বাড়ি প্রচ্ছদ পৃষ্ঠা 1685



কৃষ্ণকলি পর্ব- ০৮

কৃষ্ণকলি
পর্ব- ০৮
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

বহুকাল পর অচেনা কারো কন্ঠে সেই চিরচেনা নাম. . . . . . .
বাঁধন চমকে গেল।
থমকে গিয়ে পিছু ফিরে তাকালো বাঁধন।
“কি বললেন?”
অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করল নুসরাতকে।অনেক হয়েছে, আর নয়। এবার সময় এসেছে সত্যিটা বলার। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে মুখ খুলে নুসরাত।
“মানে বুঝতে পারেননি?আপনার…….. (……)…..?
কথার মধ্যিখানে থেমে যায় নুসরাত। বাঁধন বার বার জিজ্ঞেস করছে, কি হলো? বলুন….
কিন্তু নুসরাত যেন কোনো কথায় বলতে পারছে না। কারন- কথার মাঝখানে ফুলস্টপ’টা টেনে দিলাম আমি মায়া। ঐ মুহূর্তে আমি সামনে গিয়ে না দাঁড়ালে নুসরাতের হয়ত মনেই থাকত না আমার সাথে করার প্রতিজ্ঞার কথা।

সেদিন বাঁধনের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য ছুটে যাচ্ছিল নুসরাত। কিন্তু আমার কসমের কাছে হার মেনে যায় সে। থমকে যায় পথিমধ্যে। বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে ওকে সেদিন বলেছিলাম কখনো যদি আমার ব্যাপারে বাঁধনের সাথে কোনো কথা বলে তাহলে সেদিন বড়’ই অনর্থ ঘটে যাবে। ওকে বলেছিলাম, বাঁধন যাতে কখনো ওর গত হয়ে যাওয়া ভালোবাসার কথা জানতে না পারে………
আমি এসব ভাবতে ভাবতে বাঁধন নুসরাতকে হাজারটা প্রশ্ন করে ফেলেছে। নুসরাত বোকার মত চুপসে দাঁড়িয়ে আছে। এই মুহূর্তে বাঁধনের প্রশ্নের সঠিক জবাব দেওয়ার ক্ষমতা নুসরাতের নেই। আর একটা কিছু বলে যে বিষয়টা ধামাচাপা দিবে সেটাও মাথায় আসছে না।
এদিকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যাচ্ছে বাঁধন।
“গত রাত্রে ফেসবুকের একটা পেইজে মায়ার বাঁধন নামে একটা গল্প পড়ছিলাম আমরা। মন ছুঁয়ে যাওয়া গল্পটা পড়ে’ই নুসরাত আপনাকে মায়ার বাঁধন বলে সম্বোধন করল জনাব।”
পিছন থেকে কথাটা বলে উঠলাম আমি।
“ওহ্, তাই বলেন…”
বলেই বাসার দিকে পা বাড়ালো বাঁধন।

উফফ্, বাঁচালে খোদা!
আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কথাটা বলল নুসরাত।
আজ ভয়ংকর কিছু ঘটে যেত……
অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে নুসরাতের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলে বাসার ভিতরে চলে গেলাম আমি।

দেখতে দেখতে অনেকগুলো দিন কেটে যায়। একটু একটু করে যে বাঁধনকে প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম, সেই বাঁধনের জন্য’ই বুকের ভেতরে অল্প অল্প করে ভালোবাসার জন্ম হতে লাগল। ধীরে ধীরে বাঁধনের মায়ায় গভীর ভাবে জড়িয়ে যেতে লাগলাম। ওর কথা বলা, ওর খাওয়া, ওর চলা সব…..
সবকিছুর প্রেমে পরে যায় নতুন করে। সেদিন ছিল পহেলা বৈশাখ___
বাঁধন ও তার পরিবার প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ’টা ওদের গ্রামের বাড়িতেই উৎযাপন করেন। আর সে জন্য যথারীতি এবারো ওরা পহেলা বৈশাখের আগের দিন বিকেলে রওয়ানা দেয় গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে। ওদের পরিবারের সঙ্গে এবার আমরা দু’বান্ধবিও ছিলাম।
রাত্রি ৮টা…..
আমরা বাঁধনের গ্রামের স্টেশনে গিয়ে পৌঁছলাম। স্টেশনে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল স্বয়ং বাঁধনের দাদা। বাঁধনের কাছাকাছি পৌঁছেই বাঁধনের মা সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করল। সুইটি দাদাভাই, দাদাভাই করে জড়িয়ে ধরে দাদাকে। সুইটির কপালে চুমু খেয়ে বাঁধনের দাদা আমার দিকে এগিয়ে আসেন।
” এই তাহলে আমার আরেকটা গিন্নি”
কথাটা বলে বাঁধনের বাবা আমার গাল টেনে দিলেন। নুসরাতের সাথেও পরিচিত হলেন।
বাঁধন যখন আনমনে ফোন টিপাটিপিতে ব্যস্ত ঠিক তখন’ই ওর তলপেটে ব্যাথা অনুভূত হয়। ওহ্, বলে সামনে তাকাতেই দেখে ওর দাদা এখনো ঘুষি দিয়ে হাত ওভাবেই রেখেছে। দাদা তুমি…..???
কথাটা বলে’ই বাসার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে বাঁধন। পিছন দিয়ে বাকি সবাই যাচ্ছে।

বাড়িটা খুব পুরনো,
তবে ছিমছামও গুছানো।
চারদিকে শ্যাওলা পরা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা বাড়িটির ভিতরের বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে সুন্দর বাগান। বাগানটিতে নানারকম জানা অজানা ফুল ফুটে রয়েছে। ফুলের গন্ধে চারদিক মুখরিত।
বাগানটির ঠিক পাশেই রয়েছে বিশাল বড় দীঘি। যা বাড়ির সৌন্দর্যকে বহুগুনে বাড়িয়ে দিয়েছে। দীঘিটিতে উঠা-নামার জন্য সিড়িও রয়েছে। ঐ সিড়ি বেয়েই মহিলারা দীঘির জলে গোসল করত। বাগানের ক্ষাণিকদুরে আরেকটি জিনিস লক্ষ করলাম।
ছোট্ট করে একটা ছাউনির মত কি যেন একটা। সুইটির থেকে জানতে পারলাম এটা আসলে চা’য়ের জন্য নির্মিত।
গ্রীষ্মের পড়ন্ত বিকেলে কিংবা সন্ধ্যাবেলায় বাঁধনের দাদা সবাইকে নিয়ে এখানে বসেই চা আড্ডা দেয়।
বাঁধনের মায়ের থেকে জানতে পারলাম বাঁধনের দাদা পরদাদারা ছিলেন পুরনো ধনী। সমস্ত গ্রামের মধ্যে ওনারাই ছিলেন অধিকতর সম্পত্তির মালিক। আর সে হিসেবে ওনার এই এলাকায় রয়েছে যথেষ্ট দাপট। আর গ্রামের লোকের এ পরিবারের লোকদের যথেষ্ট শ্রদ্ধা এবং সম্মান করে। কোনো সমস্যা হলে এখানেই সবাই ছুটে আসে……

গ্রামে লোডশেডিং খুব কমন একটা ব্যাপার।
সেদিনও লোডশেডিং হয়েছিল।
বাঁধনের দাদা কাজের ছেলেকে চা বানাতে বলে সবাইকে বললেন হাতে একটা করে চেয়ার নিতে। আমরা সবাই হাতে একটা করে চেয়ার নিয়ে বাঁধনের দাদাকে অনুসরন করে হাজির হলাম দীঘির পাড়ে। দীঘি থেকে ক্ষাণিকটা দুরেই আমাদের অবস্থান। সেখানে সবাই যে যার মত চেয়ার পেতে বসে পরলাম।
প্রকৃতির শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশ,
মৃদু বাতাস,
দুরের পাখিদের বাসা ফেরার আয়োজন।
মাঝে মাঝে দু’য়েকটা পাখির কিচিরমিচির শব্দ।
সবমিলিয়ে ভালো’ই লাগছে……..

ইস!
এই সময় বাঁধন যদি কাছে থাকত,
ওর হাতটা ধরে যদি বসে থাকতে পারতাম
কিংবা ওর কাধে মাথা রেখে!
তাহলে মন্দ লাগত না।
আচ্ছা….
ওর কি আমার কথা একটুও মনে নেই?
ও কি আমাকে একটুও আর ভালোবাসে না?
আমার কথা কি ওর একটুও মনে হয় না?
মনে হয় না সেই স্বপ্নগুলোর কথা,
যা একসময় আমরা দু’জন দেখতাম?
বাঁধনকে নিয়ে যখন ভাবনার অতল গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখন’ই আমার ভাবনাচ্ছেদ ঘটে।
” কি বড় গিন্নী? আমাকে রেখে’ই হারিয়ে গেলা কল্পনাতে?”
ছি! দাদাভাই….
কি যে বলো না…..বলেই লজ্জায় মুখ লুকালাম আমি।
-তো গাচ্ছেন না কেন গান???
বাঁধনের কথা শুনে ওর দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকালাম। কিসের গান?!!!
আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলাম ওদেরকে।
দাদাভাই আমার সখি এখন ওর কল্পরাজ্যের রাজকুমারকে নিয়ে ভাবনার অতলে ডুবে আছে, ওর মন কি আর এখানে আছে???
নুসরাত কথাটা বলতেই ফিক করে হেসে দিল সবাই। আমি মুখ ভার করে বসে আছি।
তো যায় হোক!
হাসি পরে হবে। আগে রবীঠাকুরের কাব্যের নায়িকা কৃষ্ণকলি ম্যামের কন্ঠে একটা রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনে নেই, কি বলো সবাই???
ইতিমধ্যে বাঁধনের মা এবং ওনার দুই জা ও তাদের ছেলেমেয়েরা এসে যোগ দিল।
সবাই উৎসুক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে আমার কন্ঠে গান শুনার প্রতিক্ষায়। অন্যদিন হলে ঠিক বাঁধনের মুখের উপর বলে দিতাম এখন কোনো গান শুনাবো না তোমায়, গান যা শুনানোর ফুলশয্যার রাতেই শুনাবো। দুজন মিলে একসাথে আমাদের প্রিয় রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনব……
আজ তো তা বলতে পারব না।
কারন- ওর সাথে আমার মত কালো মেয়ের মিল তো কখনোই হবার নয়।
” কি হলো শুনান….!!!”
বাঁধনের কথা শুনে সম্ভিত ফিরল। ওর দিকে তাকিয়ে একটা শুকনো হাসি দিয়ে গান শুরু করলাম-

আমি এলেম, তারই দ্বারে….
আমি এলেম।
ডাক দিলেম অন্ধকারে,
হা রে……….
আমি এলেম, তারই দ্বারে……..
আমি এলেম।
আগল ধরে দিলেম নাড়া………
প্রহর গেল, পাইনি সাড়া;
দেখতে পেলেম না’যে তারে,
হা রে………..
আমি এলেম, তারই দ্বারে…….
আমি এলেম।
তবে যাবার আগে এখান থেকে,
এই লিখনখানি__
যাব রেখে………
তবে যাবার আগে এখান থেকে….!
দেখা তোমার পাইবা না পাই…..
দেখতে এলেম__
যেনগো তাই ফিরে যায় সুদূরের পাড়ে……
হা রে……
আমি এলেম, দ্বার’ই দ্বারে…..
আমি এলেম।
তবে যাবার আগে এখান থেকে,
এই লিখনখানি_
যাব রেখে…..
তবে যাবার আগে এখান থেকে….!
দেখা তোমার পাইবা না পাই…….
দেখডে এলেম___
যেনগো তাই ফিরে যায় সুদূরের পাড়ে……
হা রে……
আমি এলেম, তারই দ্বারে…….
আমি এলেম।
ডাক দিলেম অন্ধকারে…….
হা রে…….
আমি এলেম, আমি এলেম……!!!

চলবে……

কৃষ্ণকলি পর্ব- ০৭

কৃষ্ণকলি
পর্ব- ০৭
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

মাঝরাত্রে রিংটনের আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে যায় বাঁধনের মায়ের। ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে ফোন রিসিভ করে চমকে উঠেন ওনি। অজানা বিপদের আশংকায় ভিতরটা মুচড় দিয়ে ওঠে ওনার।
“গেইটের সামনে মানে….?”
কাঁপা স্বরে ওনি জিজ্ঞেস করেন।

হ্যাঁ, ঠিক’ই শুনেছেন আপনারা!
এই মুহূর্তে আমি বাঁধনের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। সাথে আছে বান্ধবী নুসরাত। হাজার অনুনয়-বিণয় করেও ওকে ওর কথা থেকে টলাতে পারিনি। গেইটের সামনে এসে ফোন করলাম বাঁধনের মাকে।
” আন্টি! গেইট’টা খুলেন। আমি গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।”
ফোন রিসিভ করার সাথে সাথে কথাটা বাঁধনের মাকে বললাম। এত রাত্রে এ ধরনের কথা শুনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। ঘাবড়ে যান ওনি। তাড়াতাড়ি বাঁধনকে ডেকে তুলে গেইটের সামনে গেলেন ওনি। গেইটের বাইরে থেকেই লক্ষ্য করলাম মা-ছেলে দু’জনের চোখে মুখেই আতঙ্কের ছাঁপ। নুসরাতের কথায় এত রাত্রে এভাবে ছুটে আসা মোটেও উচিৎ হয়নি আমার। মনে মনে নুসরাতকে হাজারটা গালি দিলাম। তারপর মাথা নিচু করে গেইট অতিক্রম করে বাসার ভেতর ঢুকলাম।

এই মুহূর্তে আমাদের অবস্থান ড্রয়িংরুমে। সোফায় মাথা নিচু করে বসে আছি আমি। আর আমার দিকে কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে কয়েক জোড়া চোখ। যে চোখগুলোতে রয়েছে হাজারো প্রশ্ন, হাজারো কথা। মিনিট দুয়েক নিরবতার পর মুখ খুলেন বাঁধনের মা।
“এত রাত্রে তুই চলে আসছিস? কি হয়েছে তোর? তুই ঠিক আছিস তো? তোর কোনো সমস্যা হয়নি তো?”

একনিশ্বাসে করা একগাদা নাগরিক প্রশ্ন।

“আসলে আন্টি ও খুব বাজে স্বপ্ন দেখেছে। আর সেটা দেখেই চিৎকার দিয়ে উঠল ঘুম থেকে। তারপর থেকে অদ্ভুত সব পাগলামী করতে থাকে। আমি বাসায় যাব, বাসায় যাব, আন্টির কাছে যাব। তাই বাধ্য হয়ে নিয়ে আসতে হলো।”
বাঁধনের মাকে দ্বিত্বীয় বার প্রশ্ন করার কোনো সুযোগ না দিয়ে কথাগুলো বলে নুসরাত। বাঁধনের মা দৌঁড়ে আমার কাছে আসলেন। জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলাতে থাকেন। নুসরাতের দিকে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকালাম। কারন- আমার পক্ষে ঐসকল প্রশ্নের কোনো সঠিক উত্তর দেওয়া সম্ভব ছিল না। আবার মিথ্যেটাও বলতে পারতাম না। কারন- ওনার মাঝে আমি আমার মাকে খুঁজে পায়!!!

চলে গেল আরো কয়েক মাস….
এর’ই মাঝে আমার সাথে সাথে নুসরাতও পরিচিত হয়ে গেল এ বাসার প্রত্যেকটি সদস্যের কাছে। এখন আর আমাকে নুসরাতের বাসায় যেতে হয় না। কাজের ফাঁকে ফাঁকে, কখনো বা পেলে নুসরাত’ই ছুটে আসে তার পরাণের বান্ধবীকে দেখার জন্য। সেদিনও নুসরাত এ বাসায় এসেছিল।
” কিরে মা?তুই এত শুকাচ্ছিস কেন? তুই কি খাস না নাকি?”
রাত্রে খাবার টেবিলে সবাই যখন খাবার নিয়ে ব্যস্ত তখন আচমকা’ই প্রশ্নটি করে বাঁধনের মা নুসরাতকে।
“হসপিটালে সারাক্ষণ রোগী নিয়ে ব্যস্ত থাকি। তারউপর বাসায় গিয়ে রান্না, গোসল, খাওয়া। ঘুমানোর আর সময় হয়ে উঠে না আন্টি।”
মাথা উচু করে গম্ভীর হয়ে কথাগুলো বলে নুসরাত।

রান্নার জন্য বুয়া রেখে নাও। আর গ্রামের বাড়িতে কেউ নেই? মানে আপনজন!!!ওখান থেকে একজনকে নিয়ে আসো। যে কিনা অলস সময়ে তোমাকে সঙ্গ দিতে পারবে।
“আমার আবার আপনজন!
ঐ যে সামনে যে মেয়েটি বসে আছে না?!!! যাকে আপনি আপনার মেয়ের স্থান দিয়ে এ বাসায় স্থান দিয়েছেন তার কপাল আর কপাল একই। আমরা একসাথে একই স্কুল+কলেজে পড়েছি। আমরা পাশাপাশি গ্রামের মেয়ে ছিলাম। আমাদের দুজনের মা’ই মারা গেছেন সেই ছোট্ট কালে। দু’জনের বাবা’ই পরবর্তীতে বিয়ে করেছেন। ওর সৎ মা অবশ্য মারা গেছেন কিন্তু আমার সৎ মা??? বেঁচে ছিলেন। ২য় মা মারা যাওয়ার পর আমার বাবা আরেকটা বিয়ে করেন। প্রথমজন যাও একটু মারার পাশাপাশি আদর করত, পড়াশুনার ব্যাপারে সাপোর্ট করত। কিন্তু এখন যেজন আছেন ওনি? ওনার কথার আঘাতে প্রতিনিয়ত আমায় জর্জরিত হতে হয়।খুব বাজে বাজে কথা বলে আমাকে নিয়ে আমার বাবার সাথে। যা একজন মেয়ে হিসেবে আমার জন্য ভিষণ লজ্জাকর ছিল। বহু সংগ্রাম করে মেডিকেল কোর্সটা কমপ্লিট করলাম। তারপর সেই যে বাড়ি ছাড়লাম আর যায়নি। কিসের জন্য যাব বলেন? ওখানে গেলে যে আমি মানসিক শান্তির পরিবর্তে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যায় আরো।
একটা শুকনো হাসি দিয়ে কথাগুলো বলে চুপ করল নুসরাত।

বাঁধনসহ ওর মা, বোন আর বুয়ার চোখে জল চিকচিক করছে নুসরাতের কথা শুনে। খাবার টেবিলে এই মুহূর্তে থমথমে ভাব বিরাজ করছে। কিছুটা সময় নিরবতা, তারপর আচমকা বাঁধনের মা বলে উঠল__
” কে বলছে তোর কেউ নেই? তোর জন্য আমি আছি, এ পরিবারের সবাই আছে। আজ থেকে তুই এ বাসায় থাকবে। আর এখান থেকেই হসপিটালে যাবি। বাঁধন রোজ তোকে দিয়ে আসবে। আর বাঁধন?!!!
তুই কালকে একবার নুসরাতকে নিয়ে ওর বাসায় যাবি। ওখান থেকে ওর সব জিনিসপত্র নিয়ে আসবি। কি মনে থাকবে তো?!!!”

– আচ্ছা….. (বাঁধন)

নুসরাতের সাথে আমার চোখ দুটোও জলে ছলছল করে উঠল।

পরদিন সকাল বেলা_
” এই, উঠবি নাকি পানি ঢালব???”(মা)
– উফ্, মা! আরেকটু ঘুমাই না।(বাঁধন)
– ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখছিস কয়টা বাজে? বেলা ১১টা বাজে। নুসরাতের জিনিসপত্র গিয়ে কখন আনবি?(মা)

ধরমরিয়ে শুয়া থেকে উঠে বসে বাঁধন। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে বলে ১১টা? মা, তুমি আগে ডাক দিবা না? বাঁধন দৌঁড়ে ওয়াশরুমে গেল। ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট করে গাড়িতে করে নুসরাতকে নিয়ে পৌঁছে গেল কাঙ্খিত স্থানে। নুসরাত ওর যাবতীয় জিনিসপত্র গুছাতে গুছাতেই কাটিয়ে দেয় ৩ঘন্টা। দুপুর ০২টা নাগাদ ওখানকার সমস্ত ঝামেলা শেষ হলো। আধঘন্টার মধ্যে বাসায় পৌঁছল ওরা। গাড়ি থেকে নেমে বাঁধন একটা একটা করে জিনিস দাঁড়োয়ান চাচার হাতে এগিয়ে দিতে লাগল আর দাড়োয়ান সেগুলো বাসার ভিতর নিয়ে রেখে আসতে লাগল। সবশেষে ড্রাইভারকে গাড়ি ভেতরে নিতে বলে বাঁধন যেই না গেইটের ভিতরের দিকে পা বাড়ালো ওমনি পেছন থেকে ডেকে উঠে নুসরাত।
এই যে মায়ার বাঁধন শুনোন?!!!

থমকে যায় বাঁধন।
দীর্ঘ অনেকগুলো বছর পর সেই প্রিয় নাম!
চমকে উঠে পেছনে তাকালো বাঁধন…..

চলবে…….

কৃষ্ণকলি পর্ব- ০৬

কৃষ্ণকলি
পর্ব- ০৬
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

“কেমন আছে এখন মায়ার বাঁধন?”

বেশ ভালো!
ছোট্ট করে বলে থেমে গেলাম আমি। কিছু সময় নিরবতা তারপর জনাব শফিক সাহেবের প্রশ্ন- কতজনের নানা হলাম?
শফিক সাহেবের এমন উদ্ভট প্রশ্ন শুনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। তাইতো চনকে উঠে ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম, মানে?
মানে হলো আমার মায়া বন্ধুর কোল আলো করে এ পর্যন্ত কয়জন এলো? আমি কতজন ছেলে মেয়ের নানা হতে পেরেছি?

বন্ধু শফিকের কথা শুনে কন্ঠ’টা স্তব্ধ হয়ে আসে। উত্তর দিতে গিয়েও দিতে পারিনি। কেন জানি মনে হচ্ছিল কথারা সব বুকের ভেতর প্রকান্ড এক পাথর রুপ ধারন করেছে। প্রচন্ড এক যন্ত্রণায় ভেতরটা ছটফট করে উঠল। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম আমি।
পৃথিবীর সবচেয়ে আপন মানুষটিকে এত সহজে হারিয়ে ফেলার বেদনায় জমে থাকা নীল কষ্টের তুষারগুলো গলে গলে পড়তে শুরু করল অশ্রু হয়ে।
এই মুহূর্তে বাঁধনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া পেছনের স্মৃতিগুলোই আমাকে পীড়া দিচ্ছে। বাঁধনের স্মৃতিগুলো বার বার হৃদয়ের ক্যানভাসে ভেসে উঠছে। হুশ হয় বন্ধু শফিকের কথায়।
এই মেয়ে! কাঁদছিস কেন? কি হয়েছে তোর?

চোখের অশ্রু মুছে হাসিমুখে উত্তর দিলাম, কই? কিছু না তো!!!

ভুলে গেলি? আজকে রাত পোহালে শুক্রবার। আজকের দিনেও তুই মিথ্যে বলবি?

উফ্! বন্ধু শফিকের কথায় মনে পরল আজকের দিনটা একটা সময় আমার আর বাঁধনের জন্য কতটা স্পেশাল দিন ছিল। ২০১০ সালের এই দিনে দু”জন দু’জনকে ভালোবাসার কথাটা বলছিলাম।
ইস! কতই না সুন্দর ছিল সেই দিনগুলো….
কখনো যদি বাঁধনের সাথে ঝগড়া হতো, আর সেটা যদি হতো শুক্রবার দিন, তাহলে বাঁধনের মুখ থেকে এই একটা কথায় শুনতাম-
” মায়া! আজ না শুক্রবার?!!! আজকের দিনেও তুমি ঝগড়া করবে? রাগ করে থাকবে?”

বাঁধনের এই একটি কথায় থেমে যেত সব ঝগড়া, উড়ে যেত সব রাগ।
বাঁধনকে বলতাম- এই দেখো! চুপ করলাম।
আর ঝগড়া করব না। এবার হলো তো???
আর রাগ? সেটা কি আদৌ গেছে?(বাঁধন)
– হ্যাঁ, গেছে। আমি আর রেগে নেই।
আমার কথা শুনে বাঁধন গম্ভীর গলায় প্রমান চাইত। আমি যে রেগে নেই তার প্রমাণ হিসেবে একটা হাসি দিতে বলত। জোর করে হলেও হাসি দিতাম এভাবে-
” হি হি হি হি হি হি হি হি হি হি হি হি”
হাসি হাসি মুখে বাঁধন বলত, এইতো আমার পেত্নী হাসছে।
প্রেমিকরা ওদের প্রেমিকাদের হাসির বর্ণনা কত সুন্দর, কত নিঁখুত ভাবে গল্প-উপন্যাসে তুলে ধরেন। আর বাঁধন?!!!
আমার হাসিকে পেত্নীমার্কা হাসির সাথে তুলনা করত।
রাগান্ধিত স্বরে বলতাম- আমি পেত্নী, নাহ?
সিরিয়াস ভঙ্গিতে বাঁধন বলত- হ্যাঁ, তুমি পেত্নী।

আচ্ছা, আচ্ছা। রাখি।
রাগ দেখিয়ে ফোনটা কেটে দিতে যাব, তখনই ও বলে উঠত-
শুনো! তুমি শুধু আমার পেত্নী। আর কারো না। এ পেত্নীটা শুধুই আমার।
বাঁধনের এই একটা কথায় আমার সমস্ত রাগ দুরে সরে যেত। ভিতরের আনন্দটা চেপে বলতাম- শয়তান!
বাঁধনও আমার সাথে সাথে লম্বা করে বলত- শয়তান!
তারপর আবার সেই হাসি।
পেত্নী মার্কা হাসি।

Oh, hlw mem!
কিছু’তো বলুন। সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি। শফিক সাহেবের কথায় সম্ভিত ফিরে। একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সেদিন বাঁধনের সাথে দেখা করতে যাওয়ার পর থেকে ওনার বাসায় আশ্রয় নেওয়া পর্যন্ত সবটা খুলে বললাম। আমার কথা শুনে জনাব শফিক সাহেব চুপসে গেলেন। শুধু চুপসে নয়, কিছুক্ষণের জন্য ওনি হয়তো নির্বাকও হয়ে গেছেন। যার কারনে ওনি কোনো কথা বলতেছেন না। টানা ৫,৬মিনিট নিরবতা চলল। ওনার কথা বলার কোনো আভাস’ই পাচ্ছি না।

নিরবতা ভেঙ্গে মুখ খুললাম আমি। বন্ধু শুনতে পাচ্ছেন?
হ্যাঁলো, হ্যাঁলো বলতে বলতে পিছনে ঘুরে তাকালাম। নুসরাত অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ওকে এভাবে দেখে চমকে উঠলাম আমি।

ফোন’টা কান থেকে নামিয়ে, তু তু তু তু….ইই……????

হ্যাঁ, আমি। মায়ার বাঁধনের বর্তমান অবস্থান জানার জন্য’ই ঘুম থেকে জেগে উঠা। আমার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে নুসরাতের জবাব।

ই ইয়ে মানে আসলে নুসরাত আমি তোকে…..

সম্পূর্ণ কথাটা বলতে পারিনি। তার আগেই আমার মুখ থেকে কথাটা কেড়ে নিয়ে রাগান্বিত ভঙ্গিতে জোর গলায় বলতে থাকে নুসরাত, তুই কিভাবে এমনটা করলি?
কিভাবে তুই আমার থেকে এত বড় সত্যি’টা লুকাইলি? আমি কি কখনো’ই কোনো ভালো বন্ধু ছিলাম না???

নুসরাত কথা’টা তো শুন।
চুপ!
একদম চুপ। তুই কোনো কথা বলবি না।রাগান্বিত স্বরে নুসরাতের জবাব। আমি আর কোনো কথা বাড়ালাম না। চুপ করে আছি। নুসরাত ১ঘন্টার আলাপকে সাড়ে ৩ঘন্টা বানালে প্যাঁচাল পেরে। প্যাঁচাল শেষে যখন হাফিয়ে উঠে আমার দিকে তাকালো। আমি তখন সোফায় বসে ঝিমুচ্ছি। নুসরাত আমার কাছে দৌঁড়ে গিয়ে আমার দু’বাহু ঝাকিয়ে বলে-
এই ঘুমোবে না একদম!
তুই এখন এই মুহূর্তে আমার সাথে চলবি।

আধো ঘুম আধো জাগরিত অবস্থায় আমি নুসরাতকে বললাম-
” কোথায় যাব?”
নুসরাত আমার কানের কাছে এসে জোরে জোরে বলতেছে-
” কোথায় আবার? বাঁধনের বাসায়। আমায় তুই বাঁধনের বাসায় নিয়ে চলবি। ঐ হারামজাদাকে আমি দেখতে চাই। দেখতে চাই কেমন বেকুব যে গার্লফ্রেন্ডের কন্ঠ শুনেও গার্লফ্রেন্ডকে চিনে না।”

কি?!!!
চমকে উঠে চোখ মেলে তাকালাম।
এই মুহূর্তে আমার চোখ থেকে নিদ্রাদেবী প্রস্থান করেছে।

কি, কি করিস না;
আমি বাঁধনের বাসায় যেতে চাচ্ছি। ওর সাথে আমার কথা আছে। নিয়ে চল আমায় সেখানে……

চলবে……….

কৃষ্ণকলি পর্ব:- ০৫

কৃষ্ণকলি
পর্ব:- ০৫
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

এফএমে লাখো মানুষের শ্রোতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলা’টা তো খুব ভাগ্যের ব্যাপার। তাহলে আংকেলকে সবাই কেন এমন করত? আমি আজ’ই আন্টির কাছে যাব। আন্টির কাছের কাছে গিয়ে আংকেলের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করতে বলব। কারন- আংকেল অবশ্যই একবার হলেও ফোন দিয়েছিল আন্টিকে।

-খবরদার!
যা বলছো এখানেই। এই কথা’টা যাতে মায়ের সামনে না বলা হয়।
তাহলে কিন্তু…… (……)……???
আমার দিকে তাকিয়ে ভয়ার্ত চোখে কথাটা বলল বাঁধন। কেন? ওনি কি এফএমকে ভালোবাসেন না? প্রশ্ন করলাম বাঁধনকে।
তাচ্ছিল্যের স্বরে বাঁধনের জবাব,
” ভালোবাসা?!!!
হা, হা। ঘৃণা করে মা। শুধু ঘৃণা না, ভয়ংকর ঘৃণা। এই নামটাই ওনি সহ্য করতে পারেন না আমার মা। এফএমের “ফ”টাও সহ্য করতে পারেন না।

বাঁধনের কথা শুনে আর কোনো কথা বলতে পারলাম না। বলতে পারলাম না, বাঁধন!
আমিও তো এফএমে প্রোগ্রাম করতাম একসময়। প্রতি বৃহস্পতি’বার দিন আমায় সেখানে যেতে হতো প্রোগ্রাম করার জন্য। অবশ্য মধ্যিখানে অনেকটা দুরে সরে গিয়েছিলাম রেডিও থেকে। কিন্তু আজ এতবছর পর লাখো শ্রোতার ভালোবাসায় আপ্লুত হয়ে যখন সিদ্ধান্ত নিলাম আমি আবার প্রোগ্রাম’টা শুরু করব, তখন…..(……)…..???
যাক!
এখন কথা না বলাটাই শ্রেয়।
আর তাই আমিও কোনো কথা বললাম না।
চুপ করে বাঁধন গাড়ি চালালো।
বাকি রাস্তা একটা কথাও হলো না আর।

সেদিন বান্ধবী ডাঃ নুসরাত কল দিয়ে বলল, ও ঢাকায় ট্রান্সফার হয়ে এসেছে। আমাকে দেখতে ওর ভিষণ ইচ্ছে হচ্ছে। আমি যেন ওর বাসায় যায়। কলিজার টুকরা বান্ধবীর ইচ্ছে বলে কথা। ফেলতে পারিনি। বাঁধনের মায়ের থেকে অনুমতি নিয়ে ছুঁটে চললাম নুসরাতের বাসার উদ্দেশ্যে। ১ঘন্টার মধ্যে’ই নুসরাতের ওখানে গিয়ে পৌঁছলাম। ওকে দেখে বুঝতে পারলাম এতক্ষণ ধরে আমার’ই অপেক্ষায় গেইটের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল। আমাকে দেখে সেকি খুশি! ওর কাছে যাওয়ার সাথে সাথে জড়িয়ে ধরল আমায়। অনেক দিনের দুঃখ কষ্ট জমে পাহাড়ের মত হয়ে গিয়েছিল আমার ভিতর। সেই দুঃখ-কষ্টের একটু একটু ওকে বলতে লাগলাম। ঘন্টা দু’য়ের মধ্যে’ই মনে হলো আমার ভিতর যে বরফগলা পাহাড় ছিল,
সেটি একটু একটু করে গলতে শুরু করেছে।
সন্ধ্যায় হালকা নাস্তা করা শেষে দু’বান্ধবীর মধ্যে কিছু কথা হয়। কথোপকথনগুলো এমন ছিল__

নুসরাত:- তারপর?
তোর প্রোগ্রামের কি খবর? এখনো
করিস প্রোগ্রাম’টা?
আমি:- না। তবে কথা দিয়েছিলাম শুরু করব। কিন্তু আমি মনে হয় ওদের কাছে দেওয়া কথাটা রাখতে পারব না। শুরু করতে
পারব না প্রোগ্রাম’টা?
নুসরাত:- কেন? কেন???
আমি:- বাড়িওয়ালাী এফএম নামটা সহ্য
করতে পারে না, ঘৃণা করে।
নুসরাত:- মানে?!!! মানে কি মায়া???

নুসরাতের সাথে বাঁধনের বলা কথাগুলো’ই পুনারবৃত্তি করলাম। আমার কথা শুনে নুসরাত চিন্তিত মনে বাহির পানে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ ওর চোখে মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠল। লাফ দিয়ে আমার কাছে এসে বলল, আইডিয়া!
– কি idea?
তোর তো প্রতি বৃহস্পতিবার রাত্রে প্রোগ্রাম, তাই না?
– হুম।
আর সেই বৃহস্পতিবার দিন কলেজ থেকে এসে আন্টিকে আমার বাসায় থাকার কথা বলে তুই যদি আমার এখানে চলে আসিস, তারপর রাত্রে আমি তোকে রেডিও অফিসে দিয়ে আসি। তাহলে কেমন হয় ব্যাপার’টা?
– Yes.

খুশিতে নুসরাতকে জড়িয়ে ধরলাম।
কিন্তু পরক্ষণে মুখটা নিকষ কালো অন্ধকারের ন্যায় হয়ে যায়। নুসরাতের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বারান্দায় চলে গেলাম। বারান্দায় গিয়ে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে। নুসরাত পিছন থেকে গিয়ে কাঁধে হাত রাখে। নুসরাতের দিকে একবার তাকিয়ে চোখটা ফিরিয়ে নিলাম। আমার দৃষ্টি তখন বারান্দার রেলিংয়ের ভিতর দিয়ে দুর অজানায় চলে গেছে। বান্ধবী নুসরাত চুপটি করে পাশে দাঁড়িয়ে আছে। মিনিট পাঁচেক পর মুখ খুলে নুসরাত।
তোকে খুব ভালোবাসেন ভদ্রমহিলা, তাইনা?

নুসরাতের দিকে না তাকিয়েই বললাম-
হ্যাঁ। বড্ড বেশীই ভালোবাসেন ওনি আমাকে। এরকম ভালোবাসা আমি আমার জীবনে পূর্বে একজনের কাছ থেকেই পেয়েছিলাম। তিনি ছিলেন- আমার মা। মা মারা যাওয়ার এই যে এত বছর পর আমি একটু তৃপ্তির হাসি দিতে পারি, সে ঐ মহিলার জন্য। যিনি আমার মা সমতুল্য। ওনি এমন একজন মানুষ যার মাঝে আমি মায়ের ছায়া খুঁজে পায়। খুঁজে পায় মায়ের সেই স্নেহমাখা ভালোবাসা, আদর-সোহাগ এবং শাসন। ওনার সাথে আমার পরিচয় তিনদিনের। অথচ দ্যাখ….
ওনি যেন আমার শিরায়-উপশিরায় মিশে আছেন।

– তো! কি করবি?(নুসরাত)

আমি করব না প্রোগ্রাম। আমি চাই না ঐ প্রোগ্রাম করতে যেটা করতে গিয়ে মায়ের সাথে দিনের পর দিন মিথ্যা কথা বলতে হবে। মাকে ঠকানো হবে। আমি আমার মায়ের সাথে এরকমটা করতে পারব না। ওনার স্নেহের মূল্য আমি এভাবে দিতে চাই না। এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে থেমে গেলাম।

নুসরাত আমার কাছে এসে বলল, তুই তাহলে রেডিওর জগত থেকে নিজেকে সরিয়ে আনতে চাচ্ছিস, এই তো?!!!

হ্যাঁ, ঠিক তাই।
আমি এ জগত থেকে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছি। তুই প্লিজ আমায় জোর করিস না।
নুসরাতের দিকে তাকিয়ে বিনীত ভঙ্গিতে কথাটা বলছিলাম।

তোর যা ভালো মনে হয়।
নুসরাত রুমে চলে গেল। নুসরাতের পিছু পিছু আমিও রুমে গেলাম।

রাতের রান্নাটা দু’বান্ধবি মিলে করলাম।
অনেক দিন পর দু’বান্ধবী একসাথে খাবার খেলাম।
বুঝলি মায়া! একেই বলে সত্যিকারের বন্ধুত্ব। এই যে দুজন দুজনকে ছেড়ে এতটা দিন এতটা দুরে ছিলাম, অথচ সম্পর্কে একটুও ফাটল ধরে নি। সেই আগের মতই হাসি, আনন্দ, খুনসুটিতে ভরপুর আমাদের সম্পর্ক। খাওয়া শেষে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে কথাটা বলল নুসরাত।
মনের টান’টাই আসল নুসরাত। আর দূরত্ব কখনো কোনো সম্পর্কের অন্তরায় হতে পারে না, যদি সেখানে একে অপরের প্রতি টান, ভালোবাসা, বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা থাকে। তা যে কোনো সম্পর্ক’ই হোক না কেন। নুসরাতের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে জবাব দিলাম।

একদম ঠিক কথা বলছেন ম্যাম। এখানে মনের টান’টাই মূখ্য। (নুসরাত)

ডাক্তার সাহেবা! রাত’তো অনেক হয়েছে। তাই দয়া করে ঘুমান। কালকে সকালে তো আপনাকে আবার হসপিটালে যেতে হবে, তাই না? (আমি)

Okey, good night…..(Nusrat)
Good night….(Myself)

ঘন্টা দেড়েক হয়ে গেছে শুয়ে আছি। নুসরাত মনে হয় এতক্ষণে ঘুমিয়ে গেছে। বিছানা থেকে উঠে বসলাম। বালিশের নিচ থেকে ফোনটা বের করে ধীর পায়ে জানালার দিকে এগিয়ে গেলাম। ফেসবুক লগইন করলাম। দীর্ঘ ৬বছর পর চিরচেনা সেই “মায়া” আইডিতে ঢুকলাম। শত শত মেসেজ। মেসেজ পাঠিয়েছে মায়ার পাগল ভক্তরা। হ্যাঁ, ওরা আমার সেই পাঠক যারা একটা সময় আমার লেখা গল্প,কবিতা না পেলে পাগল হয়ে যেত। মেসেজের পর মেসেজ দিত। কখনো গল্প, কবিতা দিতে দেরি হলে আমার প্রতি ওদের অভিযোগের অন্ত ছিল না। আজ এই যে এতদিন এফবিতে ঢুকলাম মনে হচ্ছে ওরা এতটা দিন আমার নামের পাশে সবুজ বাতিটা জ্বলার অপেক্ষায়’ই ছিল। আজ যখন সবুজ বাতিটা জ্বলে উঠল তখন ওরা ঝাপিয়ে পরে ইনবক্সের উপর। শত শত পাঠকের শত শত মেসেজ। তন্মধ্যে একটা মেসেজের মধ্যে চোখটা আটকে গেল। যেখানে লেখা ছিল-
Very bad, Maya.
Very bad.
সখাকে পেয়ে বন্ধুকেই ভুলে গেলে?!!!
সবার সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে উত্তর দিলাম ঐ মেসেজকৃত আইডিতে। যে আইডির লোকটি সাথে ফেসবুকে প্রথম পরিচয় আমার। লোকটি প্রবাসী। নাম “শফিক”।
বয়স আনুমানিক পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে। চোখে সানগ্লাস। পরনের ধূসর কালো গেঞ্জিটা ধূসর বর্ণের চাদরে আবৃত। মুখের মিষ্টি হাসিটা যেন সবসময় লেগে থাকে।
লোকটার ছবি দেখলে কেমন যেন এক ভালো লাগা কাজ করে। বাঁধনের চেহারার সাথে লোকটার চেহারার অদ্ভুত মিল রয়েছে।
বাঁধনের সাথে পরিচয়ের শুরু থেকে শেষ অবধি এই লোকটার জানা।
ওনার সাথে শেষ কথা হয় সেদিন, যেদিন বাঁধন শেষ বার আমার এলাকায় গিয়েছিল। বাঁধনের সাথে দেখা করার আগ মুহূর্ত শফিক সাহেবকে ফোন দিলাম আমি। বুকটা তখন ধুরু ধূরু করে কাঁপছে। সেদিন বন্ধু শফিকের কাছে কাঁপা গলায় দোয়া চেয়েছিলাম। বলেছিলাম-
“দোয়া করবেন বন্ধু। দেখা করতে চাচ্ছি।”
সেদিন সেই কথাগুলোই ছিল বন্ধু শফিকের সাথে আমার শেষ কথা।
তারপর আর কথা হয়নি ওনার সাথে। ফেসবুক আইডি, সিম কোনোটাই আর ইউজ করা হয়নি বাঁধনের কাছে প্রত্যাখিত হওয়ার পর থেকে।

মেসেঞ্জারটা ওপেন করার সাথে সাথে বন্ধু শফিকের কল। কোনো দ্বিধা না করে কলটা রিসিভ করে ফেললাম।
ওপাশ থেকে এক মধ্য বয়স্ক লোকের কন্ঠে ভেসে উঠে__
” কেমন আছে এখন মায়ার বাঁধন?”

চলবে……

কৃষ্ণকলি পর্ব- ০৪

কৃষ্ণকলি
পর্ব- ০৪
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

জি, আপনার বোধ হয় আর কোনো কষ্ট করতে হবে না। সুইটি এখন থেকে আমার সাথে’ই যেতে পারবে। বাঁধনের দিকে তাকিয়ে কথা’টা বলছিলাম আমি।
– সেই জন্য’ই তো বললাম ভালো’ই হলো।
মৃদু হেসে বাঁধনের জবাব।
“আচ্ছা, আসি আন্টি। আসসালামু আলাইকুম।”
বাঁধনের মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছিলাম। একমিনিট দাঁড়ান, আমিও অফিসে যাব। কথাটা বলে আমায় থামালো বাঁধন। বাঁধন ওর মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল।
বাঁধনের পাশের সিটে চুপচাপ বসে আছি এই আমি। গাড়ি চলছে। কিন্তু গাড়ি মুখে’ই কোনো কথা নেই। দুজনে’ই নিরব।
-তারপর???
কলেজ থেকে ফিরবেন কখন? নিরবতা ভেঙে বাঁধনের প্রশ্ন।
– ফিরব কখন সেটা তো জানি না। তবে ৩টা ২০পর্যন্ত কলেজ টাইম। সামনের দিকে তাকিয়ে বাঁধনের প্রশ্নের জবাব দিলাম আমি। বাঁধন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল-
” তাহলে তো মনে হয় আমার সাথে ফিরতে পারবেন। আমিও অফিস থেকে চলে আসব ৪টার দিকে। ততক্ষণে আপনার নিশ্চয় অফিশিয়াল কাজ সব শেষ হয়ে যাবে???
-হুম, শেষ হয়ে যাবে। প্রতিউত্তরে আমার জবাব।

তারপর বাকি রাস্তা আর কোনো কথায় হয়নি। বাঁধন আমাকে কোনো প্রশ্ন করেনি আর আমিও কোনো কথা বলার সুযোগ পায়নি।

গাড়ি থেকে নামার সময়_
” এই! সাবধানে, সাবধানে!!!
গাড়ি আসছে….”
বাঁধনের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট হাসি দিয়ে বললাম-
আসি তাহলে….
বাঁধন আমার দিকে তাকিয়ে বলল-
” অপেক্ষা করব ৪টার সময় এখানে।”

বাঁধনের থেকে বিদায় নিয়ে কলেজ গেইট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলাম।
আমার প্রথম ক্লাস ইন্টার প্রথম বর্ষের ছাত্রীদের ফিজিক্স সকাল ১০টায়, দ্বিতীয় ক্লাস ২য় বর্ষের ছাত্রীদের ফিজিক্স দুপুর ১২টা ৪০মিনিটে। ১টা ২০মিনিটে আমার ক্লাস শেষ। তারপর আমার পুরো অবসর। অফিসিয়াল কাজ সেরেও ২টা কিংবা আড়াইটার ভিতর কলেজ থেকে বের হওয়া যাবে, আর ছাত্রীদের প্রাইভেট কিংবা কোচিং করালে তাহলে সেটা অন্য কথা। সেদিন ক্লাস+অফিসিয়াললি কাজ সেরেও দেখলাম ঘড়িতে মাত্র ২টা বেজে ২০মিনিট।

অন্য কোনো কাজ না থাকায় বের হয়ে গেলাম কলেজ থেকে। কলেজ গেইটে গিয়ে অটোতে উঠব কি না সেই দ্বিধাদ্বন্ধে পরে গেলাম। বাঁধন তো বলেছিল ৪টায় বাসায় ফিরবে, ততক্ষণ কি আমি অপেক্ষা করব?
মাত্র তো আড়াইটা বাজে।
না, থাক।
আমি বরং বাসায় চলে যায়।
এই বলে বাসায় চলে যাচ্ছিলাম।পিছন থেকে একটা গাড়ি এসে আমার সামনে থামল। গাড়ির কাছাকাছি যেতে’ই দেখলাম বাঁধন বসে।।
আপনি? এ সময়?
আপনার না ৪টার আসার কথা? অবাক হয়ে বাঁধনকে প্রশ্ন করলাম।
~ আমারও তো একই প্রশ্ন মিস কৃষ্ণকলি!
আপনি এ সময় এখানে???

বাঁধনের প্রশ্নোত্তরে বললাম,
আমার দুইটা ক্লাস। সেটা ১টা ২০পর্যন্ত’ই। অফিসিয়াল কাজও তেমন ছিল না। তাই টিফিন করে সোজা চলে আসলাম।

আমার অফিসে এখন লাঞ্চটাইম চলে। অসুস্থ্যতার অজুহাত দেখিয়ে বস মামার থেকে ছুটি নিয়ে চলে আসলাম। হেসে হেসে বাঁধনের জবাব।
– বস মামা? সেটা আবার কেমন ডাক? আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলাম বাঁধনকে।

বস মামা মানে বস আমার মামা হয়। আপন মামা। বাবার অনুপস্থিতিতে ঐ মামায় বাবার কোম্পানির দেখাশুনার দায়িত্বে আছেন।
– আংকেল? আংকেল কোথায়??? বাঁধনের দিকে তাকিয়ে বাঁধনকে প্রশ্নটা করলাম।

বাঁধন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল__
বাবা?!!!
বাবা হারিয়ে গেছে।
আমাদের রেখে দুর অজানায় পালিয়ে গেছে।
বাঁধনের কথা শুনে হচ্ছিল আমার ভিতরটা শেষ হয়ে যাচ্ছে, ভেঙে চূরমার হয়ে যাচ্ছে। কোনো কথা না বলে বাঁধনের পাশের সিটে গিয়ে বসলাম, ছোট্ট করে বললাম “স্যরি”।
বাঁধন মনে হয় আমার এই স্যরি’টা আশা করে নি। তাই তো আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে বলল-
” Sorry?!!! But Why?”
আমি জানতাম না আংকেল নেই। জানলে এভাবে আপনাকে কষ্ট’টা মনে করিয়ে দিতাম না। আমি আবারও বলছি স্যরি…..
আর আল্লাহ ওনাকে শান্তিতে রাখুক সেই দোয়ায় করি। ভেজা গলায় কথাগুলো বললাম।
এদিকে বাঁধনের অবাক হওয়ার মাত্রা’টা যেন বেড়ে’ই চলছে উত্তরোত্তর। বাঁধন অবাক হওয়ার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেল। আর তাই তো আমার দিকে তাকিয়ে অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করল-
” নেই মানে? What do you mean?”
চোখের জলটুকু মুছলাম। করুণ চোখে বাঁধনের দিকে তাকালাম। তারপর_
” আমি সত্যি’ই দুঃখিত। আমি জানতাম না আংকেল আর এ পৃথিবীতে নেই। আর যখন জানতে পারলাম তখন মনে হলো আংকেলের মৃত্যুর কথা মনে করিয়ে দিয়ে আমি আপনাকে অনেকটা কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। এই জন্য I am sorry….”
আচমকা বাঁধন stopped, stopped বলে চেঁচিয়ে উঠল। আমি ভয়ে কেঁপে উঠলাম। কিন্তু এভাবে চেঁচানোর মানে’টা বুঝতে পারলাম না। কিছুক্ষণ পর বলল, আমার বাবা হারিয়ে গেছে দুর অজানায়,তার মানে এই নয় আমার বাবা আর বেঁচে নেই। আমার বাবা বেঁচে আছে। ওনাকে বেঁচে থাকতে’ই হবে। আমাদের ভালোবাসার টানে ওনাকে একদিন ফিরে আসতেই হবে। তা পৃথিবীর যে প্রান্তে’ই হোক না কেন। এটুকু বলে বাঁধন চুপ হয়ে গেল। আমিও কোনো কথা বাড়ালাম না। তাই আমিও চুপ করে আছি। কিন্তু কৌতূহলী মনকে কিছুতেই শান্তনা দিতে পারছি না। পারছিলাম না একটা হিসেব মিলাতে। হিসেবটা মিলানোর জন্য আমার বাঁধনের হেল্প দরকার। কিন্তু এই মুহূর্তে ওকে এ সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস না করাই ভালো। আর তাই চুপ করে আছি।

মিনিট দশেক এভাবে একই স্থানে গাড়ির ভেতর ২জন চুপ করে বসে ছিলাম। নিরবতা ভাঙে বাঁধন। সামনের দিকে তাকিয়েই বলতে থাকে_
” বাবা ছিলেন ভিষন ছটফটে এবং দুরন্ত স্বভাবের। সারাক্ষণ কাঁধে গিটার নিয়ে ঘুরে বেড়ানো’ই ছিল ওনার স্বভাব। দুরন্ত এবং চঞ্চল বাবা ছিলেন স্বাধীনচেতা আর মুক্তমননের অধিকারী। কোনো ধরাবাধা নিয়ম ওনি পছন্দ করতেন না। আর তাইতো লেখাপড়া শেষ করে দাদার ব্যবসায়ে যোগ না দিয়ে একটা এফএমে আর.জে হিসেবে জয়েন করলেন। সেই রেডিওর পোগ্রামের মাধ্যমে’ই আমার বাবা অসংখ্য দুঃখী মানুষের দুঃখ দুর করে দিয়েছেন। অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে আমার বাবা হয়ে গেলেন সকলের প্রিয় একজন ব্যক্তিত্ব। দিনে কাঁধে গিটার নিয়ে বন্ধুদের সাথে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ানো আর রাত্রে রেডিওতে মানুষের লাইফ সাপোর্ট দেওয়া। এটুকুই ছিল বাবার কাজ। বাবার জীবন যেন এটুকুতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু না!!!
বাবার জীবন এটুকুতেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
বাবার জীবনে আরো একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। সেটা ছিল ‘সংসার’। কিন্তু বাবার হাবভাব দেখে মনে হতো সংসারের প্রতি যেন ওনার কোনো দায়িত্ব’ই নেই। বাবা মাকে একদম’ই সময় দিত না। দিত না বললে ভুল হবে, আসলে বাবার সময় হতো না। মা সব দেখেও চুপ করে ছিল। ভাবত পরে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সুইটি জন্ম নেওয়ার পরেও যখন বাবার চালচলনে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না, তখন আমার মা মুখ খুলে। বাবাকে এই নিয়ে কথা বলে। দাদাও বাবাকে বকাঝকা করত। মায়ের বকবকানি, দাদার বকাঝকা আমার বাবার ব্যক্তিত্বে বোধ হয় আঘাত হানে। তাই তো একদিন ভোরে ব্যাগপত্র গুছিয়ে বাবা বাসা থেকে চলে যায়। বাবা চলে যান বলে গেছেন। কিন্তু কোথায় চলে গেছে সেটা বলে যান’নি। আমার মা আজও বিশ্বাস করে বাবা আসবে। ওনাকে আসতে’ই হবে।

চলবে…..

কৃষ্ণকলি পর্ব- ০৩

কৃষ্ণকলি
পর্ব- ০৩
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

মিনিট পাঁচেকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম কাঙ্খিত গন্তব্যে। আমার স্বপ্নের সুখের নীড়ে।
যে নীড়কে নিয়ে একটা সময় রাতভর স্বপ্ন দেখতাম;
স্বপ্ন দেখতাম আমার থাকবে একটা সাজানো ছোট্ট সংসার।
যেখানে মা সমতুল্য শাশুড়ি , বন্ধু ভাবাপণ্ন শ্বশুর আর বোনের মত একটা ছোট্ট ননদ থাকবে। ওদেরকে নিয়ে হৈহুল্লুর করে কেটে যাবে আমার দিন, আমার রাত।
আমার স্বপ্নগুলো আজ যেন স্বপ্ন হয়ে’ই রয়ে গেল। পূরণ আর হলো না….

মিষ্টি মা!
আমাদের বাড়িটা কি পছন্দ হয়েছে?
~মিষ্টি???(আমি)
হুম, মিষ্টি। এত মিষ্টি দেখতে যে তাকে মিষ্টি বলব না তো কি বলব, হুহ্?
আজ থেকে তোর নাম মিষ্টি। তুই আমার মিষ্টি মা। আগে পরে কি নাম ছিল সেসব ভুলে যা। মনে করবি,
তুই সদা বর্তমানে ছিলি, আছিস, থাকবি।
কি!!!
মনে থাকবে আমার কথা?
– হুম।

সুইটি একটু এদিকে আয়’তো!
বাঁধনের মায়ের ডাকে বাঁধনের ছোট বোন সুইটি ছুঁটে আসল। মিষ্টি করে সালাম দিয়ে আমাকে ওর রুমে নিয়ে গেল।
ফ্রেস হয়ে রেস্ট নেবার জন্য বলল। ফ্রেশ হয়ে এসে ব্যাগ থেকে কাপড়-চোপড় বের করছিলাম, এর’ই মাঝে মিস সুইটি ওর রুমের প্রতিটি কোণায়-কানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আসবাবপত্রের বর্ণনা দিতে লাগল। এমনভাবে সব কিছুর বিশ্লেষণ করছে মনে হচ্ছে ও যেন কোনো দোকানের মালিক। আর আমি সেখানকার একমাত্র ক্রেতা।
যায় হোক!
আধঘন্টা এভাবে অনর্থক পেঁচাল পারল।
তারপর মনে হয় হাফিয়ে গিয়েছিল।
আপু তুমি বসে রেস্ট নাও, আমি আসছি বলে চলে গেল সুইটি
উফ!!!
পারেও বটে।
কিছু সময়ের ব্যবধানে’ই বুঝে গেলাম মেয়েটা ভিষণ ছটফটে আর চঞ্চল। সারাক্ষণ ছুটোছুটো করাটাই যার স্বভাব। সুইটি যাওয়ার পর বিছানায় একটু গা এলিয়ে দিয়েছিলাম, ঠিক তখন’ই রুমে বাঁধনের আগমন। একবাটি নুডলস হাতে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে। অনুমতি নিয়ে’ই তবে রুমে প্রবেশ করে।
নুডলস খান বলে আমার দিকে নুডলসের বাটি”টা বাড়িয়ে দেই বাঁধন।
আমি নুডলস খাই.. না এটুকু শুধু বলছিলাম, তখন’ই ও বলে উঠে-
নিজ হাতে বানিয়েছি।
গ্রহণ করলে ভালো লাগত।
এবার আর ফিরিয়ে দিতে পারিনি। বাঁধনের হাত থেকে নুডলসের বাটিটা নিয়ে ডকডক করে গিলতে লাগলাম, যদিও নুডলস আমার ভিষণ অপছন্দের খাবারের তালিকায় পরে।
জীবনের প্রথম অপছন্দের কোনো খাবার খেলাম।
নাহ, পূর্বের ন্যায় কোনো বমি কিংবা অস্বস্তি লাগে নি। কেন যেন মনে হচ্ছে,
অপছন্দের কোনো খাবার নয়, আমি যেন কোনো অমৃত খাচ্ছি।
এমন অনুভূতির কারণ’টা কি সত্যি’ই ওর রান্নার জন্য নাকি প্রিয় কারো হাতের খাবারের জন্য সেটা জানা নেই আমার….
খাওয়া শেষ করতে’ই জিজ্ঞেস করে বাঁধন, কেমন হলো জানাবেন না???
বাঁধনের দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলাম।
ওর প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন করলাম-
” আপনি রান্না পারেন আগে কখনো বলেন নি তো?!!!”

বাঁধন আমার দিকে চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞাসো দৃষ্টি নিয়ে তাকালো। মনে মনে নিজের বোকামির জন্য নিজেকে’ই গালি দিচ্ছিলাম। প্রশ্ন করে বাঁধন__
” আগে বলব মানে?”
– স্যরি, মজা করলাম। তবে যায় হোক!
আপনার নুডলস রান্না’টা কিন্তু বেশ হয়েছে।
আমার দিকে তাকিয়ে একটা মৃদু হাসি দিয়ে বলে_
” শুনে ধন্য হলাম…..”

বাঁধন রুমে চলে যায়।
রাত্রে খাওয়া-দাওয়া শেষে অনেক কথা-বার্তা হলো সবার সাথে।
এতে এটুকু বুঝলাম যে_
” আমার ধারণা’টা মনে হয় একটু ভুল। বাঁধন শান্ত নয়, এখনো আগের মত’ই অশান্ত ভাবটা ওর মধ্যে আছে।”

মাঝরাত্রে খুব ভেঙ্গে যায়।
স্মৃতি’রা এসে মনের জানালায় কড়া নাড়ে। ভিতরে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়।
অস্থিরতা থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে নামাজকে’ই উত্তম মনে হলো।
ওযু করে বসে গেলাম নামাজের বিছানায়।
আদায় করে নিলাম তাহাজ্জদ।
নামাজ শেষে কুরআন নিয়ে বসে পরলাম।
কুরআন পাঠে এতটাই মগ্ন ছিলাম যে মনে’ই ছিল না এখন রাত্রী গভীর।
এদিকে গভীর রজনীতে তেলাওয়াতের আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায় বাঁধনের মায়ের। বিছানা থেকে নেমে ঘড়ির দিকে তাকান ওনি। রাত্রী তখন ৩টা।
এত রাত্রে কুরআন তেলাওয়াত???
বাঁধনের মা নামাজ কক্ষের সামনে এসে দাঁড়ালো। রুমে দরজা আটকানো। কিন্তু এ রুম থেকে’ই তেলাওয়াতের আওয়াজ’টা আসছে সেটা ওনি বুঝতে পারলেন। জানালার পর্দা আংশিক ফাঁক করে রুমের ভিতর তাকালেন ওনি।
ওনার মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠল।
– এত সুন্দর সুরেলা কন্ঠে তেলাওয়াত তাহলে এই মেয়ে’ই করছে। মিষ্টি হেসে রুমে চলে গেলেন বাঁধনের মা….

পরদিন সকালবেলা ব্রেকফাস্ট করে আন্টিকে(বাঁধনের মা) বলতে গেলাম যে, বাইরে যাচ্ছি। গিয়ে দেখলাম ওনি আধ শুয়া হয়ে হাদিসের বই পড়ছেন। আমাকে দেখে সোজা হয়ে বসলেন ওনি। জিজ্ঞেস করলেন-
কোথাও যাবি মা?
– জি, আন্টি। কলেজে যাচ্ছি।
~ কলেজে? কেন কোনো দরকার মা???(আন্টি)

আন্টি কলেজে আমার চাকুরী হয়েছে…..
– আলহামদুলিল্লাহ! শুনে খুশি হলাম। তা কোন কলেজে চাকুরী হয়েছে তোমার মা?
~ গার্লস স্কুলের সাথে যে কলেজ’টা আছে সে কলেজ’টাই আন্টি।
– কিহ? তুমি মহিলা কলেজের কথা বলছ?
আশ্চর্য হয়ে বাঁধনের মা প্রশ্ন করে আমায়। ওনার প্রশ্নের জবাবে ছোট্ট করে বললাম__
জি আন্টি….

বাঁধনের মা মিষ্টি হেসে বলল__
সেখানে তো সুইটিও পড়ে মা….

ভালো’ই তো হলো।
ও তাহলে এখন থেকে আমার সাথে’ই যেতে পারবে।
‘ হুম, একহিসেবে ভালো’ই হয়েছে আমার মাথার বোজা কমল, ভিষণ থেকে বলে উঠল বাঁধন………’

চলবে…….

কৃষ্ণকলি পর্ব- ০২

কৃষ্ণকলি পর্ব- ০২
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

বাঁধন চলে গেলে সেদিনের মত বাসায় ফিরে গেলাম। সারা রাত বাঁধনকে ভেবে ছটফট যন্ত্রণায় কাটল। ভোরে বাসা থেকে বের হয়ে ঐ স্থানে গিয়ে দাঁড়ালাম যেখানে বাঁধন উন্মাদের মত হাঁটছিল গতকাল। সকাল থেকে দুপুর বাসা খুঁজার অজুহাতে ঘুরঘুর করেছি সে স্থান ও তার আশেপাশে। কিন্তু বাঁধনের দেখা আর মেলেনি।
একদিন, দু’দিন করে চলে যায় এক সপ্তাহ। বান্ধবী অর্পিতাকেও যে বিশাল বড় ঝামেলায় ফেলে দিয়েছি সেটা ও মুখে না বললেও কাজে ঠিক টের পেতাম। বেশকিছুদিন আগে একটা প্রতিষ্ঠানে চাকরীর জন্য এপ্লাই করেছিলাম। রিটেনে ভালো’ই করেছিলাম। আল্লাহ, আল্লাহ করে যদি ভাইবাতে ভালো করতে পারি তাহলে চাকুরীটা হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ!
আর সে জন্য’ই অর্পিতার এখানে উঠেছিলাম। কিন্তু অর্পিতা বোধ হয় এই কয়দিনে’ই হাফিয়ে উঠেছে। আর তাই সেদিন ভাইবা দিয়ে এসে অর্পিতাকে বললাম,
আর একটা দিন অর্পি!
একটা দিন পর আমি বাসা পাই বা না পাই এখান থেকে চলে যাব। অর্পিতা করুণ স্বরে বলেছিল,
মায়া! আমি তোকে এভাবে যেতে দিতাম না। কিন্তু কিন্তু কি করব বল? আমার এত অল্প ইনকামে পরিবার চালিয়ে নিজেও চলা খুব কষ্টকর হয়ে যায়!!!
অর্পিতাকে আমার খরচ বাবদ কিছু টাকা দিয়ে পরদিন সকালে ওর বাসা থেকে বের হয়ে আসলাম। সেদিন সারাদিন হন্যে হয়ে খুঁজেও কোথাও ভালো বাসার সন্ধান করতে পারিনি। ব্যর্থ মনোরথ নিয়ে পড়ন্ত বিকেলে বাসস্টপের ছোট্ট বেঞ্চে বসে যখন জীবন অংকের হিসাব মিলাচ্ছিলাম তখন’ই পিছন থেকে কেউ একজন বলে উঠে,
” শুনছেন___”

পিছনে ফিরে তাকালাম। নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এ যে স্বয়ং বাঁধন দাঁড়িয়ে। চোখের জল লুকিয়ে বললাম, আপনি?!!!
কেমন আছেন?
এই তো আলহামদুলিল্লাহ! আপনি এখানে এভাবে!!!
— বাসা খু্ঁজতে খুঁজতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম আজকে যেভাবে’ই হোক একটা বাসা ঠিক পেয়ে যাব, তাই বান্ধবীর বাসা থেকে একেবারে চলে আসছিলাম। কিন্তু____
পেলেন না’তো বাসা???

আমার নিরবতা দেখে বাঁধন বুঝে নিল বাসা খুঁজে পাওয়া যায় নি।
এদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছিল দেখে বাঁধন বলল, চলেন। বাঁধনের দিকে তাকিয়ে চোখ’টা ফিরিয়ে নিলাম।

আমার পক্ষে আর ও বাসায় যাওয়া সম্ভব নয়।

কি করবেন তাহলে? এভাবে এখানে অসহায়ের মত বসে থাকবেন?(বাঁধন)
— থাকব।(আমি)
মিস ম্যাম! চারপাশ’টা দেখেছেন? সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আর আপনি দিনের শহর দেখেছেন, এখনো অবধি হয়ত রাতের শহর দেখেননি। তাই এ কথা নির্দ্বিধায় বলে ফেললেন। সন্ধ্যা পর থেকে’ই এখানে বখাটেদের আনাগোনা শুরু হয়ে যায়। আমি কি বুঝাতে চেয়েছি আশা করি আপনি বুঝতে পেরেছেন!(বাঁধন)

বাঁধনের কথা শুনেও আমার কোনো প্রতিক্রিয়া ছিল না দেখে বাঁধন বোধ হয় মনে মনে অবাক হয়েছিল। অবাক হওয়ার’ই কথা। আমি নির্বিকারচিত্তে সামনের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবছি,
আমি জানি বাঁধন! তুমি এই মুহূর্তে ঠিক ভাবছ? তুমি ভাবছ আমার কোনো ভয়-ডর নেই নাকি!
ভয় আমার ঠিক’ই আছে বাঁধন। কিন্তু তুমি পাশে থাকায় সেটা এখনো অবধি ভালো ভাবে ঝেকে বসতে পারেনি।

আমার দৃঢ়চিত্তে বসে থাকা দেখে বাঁধন আমায় কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল ঠিক তখনি ওর ফোন’টা বেজে উঠে। বাঁধন ওর ফোন রিসিভ করে।
এই তো মা রাস্তায়। ওকে, ওকে আসছি।
ফোন’টা রেখে বাঁধন আমার দিকে তাকালো।
কৃষ্ণকলি!!!
আমায় এখন যেতে হবে। বোন কোচিংয়ে। সেখান থেকে ওকে আনতে হবে। আপনি বরং আপনার বান্ধবীর বাসায় ফিরে যান।

বাঁধন মায়াকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে’ই ফোন কানে আসছি, আসছি বলে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। মায়া দু’টানায় পরে যায়। কি করবে বুঝতে পারছিল না। বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াতে’ই ওর ফোন’টা বেজে উঠে।
ফোন রিসিভ করে সালাম দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ থাকল মায়া। তারপরে’ই মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠে ওর। অবশেষে মায়ার চাকুরী’টা হয়ে গেছে। আর হাসি’টা সেই বিজয়ের’ই হাসি।

খুশিতে আত্মহারা হয়ে যখন আমি দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম তখন মনে হলো ওপাশ থেকে এক দোকানদার ডাক দিয়েছে আমায়। আশেপাশে কেউ ছিল না দেখে নিশ্চিত হলাম ওনি বোধ হয় আমায়’ই ডাক দিয়েছেন। আর তাই আমি টং দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দোকানদার আমায় বেঞ্চে বসতে বলে আমার দিকে এক কাপ চা এগিয়ে দিলেন। আমি চা খাই না বলে চুপচাপ বেঞ্চে বসে পরলাম। চায়ের কাপ পাশে রেখে দোকানদার আমার পাশে এসে বসলেন। তারপর বলতে লাগলেন__
” তুই বোধ হয় এই এলাকায় নতুন! তোর বোধ হয় এই এলাকা সম্পর্কে কোনো ধারনায় নেই। তাই এভাবে নির্ভয়ে এখানে হাঁটতে পারতেছিস।”

– দোকানদারের কথা শুনে এবার সত্যি সত্যি ভয় পাচ্ছি।

_ তোর বাড়ি কোথায়রে মা?
দোকানদারের আবেগী গলার কথা শুনে মনটা গলে গেল। সবটা খুলে বললাম ওনাকে। দোকানদার আমায় নির্ভয় দিয়ে বললেন, “তুই একদম চিন্তা করিস না মা। একদম কাঁদবি না। তুই শুধু এখানে ৫টা মিনিট বস। আমি তোকে বাসা খুঁজে দিব।”

কোনো কথা না বলে চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে রইলাম আমি। কিছুক্ষণ পর দোকানদার কাকে যেন বলল__
” আরে ভাবিসাব যে!
আসসালামু আলাইকুম।”
না তাকিয়েও বুঝে গেলাম কোনো মহিলা আসছে বোধ হয় সওদা করতে। মহিলাটি আমার পাশে এসে বসল বুঝতে পারলাম।
আমার চোখ দিয়ে তখনও অঝরে অশ্রু গড়িয়ে পরছিল বিপদের কথা ভেবে। আতংকে কলিজা শুকিয়ে আসছিল। মহিলাটি আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষণ। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে চলে যাচ্ছিল, তারপর কি মনে করে যেন ফিরে আসল।
মহিলাটি আমার পাশে এসে পুনরায় বসল।
আমায় মাথায় হাত রেখে বলল__
” কোন মায়ের নাড়িছেঁড়া ধনরে তুই এখানে এভাবে অনাথের মত বসে কাঁদছিস। বাসা কোথায় তোর মা?”

বহুদিন পর নারী কন্ঠে ‘মা’ ডাক শুনে চোখ দুটো জলে ছলছল করে উঠল। অশ্রুভেঁজা নয়নে সামনের দিকে তাকালাম। এক অতিকায় সুন্দরী মধ্যবয়স্কা নারী আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখে চশমা, গায়ে চাদর। আমি ভদ্রমহিলার দিকে ঢ্যাব ঢ্যাব করে তাকিয়ে আছি। কিছু বলতে যাব তখন’ই দেখি বাঁধন। বাইকে করে একটা মেয়েকে নিয়ে এদিকেই এগিয়ে আসছে। বাঁধনকে দেখে আমার মুখে শুকনো হাসি ফুটে উঠল…….

দোকানের সামনে এসে বাঁধন বাইক রাখে। বাইকের পিছনে বসা মেয়েটি আচমকা ভদ্রমহিলাটিকে জড়িয়ে ধরে।
নালিশ করে বাঁধনের নামে। মহিলা ব্যস্তভাব নিয়ে বললেন,
পাজিটার বিচার বাসায় গিয়ে করব।
আগে দেখি তো আমার আরেক মা কেন কাঁদছে? কথা বলতে বলতে ভদ্রমহিলা আমার দিকে এগিয়ে আসেন।
গম্ভীর ভাব নিয়ে প্রশ্ন করলেন,
বললে না তো মা তুই এখানে এভাবে বসে কাঁদছিস কেন???

আ…..মি…..
মুখ খুলতে যাওয়ার আগেই দোকানদার আমার মুখ থেকে কথা নেয়। ওনি বলা শুরু করেন,
” ভাবিসাব! এ আমার এক মা!
গ্রাম থেকে এসেছে চাকরীর খুঁজে।
চাকুরী ঠিক পেয়ে গেলেও কোনো বাসার সন্ধান পাইনি ও। আমি’ই ওকে এখানে বসিয়ে রেখেছি। ভেবেছিলাম দোকানপাট বন্ধ করে আপনার কাছে নিয়ে যাব ওকে। কিন্তু তার আগে’ই আপনি এসে গেছেন। এখন আপনি যদি আমার এই মা’টার জন্য কিছু করেন তাহলে বড় উপকার হতো। আপনি তো ভাড়াও দেন বাসা। যদি ওকে একটা রুম দিতেন.. ..?!!!”

দোকানি থেমে গেল এটুকু বলে।

মহিলাটি মিষ্টি হেসে বলল__
এভাবে বলবেন না ভাইজান! আপনার মা তো আমারও মা। আর ও ভাড়া কেন থাকবে? কোনো মেয়ে কি তার মা’কে নিজ বাসায় ভাড়া রাখবে???
ও আজ থেকে আমার এখানে’ই থাকবে। আমরা যা খায় তাই ও খাবে।
কি পারবি মা?
যাবি এই মায়ের সাথে???

কিছুক্ষণের জন্য নির্বাক হয়ে গিয়েছিলাম আমি। অজস্র জলরাশি চোখ থেকে গড়িয়ে পরছিল।
নাহ, এ জল বেদনার নয়!
এ জল আনন্দের।
এ আনন্দের জল। বহুদিন পর অচেনা কারো মাঝে মায়ের ছায়া দেখতে পাচ্ছি। তাই চোখ থেকে অজান্তেই সুখের দু’ফোঁটা আনন্দ অশ্রু গড়িয়ে পরছে……

কি হলো মা? যাবি না এ মায়ের সাথে?
মহিলাটির কথা শুনে চোখের অশ্রু মুছে নিলাম। মৃদু হাসি দিয়ে বললাম__
” যাব আন্টি….”

হুম, এবার তাহলে চল। রাত’তো অনেক হয়েছে। (ভদ্র মহিলা)
দোকানদারের থেকে বিদায় নিয়ে সামনের দিকে পা বাড়ালাম।
এই হতচ্ছারা! এখানে দাঁড়িয়ে ফোন টিপবি নাকি বাসায় যাবি???(মহিলা)
ওহ, মা! লাগছে বলে পিছনে ফিরে তাকালো বাঁধন। আমায় দেখে চোখ বড় বড় করে বলল, আপনি???(বাঁধন)
জি, ও আজ থেকে আমাদের সাথে আমাদের বাসায় থাকবে। কেন? তুই চিনিস নাকি ওকে???(মহিলা)

না’তো…
আমার দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলল বাঁধন। পিছন থেকে ওকে অনুসরন করে অচেনা মা-মেয়ের সাথে এক অচেনা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম আমি।

চলবে……..

কৃষ্ণকলি পর্ব:- ০১

কৃষ্ণকলি
পর্ব:- ০১
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

ছয় বছর পর বাঁধনের সাথে দেখা। ভাবতেই পারিনি, ওর সঙ্গে এভাবে দেখা হবে।
এই ছয় বছরে অনেক বদলে গেছে বাঁধন। সেই চঞ্চল বাঁধন আর এখনকার শান্ত, সভ্য বাঁধনের মধ্যে অনেক তফাত।
আমি এই বিরতিতে বাঁধনকে প্রায় ভুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন পড়ন্ত বেলায় ওর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর জীবনের হিসাব কেমন যেন পাল্টে গেল।
মাথা নিচু করে রাস্তায় হাটছিলাম। হঠাৎ উপরের দিকে তাকাতেই বাঁধনকে দেখলাম।
আশ্চর্য হয়ে গেলাম! কোনো দ্বিধা না করে বলে ফেললাম, কেমন আছেন?
ভালো। ছোট করে বলেই থেমে গেল বাঁধন। আমার মুখে তখন আর কোনো ভাষা ছিল না। কিছু সময় নিরবতা, তারপর আচমকা বাঁধনের মুখ থেকে বেরিয়ে আসল, আপনি? আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারিনি!!
স্মিতহাস্যে বললাম, কৃষ্ণকলি। “কৃষ্ণকলি”
আমার নাম।

অতীতে ফিরে গেলাম আমি। ২০১০সালে বাঁধনের সঙ্গে প্রথম পরিচয় আমার। পরিচয়টা ফেসবুকে’ই। তারপর ঘনিষ্ঠতা, ঘনিষ্ঠতা থেকে আন্তরিকতা। মনের অজান্তে’ই ওকে নিয়ে ভালোবাসার বীজ বপন করে ফেলেছিলাম। খুব বেশী ভালোবেসেছিলাম ওকে। এতটাই ভালো যা লিখে বুঝানোর মত নয়। সেও যে আমাকে ভালোবাসে নি, তাও কিন্তু নয়। বাঁধনও আমায় ভালোবাসত, কিন্তু কখনো বুঝতে দিত না। বুঝতে না দিলেও আমি ওর মনের না বলা কথাগুলো ঠিক বুঝে নিয়েছিলাম। রিলেশনের দু’বছরের মাথায় বাঁধন আমার কাছে একটা জিনিস চাই। আমার ছবি চাই। আমার কাছে বাঁধনের প্রথম আবদার, পূরণ করা’ই যেত। কিন্তু করিনি। বাঁধনকে ছবি দিতে অস্বীকার করলাম। প্রচন্ড অভিমানে বাঁধন আমার সাথে যোগাযোগ করা বন্ধ করে দেয়। তারপর অতিবাহিত হয়ে যায় দীর্ঘ একটা বছর।
সেদিন হসপিটালের বিছানায় আধাশোয়া অবস্থায় তন্ময় হয়ে মান্না দের গান শুনছিলাম। বাঁধনকে হারিয়ে মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পরেছিলাম আমি। অসুস্থ হয়ে পুরো একবছর মনোরোগ বিভাগে থাকতে হয়েছিল আমাকে। কয়েকদিন ধরে শরীরের অবস্থাও বেশী ভালো যাচ্ছিল না। বান্ধবীর জোরাজুরিতে একরকম বাধ্য হয়ে’ই তাই দু’দিন ধরে হসপিটালে আছি। গান শুনার ফাকে একসময় পাশের কেবিনের এক রোগীর সঙ্গে কথা বলছিলাম। হঠাৎ’ই ফোন’টা বেজে উঠল। ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাতে’ই মনে হলো চোখে কিরকম সরষে ফুল দেখছি। ফোন’টা চোখের কাছ থেকে আরো কাছে নিয়ে আসলাম।
চমকে উঠলাম। এ যে বাঁধন!
এতবছর পর কি মনে করে? কানে নিয়ে কথাটা বলতে’ই ও জবাব দেয়, তোমাকে দেখব। দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে খুব। তোমাদের এলাকার পরিত্যক্ত সেই জমিদারী আমলের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানকার কথা তুমি প্রায়’ই বলতে। ৩০ মিনিটের ভেতর তুমি এখানে আসো, আমি তোমায় সামনাসামনি দেখতে চাই।

ফোনটা কান থেকে নামিয়ে ফেললাম। বান্ধবী ডাঃ নুসরাতকে বলেই ছুটে চললাম এলাকার দিকে। মিনিট দশেকের ভেতর পৌঁছে গেলাম কাঙ্খিত স্থানে। সি.এন.জি থেকে নামতেই দেখলাম একটা অচেনা যুবক গিটার হাতে দাঁড়িয়ে আছে অন্যমনস্ক হয়ে। বাঁধনকে চিনে নিতে আমার ভুল হয়নি, বুঝতে অসুবিধে হয়নি এই আমার বাঁধন! এক’পা দু’পা করে এগিয়েও পিছু হটলাম।
সেদিন বাঁধনের সামনে যেতে পারিনি। বাঁধন ছিল আমার কল্পরাজ্যের রাজকুমারের চেয়েও অনেক অনেক সুন্দর। এত সুন্দর-সুদর্শন যুবকের পাশে আমি যে বড্ড বেমানান। কারণ- আমি কালো। শুধু কালো নয়, অনেক বেশী’ই কালো। মনে ভয় ছিল এমন কালো চেহেরা নিয়ে ওর সামনে গেলে যদি ও ফিরিয়ে দেয়? যদি হারিয়ে যায় ভালোবাসার এই তীব্রতা’টুকু? তার চেয়ে ভালো ওর কাছে অপ্রকাশিত’ই থাকা। বাঁধন ফিরে গিয়েছিল সেদিন। এরপর হাজার চেষ্টা করেও ওর সাথে কথা বলতে পারিনি। পারিনি কোনো প্রকার যোগাযোগ করতে। আর করব’ই বা কিভাবে?
ও যে যোগাযোগের সব মাধ্যম’ই ছিন্ন করে দিয়েছিল। বন্ধ করে দিয়েছিল ফোন নাম্বার। ফেসবুকে ব্লক করে দিয়েছিল। অন্য আইডি খুলে নক করেছিলাম। যার কারনে আইডি’টাই ডিএক্টিবেট করে দেয়। এভাবেই আমার সব স্বপ্নের ইতি ঘটল। সাজানো স্বপ্ন ভঙ্গের যন্ত্রণায় আবারো ছটফট করে উঠলাম।
~ কি হলো? বললেন না যে কে আপনি?
বাঁধনের কথায় ভাবনাচ্ছেদ হলো। ফিরে এলাম সুদূর অতীত থেকে আজকের এই নির্মম বর্তমানে। বাঁধনের দিকে তাকি বললাম, কৃষ্ণকলি।
বাঁধন বিরক্তিভাব নিয়ে বলল, কৃষ্ণকলি!
সে’তো গল্প-উপন্যাসে’ই মানায়। আপনি তো কোনো গল্প নন, তাই না? আমি মাথা নেড়ে বললাম, আমি কোনো গল্প বা উপন্যাসের কথা বলছি না। আর এটাও বলছি না আমি গল্পের নায়িকা।
আমার কথা শুনে বাঁধন বলল,
তবে আমি নিশ্চিত আপনি রবীন্দ্রনাথের সেই কৃষ্ণকলি….
বাঁধনের কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ ছিলাম।
বাঁধন নিরবতা ভেঙে বলল_
“তবে যায় হোক।
আমি মনে হয় ভুল কিছু বলিনি। আপনি’ই সেই কৃষ্ণকলি, যার রূপের বর্ণনা রবীন্দ্রনাথ ওনার কবিতায় চমৎকার ও সুচারুভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।”
বাঁধনের কথার অতল গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ ওর তুড়ির আওয়াজে দিশা হয়। সামনের দিকে তাকালাম।
– এ এলাকায় নতুন?
বাঁধনের দিকে তাকিয়ে বললাম, জি!
আজ’ই এসেছি এখানে।
– ওহ! কোথায় উঠেছেন?
জবাব দিলাম, আপাতত বান্ধবীর বাসায় আছি। বাসা খুঁজে পেলে’ই ওখান থেকে চলে যাব। আপনি?
আপনিও এখানকার…..(……)…..???
আমার কথা শুনে মৃদ্যু হেসে বাঁধন বলল, নাহ! আমি ভাড়াটে নয়। এ এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা আমি। ঐ যে সামনে যে বাসাটি দেখছেন সেটাই আমাদের বাসা। কোনো প্রয়োজন হলে জানাবেন। যথাসাধ্য চেষ্টা করব সাহায্য করার। এখন আসি।
আল্লাহ হাফেজ।

বাঁধন চলে যাচ্ছে।
একটু একটু করে দুরে চলে যাচ্ছে।
আমি নির্বাক দৃষ্টিতে ওর সেই চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছি….

চলবে…..

বাস্তবতা পর্ব- ০২(অন্তিম পর্ব)

বাস্তবতা
পর্ব- ০২(অন্তিম পর্ব)

লেখা- অনামিকা ইসলাম।

ও কল না দিলেও আমি কল দিতাম। খুঁজ খবর নিতাম। কি খেয়েছে? কি করতেছে? শরীর ভালো কি না? কখন ঘুমোবে? এসব, শুধু এসব বিষয়েই ওর সাথে আমার কথা হতো। মাঝে মাঝে একটু আধটু বেশী কথা হতো। যখন বেশী কথা হতো তখন কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যেতাম এই ভেবে যদি চিরতরে হারিয়ে যায় আমাদের বন্ধুত্ব। মনের কথাগুলো তাই অব্যক্ত হয়েই রয়ে গেল আমার মনের গহীনে।
অতিবাহিত হয়ে যায় আরো ১টি বছর। আমি তখনো সোহেলকে আমার অব্যক্ত কথাটা জানাতে পারিনি। সোহেলও আমায় ভালোবাসার ব্যাপারে কিছু বলতো না। কিন্তু মুখে না বললেও সোহেল ওর কর্মকান্ড দ্বারা ও আমায় অনেক কিছুই বুঝিয়ে দিত।

সেবার প্রচন্ড জ্বরে সোহেল যখন শয্যাশায়ী, তখন আমি ছুটে গিয়েছিলাম ওর কাছে। কয়েকদিনের ব্যবধানে মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি জন্মায় ওর। চুপ করে বসে থাকতে পারলাম না। দোকান থেকে রেজার এনে সেভ করে দিলাম। নেইলকাটার দিয়ে নখ কেটে দিলাম। গরম পানি গোসল, পরনের ওড়না দিয়ে শরীর মুছে দেওয়া। সব, সব করে দিলাম। ওর অসুস্থতায় আমি যেন ওর কাছে চলে গেলাম। একেই বলে হয়তো ভালোবাসার গভীরতা। ও সুস্থ হয়ে উঠল।
কিন্তু আমি আমার মনের কথাটা ওকে জানাতে পারলাম না।

“হৃদয় যতই ব্যথিত হোক, কর্মচক্র আপন গতিতে চলিতে থাকে।”
আমাদেরও দিন চলতে থাকল। আমি বোধ হয় আর পারলাম’ই না ওকে মনের না বলা কথাটা বলতে! গুমড়ে কেঁদে উঠলাম।
দিনটি ছিল শুক্রবার। ২০১৪সালের উক্ত দিনে সকাল ১০টায় আমি তাকে ডাকলাম। ও আসলে আমি আমার কথাটা জানালাম সাদামাটা ভাবে। হয়তো তখন তার কাছে আমার হৃদয়ের সবটুকু অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারিনি। আমি চাইনি সে আমার না বলা ভালোবাসা হোক। জানি, যখন কেউ কাউকে বেশি ভালোবাসে তখন সে তাকে দুরে ঠেলে দেয়। যে দুরে ঠেলে দেয়, তাকে আরো বেশি ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। কারন মানুষ কষ্ট পেতে ভালোবাসে। মনে হয় আমিও এর ব্যতিক্রম নই।
সোহেল আমার যোগাযোগ করা বন্ধ করে দেয়। একটানা ৩মাস ওর সাথে আমার কথা হয়নি। ৩মাস পর একবিকেলে সোহেল আমায় কল করে। ও আমাকে একটা কথা বলতে চায়। তাই ওর বাসায় যেতে বলে। একটা বছর ধরে যে কথাটা শুনার জন্য চাতকের মতো অধির আগ্রহে বসে ছিলাম আজ তার’ই অবসান ঘটতে চলেছে। আজ আমার সোহেল নিজ থেকে আমায় ডেকেছে। এতদিনে সেই বহুল প্রত্যাশিত শব্দ ‘ভালোবাসি’ কথাটা শুনতে পারব।
এ যে কি আনন্দের ছিল তা বলে বুঝানো যাবে না। আমি ছুঁটে গেলাম সোহেলের কাছে। সোহেল তখন রুমে বসে ছিল। আমাকে দেখে ও কেমন যেন ঘামছিল। বুঝতে পারলাম জীবনের প্রথম ভালোবাসার অনুভূতি তো তাই ওর এরকম অবস্থা হচ্ছে। ওকে বললাম, বলো কি বলবে? ও দরজার দিকে এগিয়ে যায়। বন্ধ করে দেয় দরজাটা। আমার খুশিতে উজ্জল মুখটা অমাবস্যার কালো অন্ধকারের ন্যায় হয়ে যায়। ওর দৃষ্টি’টা কেমন যেন অন্যরকম লাগছিল। অন্যান্য দিনের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। আমার বুকের ভেতরটা আশঙ্কায় কেঁপে উঠে। সোহেল একটু একটু করে আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। আমি ভয়ে চুপসে গেলাম কিন্তু থেমে গেলাম না। এক পা দু’পা করে আমিও পিছু হটতে লাগলাম। আচমকা সোহেল আমার সর্বাঙ্গের আঁচল ধরে টান মারে। বুকটা ধুরু ধুরু করে কাঁপছিল। কাপা গলায় সোহেলকে প্রশ্ন করলাম- কি করছ? সোহেল কোনো কথা না বলে আমার দিকে হিংস্র বাঘের মতো এগুতো থাকে। একটা সময় বিছানায় ফেলে ও আমার উপর ঝাপিয়ে পরে। আমি দু’হাত দিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করছি ওর মুঠু থেকে মুক্ত করতে। কান্না করে করে বলতেছি-
” না, সোহেল! তুমি এটা করতে পারো না। তুমি এটা কখনো করতে পারো না। তুমি আমাকে ভালোবাসো। তাই তুমি এটা করতে পারো না। সোহেল তবুও কোনো কথার জবাব দিচ্ছে না। এক পর্যায়ে বলে উঠলাম,
আমার পিরিয়ড হয়েছে। আমায় আজকের মত ছেড়ে দাও।”

সোহেল আচমকা আমায় ছেড়ে দিল। হাফ ছেড়ে বেঁচে গিয়েছিলাম আমি। আসবার কালে সোহেলকে শুধু এটুকু জিজ্ঞেস করেছিলাম তোমায় বিশ্বাস করাটা কি আমার অপরাধ ছিল? ও ভয়ার্ত হাসি দিয়ে বলেছিল সেদিন, বিশ্বাস নয়। স্বপ্ন। তোর স্বপ্ন দেখা অপরাধ ছিল। তোর মত কালো, কুৎসিত একটা মেয়ে যাকে নিয়ে কিনা বিছানায় শুইতে গেলেও রুচিতে বাঁধবে, সেই মেয়ে কি না স্বপ্ন দেখে আমায় নিয়ে। আরে তোর মত হাজারো মেয়ে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে শুধু আমার এক রাত্রের সঙ্গী হওয়ার জন্য, বেড পার্টনার হওয়ার জন্য। আর সেখানে কি না আমি তোকে ভালোবাসব???
ঐ তুই কি ভেবেছিস? তোকে আমি ভালোবাসার কথা বলব????
হা, হা, হা, হা, হা, হা….
হাসালি….
যা, এই মুহূর্তে আমার চোখের সামনে থেকে বের হয়ে যা।
সেদিন দু’চোখের নোনাজল সঙ্গী করে বের হয়ে এসেছিলাম সোহেলের ওখান থেকে। এরপর কতবার যে মরার জন্য পা বাড়িয়েছিলাম তার কোনো হিসেব নেই। আবার ফিরেও এসেছি অসহায় মায়ের কথা চিন্তা করে। যাকে কিনা রোজ রাত্রে কাঁদতে দেখেছি আমার জন্য। আমার মত একটা কালো মেয়ের জন্য। পৃথিবীর কারো কাছে আমার মূল্য না থাকলেও আমার মায়ের কাছে ছিল। তাইতো প্রচন্ড জ্বরে যখন আমি বিছানায় শুয়ে ছটফট করছিলাম তখন আমার জনমদুখিনী মা ছুটে আসে আমার কাছে, আমাকে দেখতে। এই কয়দিনে অনেক শুকিয়ে গিয়েছিলাম। আমার মা আমায় বুকে নিয়ে পরম আদরে জড়িয়ে ধরে। আমার নাকে, মুখে, কপালে চুমুর পর চুমু দিতে থাকে। মাঝরাত্রে ঘুম ভেঙে যায়। চোখ মেলে দেখি আমার মা আমার মাথার পাশে বসে ঝিমুচ্ছে। আমায় চোখ মেলতে দেখে ওনি আমার দিকে জল ছলছল চোখে তাকান। খাটে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে মায়ের দিকে তাকালাম। প্রশ্ন করলাম মাকে,
” মা! আমি কালো বলেই কি তুমি আমার নাম শিমুল রেখেছিলে? সেই শিমুল যে শিমুলের কোনো মূল্য নেই। যে রাস্তায় পথিকের পদতলে পিষ্ট হয়।”

কথাগুলো বলে মায়ের দিকে তাঁকালাম। লক্ষ্য করলাম আমার মা আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদছে। কালো মেয়ের মায়েরা বুঝি এভাবেই কাঁদে, এভাবেই দুঃখগুলো ঢেকে রাখে আঁচলের অন্তঃরালে…..

সমাপ্ত…..

[লেখিকার কথা:- নাহ! গল্প ওখানেই শেষ হয়নি। শিমুলের জীবনে আসে আমার কাজিন রুবেল। রুবেল ভাইয়া শিমুলকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনে। রুবেল ভাইয়া কাতার থাকে। পরিবারের সম্মতিক্রমে আগামী শুক্রবার দিন ওদের বিয়ে হবে ফোনে। রুবেল ভাইয়া ৩মাস পর দেশে আসবে।
শিমুল জানে না এরপর কি হবে? রুবেলও শিমুলকে ব্যবহার করবে? নাকি স্বাভাবিক জীবন দিবে]

বাস্তবতা পর্ব- ০১

বাস্তবতা
পর্ব- ০১

লেখা- অনামিকা ইসলাম।

আমি শিমুল। তাসনুভা তাবাসসুম ‘শিমুল’। তাসনুভা নামটা যে খুব বেশী খারাপ তা কিন্তু নয়। অথচ আশ্চর্য জনক হলেও এটাই সত্যি, শেষ কখন এই নামে কে বা কারা আমায় ডেকেছে সেটা আমার মনে নেই। আর ক’জন মানুষ’ই বা আমার নামটা জানে সেটা বলাও দুষ্কর। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই শুনে এসেছি অসংখ্য ডাক। আমার বাবা-মা, ভাই-বোন, আমার রিলেটিভ, ফ্রেন্ডস সার্কেল সর্বোপরি দূর দূরান্তের অসংখ্য মানুষ আমায় বিভিন্ন নামে ডাকে।
আমার আপন জ্যাঠাতো বোন যার যাদের সাথে আমাদের একই বাড়িতে বসবাস তিনি আমাকে ‘কালি’ বলে ডাকেন। আমার এলাকার মানুষ আমায় ‘কাইল্লাবি’ বলে ডাকে। এলাকার মানুষজনের কাছে আমি এই নামেই পরিচিত। আমার ফ্রেন্ডসরা আমায় ‘কালিতারা’ বলে ডাকে। ওদের সাথে কোথাও গেলে কিংবা কেউ যদি আমায় নাম জিজ্ঞেস করে তাহলে আমার বলার আগেই ওদের ডাক-
“এই কালিতারা, এদিকে আয়!”
আমি যখন স্কুল থেকে কোনো সাফল্যের সংবাদ নিয়ে বাসায় আসতাম তখন রাস্তা থেকেই উৎফুল্লের স্বরে চেঁচিয়ে আসতাম,
মা, মা! আমি প্রথম হয়েছি….
এলাকাবাসী খবরটা শুনত। শুনে তাচ্ছিল্যের স্বরে হেসে বলত, কালির আবার লেখাপড়া….
আমি ওদের প্রতিবাদের স্বরে বলতাম,
দেখুন! আমার নাম কালি নয়। আপনারা আমায় এ নামে ডাকবেন না। আমার একটা নাম আছে, সেই নামে ডাকবেন আমাকে।
আমার কথা শুনে ওদের হাসি হাসি দ্বিগুন পরিমাণে বেড়ে যেত।
সে হাসি অবজ্ঞার,
সে হাসি অবহেলার,
সে হাসি আমার কালো হয়ে জন্মানোর….
প্রচন্ড কষ্ট বুকে চেপে বাসায় এসে যখন মুখ থুবড়ে পরে ছিলাম, তখন’ই আমার বাবার ডাক। ” কাইল্লা’মা! কইরে তুই?”
বাবার ডাক শুনে মন আকাশে জমে থাকা মেঘগুলো বাষ্প হয়ে ঝরে পরে। চোখের’ই জল মুছে নিতাম আঁচলে। মনকে শান্ত্বনা দিতাম এই বলে, যেখানে নিজের বাবা এমন নামে ডাকে সেখানে ওরা তো ডাকবেই।
এভাবে অসংখ্য মানুষের অসংখ্য ডাকের ভীড়ে চাপা পড়ে যায় আমার সত্যিকারের নামটি। অন্তরালে চলে যায় আমার তাসনুভা তাবাসসুম ‘শিমুল’ নামটি।

নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম আমার। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে আমি তৃতীয়। আমার বড় আরো দুই ভাই আছে। আমি সবেমাত্র সেভেনে উঠেছি। অথচ এখনি আমার পরিবার বিয়ের জন্য উঠে পরে লেগেছে। একে তো গরিব ঘরে জন্ম, তারউপর গাঁয়ের রং কালো। বয়স হয়ে গেলে কে করবে বিয়ে? এই মনোভাব সামনে রেখে’ই ওরা আমার জন্য পাত্র দেখতে শুরু করে। নির্দিষ্ট দিনে ওরা আমায় দেখতে হাজির হয় আমাদের বাড়িতে। উঠোনে চেয়ার টেবিল গোল করে পেতে দেওয়া হয়। আমার এক ভাবি আমায় এনে দাঁড় করায় ওদের সামনে। সবসময় ক্লাসের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করা এই আমার দু’চোখ ভরা অনেক স্বপ্ন ছিল। স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া করে অনেক বড় হওয়া। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু আমার সব স্বপ্ন, স্বপ্ন হয়েই রয়ে গেল। গায়ের রং কালো+ গরীব ঘরে জন্ম হওয়ায় আমি পারিনি কোনো প্রতিবাদ করতে। ওরা আমার মাথার ঘোমটা ফেলে, চুল খুলে, হেঁটে হাটিয়ে বিভিন্ন ভঙ্গিতে আমায় দেখতে লাগল। আমায় নামাজ সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করল, তারপর হেঁটে রুমে যেতে বলল। রুমে গিয়ে চৌকির উপর উঠে জানালার ছিদ্র দিয়ে আমি ওদের দেখছিলাম আর কথাবার্তা শুনছিলাম। কথা শুনে মনে হলো এবারে বিয়েটা হয়ে যাবে। কারণ, আমার বাবা ভাইয়ের তখন এরকম হাসি ছিল যে হাসি মানুষ তখন’ই দেয় যখন তাদের কাঁধ থেকে বোজা নামে। সেদিন পুরোটা বিকেল পুকুরপাড়ের টঙের উপর উদাসীন দৃষ্টিতে বসে কাঁটিয়েছি।
মনটা ভিষণ খারাপ;
আমার জন্য পংখীরাজ ঘোড়ায় চড়ে কোনো রাজপুত্র আসেনি,
পড়ন্ত বিকেলে কারো হাতে হাত ধরে হাঁটতে পারিনি,
বৃষ্টিস্নাৎ সন্ধ্যায় প্রিয় কারো সাথে ভিঁজতে পারিনি,
কিংবা কোনো জোৎস্না রাতে কাছের মানুষটির কাঁধে মাথা রেখে পাশাপাশি বসে জোৎস্নাবিলাসও করতে পারিনি;
নাহ, এসব কোনো কারনেই আমার মন খারাপ না। আমার মন খারাপ কারন আমি কালো। সৃষ্টিকর্তা আমায় কালো করে এ পৃথিবীতে পাঠিয়েছে।
সেদিন ঘটকের সাথে বাবা গিয়েছিল ঐ পাত্রের বাড়িতে। বাড়ি দেখে এসে খুশি খুশি ভাব নিয়ে জ্যাঠিমাকে বলতে লাগল_
” ভাবি! কইছিলাম যে বাড়ি তো দেইখ্যাইছি। বিরাট বড় বাড়ি। অনেক সম্পত্তি আছে। তয় ছেলে একটা বিয়ে করছিল, বউ গেছেগ্যা।”

ভ্রু কিঞ্চিৎ বাঁকা করে জ্যাঠিমার জবাব, ” পোলা মাইনষ্যের আবার খুইত আছে নাকি? বিয়া অইছে কি অইছে? দিয়া দেন বিয়া। এত ভালা ঘর আর পাইবেন না।”

আমার বাবা জেনেশুনে এক বিবাহিত পুরুষের সাথে তার অবিবাহিত, অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ের বিয়ে দেয়। বিয়ের কয়দিন যেতে না যেতে’ই আমার উপর নেমে আসে অবর্ণনীয় নির্যাতন। শ্বশুর বাড়ির সবাই বিভিন্ন কৌশলে আমার উপর নির্যাতন করত। কখনো শারীরিক, কখনো বা মানসিক। আমি প্রতিবাদ করতে পারতাম না। প্রতিবাদ করতে গেলেই আমায় বলত, বাপের বাড়ি থেকে তিন লাখ টাকা আনতে। যা কিনা আমার পরিবারের পক্ষে অসম্ভব। আমি নিরবে সয়ে যেতে লাগলাম। আমার স্বামী (মিলন) দিনদুপুরে মদ খেয়ে এসে মাতলামি করত। আমায় অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করত। কখনো বা আমার বাবা মা তুলে গালি দিত। আমি সয়ে যেতাম। সেসব কিছু মুখ বোজে সহ্য করে যেতাম।
কারণ- আমি কালো। সৃষ্টিকর্তা আমায় কালো করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। আর এটাই আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ। কতদিন যে মেরে রক্তাক্ত করে টেনে হিঁচড়ে আমায় বাড়ির বাইরে ফেলে দিয়ে এসেছে তার কোনো হিসেব নেই। ঐ বাড়ির সবাই মনে প্রাণে চাইতো আমি যেন ঐ বাড়ি থেকে চিরবিদায় হয়ে যায়। কিন্তু আমি যেতাম না। আমার স্বামী আমায় বাড়ির পিছনে ফেলে আমায় অজস্র লাঠি, উষ্টা দিয়েছে। আমি চিৎকার করিনি। দাঁতে দাঁত চেঁপে কখনো গরুর খোয়ার, কখনো বা সামনে থাকা গাছকে জাপটে ধরে থাকতাম। ওরা আমায় মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে যখন বাড়িতে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিত, তখন আমি গরুর ঘরে গিয়ে আশ্রয় নিতাম। অজস্র রাত আমি আমার শ্বশুর বাড়ির গরুর ঘরে কাটিয়েছি।
চাইলেই পারতাম চলে যেতে। একেবারে বিদায় নিয়ে চলে যেতে। কিন্তু যায়নি। কারণ ছোট থেকে একটি কথা শুনেই বড় হয়েছি-
” বাঙ্গালি মেয়েদের বিয়ে নাকি জীবনে একবার’ই হয়…..”
তাই সবসময় মনকে এই বলে শান্ত্বনা দিতাম, দেখিনা আরেকটু সহ্য করে। সব ঠিকঠাক হয় কিনা….???
দিন অতিবাহিত হতে থাকে। কিন্তু ওরা কেউ আমাকে আমার অবস্থান থেকে নড়াতে পারিনি। তাই একদিন বাধ্য হয়ে আমার স্বামী আমায় নিয়ে আমার বাপের বাড়িতে যায়। বিয়ের পর প্রথম বাপের বাড়িতে যাওয়া। আমাকে দেখে খুশি হওয়ার পরিবর্তে সবার চোখে পানি ছিল সেদিন। জন্ম থেকে নাদুসনুদুস এই আমি মাত্র তিনমাসের ব্যবধানে শুকিয়ে কঙ্কাল প্রায়। সে রাত্রে কাউকে কিচ্ছু না বলে আমার স্বামী চুরের মত পালিয়ে যায়। তারপর একদিন, দু’দিন করে অতিবাহিত হয়ে যায় ১৫টি দিন। আমার স্বামী আর আমার খুঁজ নেয় না দেখে আমার বাবা কল করে। কল রিসিভ করে আমার শ্বশুর স্পষ্ট গলায় বলে-
” এমন কালো মেয়েকে নিয়ে আমরা চলতে পারব না।”

ওরা ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু তিনমাস অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরও ওরা ডিভোর্স লেটার পাঠায় না। আমার পরিবারের লোকজন আমায় নিয়ে কোর্টে যায়। মামলা দায়ের করে আমার শ্বশুর বাড়ির বিরুদ্ধে। নারী নির্যাতনের মামলা করে ওদের নামে।
বাংলায় একটা প্রচলিত বাক্য আছে-
” টাকা কথা বলে।”
আইন বিক্রি হয়ে যায় টাকার কাছে। আমার শ্বশুর বাড়ির লোকজন ওদেরকে মোটা অঙ্কের টাকা দেয়। বন্ধ হয়ে যায় আইনের মুখ। ওরা উল্টো আমাদের শাসাতো। বাধ্য করল ডিভোর্স লেটার পাঠাতে। শুধুমাত্র গরীবের ঘরে জন্ম নেওয়ার কারনে আমি আমরা পাইনি সুষ্ঠু বিচার।

একে তো কালো মেয়ে তারউপর ডিভোর্সি। গার্মেন্টস, মিল, ফ্যাক্টরিতে যাওয়া ছাড়া কোনো জায়গা ছিল না। বাড়িতে ভাবিদের জ্বালাময়ী কথা আর সহ্য করতে পারছিলাম না। খালার সহযোগীতায় প্রাণ কোম্পানিতে চাকরী নিলাম। ভাড়া বাসায় থেকে আসা করতাম ওখানে।

পরিচয় হয় সোহেলের সাথে। আমার বিষণ্নতার সাথী হয় সে। অতীতের সমস্ত কিছু ও শুনে। আমার কষ্ট ওকে ভিষণ যন্ত্রণা দিত। আমার মন খারাপ, আমার বিষণ্নতা ও সহ্য করতে পারত না। আমায় বিভিন্ন ভাবে হাসানোর চেষ্টা করত। ও আমার খুব ভালো একজন বন্ধু হয়ে যায়।
২বছরের ব্যবধানে সে বন্ধুত্ব ভালোবাসায় রূপ নেয়। ভালোবেসে ফেলি সোহেলকে। প্রচন্ড রকম ভালোবেসে ফেলি।

চলবে…..

স্যার যখন স্বামী সিজন২ শেষ_পার্ট

স্যার যখন স্বামী সিজন২
শেষ_পার্ট
#লিখা জান্নাতুল ফেরদৌস

ফারিদ- ছাদ থেকে এসে দেখি তমা ঘুমিয়ে গেছে।ওর কাছে আর ক্ষমা চাইতে পারালাম না।ভাবলাম কাল সকালে ঠিকইই ক্ষমা চেয়ে নিব।নাহলে আমার বউটা একরাশ রাগ আর অভিমান নিয়ে বসে থাকবে।

সকালে ঘুম থেকে উঠতেইই দেরি হয়ে গেল।তাড়াতাড়ি করে আমিসহ তমাকে খাইয়ে দিয়ে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।সারাদিনের ক্লাস শেষ করে বিকালে ঘামের শরীর নিয়ে বাসায় আসলাম।বাসায় এসে সোজা খাটে এসে শুয়ে গেলাম।সারাটাদিন এত পরিশ্রম করার সত্ত্বেও বাসায় এসে আমার বউটার মায়াবি মুখটা দেখলেই আমার সব ক্লান্তি নিমিষেই দূর হয়ে যায়।আশ্চর্য এতক্ষণ হল বাসায় এসেছি মেয়েটা কোথায়?এইসময় তো ওর রুমে থাকার কথা।পুরো বাড়ি খুঁজেও ওকে পেলাম না।এই অবস্থায় ও কোথায় গেল আমাকে কিছু না বলে।টেনশনে পড়ে গেলাম।হঠাৎ টেবিলের উপর একটা কাগজ দেখতে পেলাম।কাগজ খুলে দেখি তমা আমার জন্য একটা চিঠি লিখে গেছে।

প্রিয় ফারিদ,
আপনাকে না জানিয়ে আমি আপনার সংসার থেকে চলে যাচ্ছি। আমার পক্ষে এই সংসার করা সম্ভব না।এত টেনশন এত চিন্তা আর প্রিয়জনদের হারাতে হারাতে আমি বেঁচে থাকার আশাটা হারিয়ে ফেলেছি।কিন্তু আপনার কাছ থেকে যেদিন জানতে পারলাম আমি মা হতে যাচ্ছি বিশ্বাস করেন নিমিষেই আমার সব কষ্ট দূর হয়ে গেল।মা হওয়ার খুশিতে নিজেকে দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হচ্ছিল। কিন্তু তা শুধু ক্ষণিকের জন্য।এই মা হওয়া বিষয়টার সাথে আমার অতীতের ভয়ানক স্মৃতি লুকিয়ে আছে।যা আমি আপনাকে প্রথমে বলতে চাইলেও পরে তা লুকিয়ে রাখি।কেন জানেন শুধু আপনার জন্য।আপনার ভালোবাসা হারিয়ে ফেলার ভয়ে আমি এই কাজটা করতে বাধ্য হই।ভেবেছিলাম অতীত অতীতের মাঝে রেখে দিব তা কখনো আপনার সামনে আসতে দিব না।কিন্তু আমি মন থেকে এই কষ্টের বোঝার পাল্লা আর বয়ে বেড়াতে পারছি না। তাই আপনাকে আজকে সব খুলে বলব।আপনার সামনে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলা উচিত ছিল কিন্তু আপনার সামনে এই ভয়ানক কথাগুলো বলার দুর্সাহস আমার কোনকালেই ছিল না আর আজো নেই।তাছাড়া আমার নিজের আত্মসম্মানের একটা ভয় আছে।যার কারণে আজকে এই চিঠির সাহায্য নিচ্ছি।সব জানার পর আমাকে আর মেনে নিতে পারবেন না তা আমি জানি।আর আপনার ভালো মানুষিকতার সুযোগ নিয়ে আপনাকে সারাজীবন কষ্টের মধ্যে রাখার কোন মানেই হয় না।তাই আমি নিজেই আপনার জীবন থেকে সরে যাচ্ছি। পারলে ভালো একটা মেয়ে দেখে বিয়ে করবেন যে ঘরের সব কাজ করতে পারবে, আপনার সংসার সামলাতে পারবে আর তার পবিত্র ভালোবাসা দিয়ে আপনার জীবনকে সুখের কানায় কানায় ভরিয়ে দিবে।ভালো থাকবেন আর নিজের যত্ন নিবেন।

ইতি
আপনার তিলোত্তমা
.
.

চিঠিতে তমার জীবনের অতীতের ঘটনা জানতে পেরে বুঝতে পারলাম মেয়েটা কেন এই সংসার আর ভালোবাসা থেকে নিজেকে সবসময় গুটিয়ে নিত।ওর কষ্টগুলো দূর করার সর্বাত্মক চেষ্টা করতাম ভাবতাম আমি ওর কষ্টগুলো দূর করতে সফল হয়েছি কিন্তু না আমি ভুল ছিলাম। আমি সত্যিই ওর কষ্টগুলো এখনো মুছে ফেলতে পারিনি
ব্যর্থ হয়েছি আমি।এতদিন আমার সাথে সংসার করেও ও এখনো বাকি সব পুরুষদের সাথে আমার তুলনা করছে।যেটা ওর মন থেকে আমাকে দূর করতেই হবে।

দেখি কতদিন ও আমার থেকে নিজেকে দূরে রাখে।আমিও বসে থাকার পাত্র নয় ওর মনের ভিতরে নিজের জায়গা আরো ভালোভাবে গড়ে তুলতে হবে। যাতে আর কখনো ও আমাকে ভুল বুঝে এই ফালতু কাজটা করার পদক্ষেপ আর দ্বিতীয়বার না তুলে।ওকে কিভাবে নিজের বশে আনতে হবে তা আমার বেশ ভালোভাবেই জানা আছে।এখন থেকে ওকে আগের থেকেও আরো অনেক বেশি বেশি ভালোবাসব যে ও আমার ভালোবাসার মায়াবন্ধন থেকে কিছুতেই ছুটে পালাতে না পারে।বাবুর আম্মু….. এত সহজে আমার থেকে তুমি পালাতে পারবে না।তোমার অতীত জানার আগে তোমার প্রতি আমার যে ভালোবাসাটা ছিল সেটা অতীত জানার পরেও থাকবে।এত সহজে তোমাকে আমি ছাড়ছি না বাবুর আম্মু।
.
.
তাড়াতাড়ি করে রেলস্টেশনের রওনা দিলাম।বাসে করে ও কোথাও যাবে না সেটা আমি ভালো করেই জানি।তাই রেল স্টেশনের দিকে রওনা দিলাম।আর আমার বোকা বউটাকেও অনেক খোঁজার পরে পেয়ে গেলাম।

ফারিদ- কি ব্যাপার এখানে কেন?আমাকে ছেড়ে আমার সংসারকে ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার এত শখ কেন?

ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি আমার এমন কথা শুনে ও অনেক বড় একটা শকড খেল। বিষণ্ন চোখ দিয়ে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে আবার মাথাটা নিচু করল।

তমা- আপনি এমনভাবে কথা বলছেন মনে হয় যেন কিছু জানেন না।কেন এখানে আসলেন?প্লিজ চলে যান এখান থেকে।

ফারিদ- হ্যা যাবতো এখান থেকে।এখানে থাকার আমার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নাই।এখানে থেকে বউয়ের সাথে রোমান্স করা যায় নাকি?চল বাসায় চল।বাসায় গিয়ে রোমান্সের কাজটা শুরু করব।

ও আবারো বিস্ময় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।ভাবছে আমি ওর অতীতের কথা শুনে অতিরিক্ত শকড খেয়ে পাগল টাগল হয়ে গেলাম নাকি!

আরে….. আমার দিকে এইভাবে তাকিয়ে আছে কেন? এই আমি কিন্তু এখনো আমি সুস্থ আছি।পাগল হয়নি।কিন্তু মাই ডিয়ার বাবুর আম্মু তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেলে হয়ত সত্যিইই আমি পাগল হয়ে যাব। আমাকে ছেড়ে চলে যাবা এতবড় ডিসিশনটা তুমি একা নিতে পার না।আমি কি কখনো তোমাকে এই অনুমতি দিছি যে নিজের যখন ইচ্ছা হল তখন আমাকে ছেড়ে চলে যাবা।যেখানেই যাও আমাকেও সাথে করে নিয়ে যাবে নাহলে তুমি যেখানে যাবে আমিও ভূতের মতন তোমার পিছু পিছু যাব। কিছুতেই তোমার পিছু ছাড়ছি না।
.
.

ও মাথা নিচু করে কাঁদছে সেটা বেশ বুঝতে পারছি।

ফারিদ- এই কাঁদছ কেন বোকার মতন?

তমা- আপনি এখানে এসে আমার সাথে কি মশকরা করছেন?

ফারিদ- আজব এখানে মশকরা করার কি হল?

তমা- প্লিজ অবুঝের মতন কথা একদম বলবেন না।আমার সাথে যা হয়েছে সে পাপজনক কথাগুলো আমার মুখ দিয়ে আসবে না বলে আমি আমার অতীতের কথাগুলো চিঠিতে লিখে রেখে এসেছি।আমি জানি আপনি সবকিছু জেনে গেছেন তারপরও কেন আমার মুখ দিয়ে সে কথাগুলো খুলাতে চাচ্ছেন।আপনি আসলে কি চাচ্ছেন?

ফারিদ- আমার তোমাকে চাই আর বাবুকে চাই।কি সুন্দর করে চিঠি লিখে বলেছেন আপনি আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছেন। যাচ্ছ তো যাচ্ছ সাথে আমার বাবুকে নিয়েও যাচ্ছ। এই বাবুটা কি শুধু তোমার একার আমার কিছু হয়না না?তুমি যেমন ওর মা তেমনি আমি ওর বাবাও। বাবার ভালোবাসা থেকে আমার বাবুকে কেন বঞ্চিত করছ?

তমা-………….

ফারিদ- তোমাদের দুইজনকে ছাড়া এই লাইফে একা চলা আমার জন্য অনেক কষ্টকর।আর হ্যা আমি চাচ্ছি তুমি মুখ দিয়ে তোমার অতীত বল।তাতে সমস্যাটা কি?

তমা- …………

ফারিদ- তোমার কাছে এই সমস্যা মনে হচ্ছে না তুমি খারাপ, অপবিত্র একটা মেয়ে।তুমি এমন ভাব করছ মনে হয় যেন তোমার নিজ ইচ্ছাতে সবকিছু হয়েছে।

তমা- …………

ফারিদ- তোমার সাথে খারাপ হয়েছে, দোষ ওরা করেছে আর তার মাশুল তুমি দিয়েছ। এখানে আমি তোমার কোন ভুল,দোষ দেখছি না।আমার নিজেরও দুই বোন আছে।সেটা থেকে আমি ভালো করেই বুঝি একটা মেয়ের সাথে এইসব হলে কতটা কষ্ট লাগে। আরেকটা কথা তুমি ভুলে যাচ্ছ তুমি অপবিত্র না।যেদিন আমার ভালোবাসা দিয়ে আমি তোমাকে স্পর্শ করেছি,পবিত্র ভালোবাসায় আমরা সিক্ত হয়েছি সেদিনি তুমি আমার কাছে পবিত্র হয়ে গিয়েছিলে।আমার ভালোবাসার স্পর্শ দিয়ে আমি তোমাকে অপবিত্র অপবাদ থেকে পবিত্র করেছি।আমার কাছে সবসময় তুমি যেমন ছিলে আজো ঠিক তেমনটাই আছ।

আর আমি কাউকে দয়া করছি না।ভালোবাসার মানুষকে দয়া, করুণা কোনটাই করা যায় না।ভালোবাসি বলেই তোমাকে আমার সাথে থাকতে হবে।তোমার মা বাবা আমার উপর ভরসা করে তোমাকে আমার হাতে দিয়ে গিয়েছে আর তুমি…….!তুমি আর বাবু এখন আমার দায়িত্ব।তোমাদের উপর আমার সব দায়িত্ব আমি ঠিকভাবে পালন করতে চাই।যাই হোক এখন চল বাসায় চল।

ওর হাত ধরাতে ও আমার মুখের দিকে দ্বিধানিত্ব দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।কি করা উচিত এই মূহুর্তে ও ভেবে উঠতে পারছে না।

ফারিদ- বাবুর আম্মু তুমি একটাবার আমার উপর বিশ্বাস করে দেখ।শুধু একটাবার।আমাদের লাইফের সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। তোমার একটাই ভয় না যদি কখনো আমি ভুল করে এইসব অতীতের কথা তোমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তোমাকে সেই আঘাতটা আবারো দিয়ে ফেলি।

বিশ্বাস কর এমন কিচ্ছু হবে না।এই মূহুর্তে আমি তোমার অতীত আমার মন থেকে মুছে ফেলছি সাথে তুমিও মুছে ফেল।এগুলো তোমার মন বা আমার মনে আজকে আর এখনের পর থেকে আসতে দিব না।এখন থেকে আমি তুমি আর আমাদের বাবু নিয়ে আমাদের পরিবার হবে।তুমি শুধু আমাদের নিয়ে আমাদের পরিবার নিয়ে ভাববে আমাদের ভালোবাসবে বাকি সব আলতুফালতু কথা বাদ।প্লিজ একটাবার বিশ্বাস করে আমার হাতে হাত রাখ।শুধু একটাবার।
.
.
তমা- আর কোনকিছু না ভেবেই ওর হাতে হাত রেখে দিলাম।

ফারিদ- থ্যাংকস বাবুর আম্মু।তোমার কাছে আমি এই আশাটাই করেছিলাম।

তমাকে সাথে সাথে কোলে তুলে নিলাম।

তমা- এই কি করছেন?এইভাবে পাব্লিক প্লেসে আমাকে কোলে তুলে নিলেন কেন?মানুষ কি ভাববে!

ফারিদ- হায়রে তুমি মানুষের টেনশনে আছ।আর আমি আমার বাবু আর বাবুর আম্মুর টেনশনে আছি।মানুষের কথা ভাবা তুমি বাদ দাও আর আমাকে নিয়ে ভাব।

তমা- ………..

ফারিদ- বাবুর আম্মু একটা কথা বলার ছিল……

তমা- হ্যা বলেন….

ফারিদ- আসলে কালকে তোমার সাথে বাজে ব্যবহারের জন্য আমি সত্যি দুঃখিত।তোমার মনখারাপ চেহেরাটা দেখে খুব কষ্ট হচ্ছিল তাই রাগের মাথায় তোমাকে অনেককিছু বলে ফেলেছি।প্লিজ এই বিষয় নিয়ে তুমি আর মন খারাপ কর না।

তমা- আমি মন খারাপ করেনি।

ফারিদ- সত্যি…..

তমা- হুম সত্যি……

ফারিদ- যাক বাবা বাঁচা গেল।আচ্ছা শোন কালকে ইউটিউব থেকে রান্নার একটা নতুন আইটেম শিখেছি আজকে নিজ হাতে আমি সেই মজার আইটেমটা রান্না করে তোমাকে খাওয়াব।ঘরের সব কাজ আমি আগের মতনই করব তোমাকে কিচ্ছু করতে হবেনা তুমি শুধু নিজের আর আমাদের বাবুর খেয়াল রাখবে।

তমা- হুম

ফারিদ- ইশ দেখ মুখটার কি হাল বানিয়েছে।দুপুরে কিছু খাওনি না?কেন খাওনি?এতক্ষণ ধরে না খেয়ে ছিলে?আগে তোমাকে বাসায় নিয়ে যাই তারপর তোমার খবর আছে।এতক্ষণ ধরে না খেয়ে থেকে নিজেও কষ্ট পেলে আমাদের বাবুটাকেও না খাইয়ে কষ্ট দিলে।

.
.

তমা- বেচারা রেল স্টেশন থেকে আমাকে কোলে নিয়ে হাঁটছে আর বকরবকর করে আমাকে আর আমাদের বাবুকে নিয়ে কথা বলছে আর একটুপর পর বকা দিচ্ছে,শাসন করছে, উপদেশ দিচ্ছে।আমার পাগল স্বামী আর পাগল স্যার।উনাকে নিয়ে বাকিটা জীবন সুন্দর করে পাড়ি দিতে চাই।বিশ্বাস করে উনার হাতে হাত রেখে সংসার জীবনে আবারো নতুন করে পা রাখলাম।দেখি না একবার বিশ্বাস করে।হয়ত সব দুঃখের পর আমার সাথে ভালো কিছু হবে। আমার বাবার ভুলের কারণে আমার মা বাবাকে যে কষ্ট পেতে হয়েছে সে একি ভুল ফারিদ করবে না এই বিশ্বাস রেখে ওর হাত ধরেছি।ফারিদ আমার এই বিশ্বাসটা যাতে সারাজীবন অটুট রাখে আল্লাহর কাছে সে প্রার্থনা করি।

মূলকথা- বিশ্বাসের উপর সবকিছু টিকে থাকে।একবার বিশ্বাস ভেঙ্গে গেলে হাজার চেষ্টা করেও ভালোবাসার মানুষের মন জয় করা যায় না।এক্ষেত্রে সম্পর্কে শুধু ফাটল ধরে।আর পর মানুষের থেকে ঘরের মানুষকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।তৃতীয় কোন ব্যক্তির কারণে যদি সম্পর্কে ফাটল ধরার সম্ভাবনা থাকে তাহলে তৃতীয় ব্যক্তিকে তার আসল জায়গা দেখিয়ে দেয়া উচিত।সে যেমন তার সাথে তেমন ব্যবহার করা উচিত।

বি.দ্র.- গল্পটা তোমাদের কাছে কেমন লাগল তা জানি না।কিন্তু সত্যি বলতে এই গল্পে কিছু বাস্তব দিক তুলে ধরে গল্প লিখতে পারায় আমি নিজের উপর অনেক সন্তুষ্ট। বাস্তবধর্মী গল্পগুলোই লিখতে আমার বেশি ভালো লাগে।তারপরও সিজন ২ তোমাদের কেমন লেগেছে অবশ্যই জানাবে।

তোমাদের কিছু কথা বলতে চাই।আগে আমার গল্প কপি করায় আমাকে কপিবাজ বলায় ভিষণ খারাপ লাগত সেকারণে আমি বারবার গ্রুপে পোস্ট দিতাম আমি আর গল্প লিখব না।আমি গল্প লিখায় একেবারে নতুন তাই এইরকম বিষয় যে প্রায় ঘটবে আর কপিবাজরা এইরকম কাজ প্রায় করে সেটা আমার জানা ছিল না।পরে বুঝতে পারলাম এইরকম কারণে গল্প লিখা ছেড়ে দেওয়াটা ঠিক হবে না।তাই গল্প লিখাটা পরে চালু করলাম। কিন্তু এই গল্পের সিজন ১ এ গল্প লিখার মাঝখানে আমি অনেক বড় একটা প্রবলেমে পড়ি।তাই আমাকে আইডিটা ডিএক্টিভ করতে হয়।আইডি ডিএক্টিভ করার কারণ আমার কাছের কয়েকটা ফ্রেন্ড জানে।কিছু ভাবতে না পেরে আমি আর গল্প লিখছি না এই পোস্ট আরেকজনকে দিয়ে দিয়েছিলাম।আমার এই গল্পের পাঠক অনেক ছিল তাই পরে অনেক কিছু ভেবে অনেক কষ্টে একজনকে ঠিক করলাম আর তার সাথে যোগাযোগ করে তাকে বলছি তিনি যাতে আমার গল্প পোস্ট করেন।কিন্তু আমি ঠিক টাইমে আমি তাকে গল্পের পার্টগুলো দিতে পারিনি।যেটা আমার আরেকটা ব্যর্থতা ছিল।গল্পের পার্টগুলো তাকে না দেওয়ার কারণ হচ্ছে আমার অসুখটা আগের থেকে আরো বেড়ে যায়।।আমার কাশির প্রবলেম ছিল। সেটা গল্প লিখার আগ থেকেই ছিল।হাই পাওয়ারি ঔষুধ খেয়েও অসুখ সারছিল না।পরে কাশির আওয়াজ আর ব্যথাটা আস্তে আস্তে অনেক বাড়তে থাকে। এই কাশিটা উঠলেই গলা বুক প্রচন্ড ব্যথা করত আর একনাগাড়ে কাশতে থাকতাম।খাওয়া দাওয়াও প্রায় অফ হয়ে যাওয়ার মতন অবস্থা।এইরকম কাশি যাদের হয় একমাত্র তারা জানে এইরকম অসুখ হলে কত কষ্ট হয়।পরে ফৌজদারহাট হসপিটালে গিয়ে ডাক্তার দেখালাম।বাসায় পুরা দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে ঔষুধের উপর ছিলাম।খাওয়া দাওয়ার কথাতো বাদ দিলাম।এর সাথে ঠাণ্ডা, জ্বর প্রায় উঠত।এই হল আমার গোপন অসুখের বিবরণ।ইভেন এখনো এই অসুখের কিছু কিছু লক্ষণ আমার এখনো আছে।আমার অসুখ ছিল সেটা সবাইকে বলছি কিন্তু অসুখটা কি ছিল সেটা না বলায় অনেকে বলছেন আমি নাটক করছি।যেটা শুনে সিরিয়াসলি খুব খারাপ লেগেছিল।অসুখটা কি ছিল তা কাউকে না বলায় এইরকম কথা আমাকে শুনতে হয়েছে।কাউকে এইরকম অসুখের কথা বলতে চাই নি তাই কথাটা চেপে গেছি সবসময়।যদি কারোর কাছে মনে হয় আমি অসুস্থতা নিয়ে নাটক করছি তাহলে আমার আর কিছু বলার নাই।সবাইকে আমার সরি বলা উচিত ছিল।যেটা আমি বলি নি।কিছুটা সঙ্কোচ ছিল তাই।আজকে যেহেতু সিজন ২ টা শেষ করে দিলাম তাই সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।আমার ব্যবহারে কেউ কষ্ট পেলে আমি সত্যিই আন্তরিকভাবে দুঃখিত।আর ধন্যবাদ সবাইকে আমার গল্পের সাথে থাকার জন্য।
ধন্যবাদ সবাইকে।

সমাপ্ত

স্যারযখনস্বামীসিজন২ পার্ট_২৫

স্যারযখনস্বামীসিজন২
পার্ট_২৫
#লিখা জান্নাতুল ফেরদৌস

তমা- তাড়াতাড়ি করে বাবার রুমে ঢুকে গেলাম।রুমে গিয়ে দেখি বাবাকে ঘিরে সবাই কান্না করছে।দরজার নিচে হেলান দিয়ে বসে গেলাম।কি হয়ে গেল এটা!

বাবাকে আমার মনের কথা বলতে পারলাম না।আমার মামণির কি হবে?বাবা যে আর আমাদের মাঝে এই খবর জানার পর আমার মামণির কি হবে?এইসব কথা ভাবতেই বুকটা কেঁপে উঠছিল।

.
.

ফারিদ- কয়েকঘন্টার জার্নিতে তমার বাবার বাসায় আসলাম।আর বাসায় আসা মাত্র কান্নাকাটির আওয়াজ শুনলাম।এখানে আসার আগে যে ভয়ের আশঙ্কা করছিলাম সেটাই শেষ পর্যন্ত সত্য হয়ে দাঁড়াল।যে রুম থেকে কান্নার আওয়াজ আসছিল সেখানে দৌড়িয়ে গেলাম।আর দেখালাম তমা দরজার নিচে হেলান দিয়ে বসে আছে আর নিরবে অশ্রু ফেলছে।মেয়েটার কি কষ্ট হচ্ছে তা বুঝতে পারছি। ওকে মনের দিক দিয়ে স্বান্তনা দেওয়ার জন্য ওর কাছে কাছে গেলাম।ওকে অনেক কিছু বুঝাচ্ছি আমি কিন্তু ও আমার কথা না শুনে ওর বাবার মৃত লাশটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।ওর হুশ আনার জন্য ওকে কাঁধ ঝাকিয়ে কয়েকবার নাড়ালাম।এরপর ও আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেল।

.
.
ফারিদ- এখন কেমন লাগছে তোমার?

তমা- বাবা……!

ফারিদ- তমা প্লিজ শান্ত হও। এই অবস্থায় তোমার উত্তেজিত হওয়া চলবে না।প্লিজ লক্ষ্মীটা বুঝার চেষ্টা কর।

তমা- আপনি কথা কেন ঘুরাচ্ছেন?আগে বলুন আমার বাবা কোথায়?

ফারিদ- তোমার বাবাকে মাটি দিয়ে আসছি।

তমা- ……..

ফারিদ- আমি জানি তোমাকে না জানিয়ে কাজটা করা মোটেও উচিত হয় নাই।কিন্তু এতক্ষণ ধরে একটা মৃত লাশকে এইভাবে রাখা সম্ভবও না।তাই তাড়াতাড়ি করে কাজটা শেষ করতে হল।সেই ৭ ঘন্টা ধরে তুমি অজ্ঞান অবস্থায় ছিল।এমনিতেই তোমার এই অবস্থা, তার উপর আবার সারাদিন না খেয়ে অনেক টেনশন আর কষ্টের মধ্যে ছিলে তাই তোমার শরীরটা দুর্বল হয়ে যায়।দেখো তোমার হাতে স্যালাইন। ডাক্তার এসে স্যালাইন লাগিয়ে গেছে।প্লিজ আর কোন কিছু ভেবে নিজেকে কষ্ট দিও না।নাহলে তোমার বাবাও যে সেখানে শান্তি পাবে না।
.
.

তমা- ফারিদের বুকে মাথা রেখে চোখের পানি ফেলা ছাড়া আমার আর কোন উপায় নেই।নিজের মনের কষ্টগুলো ফারিদকে বলতে পারছি না।বাকি সবাই যেমন কষ্ট পেলে নিজের ভিতরের অনুভূতিগুলো খোলা বইয়ের মত মেলে ধরে তার আপন মানুষকে বুঝায় যে তার কত কষ্ট হচ্ছে ঠিক তেমন ভাবে আমি নিজের মনের অনুভূতি, কথাগুলো বলতে পারছি না।মনের কথাগুলো মুখের মধ্যে আটকে আছে।এটাও আরেক কষ্ট আর জ্বালা।এই জীবনে হয়ত আর শান্তি নামক জিনিসটার আমার দেখা মিলবে না।হায়রে জীবন! এই ছোট জীবনে কত কি না দেখে আসলাম।আর এখনও হয়ত অনেক কিছু দেখার বাকি আছে।এখানেই কষ্ট দেখার শেষ হয়ত আমার কপালে নেই।না জানি আরো কত কি দেখে জীবনটা পাড়ি করতে হবে।

.
.
তমা- আপনি মামণিকে বাবার মৃত্যুর কথা জানিয়েছন?

ফারিদ- না এখনো জানায়নি।কিভাবে কথাটা বলব বুঝতে পারছি না।

তমা- ভালোই করেছন কিছু না বলে।আপনাকে কিছু বলতে হবে না।মামণিকে যা বলার আমি বলব।

ফারিদ- হুম।এটাই ঠিক হবে।



বাসায় এসে মামণিকে বাবার মৃত্যুর খবর জানালাম।কিন্ত এ খবর শুনার পর মামণিকে কাঁদতে দেখলাম না।

তমা- মামণি বাবা এই ডাইরিটা তোমাকে পড়তে বলেছে আর এইও বলেছে তুমি যাতে তাকে ক্ষমা করে দাও।

মেঘ- ……..

তমা- মামণি আমি বাবাকে তার ভুলের জন্য ক্ষমা করে দিয়েছি।তুমি কি পার না বাবার ভুলগুলো ক্ষমা করে দিতে?জানি তোমার খুব কষ্ট হবে কিন্তু তারপরও যে এখন এই দুনিয়ায় নেই তাকে ক্ষমা করে দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

মেঘ- তোর বাবাকে আমি সেদিনি মাফ করে দিয়েছি যেদিন জানতে পেরেছি সে অসুস্থ।অসুস্থ শরীর নিয়ে সে আমার কাছে মাফ চেয়েছে তাই তাকে মাফ করে দিয়েছি।তমা জানিস,, তোর বাবা খুব ভালো মানুষ। তার কাছ থেকে আমি যে ভালোবাসা,যে শিক্ষা পেয়েছি তা আমার কাছে অনেক মূল্যবান।আমার জানামতে সে কখনো কোন ভুল কাজ করেনি।কিন্তু সংসার জীবনে চলমান অবস্থায় সে অনেক বড় একটা ভুল করে বসে।সেটা আসলে ভুল বললে ভুল হবে সে আমার সাথে অন্যায় আর অপরাধ করেছে। যার ক্ষমা কখনো হয় না।কিন্তু তার জন্য সে অনেকবছর ধরে কষ্ট পেয়েছে তার প্রায়শ্চিত্তও করেছে।আর এই প্রায়শ্চিত্তের আগুনে পুড়ে সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।মন থেকে বাঁচার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলার কারণে সে অসুস্থতার দুহায় দিয়ে আমার আগেই এই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে।

তমা- ………

মেঘ- ওকে আমি মন থেকেই মাফ করে দিয়েছি।শুধু একটাই আফসোস আর কষ্ট রয়ে গেল ওকে শেষ দেখাটা দেখতে পারিনি।আজ কতটা বছর হয়ে গেল ওর মুখটা দেখি না।এতটাবছর পর এসে সেই প্রিয় মুখটা না দেখার যন্ত্রণাটা না আমি নিতে পারছি না।

তমা- মামণি প্লিজ তুমি কষ্ট পেয় না।জানই তো কেন বাবা তোমাকে দেখতে চাইনি।

মেঘ- হ্যা জানি।কিন্তু মনটা যে বড় অবুঝ।তমা সারাদিন তোর উপর দিয়ে অনেক ধখল গেছে যা রুমে গিয়ে বিশ্রাম নে।আর আমার এখন এই সময়ে একা থাকতে ইচ্ছা করছে কারো সাথে কথা বলতে ভালো লাগছে না।

তমা- মামণিকে এখন একা ছেড়ে দেওয়া উচিত এই কথাটা মনে করে সেখান থেকে আমি চলে আসলাম।
.
.

বাবার মৃত্যুর পর মামণিকে খুশি রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলাম।কিন্তু মামণির মনের দিক দিয়ে কোন শান্তি আর সুখ ছিল না তাই বাবার মৃত্যুর কয়েকদিন পরই মামণি আমাদের ফেলে চলে যায় আরেক দুনিয়ায়।

একটার পর একটা কষ্ট পাওয়ার পর আমি অনেক ডিপ্রেশনে পড়ে যায়। দিন দিন শরীরের অবস্থা আমার খারাপ হতে থাকে।আমাকে নিয়ে ফারিদ অনেক দুশিন্তায় থাকে।ওকে এই দুশ্চিন্তায় আর রাখতে ইচ্ছা করছিল না।কিন্তু এই অবস্থা থেকে আমি বেরিয়েও আসতে পারছিলাম না। সংসার করার ইচ্ছাটাও আস্তে আস্তে দমে যাচ্ছে। ঘরের বউ হিসেবে যে কাজগুলো আমার করার কথা সেগুলো ফারিদ করে যাচ্ছে।
.
.
ফারিদ- এই মেয়ে শরীরের কি অবস্থা করেছ একটাবার দেখেছ?কেন তুমি বারবার ভুলে যাও তোমার এই অবস্থায় টেনশন নেওয়া একদম চলবে না।তুমি এখন একা না তোমার সাথে আমাদের সন্তানও আছে।তুমি নিজে কষ্ট পাচ্ছ আর আমাদের বাবুটাকে কষ্ট দিচ্ছ।প্লিজ নিজেকে সামলাতে শিখ তিলোত্তমা।এই দুনিয়ায় কেউ অমর নয়।

তমা- ……….

ফারিদ- একদিন না একদিন এই দুনিয়া ছেড়ে আমাদের সবাইকে যেতে হবে।আমরা আমাদের প্রিয় মানুষদের যত ভালোবাসি না কেন তাদের আটকে রাখার শক্তি বা ক্ষমতা আমাদের কারোর নেই।আমাদের মর্জিতে কোন কিছুই হয় না।

তমা- ………

ফারিদ- প্রত্যেকটাদিন এইরকম মুখ ভার করা চেহেরা দেখতে আমার মোটেও ভালো লাগে না।ভার্সিটি থেকে এসে তোমার যত্ন নেওয়া,ছোটবাচ্চাদের মতন বুঝিয়ে শুনিয়ে তোমাকে খাওয়ানো, ঘর গুছগাছ রাখা এইসব করা কত কষ্ট লাগে সেটা কি তুমি বুঝ না।এক কথা তোমাকে বুঝাতে আমি ক্লান্ত।আর পারছি না আমি এই অসহ্য প্যারা নিতে।প্রত্যেকটাদিন তোমার এই খামখেয়ালিপনা,একই বিষয় বুঝাতে বুঝাতে আমি সত্যিই অতিষ্ট হয়ে যাচ্ছি। ধুত্তুরি আর ভালো লাগে না।এটা সংসার না ছাই……..।
.
.

ফারিদ- তমা ওর বাবাকে দেখার পর যেদিন ঢাকায় যায় সেদিনি আমি জানতে পারি আমার বউটা প্রেগন্যান্ট। একদিকে বাবা হওয়ার খুশি আর আরেকদিকে তমার বাবার অসুস্থতার কথা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল।আর এইও বুঝে গিয়েছিলাম তমার বাবার দিনটা আজকে শেষ দিন।আমার বউটা এই অবস্থায় নিজেকে কিভাবে সামলাবে তা ভাবতেই মাথায় চিন্তা ভর করছিল। তাই দেরি না করেই ঢাকায় রওনা দিই।এরপর তমার বাবার মৃত্যু, কয়েকদিন পর তমার মার মৃত্যুতে মেয়েটা পুরো ভেঙ্গে পড়ে।ওকে সামলানো খুব কষ্টকর হয়ে দাঁড়ালো আমার জন্য।এত কিছু হওয়ার কারণে ওকে আমাদের বাবু আসার খুশির খবরটা দিতে পারিনি।তাই সময় করে একদিন এই খবরটা ওকে জানাই যে ও মা আর আমি বাবা হতে যাচ্ছি। এই খবরটা শুনে প্রথমদিকে ও খুশিতে আমাকে জড়িয়ে ধরে এরপর হঠাৎ জানি না কি কারণে ওর মনটা নিমিষেই খারাপ হয়ে যায়। এরপর থেকে প্রতিদিন ওকে খুশি রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু প্রতিবারই আমি ব্যর্থ হচ্ছি।দিনদিন ওর শরীরটাও খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ওর সাথে ও আমাদের বাবুটাকেও কষ্ট দিচ্ছে যেটা সহ্য করার মতন না।আর আজকে ভার্সিটি থেকে এসে ঘরের সব কাজ শেষ করে দেখি ও মুখভার করে বসে আছে।ওকে আজকেও এত বুঝানোর পরে যখন দেখি ও মনমরা হয়ে আছে রাগটা তখন মাথায় উঠে যায়। ওর এই কষ্টটা দেখতে পারছিলাম না সাথে আমার বাবুরও তাই রাগে ওকে অনেক কিছু বলে ফেলেছি।যেটা করা সত্যিই অন্যায় হয়ে গেছে।এই অবস্থায় ওকে খুশি রাখা আমার কর্তব্য।কিন্তু সেটা না করে ওকে অনেক কথা শুনিয়ে ফেলেছি।তাই ওর কাছে মাফ চেয়ে নিব।

স্যার যখন স্বামী সিজন২ পার্ট_২৪

স্যার যখন স্বামী সিজন২
পার্ট_২৪
#লিখা জান্নাতুল ফেরদৌস

পুষ্প নামের মানুষিক রোগীটা আমার থেকে আমার মেঘকে বিচ্ছিন্ন করেছে।পুষ্পকে নিয়ে আমার মনের ভিতর যে রাগ ছিল ওর সাথে ঝগড়া করে তা এক এক করে বের করে দিলাম।রাগের মাথায় ওকে অনেক কথা শুনিয়েছি।ও একটা মানুষিক রোগী,ওর মতন মানুষিক রোগী আমার জীবনে এসে আমার সুন্দর গুছানো সংসারটা নষ্ট করে দিয়েছে।ওর কারণে আমি আমার মেঘকে হারিয়েছি।আর এখনো যে আমি মেঘকে ভালবাসি তা ওকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছি।আর এইও বলেছি আমি বাইরে থেকে আসার পর ওকে যাতে আমার বাসায় আর না দেখি।ওর এই বিষভরা মুখটা আমি আর দ্বিতীয়বার দেখতে চাই না।

এইরকম আরো অনেক কথা ওকে শুনিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসলাম।বাইরে আসার পরও রাগটা কিছুটা কমাতে পারিনি।পুষ্প মেঘকে হিংসা করে সেটা আমি আজ বুঝতে পারলাম।আর তাইতো ও আমার আর মেঘের জীবনকে এলোমেলো করে দিয়েছে।আমার সংসার থেকে মেঘ চলে যাওয়ার আগে ও আমার হাতে যে চিঠিটা দিয়েছিল সেটা পুষ্প চুরি করে পড়েছিল।আর সেই চিঠিটা পড়েই সে জানতে পেরেছে যে মেঘ প্রেগন্যান্ট। আর এই খবরটা যাতে আমি জানতে না পারি সেজন্য ও সেই চিঠি টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিল।এত্ত বিষ এই মেয়েটার মধ্যে।আর আমিই কিনা এইরকম একটা শয়তান মেয়ের রুপের মোহে পড়ে ওর সাথে একটা অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলাম।আর তার ফল এখন ওর গর্ভে।এইসব ভাবতে ভাবতে পুরো পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। সেইদিন আর বাসায় যায় নি।রাস্তায় রাস্তায় হেঁটেছি আর মেঘের সাথে কাটানো দিনগুলো ভেবে কষ্টের আগুনে পুড়ছিলাম।

.
.

সকালে বাসায় এসে দেখি পুরো বাড়িতে মানুষ।এত মানুষ এত সাতসকালে এখানে কি করছে বুঝতে পারছিলাম না।কিন্তু এর কিছুক্ষণ পর যা দেখলাম তাতে আমার কাছে বিষয়টা পরিষ্কার হল।

কালকে আমাদের মাঝে ঝগড়া হওয়ার পর যখন আমি রাগ করে বাসা থেকে বাইরে চলে আসি ঠিক তার কিছুক্ষণ পর পুষ্প ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করে।ওর এই আত্মহত্যা করার পিছনে শুধুমাত্র আমিই দায়ি ছিলাম।পুষ্পকে যে এত কথা শুনিয়েছিলাম তাতে ও বুঝে গিয়েছিল ওর জন্য আমার মনে কোন ভালোবাসা নেই।আর তা ও মেনে নিতে না পারায় এত বড় পাপ কাজটা করে ফেলেছিল।

আমি আবারো সেই একি ভুল করলাম।যে বাচ্চার জন্য আমি পুষ্পকে আমার জীবনে এনে মেঘকে সরিয়ে দিয়েছিলাম সেই বাচ্চাটাই দুনিয়ায় আসার আগে দুনিয়া ছেড়ে বিদায় নিল।আমি আবারো সব হারালাম।পুরো নিঃস্ব হয়ে গেলাম।মনের ডিপ্রেশনটা আগের থেকে আরো অনেকগুণ বেড়ে গেল।
.
.

এর কিছুদিন পর মেঘকে খুঁজার অনেক চেষ্টা করি।কিন্তু ওর কোন খোঁজ পাইনি।তারপরও ওকে খোঁজার আপ্রাণ চেষ্টা আমি দিনের পর দিন চালাতে লাগলাম।আর শেষ পর্যন্ত আমার লোকের দ্বারা ওর খোঁজ পেয়েও গেলাম। কয়েকটা বছর পর ওকে খোঁজে পাওয়ার খুশিতে আর আমার মেয়েটাকে দেখার জন্য চট্টগ্রামে রওনা দিলাম।আমার মেয়েটার বয়স তখন মাত্র ছয় বছরে পড়েছে।কিন্তু মেঘ আর আমার মেয়েটার কাছে যাওয়ার সাহসটুকুও আমি পেলাম না।কিভাবে আমি ওদের চোখের নজরে গিয়ে দাঁড়াব সেই দুশ্চিন্তা থেকে ওদের কাছে যেতে গিয়েও আর যেতে পারলাম না।ওদের কাছে যেতে না পারলেও আমি সবসময় ওদের খোঁজ রাখতাম।ভুল যেহেতু করেছি ভুলের মাশুলও আমাকে দিতে হবে।আর এতটা বছর ধরে আমি সেই ভুলের মাশুল দিয়ে আসছি।

.
.

বিয়ের আগে আর পরে মেঘের জন্য আমার অনুভূত ভালোবাসা,আমাদের ভালোবাসার কাহিনী এই ডাইরিতে লিখে তার স্মৃতিটুকু আমি টাটকা রেখেছি।এরপর জীবন সংসারের প্রতিকূলতায় পা রাখার পর অনুতপ্তের আগুনে পুড়ে আমার আর ডাইরি লিখার সময় হয়ে উঠে নি।কি লিখতাম ডাইরিতে!আমি মেঘের সাথে যে বাজে কাজগুলো করেছি সেগুলো লিখতাম!সেগুলো লিখার সাহসটা আমার মন থেকে আসেনি।

কেন জানি না বুঝতে পেরেছিলাম মেঘকে আর কখনো সামনে থেকে দেখতে পাব না, ওর কাছে আমি আমার ভুল করা কাজের জন্য ক্ষমাও চেতে পারব না।কিন্তু মনে মনে এই বিশ্বাস ছিল তোকে একদিন না একদিন আমি সামনে থেকে দেখতে পারব আর তোর সাথে আমি যে ভুল কাজগুলো করেছি তার জন্য ক্ষমাও চেয়ে নিতে পারব। আর তার জন্য আমাদের ব্যাপারে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা তোর জানা দরকার।তাই এই ডাইরিতে আবারো কলমের কালি দিয়ে লিখা শুরু করলাম।কিন্তু এইবারে ডাইরিতে আমাদের ভালোবাসার কাহিনী না বরং আমাদের জীবনের দুঃখ আর কষ্টের কাহিনী লিখলাম।আর এখন আমার জীবনে সব কাহিনী শুনে তুই এটা বুঝতে পেরেছিস সব দোষ আমারি ছিল। আমারি কারণে আজ এতকিছু ঘটেছে।আমি নিজের সব ভুল, দোষ স্বীকার করছি।আর এই ভুল স্বীকার করে আমি তোর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।পারলে এই বুড়ো বাপটাকে মাফ করে দিস।সাথে তোর মাকেও বলিস যাতে সে আমাকে ক্ষমা করে দেয়।

.
.

তমা- ডাইরিটা অফ করে নিজের এক হাতের আঙ্গুলের নখ দিয়ে আরেক হাতকে খামচি দিচ্ছি।খুব কষ্ট হচ্ছিল।বন্ধ রুমে চুপচাপ কান্না করছি।এই লোকটাকে আমি সবসময় খারাপ ভেবে এসেছি।কিন্তু এখন জানলাম আর বুঝলাম উনি মোটেও খারাপ নয়, অনেক ভালো মানুষ।কিন্তু উনার….. আমার বাবার এই একটা ভুল আমাদেরকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে আসছে।এই ভুলটা না হলে হয়ত আজ এই পরিস্থিতিতে আমাদের কাউকে পড়তে হত না।বাবাকে মাফ করে দেওয়াটা এত সহজ না কিন্তু মাফ না করেও থাকতে পারছি না।বাবার এই অসুস্থতা দেখে উনাকে আর মাফ না করে পারলাম না।উনার সব অপরাধ মাফ করে দিলাম।
.
.
অনেকক্ষণ ধরেই কান্না করে চলেছি।কান্না থামার কোন নামই নেই।তারপরও অনেক কষ্টে নিজের কান্নাগুলোকে লুকিয়ে বাবার কাছে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম।একটাবার বাবাকে দেখে আসি।এই রুমে আসছি অনেকক্ষণ হয়।এতক্ষণে একবারের জন্য বাবাকে দেখা হয়ে উঠে নাই।বাবার কাছে গিয়ে বাবাকে বলব উনি যাতে আর চিন্তা না করে।বাবাকে আমি মন থেকে মাফ করে দিয়েছি এই কথাটা শুনলে বাবা মনে স্বস্থি ফিরে পাবে।যাই তাড়াতাড়ি বাবার কাছে গিয়ে কথাটা তাকে জানিয়ে আসি।

.
.

দরজা খুলে বাইরে আসলাম।হঠাৎ করে বাবার রুম থেকে অনেক জোরে চিল্লানোর আওয়াজ আসলো। কি এমন হল যে হঠাৎ করে এত জোরে চিল্লানোর আওয়াজ শুনলাম।চিল্লানোর সাথেসাথে কান্নার আওয়াজও শুনা যাচ্ছে।এইরকম কান্নার আওয়াজ শুনে মনে মনে এই দুয়া করতে লাগলাম সব যাতে ঠিক থাকে।আবার যাতে কোন খারাপ খবর আমাকে শুনতে না হয়।

স্যার যখন স্বামী সিজন২ পার্ট_২৩

স্যার যখন স্বামী সিজন২
পার্ট_২৩
#লিখা জান্নাতুল ফেরদৌস

এরপরের দিন আমি আমার এই জঘন্যতম কাজের জন্য ওর কাছে গিয়ে একটাবারও সরি বলে নি।আসলে ওর কাছে কোন ভুল করলে আমি কখনোই ওকে সরি বলতাম না।আর সেদিনের এত বড় ভুলের পরও যদিউ সরি বলাটা আমার উচিত ছিল কিন্তু আমি তা পারিনি।

পরেরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি মেঘের কাছে সরি বলে মাফ না চেয়ে পুষ্পের কাছে চলে যাই। কারণ আমি নিজেও বুঝতে পারছিলাম না এখন আমার কি করা উচিত।

পুষ্প- আচ্ছা তন্ময় আমি দেখতে কি বেশি খারাপ?

তন্ময়- না।

পুষ্প- আচ্ছা তুমি মেঘকে কেন বিয়ে করেছ বলতে পার?ওর গায়ের রঙয়ের সাথে আমার গায়ের রংয়ের তুলনা করলে দেখা যাবে আমিই ওর থেকে বেশি সুন্দর।শ্যামলা বর্ণের মেয়েকে পেলে শেষ পর্যন্ত বিয়ে করার জন্য।ইশ ওর আগে যদি তোমার সাথে আমার দেখা হত তাহলে ওর জায়গায় হয়ত আমিই তোমার বউ হতাম। তাছাড়া তোমাদের বিয়ের এতবছর হয়ে গেছে মেঘ এখনো কোন বাচ্চা তোমাকে দিতে পারেনি আর ভবিষ্যতে পারবেও না মনে হয়।বাচ্চা হলে অনেক আগেই হয়ে যেত।এর চেয়ে বরং আমাকে বিয়ে করে নিতে।সুন্দরী বউ সাথে বাচ্চা তুমি পেয়ে যেতে ।

.
.

পুষ্পের এই কথাগুলো কোন নতুন কথা নয়।সবসময় ঘুরিয়ে পেচিয়ে এই কথাগুলো বলে ও আমাকে বুঝাতে চাইত যে আমাকে ভালোবাসে।মেঘের চাইতে ও আমার জন্য বেশি উপযুক্ত।প্রথমদিকে ওর কথাগুলো সহ্য হত না কিন্তু অনেক কষ্টে সেগুলো সহ্য করে নিতাম।একদিন এই কথাগুলো শুনে অনেক রেগে ওকে অনেক কিছু বলি যার ফলে ও সুইসাইড করার চেষ্টা করে।তাই এরপর থেকে ভয়েও ওর সাথে আর রাগ করে কথা বলিনি।ওর প্রতি দুর্বলতাকে এড়ানোর জন্য ওর সাথে আমি চলাফেরা বন্ধ করে দিলেই ও আবার আগের মতন পাগলামি শুরু করে দেয়।এদিকে ওর মা বাবাও ওদের একমাত্র মেয়ে পুষ্পের পাগলামি দেখে আমার কাছে এসে কান্নাকাটি করে।কিন্তু ওদের মেয়ের কারণে পুষ্পের প্রতি আমার দুর্বলতা বাড়ার সাথেসাথে আমার সংসারটা ভাঙ্গুক তা আমি চাইনি।আবার পুষ্পের মা বাবাকেও না করতে পারছিলাম না তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই ওর সাথে আমাকে থাকতে হত ওকে সময় দিতে হত।

.
.

মেঘকে নিয়ে পুষ্পের প্রতিদিনের এই কথাগুলো শুনার পর এই বিষয় নিয়ে আমি অনেক টেনশনে পড়ে যাই। সত্যিইই কি মেঘ কোনদিন মা হতে পারবে না। তাহলে আমার বাবা হওয়ার ইচ্ছাটাও সারাজীবন অপূর্ণ থাকবে।পুষ্পের সাথে এতদিন চলাফেরা করাতে এতদিনে ও আমার মাথার ব্রেইন ভালোই ভাবে ওয়াশ করে ফেলেছে।আমি তন্ময় যে কিনা সবসময় কারো থেকে উপদেশ না নিয়ে বরং অন্যকে উপদেশ দিতাম আজ সে কিনাই অন্য কারোর উপদেশ মন দিয়ে শুনত।কারণ একটা বাচ্চার জন্য মেঘের সাথে সাথে আমিও অনেক ডিপ্রেশনে পড়ে যাই। আর ডিপ্রেশনের রোগীরা যাদের সাথে বেশি মিশে তাদের কথা অনুয়ায়ী চলে।কারণ তাদের কথা ডিপ্রেশন রোগীদের মগজে ভালোভাবে ঢুকে যায় যে এই কাজটা করলে তার জন্য ভালো হবে।
.
.

পুষ্পের সৌন্দর্য,ওর সাথে চলাফেরা করার কারণে আমার দুর্বলতা,আমার প্রতি ওর নির্ভরশীলতা আর ওর প্রতিদিনের একি রকম কথায় জানি না আমার কি হয়ে গিয়েছিল।আমি পাল্টে যেতে থাকি।আর এর ফলেই হঠাৎ করে পুষ্পের সাথে আমার অবৈধ সম্পর্ক গড়ে উঠে।এর কয়েকমাস পর পুষ্পের মা বাবা বাস এক্সিডেন্টে মারা যায়।এই দুঃসংবাদের কিছুদিন পরেই আমি পুষ্পের কাছ থেকে ভালো খবর পাই।আমি জানতে পারি পুষ্প প্রেগন্যান্ট।এই অবস্থায় ওকে একা ফেলে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। একদিকে ও আমার বাচ্চার মা হতে যাচ্ছে সেই আনন্দের কথা আরেকদিকে আমাদের এই অবৈধ সম্পর্কের কথা মেঘকে কিভাবে বলব তা ভাবতে পারছিলাম না।পরে দিয়ে পুষ্পের জোরাজুরিতে মেঘকে সবকিছু বলতে আমি বাধ্য হই।আর এইও বলে দিই ও যাতে আমার আর পুষ্পের জীবন থেকে একেবারে চলে যায়।সেদিন শুধু নিজের সুখের কথা ভেবে আমি এই নির্দয় কথাগুলো মেঘকে কিভাবে বলেছিলাম আমি নিজেও জানি না।সেদিন মেঘের মনের ভিতর দিয়ে কি ঝড় যাচ্ছিল তা বুঝার বিন্দুমাত্র চেষ্টাও আমি করেনি। খুব স্বার্থপর হয়ে গিয়েছিলাম সেদিন।আমার এই কথা শুনার পর মেঘ শুধু শেষ একটাই কথা বলেছিল তন্ময় তুমি এখন কাকে ভালোবাস?সেদিনের উত্তরে আমি এটাই বলেছিলাম আমি আমার বাচ্চার মা পুষ্পকে ভালোবাসি।এই কথা শুনার পর ও নিজের রুমে চলে যায়।

.
.

এরকিছুক্ষণ পর ও আমার কাছে এসে বলে, পারলে সময় করে এই চিঠিটা পরে নিও।জানি না তুমি বর্তমান সুখের মোহে পড়ার কারণে আমার এই চিঠি পড়ার সময় তোমার হয়ে উঠবে কিনা কিন্তু তাও যদি কখনো সময় হয়ে উঠে পড়ে নিও। ভেবেছিলাম আজকে তোমাকে আমি অনেক বড় একটা সারপ্রাইজ দিব।কিন্তু আমি সারপ্রাইজ দেওয়ার আগেই তুমিই আমাকে জীবনের সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজ দিলে।সেদিনের সেই ঝগড়ার পর ভেবেছিলাম তোমার সাথে আর থাকব না।কিন্তু মেয়েরা বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়িতে একবার পা রাখলে সেই বাড়ি তার জন্য আসল ঠিকানা হয়ে দাঁড়ায়।অন্য কোথাও মেয়েদের যাওয়ার জায়গা থাকেনা।বলতে গেলে তাদের আশ্রিতের মতন জীবন কাটাতে হয়।তাই তোমার দেওয়া সব অপমান সহ্য করেও আমি এখানে পড়ে ছিলাম।কিন্তু আজ যখন শুনতে পারলাম তুমি আমার ভালোবাসাকে তুচ্ছ করে অন্য আরেকটা মেয়েকে আমার জায়গা দিয়ে দিয়েছ আর সেই মেয়েই তোমার বাচ্চার মা হতে চলেছে তখন তোমার সাথে একবাড়িতে থাকার কোন প্রশ্নই উঠে না।আমাকে যেতে না বললেও আমি নিজ থেকেই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতাম। কারণ আজকের পর থেকে আমি জেনে গেছি আমার জন্য তোমার হৃদয়ে কিছুই নেই।এই মেয়ের মোহে পড়ে তুমি আমার ভালোবাসাকে আজকে যে পরিমাণ অপমান করেছে তার ফল তুমি পাবেই তন্ময় ।আর পুষ্প….. তোমার নজর অনেক আগে থেকেই খারাপ ছিল সেটা আমি পরে বুঝতে পেরেছি।আমার দামি জিনিসটার উপর তুমি বদনজর দিয়েছিলে।আমার প্রতি তন্ময়ের ভালোবাসা,কেয়ারিং আর আমাদের ভালোবাসার গল্প শুনে মনে মনে তুমি ঠিক করে নিয়েছিলে তন্ময় যদি তোমার হয়ে যায় তাহলে তুমিও ঠিক একিরকম ভালোবাসা আমার স্বামীর কাছ থেকে পাবে তাইতো জেনেশুনে সারাদিন নির্লজ্জের মতন আমার বাসায় এসে আমার স্বামীর সাথে বেশি সময় কাটাতে।আমার স্বামীর আজকের এই অবনতি হওয়ার পিছনে শুধু ওর একার হাত নেই তোমারও অনেক বড় হাত ছিল।কারণ এক হাতে কখনো তালি বাজে না সেটা তুমি ভালো করেই জানো।

.
.

তুমি তোমার রুপ,কথার ছলচাতুরী, আর আমার নামে অনেক নেগেটিভ কথা ওর মনে ঢুকিয়ে তুমি তন্ময়কে নিজের বশীভূত করেছ।তুমি একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ের সংসার ভাঙ্গার জন্য এমনভাবে উঠে পড়ে লেগেছিলে যে তন্ময়কে আমি এত বুঝানোর পরেও আমার ভালো কথা আমার স্বামীর মগজে ঢুকত না কিন্তু তোমার কুবুদ্ধিগুলো ওর মন আর মগজে বেশ ভালো করেই তা ঢুকেছে।তুমি শুধু আমার ভালোবাসাকে কেড়ে নাও নি তুমি আমার সাজানো সংসারটাও কেড়ে নিয়েছ।তোমরা দুইজনেই আমার কষ্টের অপরাধী। শাস্তিতো তোমরা পাবেই সেটা আজ কিংবা কাল।আমিও দেখতে চাই এই মোহ,সৌন্দর্য আর অবৈধ সম্পর্কের বাচ্চাটাকে নিয়ে তোমরা কতদিন সুখে থাকতে পার।

.
.

আমার সংসার থেকে মেঘ চলে যাওয়ার পর আমি বুঝলাম ও আমার কি ছিল।আমার সবসময়ের সব প্রয়োজনে ওকে আমি কাছে পেয়েছি, আমি কিছু বলার আগেই ও আমার সব প্রয়োজনের অভাব মিটিয়েছে। ওর এই অধিক ভালোবাসাটা আমাকে কখনো কোন কিছুর অভাব বুঝতে দেয়নি।কিন্তু ও যাওয়ার পর সেটা আমি পাইপাই করে বুঝতে পারলাম যে ও আমার কি ছিল।আমার থেকে দূরে চলে যাওয়ার পর থেকে ওকে খুব মনে পড়ত।ওর রেখে যাওয়া চিঠিটার কথা মনে পড়ল।পুরো বাড়ির সব জিনিস ঘেটেও আমি সেই চিঠি পাইনি।পরে ময়লার ঝুড়িতে গিয়ে দেখি সেখানে কিছু কাগজের টুকরা পড়ে আছে।এক এক করে সব কাগজের টুকরা একত্র করে দেখি এটা মেঘের সেই চিঠি। আমার রুম থেকে চিঠিটা এখানে কিভাবে এল তা বুঝতে পারলাম না।কাগজের টুকরাগুলো অনেক কষ্টে এক এক করে জোড়া লাগিয়ে চিঠিটা পড়লাম।

.
.

চিঠিটা পড়ে জানতে পারলাম মেঘ সাড়ে তিন মাসের প্রেগন্যান্ট ছিল।নিজের হাত দিয়ে আমি এই পর্যন্ত কি কি করে ফেললাম সেটা ভাবতেই পুরো পাগল পাগল লাগছিল।একটা বাচ্চার ডিপ্রেশনে ওর থেকে আমার দূরত্ব বাড়লেও ওর প্রতি আমার ভালোবাসাটা কখনো কমেনি সেটা ও এখান থেকে যাওয়ার পর বুঝতে পেরেছিলাম।আসলে ওই সময় আমার শক্ত হাতে সবকিছু সামাল দেওয়ার দরকার ছিল।সব কিছু লিমিটের ভিতরে রাখা দরকার ছিল।পুষ্পের কারণে আমার সংসারটা যে ভাঙ্গবে সেটা মাথায় রেখে ওর অসুস্থতার চিন্তাটা বাদ দিয়ে আমাদের সংসারের ভালোটা সবার আগে আমার বুঝা উচিত ছিল ।যার কোনটাই আমি করতে পারিনি।পুষ্পকে অধিক প্রশয় দেয়াতে ও আমার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সঠিক সময়ে সঠিক কোঁপটা মেরে আমাকে ওর ফাঁদে ফেলল।আর আমিও ওর রুপের মোহে পড়ে, একটা বাচ্চার জন্য ওর সব কথা মেনে চলার কারণে আজ এই অবস্থায় আমাকে আর মেঘকে এসে দাঁড়াতে হল।

.
.

মেঘের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য কি না কি করেছিলাম আমি। ৫টা বছর অপেক্ষার পর ওকে আমি পেয়েছিলাম এরপর ওকে বিয়ে করে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ওকে আপন করে নিয়েছি। আর সেই আমি সংসারের কয়েকটা বছরে বাচ্চা না হওয়ার কারণে এতটাই অধৈর্য হয়ে পড়েছিলাম কোনটা ভুল কোনটা সঠিক তা বুঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি।এর সব কিছুর মূলে পুষ্প ছিল।ওর মতন মানুষিক রোগীর খারাপ সঙ্গে পড়ে আমি কোথা থেকে কি করে ফেললাম তা বুঝে উঠতে পারিনি।আমার প্রতিটা কাজই বলে দিচ্ছে পুষ্পের সাথে থেকে থেকে আমি নিজেও মানুষিক রোগী হয়ে পড়েছি।এরপর ওর প্রতি আমার প্রচন্ড রাগ হল।ওকে ঘুম থেকে উঠিয়ে ওর সাথে ঝগড়া শুরু করে দিই।

স্যার যখন স্বামী সিজন২ পার্ট_২২

স্যার যখন স্বামী সিজন২
পার্ট_২২
#লিখা জান্নাতুল ফেরদৌস

জুয়েল- তমা!

তমা- আপনি আমাকে চিনেন?

জুয়েল- হ্যা, তোমাকে না চিনি কিভাবে?স্যারের মেয়ে তুমি

তমা- উনি কোথায়?আমাকে উনার কাছে নিয়ে চলুল।

জুয়েল- উনি কে?তন্ময় স্যার!

তমা- হ্যা

জুয়েল- দীর্ঘশ্বাস ফেলে,,আসো আমার সাথে।

রুমে গিয়ে দেখি একজন লোক বিছানায় শুয়ে আছে।শরীরটা পুরো কঙ্কাল হয়ে গেছে।মুখে ক্লান্তির ছাপ।বুঝতে পারলাম উনিই আমার বাবা।দেওয়ালে টাঙ্গানো বাবার অনেক আগের ছবিটার সাথে বর্তমান অসুস্থ চেহেরার কোন মিল নেই। নিজের বাবাকে এই অবস্থায় এতদিন পর দেখে কান্না করে দিলাম।

জুয়েল- স্যার আপনার মেয়ে তমা আসছে

তন্ময় চোখ খুলে দেখে সত্যি সত্যি ওর মেয়ে ওর কাছে এসেছে।মেয়েকে দেখে খুশিতে মনটা ভরে উঠল।হাতের ইশারা দিয়ে মেয়েকে ওর কাছে এসে বসতে বলল

তন্ময়- কেমন আছিস মা

তমা- কাঁপা গলায়,, ভালো।

তন্ময়- শুনলাম তোর নাকি বিয়ে হয়ে গেছে?

তমা- হ্যা

তন্ময় – নতুন সংসার জীবনে ভালো থাক সেই দুয়া করি।

তমা- …….

তন্ময়- আজকে তোকে সামনে থেকে দেখতে পেরে খুব শান্তি লাগছে।জানিস তোর মাকেও এখন খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।কিন্তু ওর চোখের সাথে চোখ মিলানোর সাহসটুকুও আমার নেই।তাই শুধু তোকে আসতে বলেছি।

মারে আমার ভুলের জন্য আমাকে মাফ করে দিস।আর তোর মাকেও বলিস আমাকে যাতে মাফ করে দেয়।নাহলে মরেও যে আমি শান্তি পাব না।অনেক কষ্টে জড় গলায় তন্ময় কথাগুলো বলল।

তমা- কি বলব বুঝতে পারছিলাম না।আজকে বাবাকে এই অবস্থায় দেখে শুধু মায়া হচ্ছে।

তন্ময়- জুয়েল তমাকে আমার সেই ডাইরিটা এখন দাও।

তমা- বাবার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম।কিসের ডাইরি!

তন্ময়- তোকে যে কথাগুলো বলতে চাই তা আমি ডাইরিতে লিখে রেখেছি। তোর সব কিছু জানার অধিকার আছে।তাই আজকে তোকে ডাইরিটা পড়ার জন্য দিয়ে দিলাম।এটা পড়ার পর যদি মনে হয় তুই আমাকে ক্ষমা করতে পারবি তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিস।

.
.
ফারিদ- তমাকে বাসায় না পেয়ে তমার মায়ের বাসায় আসলাম।আন্টিকে এতবার ডাকার পরও যখন উনি সাড়া দিচ্ছেলেন না তখন খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম।তমার রুমে ঢুকার সময় দেখি ফ্লোরে একটা কাগজ পড়ে আছে।কাগজটা উঠিয়ে দেখি কিছু লিখা আছে সেখানে।পড়তে গিয়েই মাথায় বাজ পড়ল।
তার মানে তমা ওর বাবার কাছে গেছে। ও এখান থেকে জার্নি করে ঢাকায় গেছে!তাও আবার এই অবস্থায়!আমি জানি এরপরে কি হবে।আর সেটা বুঝতেই পেরে আমার বউটার জন্য টেনশন হচ্ছে।ওর এই অবস্থায় এতবড় ধাক্কাটা ও সামলাবে কি করে!যে করেই হোক আমাকে সেখানে ঠিক সময়ে পৌঁছতে হবে।এই সময় ওর এখন আমাকে খুব প্রয়োজন।

তমার বাবার এড্রেস এখনি নিতে হবে।আন্টিকে এখন দরকার।হয়ত উনার কাছেই এড্রেসটা পাওয়া যাবে। আন্টির রুমে গিয়ে দেখি উনি জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছেন।

ফারিদ- আন্টি,, আমার এখনি আংকেলের এড্রেসটা প্রয়োজন।আমার বউকে এই অবস্থায় আমি এখন একা ছাড়তে পারবনা।

মেঘ – প্রথমে ফারিদের কথাগুলো মাথায় না ঢুকলেও পরে দিয়ে ঢুকল।ফারিদের কথা কিছু বুঝলাম আর বাকিটা বুঝার মতন অবস্থায় এখন নেই তাই ওর কথায় কোন আগ্রহ দেখালাম না।
পরে ড্র‍য়ার থেকে একটা কার্ড বের করে ফারিদকে দিল।

ফারিদ- থ্যাংকস আন্টি।আমি এখনি আমার বউয়ের কাছে যাচ্ছি। আন্টি প্লিজ নিজের খেয়াল রাখবেন।আল্লাহ সহায় আছেন।

এরপর তাড়াতাড়ি করে মাকে কল দিয়ে তমার মায়ের বাসায় আসতে বললাম।উনাকেও এখন একা ছাড়া যাবে না।উনাকে সার্পোট দেওয়ার জন্য এখন কাউকে খুব প্রয়োজন।

.
.

বাবার লোক জুয়েল আমাকে একটা রুমে নিয়ে গেল।সেখানের টেবিলে ডাইরিটা ছিল।ডাইরিটার পৃষ্ঠা তুলে পড়া শুরু করলাম।

বাবা আর মায়ের প্রেমের কাহিনী পড়ে বুঝতে পারলাম তাদের মধ্যে অনেক ভালোবাসা ছিল।তাহলে কিভাবে এই ভালোবাসায় দূরত্ব বাড়ল।তা জানার জন্য ডাইরিটা পড়তে লাগলাম।
বিয়ের ৩ বছরেও আমাদের ভালোবাসায় কোন ফাটল ধরেনি।ঠিক আগের মতই ভালোবাসাটা ছিল।কিন্তু এর পরে আমাদের অনেক চেষ্টার পরেও যখন বাচ্চা হচ্ছিল না তখন আমি আর মেঘ দুইজনে ডিপ্রেশনে পড়ে যাই। অনেক কষ্টে মেঘকে এই ডিপ্রেশন থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা করলেও নিজের ডিপ্রেশনটা কিছুতেই দূর করতে পারছিলাম।একটা বাচ্চার জন্য মনে মনে খুব মরিয়া হয়ে উঠছিলাম।আর তার কারণেই হয়ত আমাদের আগের ভালোবাসাটা আগের থেকে অনেকখানি কমে যায়।এরসাথে ভালোবাসাটা কমার ক্ষেত্রে আরেকটা কারণ ছিল পুষ্পের প্রতি আমার দুর্বলতা।আমাদের ফ্ল্যাট এ নতুন ভাড়াটিয়া হিসেবে পুষ্পরা আসে।প্রথম প্রথম ওদের বাসা থেকে পুষ্পের চিৎকারের শব্দ আসত।প্রথম দিকে ব্যাপারটা না বুঝতে পারলেও পরে ওর বাবা মায়ের সাথে কথা বলে ব্যাপারটা বুঝতে পারি।পুষ্প একজন মানুষিক রোগী।জীবনের প্রথম প্রেমিকের ভালোবাসার কাছে ধোকা খাওয়ার পর ও অনেকটা মানুষিক রোগীর মতন আচরণ করতে থাকে।পুষ্পের এই চিৎকার, জিনিসপত্র ভাঙ্গচোরের আওয়াজ, ফ্ল্যাটের মানুষদের সাথে খারাপ আচরণ দেখে ওকে অনেকেই অনেক কটু কথা শুনাত।যেটা আমার খুব খারাপ লাগত।তাই এই ছোট মেয়েটাকে সাহায্য করার জন্য আমি নিজেই এগিয়ে আসি।প্রথমদিকে ও নিজেও আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করত এরপর ও আস্তে আস্তে অনেকটা উন্নতির পথে আসে।ধীরেধীরে আমাদের বাসায় পুষ্পের যাতায়াত চলতে থাকে।ও প্রায়ই মেঘের কাছ থেকে আমার আর মেঘের ভালোবাসার কাহিনী জানতে চাইত।স্বামী- স্ত্রীর ভালোবাসার প্রাইভেসির মধ্যে যতটুকু কথা বলা যায় ততটুকু গল্প মেঘ ওকে শুনাত।হয়ত এইসব শুনার পর পুষ্পের আমার প্রতি দুর্বলতা বাড়তে থাকে।এরপর প্রায়ি যে টাইমে আমি বাসায় থাকতাম ও সেই টাইমে আমার বাসায় এসে উপস্থিত হয়।মেঘের উপস্থিতেই ও মেঘকে ইগনোর করে আমার সাথে গল্প জুড়িয়ে দিত।প্রথম প্রথম তা লিমিটের মধ্যে থাকলেও এরপর তা লিমিট ক্রস করে।বিরক্ত হলেও কিছু বলতে পারতাম না।কারণ এই রকম টাইপের রোগীর কাছে অনেক হিসাবনিকাশ করে কথা বলতে হয়।ফলে নিজের স্ত্রীকেও তেমন সময় দিতে পারতাম না।এতে যে মেঘ মন খারাপ করত তা বুঝতে পারতাম তাই পুষ্পের অবস্থার ব্যাপারে মেঘকে বুঝাতাম।এ ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না।

.
.

ধীরে ধীরে ওর সাথে অধিক সময় কাটানোর ফলে আমি নিজেও ওর প্রতি অনেক দুর্বল হয়ে পড়ি।নিজের পরিবার, স্ত্রীকে গুরুত্ব না দিয়ে বাইরের একটা মেয়েকে বেশি গুরুত্ব দিলে, তার সাথে বেশি সময় কাটালে ওর প্রতি দুর্বল হয়ে যাব এটাই স্বাভাবিক।যেটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল কাজ ছিল।পুষ্পকে নিয়ে মেঘের সন্দেহ দিনদিন বাড়তে থাকে।একদিন এই বিষয় নিয়ে মেঘ অনেক রাতে আমার সাথে ঝগড়া করে।আমি পুষ্পের প্রতি দুর্বল ছিলাম সেটা আমি নিজে জানতাম, কিন্তু মেঘকে সেটা বুঝতে দিতাম না এইটা আমার কাছে অনেক বড় একটা অপরাধের মতন মনে হত।সেই অপরাধবোধটা কেমন করে জানি আমাকে হিংস্র বানিয়ে দিল।মেঘ আমাকে আর পুষ্পকে নিয়ে অনেক খারাপ কিছু বলছিল যেটা শুনে আমি অনেক রেগে যাই যদিউ ওর রাগটা স্বাভাবিক ছিল কিন্তু এরপর ও আমাকে ক্যারেক্টারলেস বলাতে আমার মনের সেই অপরাধবোধটা থেকে হঠাৎ করে তখন অনেক রাগ জন্মায়।নিজের অপরাধ ঢাকতে আর ও আমাকে ক্যারেকটারলেস বলাতে আমি একটা পশু হয়ে যাই।আর তাই সেদিন মেঘকে জানোয়ারের মতন মারতে থাকি।