এক দৃষ্টিতে ওকে দেখছি সত্যি কি ও আমাকে ভালোবাসে)
এভাবে কি দেখছ আমার লজ্জা লাগে না বুঝি
–কি বললে লজ্জা
–(নিশ্চুপ)
–আচ্ছা তুমি যে ওদের মাস্তান ভাড়া করে পিটিয়েছ এখন যদি পুলিশ এসে তোমাকে নিয়ে যায়
–এসব আমি ভয় পাই না আর আমার শশুর আব্বুটা খুব ভালো উনি বলেছেন সব জামেলা মিটিয়ে নিবেন শুধু আমি যেন আসার সময় উনার জন্য একটা….
–একটা কি
–পরে বলবো
–ওকে এখন চলো প্লেনে উঠতে হবে
–ওকে

সোহাগীকে নিয়ে প্লেনে এসে বসলাম এখন তো আমি আমেরিকা থাকার চিন্তা বাদ দিয়ে হানিমোনের চিন্তা করছি হাহাহা, কিন্তু এই পিচ্ছি মেয়ে এতোসব কান্ড করে এসেছে ভাবতেই আমার মাথা ঘুরছে, বেচারা জিসান বিয়ের সখ মিটে যাবে হসপিটালে থাকতে থাকতে হাহাহা
–এই এভাবে পাগলের মতো হাসছ কেন
–হানিমোনে যাচ্ছি তো তাই আনন্দ হচ্ছে
–এই হানিমোন কি (দিল সব আনন্দ মাটি করে বিয়ের দিন প্রশ্ন করেছিল বাসর রাত কি আর এখন হানিমোন কি এমন প্রশ্নের কি উত্তর হতে পারে সত্যি আমার জানা নেই ইচ্ছে হচ্ছে কান্না করে দেই)
–নাহিল তুমি তো কান্না করে দিচ্ছ হিহিহি
–(আবার সেই হাসি)
–কিছু বললে
–হুম
–কি
–কাছে এসো কানে কানে বলছি
–ওকে বল
–তোমার কালো সিল্কি শাড়ি আর খিলখিল করে হাসি আমাকে আগেই পাগল করে দিয়েছিল আজ আবার নতুন করে পাগল করে দিয়েছে (কথাটা ওর কানের কাছে ফিসফিস করে বলতেই লজ্জা পেয়ে আমার বুকে মুখ লুকালো)
–নাহিল সরি আমাকে ক্ষমা করে দাও
–কেন
–এইযে তোমাকে এতো কষ্ট দিয়েছি, আমি না বুঝে এমন করেছি ওই জিসান যা বলত আমি তাই করতাম
–ভুল তোমার একার না আমিও ভুল করেছি বাহিরে গিয়ে তোমাকে সময় দেওয়া উচিত ছিল কিন্তু আমি তা করিনি আর তোমার এই একাকীত্বের সুযোগ নিয়েছে জিসান….
–তাও তো আমার বুঝা উচিত ছিল সরি প্লিজ ক্ষমা করে দাও এইযে কান ধরছি
–দোষ করেছ তুমি আর কান ধরছ আমার ফাজি মেয়ে
–তোমার কান মানে আমার কান আর আমার কান মানে তোমার কান হিহিহি
–তাই বুঝি
–জ্বী
–এতো চটপট করোনা কখনো প্লেনে উঠনি তো প্লেন এখন উপড়ে উঠবে তুমি ভয় পেয়ে যাবে
–আমি এখন আর কিছু ভয় পাই ন….
–কি হল ভয় তো পাওনা বলতে চাইছিলে তাহলে ভয়ে আমাকে জরিয়ে ধরেছ কেন
–আজকের জরিয়ে ধরায় ভয়ের চেয়ে ভালোবাসাটা বেশি (আমার চোখের দিকে তাকিয়ে খুব শান্তভাবে কথাটা বলল)
–বাব্বাহ্ পিচ্ছি দেখি লোমান্তিক কথা বলতে শিখে গেছে
–আবার পিচ্ছি বলছ আব্বু আম্মু সবাই বুঝে গেছে আমি আর পিচ্ছি নেই তুমি কেন বুঝছ না
–আব্বু আম্মু বুঝে গেছে
–হ্যাঁ নাহলে কি আব্বু আম্মু বলে দিতেন আসার সময় যেন উনাদের জন্য ফুচকে একটা নাতনী নিয়ে আসি আর মুমু আপু কি বলে দিত ফুচকে একটা….
–বলো থেমে গেলে কেন
–তুমি এভাবে তাকিয়ে আছ কেন আর বলতে পারবো না (পিচ্ছিটা লজ্জা পেয়ে আমার বুকে মুখ লুকালো)

সোহাগী আমার কাধে মাথা রেখে হাতে হাত রেখে বকবক করে যাচ্ছে আর আমি এসব শুনছি আজ মনে হচ্ছে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ
–নাহিল
–হুম
–তুমি যখন বাহিরে ছিলে তখন আমি সত্যি একা হয়ে গিয়েছিলাম সবসময় তোমার সাথে কাটানো মুহূর্ত গুলো মনে পড়তো রাতে ঘুম আসতো না তোমার বুকে মাথা রাখতে ইচ্ছে হতো….
–সোহাগী আসলে আমারি ভুল হয়েছে কাজের জন্য আমি তোমাকে সময় দিতে ভুলে গিয়েছিলাম, শত ব্যস্ততার মাঝে প্রিয়জনকে একটুখানি সময় দেওয়াই তো সত্যিকারের ভালোবাসা
–বুঝেছ তাহলে
–হুম জানো প্রথম ভেবেছিলাম জিসানকে শাস্তি দিব কিন্তু তুমি যখন বললে ওকে ভালোবাস তখন আমি মনের দিক থেকে অনেক দূর্বল হয়ে পরেছিলাম কিন্তু আমার বিশ্বাস ছিল তুমি তোমার ভুল বুঝতে পারবে আর আমার কাছে ফিরে আসবে, আমার বিশ্বাসই সত্যি হলো আজকে আমি অনেক খুশি তুমি আমার কাছে ফিরে এসেছ এর চেয়ে বেশি কিছু আমি আর চাই না
–তোমার এতো খুশির দিনে আমাকে কিছু দিবে না
–কি চাও
–একটা ফুচকে বাচ্চা
–কি
–অবাক হচ্ছ কেন আমার একটা বাচ্চা চাই বুঝেছ
–তুমি নিজেই তো একটা বাচ্চা তুমি আবার বাচ্চা দেখাশোনা কিভাবে করবে
–কেন তুমি দেখাশোনা করবে আমার আর আমি দেখাশোনা করবো আমাদের বাচ্চার (এই পিচ্ছি বলে কি এসব আমি তো হাসতে হাসতে শেষ)
–নাহিল তুমি আমাকে সত্যি ক্ষমা করে দিয়েছ তো আমার ভুল হয়ে গিয়েছে আমি সত্যি না বুঝে…
–এই পাগলী কাঁদছ কেন আমি তোমাকে সত্যি ক্ষমা করে দিয়েছি এখন আর কোনো কান্না নয় আমরা এখন আমাদের নতুন জীবন শুরু করবো আবার সবকিছু আগের মতো সুন্দর হবে (পাগলীটা নিশ্চুপ হয়ে কাঁদছে আমি আর বাঁধা দিচ্ছি না কাঁদলে কষ্টটা হালকা হয়ে যাবে)
–নাহিল মনে হচ্ছে আমি যেন আজ প্লেনে করে আকাশে উড়ছি না কোনো এক স্বপ্নের রাজ্যে ভাসছি
–তাই বুঝি
–হ্যাঁ আজ তুমি আমার কাছে কিছু চাইবে না
–চাইলে দিবে
–হ্যাঁ কেন দিব না
–সত্যি তো
–হ্যাঁ
–ওকে দেখা যাক, তোমার নাভির একদম কাছে একটা তিল আছে ওইটায় মায়া দিতে দাও (দুষ্টুমি করে ওর কানের কাছে ফিসফিস করে বললাম)
–ফাজি ছেলে তুমি জানো কিভাবে
–মনে আছে তোমাকে একদিন শাড়ি পরিয়ে দিয়েছিলাম সেদিন দেখেছিলাম কিন্তু বলার সাহস হয়নি, আজ তো তুমি নিজ থেকে বলেছ যা চাই দিবে এখন দাও
–একদম না
–প্লিজ দাও
–না
–প্লিজ বউ
–না
–প্লিজ পিচ্ছি বউ
–ওকে
আমাকে আর পায় কে হিহিহি, সোহাগীর চোখের দিকে তাকালাম কেমন যেন এক মাতাল করা চাহনি আমাকে ওর দিকে টানছে, এই নেশা ধরানো দুটু চোখের দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে আমার এই অবুঝ বউটার কাছে এগিয়ে যেতে লাগলাম…..

প্লেনের সবাই ঘুমুচ্ছে আপনারা এভাবে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে না থেকে চোখ বন্ধ করুন আর নাহিলকে ওর পিচ্ছি বউ এর সাথে শান্তিতে রোমান্স করতে দিন???

#সমাপ্ত?

(গল্পটা পুরোটাই কাল্পনিক আমি আমার মন থেকে সাঝিয়ে লিখেছি কিন্তু এই গল্পের জন্য অনেক কথা শুনতে হয়েছে, আমি প্রত্যেক গল্পে কিছু শিক্ষণীয় বিষয় বা একটুখানি বাস্তবতার ছোঁয়া রাখি, এই গল্পেও বাস্তব কাহিনী তুলে ধরার চেষ্টা করেছি এমন কাহিনী তো অহরহ ঘটছে ভালোবাসার মানুষকে ছেড়ে অন্য কাউকে ভালোবাসা, ব্যস্ততার অজুহাত দিয়ে প্রিয়জনকে একটু একটু করে দূরে সরিয়ে দেওয়া, আমি এই দুইটা বিষয়ই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি
সবাই সোহাগীর পাল্টে যাওয়া নিয়ে বাজে মন্তব্য করেছ একবারো নাহিলের ব্যস্ততা দেখনি, নাহিল যদি শত ব্যস্ততার মাঝে সোহাগীকে একটুখানি সময় দিত তাহলে সোহাগী পাল্টে যাওয়ার সুযোগ পেতো না এখানে দুজনেরই দোষ আছে।
অনেকে কমেন্ট করেছেন আমার এই গল্প পড়ে রোজ কাঁদতে হয় কারন আপনাদের সাথে এমন কিছুই ঘটেছে আমি সত্যি দুঃখিত কাউকে কষ্ট দেওয়ার জন্য আমি গল্প লিখিনি ক্ষমা করবেন।

আর হ্যাঁ অনেকে বলেছ নাহিল যেন সোহাগীকে কখনো ক্ষমা না করে কিন্তু আমি ক্ষমা করিয়ে দিয়েছি কারন আমার মতে ভালোবাসা সব অন্যায় ক্ষমা করতে জানে আর ভালোবাসার মানুষকে ক্ষমা করে আপন করে নিতে না পারলে সেটা কখনোই সত্যিকারের ভালোবাসা হয়না

প্রিয়জনের ভালোবাসা ছেড়ে একটু বেশি সুখের আশায় অন্য কাউকে ভালোবাসলে কখনো সুখী হওয়া যায় না, শত ব্যস্ততার মাঝে প্রিয়জনকে বেশি না পারেন একটুখানি সময় দিন দেখবেন সম্পর্কটাই মিষ্টি হয়ে যাবে??
টাটা??)