অটোগ্রাফ

0
396
রেডি হয়ে বেরুতে যাবো, সুন্দরী একমাত্র মামাতো বোন বললো,এতো ফুলবাবু সেজে কোথায় যাবে, শুনি? আমি বললাম, একটা লেখক পাঠক সম্মেলনে যাবো,একটা সাহিত্য গ্রুপ থেকে সম্মেলন ডাকা হয়েছে, সব বড় বড় লেখকেরা আসবে। মামাতো বোন বললো, আচ্ছা, লেখা লেখি করে কি হয়,শুনি? টাকা পয়সা কিছু পাও,নাকি বেগার খেটে মর?আমার তো ধারণা, যাদের কিচ্ছু করার যোগ্যতা নাই তারাই লেখক হয়। নেই কাজ তো খই ভাজ!অযোগ্য লোকেরাই কিছু হতে না পেরে লেখক হয়।
আমি বললাম, ছিঃ,লেখক সম্পর্কে এই তোর ধারণা? শুনেছি, সুন্দরী মেয়েরা কিছুটা আবাল টাইপ হয়,তুই তো গাধা হয়ে বসে আছিস! লেখকদের মানুষ কতো সম্মান করে, জানিস? তারা সৃষ্টিশীল মানুষ, টাকা পয়সা নিয়ে ভাবে নাকি? কাছে পেলে পাঠক যখন হুমড়ি খেয়ে পড়ে অটোগ্রাফের জন্য, তখন কি যে ভালো লাগে!তো এ জীবনে কাউকে অটোগ্রাফ দিয়েছো? কেউ কি কখনও তোমার কাছে অটোগ্রাফ চেয়েছে? প্রেস্টিজে আঘাত লাগলো, বললাম, এতো যে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছিস ,চল আমার সাথে, গেলেই দেখবি মানুষ আমাদের কত সম্মান করে! মামাতো বোন কে নিয়ে সম্মেলনে উপস্থিত হলাম। আগেই অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে, আমি সবার পরে গিয়ে পৌছালাম।গেইটের সামনে দেখলাম লেখিকা মধুমালা চৌধুরীকে ঘিরে বেশ জটলা, অটোগ্রাফ শিকারীর পাল্লায় পড়েছেন তিনি। সমানে অটোগ্রাফ দিয়ে চলেছেন। যারা অটোগ্রাফ নিতে এসেছেন, সবাই পুরুষ। আরেকটু সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম লেখিকা চয়নিকা চৌধুরী দুই হাতে অটোগ্রাফ দিয়ে চলেছেন। এখানেও সব পুরুষ, দু,একজন মহিলা পাশে দাড়িয়ে দৃশ্য দেখছে। আমি মামাতো বোনের দিকে তাকিয়ে হাসলাম, যার অর্থ, আমার কথা সত্যি হলো? দেখ,লেখকদের মানুষ কতো সম্মান করে!
ভিতরে হাটাহাটি করছি, সব মহিলা লেখিকা অটোগ্রাফ দিয়ে চলেছেন, পুরুষ লেখকরা বিমর্ষ বদনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কেউ তাদের কাছে অটোগ্রাফ চাইছে না! এক জায়গায় দেখলাম, এবারের বই মেলার সেরা লেখক আরিফ আজাদ দাড়িয়ে আছে। বেচারা মোল্লা টাইপ মানুষ। দাড়ি টুপি মাথায় দাড়িয়ে আছে, সবাই হৈ চৈ করছে,তাকে এখানে বেশ বেমানান মনে হলো। এতো বড় লেখক অথচ কেউ পাত্তা দিচ্ছে না। আমি বললাম, ভাই কি অবস্থা? বেচারা এমনিতেই কম কথার মানুষ, শুধু বললেন, আলহামদুলিল্লাহ। আরেক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন আয়মান সাদিক, ওনিও এ বছরের বই মেলার বেস্ট সেলার। তিনিও শুকনো মুখে দাড়িয়ে আছেন। আমি কর মর্দন করে বললাম, কেমন লাগছে ভাই? তিনি ও শুকনো মুখে বললেন, ভালো। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি, কোথা থেকে হাজির হলেন সোলাইমান সুখন,যিনি এবারের বই মেলার বই বিক্রির দিক দিয়ে তিন নাম্বার আছেন। তিনি পরিবেশ হালকা করার জন্য বললেন, আমার না হয় চেহারা খারাপ, কিন্ত আয়মান সাদিকের চেহারা তো মাশাল্লাহ, ওর কাছেও তো কেউ অটোগ্রাফ চাইতে পারে! তা না, সবাই ছুটছে মহিলা লেখিকাদের কাছে! আমি বললাম, ভাই আপনারা তো মানুষকে মোটিভেট করেন,পাঠকদের মোটিভেট করার কি সিস্টেম নাই, যাতে তারা মহিলা লেখকের পাশাপাশি পুরুষ লেখকদের অটোগ্রাফ নেয়?একটা পাঠক সম্মেলন করে চেষ্টা করে দেখেন না রে ভাই! সোলাইমান সুখন শুকনো মুখে বললেন, দেখি!আয়মান সাদিক বললেন, আমরা পুরুষ হয়েছি বলে কি আমাদের মান ইজ্জত নাই?সমানাধিকার বলেও তো একটা কথা আছে, কিছু কিছু মেয়ে প্রতিদিন শুধু প্রোফাইল পিকচার পরিবর্তন করে বিখ্যাত হয়ে গেল, এটা একটা কথা! আমি দেখলাম, অবস্থা বেগতিক, মামাতো বোনের কাছে ইজ্জত যায় যায় অবস্থা। আমি বললাম, তোমরা দাঁড়াও আমি ওয়াস রুম থেকে আসি।ওয়াস রুমে ঢুকে চোখে মুখে আচ্ছা করে পানি দিলাম। হায় আল্লাহ, এতো বড় মুখ করে এলাম,এই তার নমুনা! দশ মিনিট পর ওয়াসরুম থেকে ফিরে এসে দেখি, এলাহি কান্ড! মামাতো বোন ধুমাইয়া অটোগ্রাফ দিয়ে যাচ্ছে! দশ মিনিটেই কি সে সেলিব্রিটি হয়ে গেল? আমি ওয়াস রুমে যাওয়ার পর একজন এসে মামাতো বোনের কাছে অটোগ্রাফ চাইল,সে ধরে নিয়েছে মামাতো বোন লেখিকা! একজনকে অটোগ্রাফ দেওয়ার পরই সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়লো। মামাতো বোন সুন্দরী, সব পুরুষ অটোগ্রাফ শিকারী তাকে ঘিরে ধরলো। মামাতো বোন দুই হাতে ধুমাইয়া অটোগ্রাফ দিতে লাগলো। ভীড় থেকে একজন বললো, ম্যাডাম, এবারের বই মেলায় আপনার কোন বইটা বেশি চলেছে? আমি মনে মনে প্রমাদ গুনলাম, এই সেরেছে! এখন কি হবে? সে অটোগ্রাফ দিতে দিতে বললো, ‘বর্ষা কালে ঘুঘু ডাকে ‘বইটা বেশ চলেছে। ব্যাটা হাসি হাসি মুখ করে বললো, ম্যাডাম বইটা আমি পড়েছি, অসাধারণ বই! ভীড় থেকে আরেক জন বললো, আমি ও পড়েছি!
আমি হ্যাবলা কান্তর মতো দাড়িয়ে আছি, কি করবো বুঝতে পারছি না। তের চৌদ্দ বছরের একটা স্কুল পড়ুয়া মেয়ে সামনে এগিয়ে এলো অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য। মামাতো বোন আমাকে দেখিয়ে বললো, এই যে দাড়িয়ে আছেন, উনি হানিফ ওয়াহিদ। ভালো লেখক। তুমি ওর কাছ থেকে একটা অটোগ্রাফ নাও। মেয়েটা খাতা হাতে আমার দিকে এগিয়ে আসছে, যাক ভালোই হলো, একটা অটোগ্রাফ দিয়ে অন্তত ইজ্জত রক্ষা করি! আমি হাসি মুখে পকেট থেকে কলম বের করতে গেলাম, হঠাৎ মেয়েটা বলে উঠলো, বাইরে আমার বয়ফ্রেন্ড দাঁড়িয়ে আছে, বেশি দেরি হলে রাগ করবে, থাক অটোগ্রাফের দরকার নাই। আমি হতাশ হয়ে দেখলাম, মেয়েটা হনহন করে বেড়িয়ে যাচ্ছে!#অটোগ্রাফ হানিফ ওয়াহিদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here