#অর্ধাঙ্গিনী
#নুসাইবা_ইভানা
#পর্ব -২৮
চোখ খুলে নিজেকে হসপিটালের বেডে আবিষ্কার করলো নয়না৷ তার পায়ের কাছেই বসে আছে জাহানারা বেগম।
“নয়নার জ্ঞান ফিরেছে এটা দেখেই দ্রুত সামনে এগিয়ে এসে নয়নার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,এখন কেমন লাগছে মা?”
“নয়নার চোখে অশ্রু টলমল করছে। ইচ্ছে করছে তার মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে।”
“নার্স এসে বলল,একটু সময় দিন এখন কেউ রোগীকে ডিস্টার্ব করবেননা৷”
“নয়না পাশ ফিরতেই চোখ পরলো মিতা বেগমের দিকে৷
“এগিয়ে এসে নয়নার চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুটুকু মুছে দিয়ে কপালে চুমু দিয়ে বলেন, দ্রুত সুস্থ হয়ে যাও।”
“নয়নার কেনো যে ইচ্ছে করছে না কারো কথার উত্তর দিতে!
রাতেই নয়নাকে বাসায় আনা হয়েছে। নয়না জাহানারা বেগমের রুমে। একবারের জন্য ও নিজের মোবাইলটার খোঁজ করেনি। বালিশে হেলান দিয়ে বসে আছে চোখভর্তি অশ্রু মস্তিষ্ক ভর্তি টেনশন।
” হঠাৎ মাহবুব তালুকদার একগাদা লাল শাক নিয়ে রুমে ডুকলেন৷ ফিল্মি স্টাইলে হাঁটু মুড়ে জাহানারা বেগমের সামনে শাকগুলো বাড়িয়ে দিয়ে বলে হ্যাপি হাগ ডে।
“জাহানারা বেগম ভ্রু কুঁচকে বলে,বুড়া বয়সে ভীমরতিতে ধরছে!
“নয়না হাসছে।
“মাহবুব তালুকদারের হৃদয় ও যেনো হাসছে। পৃথিবীতে এই একটা নারী যার চোখের কোনে অশ্রু তার সহ্য হয়না। কিভাবে তার মুখে হাসি ফিরিয়ে আনবে পৃথিবীর সব সুখ তার পায়ে এনে রাখবে সেটাই যেনো তার প্রধান কাজ।”
“নয়না হাসিমুখে বলে,আম্মা বাবা তোমাকে এখনো কত ভালোবাসে দেখছো! হাগ ডে’তে শাক নিয়ে এসেছে।”
“নয়নাকে দুইপাশ থেকে দুজন জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমু দিয়ে বলে,এভাবে হাসবি, তুই হাসলেই আমাদের পৃথিবী হাসে। তোর মন খারাপে আমাদের পৃথিবীতে ভুমিকম্প শুরু হয়।”
” নয়না শুধু এই মানুষ দুটোর জন্য সেদিন বিয়েতে অমত করতে পারেনি। এদের ভালোবাসার কাছে তার সব কষ্ট সব ত্যাগ তুচ্ছ।”
“জানালার গ্রীল আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে জিয়ান। মোবাইলটা ভেঙে ফেলেছে। চোখ দুটো বন্ধ করলেই ভেসে উঠছো এক অসহায় নিস্পাপ মুখশ্রী। জিয়ানের এখন সিগারেট প্রয়োজন কিন্তু সিগারেট তার হাতের নাগালে নেই।
জিয়ান বেডের উপর বসলো। চোখ বন্ধ করে বলে,স্যরি পাখি আমি না চাইতেও বারবার তোমার কোমল হৃদয়ে আঘাত করছি। আমি তোমার মায়ায় জড়িয়েছি খুব অল্প সময়ে। মায়াবতী তোমার মায়া কাটবে কিনা জানি না৷ তবে আমি তোমার ভালোর জন্য আমাকে তোমার থেকে সরিয়ে নেবো৷ আমি তোমার কষ্টের কারন হতে চাইনা। তবুও আমিই অপরাধী তোমার ছোট হৃদয়টাকে ক্ষতবিক্ষত করার অপরাধে। তোমাার মত নিষ্পাপ এক ফুলকে কলুষিত করেছি আমি আমাকর ক্ষমা করে দিও মায়াবতী।
🌿
সায়নার পাশে অনিকেত চুপচাপ বসে আছে। একি রিকশায়। অনিকেত বাস্তবতা বোঝে সে জানে পৃথিবী কতটা কঠিন৷ বাবা, মা না থাকলে তার দুনিয়া কত নির্মম।
” এই যে হার্টের ডাক্তার আপনি হার্টের ডাক্তার হয়ে আমার হার্টের চিকিৎসা কেন করবেননা?”
“তুমি না জাহিনকে ভালোবাসো।”
” ভালো আমি এজন্মে কাউকে এখনো বাসিনি৷ তবে জিয়ান আর জাহিন ভাইয়া আমার চাইল্ডহুড ক্রাশ৷ জিয়ান ভাইয়া রাগী গম্ভীর সব সময় পড়ালেখা আর পড়ালেখায় ডুবে থাকতো। তাই আমার পছন্দ ছিলো জাহিন৷ ছোট থেকে ও কোন বিষয়ে বেশী সিরিয়াস হয় না৷ সব সময় নিজের মন মর্জি মত চলতো। তাই ভেবেছিলাম এরে বিয়ে করে আমিও মনমতো ঘুরতে পারবো। লাইফে সুদর্শন ছেলে আর টাকা দুটো একসাথে পেলে কেউ হাত ছাড়া করতে চায়?”
“আমার তো দুটোর একটাও নেই?”
” আপনার আছে সুদ্ধ মন পবিত্র দেহ। আপনি ওইদিন বলেছিলেন আপনার শরীর টাচ করতে না। কারন এটা আপনার ভবিষ্যত বৌয়ের আমানত ব্যাস আমি আপনার উপর ফিদা। বিয়ে করলে আপনাকেই করবো৷ আর হ্যা যথেষ্ট সুদর্শন আপনি আর ডাক্তাররা আবার গরীব ও হয়! আমাকে বোকা মনে হয় আপনার?”
“অনিকেত শান্ত কন্ঠে বলে,আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারবো না আমি নিজেও জানিনা আমার বাবা মা কে? এমন পিতৃ পরিচয়হীন ছেলের কাছে কোন পরিবার নিজের মেয়ে দেবে?”
“পরিবারের দিতে হবে কেন? মেয়ে নিজেই আপনার কাছে চলে আসবে৷”
“দূরত্ব ঠিক রেখে কথা বলুন।”
” সায়না হুট করে এক অকাজ করে বসলো। হঠাৎ অনিকেতর হাতদুটো ধরেই ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো অনিকেতের ঠোঁটে। প্রথমবার কোন নারীর স্পর্শে অনিকেতের শরীরে যেনো বিদ্যুৎ বয়ে গেলো।”
🌿
লাবিব বাসায় আসতেই তার বাবা তাকে বকাঝকা করলো এরপর ঠান্ডা মাথায় ব্রেইন ওয়াশ করলো৷
“লাবিব বসে আছে একটা হোটেল রুমের সোফায়। তার নতুন গার্লফ্রেন্ড সোনিয়াকে নিয়ে এসেছে৷ সোনিয়া নিজেই তাকে এখানে আসার অফার করেছে৷ লাবিব মনে মনে ভাবলো এই মেয়ে বড়লোক হলে তো আর নীলাঞ্জনা বেবিকে ফিরিয়ে আনবো না। লাবিব সোনিয়ার হাতের উপর হাত রেখে বলে,বেবি ইউ আর সো বিউটিফুল। এই ড্রেসটা পরে আসো বেব।”
” সোনিয়া এক চোখ টিপে বলে,ড্রেসের কি দরকার সোনা৷বলেই দুজন কাছাকাছি আসলো। হঠাৎ সোনিয়া একটা ছু’ড়ি বের করে লাবিবের গলায় ধরে বলে,শা’লা যা আছে বের কর নয়ত এখানে তোর লাশ ফেলে রাখবো। একদম শক্তি দেখানোর চেষ্টা করবি না এখানে সব আমার লোক।”
🌿
গোটা একটা সপ্তাহ কেটে গেছে এরমধ্যে জিয়ান নয়নার কোন যোগাযোগ হয়নি৷
“হসপিটাল থেকে ফিরে নয়না পড়ালেখায় ব্যস্ত হয়ে পরেছে৷ সে যেনো তার মনের সাথে যুদ্ধ করেই এইভাবে কাউকে ভুলে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। দুটো পরিক্ষা শেষ। মোবাইল বন্ধ করে আলমারির ড্রয়ারে রাখা সেটা একবারের জন্য ও ধরেনি নয়না৷ এখন সূর্য অস্ত যাওয়ার সময়। নয়না বারান্দায় এসে দোলনায় বসলো, মাঝে এখানে বসে সে আনমনে কবিতা আবৃত্তি করে,সূর্য ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামছে নয়নার চোখের কোন ভিজে উঠেছে অজানা কারনে৷ তার কেন মন খারাপ লাগছে! কেনো না চাইতেও চোখদুটো ভিজে উঠছে! মানুষ কি এতো সহজে কারো মায়ায় আটকে যেতে পারে? কোন মানুষকে কি এতো সহজেই হৃদয়ে জায়গা দেয়া যায়? আচ্ছা আমরা কি নিজের ইচ্ছেতে কারো মায়ায় আবদ্ধ হতে পারি? অথবা ভালোবাসতে পারি? হৃদয় তো মস্তিষ্কের মত না যে এসব ভেবেচিন্তে করা যায়! সেতো নিজের মত চলে মন আর মস্তিষ্কের দ্বন্দ্বে আমাদের কাকে প্রধান্য দেয়া উচিৎ? মন আর মস্তিষ্ক কেনো আলাদা চলে? এসব প্রশ্ন যেনো নয়নাকে ঘীরে ধরেছে অথচ উত্তর মেলাতে সে ব্যর্থ! সূর্যের রক্তিম ভাবা টুকুও বিলুপ্ত হওয়ার পথে, নয়না উঠে দাঁড়িয়ে আনমনে বলছে,
“আমি চাইনা তুমি আমাকে সূর্যের মত ভালোবাসো যার প্রখরতা বিলুপ্ত হয়ে যায় আঁধারে,
আমি চাইনা তুমি আমায় চাঁদের মত ভালোবাসো,
যার সৌন্দর্য হারিয়ে যায় দিনের আলোয়।
আমি চাই তুমি আমায় আকাশের মত ভালোবাসো,যে ক্ষনে ক্ষনে বদলাবে তবুও ছেড়ে যাবে না৷ সব সময় স্থীর থাকবে আমার পাশে।”
“নীলাঞ্জনা পাশ থেকে বলে,বাহহ সুন্দর বলেছিস তো। তা খুব ভালোবাসিস বুঝি?”
“নয়না কোন উত্তর না দিয়ে রুমে চলে আসলো, জায়নামাজ নিয়ে ফ্লোরে পেতে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলো৷ আর কোন সময় নামাজ পড়ুক আর না পড়ুক পরিক্ষার সময় নয়নার নামাজ যেনো মিস হয় না৷
” নীলাঞ্জনা হাসছে। ছোট বেলা থেকেই নয়না এক্সামের নামাজি। নীলাঞ্জনা একসপ্তাহ ধরে এবাসায় কেউ তার খোঁজ নেয়নি৷ সে খাচ্ছে ঘুমাচ্ছে। কেউ তাকে কিছুই জিজ্ঞেস করছে না। কাছে ডাকছে না! সবার এই নিরবতা নীলাঞ্জনাকে যেনো কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।
🌿
“নয়না চিৎকার করে বলে,আপনার দুঃখ, আপনার কষ্ট, আপনার সেক্রিফাইস, আপনার হৃদয়ের ক্ষত। সব দিকে আপনি আর আপনি! স্বার্থপর মানুষ আপনি নিজেকে ছাড়া আর কাউকে দেখতে পাননা!আপনার এতো কিছুর মধ্যে আমি কোথায়? আমার ক্ষত বিক্ষত হৃদয় একবারও আপনার দৃষ্টিতে পরেনি? একবারও আপনার মন বলেনি আপনি অন্যায় করছেন আমার সাথে?আপনার এতোকিছুর ভীড়ে ভিক্টিম কার্ড প্লে করছি আমি!” জিয়ান ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো কপালে জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। বেড সাইড ল্যাম্প জ্বালিয়ে জোড়ে জোড়ে নিঃশ্বাস নিলো৷ তারমানে এসব স্বপ্ন ছিলো।মোবাইল হাতে নিলো । নতুন মোবাইল কিনেছে৷ মোবাইলের স্কিনে তারিখ দেখে বলে,আজ একটা সপ্তাহ আমাদের কথা হয় না৷ রোজ আমার তোমার কথা মনে পরে তোমার কি আমার কথা মনে পরে না ষোড়শী? তোমার এক্সাম কেমন হচ্ছে জানা হলো না৷আমি তোমাকে আমার করতে পারবো না৷ আমি তোমাকে মুক্ত করে দিলাম। তবুও চাই তুমি ভালো থাকো। আমি তোমার অপরাধী তুমি কখনো আমার অপরাধ ক্ষমা করে আমাকে আপন করতে পারবে না৷ আমি বারবার তোমাকে হার্ড করেছি বারবার তোমার কোমল হৃদয়ে গভীর আঘাতে জর্জরিত করেছি। ক্ষমা যাওয়ার ভাষা টুকুও আমার কাছে নেই৷ আমি জানি তুমি ভালো কাউকে ডিজার্ভ করো আমার মত অপরাধীকে না৷ মোবাইলের স্ক্রীনের আলো নিভে যাচ্ছে জিয়ান আবার জ্বালাচ্ছে। সেখানে জ্বলজ্বল করছে তার ষোড়শী রমনীর হাসোজ্জল মুখশ্রী।
#চলবে৷