অতিথি পাখি পর্বঃ ০১

0
1431

অতিথি পাখি পর্বঃ ০১
লেখকঃ আবির খান

অফিসটা মাত্র শেষ করেই রিয়াজ দৌঁড়ে এসে মিরপুর থেকে বাসে উঠলো বাসায় আসবে বলে। সেই মিরপুর থেকে মতিঝিল আসবে রিয়াজ। প্রতিদিন যা কষ্ট হয় রিয়াজের তা বলার বাইরে। তার উপর এখন আবার শীত কাল। প্রতিদিনের মতো আজও বাসের ভিতরে একগাদা অপরিচিত মানুষ। কিন্তু সবার ভিতরেই কেমন এক প্রশান্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কারণ সবাই এখন বাসায় ফিরছে। রিয়াজ কন্টাক্টারের চিল্লাচিল্লিতে সামনে থেকে বাসের শেষ ভাগে চলে গেল। এটা প্রতিদিনের নিয়ম হয়ে গিয়েছে। কারণ কন্টাক্টার যেই কিনা শুনে রিয়াজ লাস্ট স্টপেজে নামবে ওমনি চিল্লাতে থাকে আর বলে,”পিছনে যান পিছনে যান” রিয়াজকে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার আগেই তার চিল্লাচিল্লি শুরু। যাক অনেক কষ্টে সারাদিন কষ্ট করা মানুষগুলোকে পার করে রিয়াজ পিছনে এসে দাঁড়ায়। গমগমে মানুষের জন্য বেশ গরম গরমই লাগছে রিয়াজের।

রিয়াজ দাঁড়িয়ে জানালার বাইরে তাকাতে যাবে ঠিক তখনই ওর চোখ আটকে যায় একটা মেয়ের দিকে। মেয়েটাকে বেশ মধ্যবিত্ত কিংবা ধনী পরিবারের বলা যায়। পরনে শীতের জামা আর একটা দামী চাঁদর পেচানো গায়ে। সে বাসের জানালার গ্লাসের সাথে মাথা হেলান দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। বাসের ছোট লাইটের আলোতে তার ফর্সা মুখখানা বেশ স্পষ্ট। বড় বড় চোখের পাপড়ি গুলো বেশ দূর থেকেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। নেশাকাতর ঠোঁটখানা কি যেন বিড়বিড় করে বলছে। রিয়াজ তা পড়ার চেষ্টা করলেও সে ব্যর্থ হয়। হঠাৎ,

অপরিচিতঃ কি ভাই পছন্দ হয়েছে বুঝি??

রিয়াজ ঘাবড়ে যাওয়ার সাথে কিছুটা লজ্জাও পায়। তাও নিজেকে সামলে বলে,

রিয়াজঃ কি আর বলবো ভাই, বাগানের সুন্দর ফুলটা দূর থেকেই ভালো লাগে। কাছে গেলে যদি ছিড়ে নিয়ে যেতে ইচ্ছে করে।

অপরিচিতঃ ফুল যদি নিজেই আসতে চায়??

রিয়াজঃ তাও আমি ছিড়বো না। দূর থেকে একটু দেখছি এই বেশ।

অপরিচিতঃ সাব্বাশ। আপনি পাশ করেছেন।

রিয়াজ কিছুটা অবাক হয়ে বলে,

রিয়াজঃ কিসে পাশ করেছি??

অপরিচিতঃ আমি লক্ষ্য করছিলাম আপনি মেয়েটিকে বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ দেখছিলেন। তাই পরীক্ষা করে দেখলাম, এই চাহনিতে কি আছে।

রিয়াজঃ তা কি পেলেন??

অপরিচিতঃ অনেক সম্মান মেয়েটার জন্য৷ আর আপনি ভালো মানুষও বটে।

রিয়াজঃ বাবা-মা সেই খারাপ শিক্ষাটাই কখনো দেয়নি। মা বলেছে, মেয়েরা নারীর জাত। কখনো তাকে অসম্মান করবিনা৷ যদি করিস, তাহলে ভাবিস আমাকেই করছিস।

অপরিচিতঃ বাহ!! আপনার মাতো খুব ভালো সাথে পরিবারও।….যান আপনার ভাগ্য খুলেছে।

রিয়াজ অবাক হয়ে প্রশ্ন করে,

রিয়াজঃ মানে কীভাবে??

অপরিচিতঃ ওই যে, মেয়েটার পাশে বসা লোকটা বোধহয় এখন নেমে যাবে…ওই তো নেমে পড়ছে। যান যান বসুন। না হয় কেউ বসে পড়বে।

রিয়াজ বোকা হয়ে গিয়েছে। তাও গিয়ে বসে পড়লো। অপরিচিত লোকটা একটা মুচকি হাসি দিলো। তার কিছুক্ষণ পর সেও নেমে গেল। রিয়াজ চুপচাপ বসে আছে। দূর থেকেই খুব ভালো ছিল। পাশে বসাতে রিয়াজের কেমন নার্ভাস ফিল হচ্ছে। শার্টটা একটু ঠিক করছে, মুখটা বারবার রুমাল দিয়ে মুছছে। রিয়াজ যে কি করছে তা ও নিজেই বুঝতে পারছে না। রিয়াজ এবার মনের সব শক্তি এক করে বাম পাশে তাকিয়ে দেখে, একি মেয়েটা চোখ বন্ধ করে হেলান দিয়ে বসে আছে। ও একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে। রিয়াজ ভাবছে, “যাক মেয়েটা ঘুমাচ্ছে এই বেশ। জেগে থাকলে আমার অনেক নার্ভাস লাগতো।” কিন্তু বিপত্তিটা ঘটে একটু পরই। অবশ্য এই ঘটনাকে বিপত্তি বললে ভুল হবে। এটাকে রিয়াজের স্বপ্ন পূরণ ও বলা যেতে পারে। রিয়াজের স্বপ্ন ছিল ওর কাঁধে কোনো অতি সুন্দরী না হলেও অল্প সুন্দরী রূপবতী একটা মেয়ে মাথা রাখবে আর ওকে নিয়ে পুরো শহরটা ঘুরবে। সেটাই হলো এখন। মেয়েটা ঘুমের ঘোরে রিয়াজের কাঁধে মাথা রাখে। রিয়াজের মনে যেন লাড্ডু ফুটছে। আজ জীবনে প্রথম এমন একটা অনুভূতির সাক্ষী হলো রিয়াজ। ও মাথা তুলে উপরে সোজা তাকাতেই খেয়াল করলো, কিছু লোক বিরক্তি নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। এদের চোখ দেখে বুঝা যাচ্ছে এদের রিয়াজের খুশী সহ্য হচ্ছে না। রিয়াজ মেয়েটির ওড়নাটা খুব সাবধানে ধরে ভালো ভাবে ঠিক করে দিল। কারণ কেন জানি ও চায় না মেয়েটিকে কেউ খারাপ ভাবে দেখুক।

একে একে সবকটি বাস স্টপেজ পার হয়ে শেষ বাস স্টপেজে এসে পৌঁছাল ওরা। কিন্তু একি মেয়েটা এখনো দিব্বি ঘুমাচ্ছে। কন্টাক্টার মামা আবার চিল্লিয়ে বলছে সবাই নেমে পড়ুন। রাত প্রায় ৯.৩০। রিয়াজ এখন কি করবে বুঝতে পারছে না। মেয়েটাকে ডাক দিতে হবে। তাই রিয়াজ,

রিয়াজঃ এই যে হ্যালো.. শুনছেন..উঠুন আপনি এসে পড়েছেন। এই যে…

রিয়াজ অনেকক্ষণ চেষ্টা করলো কিন্তু কোন লাভই হচ্ছে না। মেয়েটা কোন নড়াচড়াই করছে না। রিয়াজের এই কনকনে শীতের মধ্যেও কপালটা কেমন ঘামে ভরে আসছে। রিয়াজ লক্ষ্য করে কন্টাক্টার আর ড্রাইভার ওদের দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে আছে। কন্টাক্টার রিয়াজের কাছে এসে প্রশ্ন করলো,

রিয়াজঃ কি ভাই কোনো সমস্যা?? আপনারা নামছেন না কেন?? আর উনি কে??

রিয়াজ এখন সত্যিটা বললে কিছু খারাপ হতে পারে। তাই মিথ্যা বলল,

রিয়াজঃ ভাই আমার বউটা হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। কোনো কথা বলছে না। ও একটু অসুস্থ। একটা রিকশা করে দিবেন ভাই??

কন্টাক্টারঃ ও আচ্ছা। আপনি তারে নিয়ে আসেন আমি রিকশা ডাক দিতাছি।

রিয়াজ মেয়েটার গায়ে থাকা চাঁদর দিয়ে ভালো করে পেঁচিয়ে কোলে তুলে নিচে নেমে রিকশায় করে সামনেই একটা হাসপাতালে দ্রুত নিয়ে যায়। রিয়াজ আসার সময় কন্টাক্টার আর ড্রাইভারকে বলতে শুনেছে,

– “শালার বউ না হইলে আজকে সেই একটা খেলা হইতো।”

রিয়াজের মন চাচ্ছে এদের শরীরের ভিতরে বোমা ভরে উড়িয়ে দিতে। নাহলে এদের লজ্জা স্থানে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া উচিৎ। এদের জন্যই আমাদের মা বোনরা রাতে একটু জীবিকার জন্য চলাচল করতে পারে না। রিয়াজ হাসপাতালে পৌঁছালে দ্রুত মেয়েটাকে ইমার্জেন্সিতে নেওয়া হয়। ডাক্তার মেয়েটাকে অনেকক্ষণ চেকআপ করে এসে রিয়াজকে বলে,

ডাক্তারঃ উনি অনেকটা দুর্বল। কয়েকদিন যাবৎ হয়তো কিছু খান নি। আর হয়তো কোন কিছু নিয়ে অনেক চিন্তা করছিলেন। তাই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছেন। উনি আপনার কে হন??

রিয়াজঃ আসলে ডাক্তার ওনাকে আমি বাসের মধ্যে পেয়েছি।

ডাক্তারঃ ওহহ। ওনাকে স্যালাইন দেওয়া হয়েছে। জ্ঞান আসলেই উনি কে জানা যাবে। আপনি ততক্ষণ অপেক্ষা করুন।

রিয়াজঃ জি।

২ ঘন্টা পার হয়েছে। এখন রাত ১২.১৩ মিনিট। রিয়াজ ঝিমাচ্ছিল। হঠাৎই নার্স এসে বলল,

নার্সঃ আপনার রোগীর জ্ঞান এসেছে।

রিয়াজ অনেকটা খুশী হয়ে ভিতরে যায়। সাথে ডাক্তারও এসে পড়ে। মেয়েটিকে একজন মহিলা ডাক্তার দেখেছেন। তিনি এসে মেয়েটিকে প্রশ্ন করেন,

ডাক্তারঃ আপনি ভালো আছেন??

মেয়েঃ জি একটু খারাপ লাগছে। কিন্তু আমি এখানে কেন?? আমার কি হয়েছে?? (চিন্তিত কণ্ঠে)

ডাক্তারঃ ভয় নেই। আপনি দুর্বল হয়ে পরায় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। উনি আপনাকে এখানে এনেছেন।

রিয়াজ একটা হাসি দিয়ে মেয়েটির কাছে এগিয়ে যায়। মেয়েটি রিয়াজকে কিছুক্ষন দেখেই বলে উঠে,

মেয়েঃ ও তো আমার বয়ফ্রেন্ড। বাবু তুমি আমাকে এখানে নিয়ে এসেছো?? অনেক থ্যাংকস।

উপস্থিত ডাক্তার নার্স রিয়াজের দিকে আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে আছে। রিয়াজ নিজেই যেন আকাশ থেকে পড়েছে। রিয়াজ অসহায় ভাবে বলে উঠে,

রিয়াজঃ আমিতো উনাকে চিনিই না। আমি উনার বয়ফ্রেন্ড হলাম কীভাবে?? উনি মিথ্যা বলছেন।

মেয়েঃ এই বাবু তুমি মিথ্যা বলো কেন?? তুমিই তো আমার বয়ফ্রেন্ড।

রিয়াজের দিকে কেমন করে যেন বাকিরা তাকিয়ে আছে। আর রিয়াজ….

চলবে….

কেমন লেগেছে সবার জানাবেন কিন্তু। সবার ভালো সাড়া চাই। সাথে থাকবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here