অনুভবে_তুমি পর্ব ৭

0
714

#অনুভবে_তুমি
#পর্বঃ০৭
#সানজিদা_আক্তার_সীমা

অনুষ্ঠানের সকলের দৃষ্টি তখন লাজুকের দিকে।
লাজুক ইতস্ততবোধ করছে।

তার থেকেও বড় কথা মুনতাসির চৌধুরীর কথা লাজুককে খুব ভাবাচ্ছে।

লাজুকের অজান্তেই তার বস মাইকে তার নাম ঘোষনা করেন “যে লাজুক গান গাইবে”।

অথচ আজ ৮ বছরে লাজুক কখনো গান গায়নি।

ভাবনার টানাপোড়নের মধ্যে লাজুক একদম মিডিলে এসে একটা গান ধরে____

“সখী ভাবনা কাহারে বলে, সখী যাতনা কাহারে বলে?
তোমরা যে বলো দিবসও রজনী, ভালোবাসা ভালোবাসা!
সখী ভালোবাসা কারে কয়?সে কি কেবলই যাতনাময়।
সেকি কেবলই চোখের জল, সেকি কেবলই দুঃখের শ্বাস?
লোকে তবে করে কি সুখেরই তরে এমন দুঃখের ফাঁস।”

লাজুক মনোযোগ দিয়ে গানটা শেষ করলো।

সকলের কড়ো তালিতে আশেপাশে মুখরিত হয়ে উঠেছে। এভাবেই অনুষ্ঠানের পর্ব শেষ করে ওরা।

সবাই বাসার উদ্দেশ্যে বের হতে হতে প্রায় ১২টা বেজে যায়।এদিকে এখন গাড়ি পাওয়া মুশকিল।

লাজুক চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে।তখন একটা গাড়ি এসে থামে তার সামনে ।
.
.
“মিস লাজুক গাড়িতে উঠুন, আপনাকে পৌঁছে দিচ্ছি।”
শান্ত কন্ঠে কথাটা বলে মুনতাসির।

লাজুক ভয়ে ভয়ে গাড়িতে ওঠে।কেননা এতো রাতে যদি গাড়ি না পাওয়া যায়?

চারিদিকে নিস্তব্ধ পরিবেশ।দিনের এই ব্যস্ততাময় শহর রাতের বেলা কতটা নির্জন।দুজনেই চুপ করে আছে।লাজুক জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখছে।

লাজুকের দিকে একটা ফাইল এগিয়ে দিয়ে মুনতাসির তার উদ্দেশ্যে বলে_____

“আগামীকাল আপনার অফিস ছুটি।পরশু আমরা একটা প্রোজেক্টের জন্য বাগেরহাট যাচ্ছি।আশা করি তৈরী থাকবেন।
আর হ্যাঁ আমাদের কোম্পানি থেকে কিন্ত এই প্রোজেক্টের উদ্দ্যেশে আপনি মেইন লিডার।”

“জ্বি স্যার।আই উইল ট্রাই মাই বেস্ট।”

“দ্যাটস গুড।”

রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় বসে লাজুক।

আজ শুভাকাঙ্খী কোনো ম্যাসেজ করলো না যে!

এটা ভাবতে ভাবতে ফোনে ম্যাসেজ টোন বাজে।
তাতে লেখা ছিলো”নীল রং এ তোমাকে অসম্ভব মানায়।নীলকে কষ্টের রং বলা উচিত না,নীলকে ভালোবাসার রং বলা উচিত।
আচ্ছা গান এতো অন্তর থেকে করো কেন?চাইলে তো গানকে ফ্যাশন করতে পারো।
আজকে রিপ্লাই আশা করবো না।কারন তুমি ক্লান্ত।ঘুমাতে যাও মায়াবতী।”

লাজুক সত্যিই খুব ক্লান্ত ছিলো।তার উপরে প্রোজেক্টের টেনশন।ও কী পারবে এতো বড় বড় দুটো কোম্পানির সামনে তাদের কোম্পানিকে প্রেজেন্ট করতে?
এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ঘুমের দেশে পাড়ি জমায় লাজুক।

সকাল ৭টা বাজে।মুনতাসিরের কথামতো সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে লাজুক।তার বসের ইচ্ছা হয়েছে বাস জার্নি করার।
বাসে এটা লাজুকের প্রথম জার্নি।ছোট থাকতে গাড়িতেই যাতায়াত করতো।আর এখানে এসেছিলো ট্রেনে॥

.
.
“মিস লাজুক আপনি কি সবসময় সব কাজে এডভান্স?”
লাজুকের উদ্দ্যেশ্য প্রশ্নটা ছোড়ে মুনতাসির।

লাজুক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়।

“ইয়েস স্যার, আই মিন নো স্যার।”
কথাটা শেষ করেই মুনতাসিরের দিকে তাকিয়ে দেখে মুনতাসির তার বড় বড় চোখদুটো ছোট করে মুখ কুচকে তাকিয়ে আছে।বেশ লাগছে তাকে দেখতে।

“জীম করা বডি, মুখে খোচা খোচা দাড়ি, ঠোঁট দুটো একদম রেড ওয়াইনের মতো,এক চুমুকেই খাওয়া যাবে, চোখে তার নীচলে আভা।চোখ দুটো বড় বড় না হয়ে ছোট ছোট হলে ভালো লাগতো।সৃষ্টিকর্তা বোধহয় তাকে তৈরী করার সময় মাটি একটু কম ব্যবহার করেছে।”

অপন মনে ভাবছিলো লাজুক এগুলো।

মুনতাসিরের ধমক শুনে বাস্তবে ফেরে।কেননা আর ২ মিনিট পর বাস ছাড়বে।
জানালার সাইডে বসেছে লাজুক।পাশে কেউ একজন বসেছে, তাকে এক পলক দেখেই আত্মা শুকানোর উপক্রম।
মুনতাসির তার পাশে বসা।
অস্বস্তি লাগছিলো লাজুকের।
অথচ মুনতাসির কানে হেডফোন গুজে গান আর আশেপাশে সবকিছু উপভোগ করছে।

বাগেরহাট পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে।
ওরা একটা গ্রামের রাস্তা দিয়ে হাঁটছে।
মুনতাসির যে এতো আভিজাত্যের মাঝেও এতো সাধারন লাজুক তা কল্পনাও করেনি।দুজনেই চুপচাপ হাঁটছে, কেউ কোনো কথা বলছে না।

ঋতুরাজ বসন্তের দৌলতে এখানে একটু কোকিলের ডাক উপভোগ করা যাচ্ছে।না হলে শহরে এগুলো পৌঁছায়না।

কোকিল পাখিকে নকল করছে লাজুক।সে এমন ভাব করছে যেন সে একটা মজার খেলা খেলছে।

অতিরিক্ত খুশিতে লাজুক ভুলেই যায় পাশে তার বস দাঁড়ানো।ও শক্ত করে মুনতাসিরের হাত চেপে ধরে।মুনতাসির তবুও রিয়্যাক্ট করে না।

ভয়ে আর লজ্জায় মুখটা কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে আছে লাজুক।
দুরে থেকে সে দেখতে পারছে একটা ওয়েস্টার্ন ড্রেস পড়া মেয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে, মুখে তার অজস্র হাসি।পাশে তাকাতেই লাজুক দেখে মুনতাসির মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হাসছে।

মেয়েটা কাছে আসতেই মুনতাসিরকে শক্ত করে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে।যেন সে ছুটে পালাবে।

এদিকে লাজুকের মনে হচ্ছে তার বুকের বাম পাশে কয়েক হাজার বোলতা তাদের বিষ ছেড়ে দিচ্ছে লাজুকের শরীরে।

চলবে……….

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে