#অর্ধাঙ্গিনী
#নুসাইবা_ইভানা
#পর্ব -৩৯
নয়না ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেয়াল ঘেঁষে। জিয়ান একটা সিগারেট ধরিয়েছে। সিগারেটের স্মেলে নয়না কাশি শুরু করে দিলো।
জিয়ান নয়নার দিকে ফিরে নিকোটিনের ধোঁয়া ছেড়ে বলে,”বেবি কি সমস্যা তোমার?”
“নয়নার কাশির মাত্রা বেড়ে গেলো। জিয়ান নিজের হাতে থাকা সিগারেট ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলে, সুনয়না অনেক হয়েছে রাগ অভিমান এখন দশ মিনিট মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনবে তুমি।”
‘নয়না চুপ করে রইলো। জিয়ান নয়নার হাত ধরে নিজের কোলে বসলো৷ নয়না উঠে যেতে চাইলে বলে,”একদম নড়বে না। চুপচাপ লক্ষী মেয়ের মত বসে আমার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোন।”
“আপনার কোন কথা আমি শুনবো না৷ যে পুরুষের একাধিক নারীর সাথে সম্পর্ক থাকে সে কখনো ভালো পুরুষ হতে পারে না। আপনি বলবেন আমি ছোট তাই কম বুঝি? সতেরো বছর হতে আর দু’মাস বাকি। কোনটা ভালো কোনটা খারাপ সে জ্ঞান আমার আছে। আমার বয়সী অনেক মেয়ে যারা সংসার করছে স্বামী সন্তান নিয়ে৷ ভালো খারাপ বোঝার বোধবুদ্ধি আমার আছে।”
জিয়ান নয়নাকে বেডে বসিয়ে নিজে নয়নার সামনে এসে ফ্লোরে বসে নয়নার হাতে হাত রেখে বলে,”আমি জিয়ান রেজা চৌধুরী স্বজ্ঞানে কোনদিন কোন মেয়ের সংস্পর্শে যাইনি৷ তোমার বোনের সাথে আমার রিলেশন ছিলো তবে তাকে আমি হালাল ভাবে পেতে চেয়েছি। কোনদিন কিস আদান প্রদানও হয়নি আমাদের মধ্যে। মাঝে মাঝে তোমার বোন শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। আমি সেটাকেও প্রশ্রয় দেইনি। কারন আমি তাকে পবিত্র ভাবে সারাজীবনের জন্য নিজের অর্ধাঙ্গিনী রুপে চেয়েছিলাম। আমার ছোট বেলা থেকে ইচ্ছে ছিলো পাইলট হবো। বড় হওয়ার সাথে সাথে আমার ইচ্ছেও প্রবল হতে থাকে৷ পড়ালেখা ছাড়া আর ধ্যান কোনদিন অন্যদিকে যায়নি৷ নীলাঞ্জনাকে আমি ভালোবাসতাম কিন্তু সেটা স্থায়ী করার জন্য টাইমপাস করার ছেলে রেজা না।”
‘নয়নার চোখে অশ্রু টলমল করছে যে কোন সময় টুপ করে ঝরে পড়বে। জিয়ান নিজের হাত দিয়ে নয়নার অশ্রু গড়িয়ে পড়ার আগেই মুছে নিলো৷
“কাঁদবে না তুমি কাঁদলে আমার হৃদয়ে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। আমি বেঁচে থাকতে তোমার চোখে পানি দেখতে চাইনা৷”
“নয়না কিছু বলতে চাইছে কিন্তু তার ভেতরে শত শত কথা থাকলেও শব্দ হয়ে তা বের হচ্ছে না।
জিয়ান নয়নার কাঁপতে থাকা ঠোঁটের উপর আঙ্গুল রেখে বলে,”তোমাকে কিছু বলতে হবে না তুমি শোন৷ আমি পাইলট জিয়ান রেজা চৌধুরী। ফার্স্ট ক্যাপ্টেন আমি৷ বাসা থেকে বের হলে আমি কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকি। তেরো ঘন্টা জার্নি করার পর আমি রেস্ট করি আর নিজেকে ফিট রাখি৷ পাইলটদের নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হতে হয়৷নিজেকে সুস্থ রাখতে হয় এটাও কাজের মধ্যে পড়ে। এই কয়দিন তুমি কাকতালীয় ভাবে যাকে দেখেছো সে আমি না।”
“নয়না এবার শব্দ করে কেঁদে ফেললো৷”
জিয়ান নয়নাকে জড়িয়ে ধরলো নিজের বাহুতে আগলে নিয়ে বলে,”এই পাগলি এভাবে কাঁদছো কেনো! আমি সত্যি বলছি আমি তোমাকে ঠকাই’নি ওটা তোমার ছোট দেবর আর আমার জমজ ভাই জাহিন ছিলো। যার সাথে তুমি আমাকে গুলিয়ে ফেলে মোবাইলে দিনরাত্রি আমার ক্লাস নিয়েছো৷”
“নয়না কাঁদছে তার কান্না বন্ধ হওয়ার কোন নাম নেই।”
জিয়ান নয়নার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে,”এভাবে কান্না করতে থাকলে কিন্তু খুব আদর করবো বৌ।পরে কিন্তু এখানেই বাসর সেরে ফেলবো। তখন কিন্তু আফসোস করবে সারাজীবন, ফুলছাড়া ফুলসজ্জা করার জন্য। মনে রেখো ফুলসজ্জা জীবনে একবারই হয় এরপর সজ্জা হলেও ফুল কিন্তু মিসিং থাকে৷”
নয়নার ঠোঁটের কোনে কিঞ্চিৎ হাসির রেখে, নয়না বলল,”বাসর ছাড়া কি আপনার আর কোন কথা নেই?” চোখে পানি ঠোঁটে হাসি অদ্ভুত কম্বিনেশন।
“জিয়ান নয়নার দিকে তাকালো,অদ্ভুত মোহনীয় লাগছে নয়নাকে। জিয়ান বললো,”আটাশ বছর ধরে অপেক্ষা করছি বাসর করার জন্য। তো সারাদিন বাসর বাসর করবো না! জন্মের পর থেকে এখনো বাসর করিনি৷”
‘নয়না জিয়ানের বক্ষে লেপ্টে আছে শান্ত ছানার মত৷ জিয়ান নয়নাকে আগলে নিয়েছে। সেভাবে শুয়ে আছে দুজন৷
“নয়না এখন কিছুটা স্বাভাবিক, জিয়ানকে বলল,আপনার সত্যি জমজ ভাই আছে তো নাকি আমাকে টুপি পরাচ্ছেন?”
“ওরেহহহ বাপরেহহহ দ্যা গ্রেট সুনয়না তালুকদার থুরি মিসেস চৌধুরীকে কেউ টুপি পরাতে পারে! এ সাধ্য কারো আছে?” জিয়ান নিজের মোবাইল বের করে অনেকগুলো পিক দেখালো তার আর জাহিনের।
জিয়ান ঘুরে,নয়নাকে বেডে শুয়ে নয়নার উপরে ঝুঁকে বলে,”তুমি আমাকে আরেকটাবার সুযোগ দিবে? আমি তোমাকে আমার সারাজীবনের জন্য পাশে চাই প্রিয়তমা অর্ধাঙ্গিনী।”
“নয়নার অনূভুতিরা জাগ্রত হচ্ছে এলোমেলো লাগছে নয়নার৷ শ্বাসের উর্ধ্বগতি জিয়ানের কানে আসছে৷ জিয়ান দ্রুত সরে আসলো নয়নার উপর থেকে। গ্লাসে পানি ঢেলে নয়নাকে বসিয়ে বলে,রিলাক্স হও জান কিছু হয়নি সব ঠিক হয়ে যাবে। এই নাও পানি খাও। নয়না জিয়ানকে আঁকড়ে ধরলো জিয়ানের হাতে নখ বসে রক্ত বের হয়ে আসছে৷
“জিয়ান নয়নাকে পানি খাওয়ালো৷ ধীরে ধীরে শ্বাস নাও জান। কিছু হয়নি কিছু হবে না। আমি আছি তোমার পাশে৷”
‘অনেকটা সময় পর নয়না স্বাভাবিক হলো।
“জিয়ান নয়নার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে৷ এই শোন তুমি ঘুমানোর চেষ্টা করো চোখ বন্ধ করো৷”
“আম্মু, মামা সবাই আমাকে খুঁজবে পেরেশান হবে আমাকে না পেয়ে।”
“টেনশন করতে হবে না তোমার৷ শ্বাশুড়ি আম্মাকে কল করে বলেছি। কাল সকালে তোমাকে নিয়ে বিয়ে বাড়িতে যাবো সোজা।”
“আপনিও যাবেন?”
“তুমি চাওনা আমি যাই?”
“আপনি এমন পাগলামি কাজ করেছেন সবাই ক্ষ্যাপাবে আমাকে।”
“তো পাগলামি করবো না! দশটা না পাঁচটা না আমার একটা মাত্র বৌ তাকে নিয়ে পাগলামি না করলে কাকে নিয়ে করবো? পাশের বাসার ছকিনাকে নিয়ে?”
জিয়ান কথা বলতে বলতে হঠাৎ খেয়াল করলো নয়না চোখ লেগে আসছে৷ আলতো করে নয়নার কপালো ঠোঁট ছুঁয়ে বলে,”তুমি শুধু আমার শুধুই আমার। আমার সবটুকু ভালোবাসা তোমাকে উজাড় করে দিয়ে তোমার এই ভয় আমি জয় করে নেবো।”
জিয়ানের খুব গান গাইতে ইচ্ছে করছে,বহু বছর হয়েছে জিয়ান গান গায় না৷ নয়নার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে সুর তুলল..
“ঘুমাও তুমি ঘুমাও গো জান,
ঘুমাও আমার কোলে…..
ভালবাসার নাও ভাসাবো,
ভালবাসি বলে….
তোমার চুলে হাত বুলাবো,
পূর্ণ চাঁদের তলে …..
কৃষ্ণচূড়া মুখে তোমার,
জোসনা পড়ুক কোলে…..
ঘুমাও তুমি ঘুমাও গো জান,
ঘুমাও আমার কোলে…..
ভালবাসার নাও ভাসাবো,
ভালবাসি বলে….
আজকে জড়ায় ধরবে,তোমার
মনকে আমার মন….
গাইবে পাখি, গাইবে জোনাক
গাছ গাছালি বন…
এত ভালবাসা গো জান,
রাখিও আঁচলে….
দোলাও তুমি, দুলি আমি
জগত বাড়ি দোলে
ঘুমাও তুমি ঘুমাও গো জান,
ঘুমাও আমার কোলে…..
ভালবাসার নাও ভাসাবো,
ভালবাসি বলে….
তোমার চুলে হাত বুলাবো,
পূর্ণ চাঁদের তলে …..
কৃষ্ণচূড়া মুখে তোমার,
জোসনা পড়ুক কোলে…..
ঘুমাও তুমি ঘুমাও গো জান,
ঘুমাও আমার কোলে…..
ভালবাসার নাও ভাসাবো,
ভালবাসি বলে….”
গান শেষ হতে হতে নয়না গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পরলো৷ জিয়ান নিজের বক্ষে তার পিচ্চি বৌটাকে সযত্নে আগলে নিয়ে নিজেও তলিয়ে গেলো গভীর নিদ্রায়৷ যেনো বহুকাল পর তার হৃদয় প্রশান্ত হলো!
🌿
সায়না অনিকেতের সামনে দু হাত মেলে দাঁড়িয়ে আছে৷
“এসব কি হচ্ছে মিস সায়না? রাস্তা ছাড়ুন আমার কাজ আছে৷”
“আমি তো রাস্তা ছাড়ার জন্য রাস্তা আগলে দাঁড়াইনি ডাক্তার মশাই। আপনি আমার নাম্বার ব্লক করেছেন কেনো?”
“দেখো আমি বহুবার বলেছি তোমার আমার মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক সম্ভব নয়৷ কখনো আকাশের চাঁদকে জমিনে আসতে দেখেছো?”
“বহুবার দেখেছি আপনি দেখেন নি! শুনুন রসকষহীন ডাক্তার শুধু জানেন কাটাছেঁড়া করতে ভালোবাসা টাসাতো জানেননা, পূর্নিমা রাতে সচ্ছ জলধারায় দৃষ্টি দিয়ে দেখবেন পূর্নিমার চাঁদ কেমন জমিনে নেমে আসে।”
“এসব ফিল্মি ডায়লগে জীবন চলে না।”
“সায়না অনিকেতের হাতের মধ্যে হাত রেখে বলে,ভালোবাস মানুষ পাশে থাকলে জীবনটা ফিল্মের চেয়েও বহুগুণ ভালো কাটে।”
“হাত ছাড়ুন।”
“কবে তুমি নাম ধরে ডাকবে আমায়?কবে তুমি বলবে?”
“কেনো করছো এমন! আমি মানুষটা বড্ড ভালোবাসার কাঙাল কেনো আরো বিধ্বস্ত করতে চাইছো? কেনো চাঁদ হয়ে বামনের ঘরে উঁকি দিয়ে লোভ বাড়াচ্ছো? আমি জানি আমার লিমিট তাই আমাকে আমার মত থাকতে দাও।” অনিকেত দ্রুত গতিতে স্থান পরিবর্তন করলো৷
“পালিয়ে আর কতদিন থাকবেন ডাক্তার সাহেব? ফিরে কিন্তু এই আমার আঁচলের তলায় আসতেই হবে। ভালোবাসি আপনাকে ভালোবাসা না নিয়ে ফিরবো না খালি হাতে৷হয় আপনার হবো, না হয় আপনার বাচ্চার মা হবো তবুও আপনার পিছু ছাড়বো না৷”
🌿
মিজান তালুকদার তার ওয়াইফের পাশে বসে আছে৷ দু’জনেই চুপচাপ। মিজান তালুকদার নিরবতা ভেঙে বলল,দেখো মেয়ে ভুল করছে তাই বলে তো মেয়েটাকে মরার জন্য ছেড়ে দেয়া যাবে না। তুমি ওর সাথে রাগ করে না থেকে মেয়েটাকে স্বাভাবিক হতে সাহায্য করো।
“তুমি জানো কাল রাতে নীলাঞ্জনাকে বাসায় কে দিয়ে গেছে?”
“অন্তর নামের একটি ছেলে আমাদের এলাকার পরের এলাকায় ওদের বাসা৷”
“রেজা চৌধুরী দিয়ে গেছে৷ কিন্তু বাসায় পাঠিয়েছে ওই ছেলেকে।
“এসব তুমি কি বলছো নাহার! রেজা কোথা থেকে আসবে এখানে?”
“আমি জানি তুমি আমার কথা বিশ্বাস করবে না৷ আমি কোনদিন তোমার কাছে বিশ্বস্ততা অর্জন করতে পারিনি৷ তুমি বরং দারোয়ান কে জিজ্ঞেস করো। জানো আমার মেয়েটার জীবন ওই ছেলেটাই নষ্ট করেছে।”
#চলবে