Saturday, June 6, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"কাব্যের বিহঙ্গিনীকাব্যের বিহঙ্গিনী পর্ব-৩৭+৩৮

কাব্যের বিহঙ্গিনী পর্ব-৩৭+৩৮

#কাব্যের_বিহঙ্গিনী
#পর্ব_৩৭
#লেখিকা_আজরিনা_জ্যামি

আছিয়া খাতুন হুট করেই মেহবিনের হাত ধরলেন। হুট করে ধরায় ও একটু অবাক হলো। তবুও বলল,,

‘কিছু বলবেন?”

আছিয়া খাতুন মেহবিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দুটো ছলছল করছে তা দেখে মেহবিন বলল,,

“কি হয়েছে দাদিজান?”

‘আমি বোধহয় অনেক বড় একটা ভুল কইরা ফালাইছি নাতবউ।”

নাতবউ শুনে মেহবিন একটু থমকালেও পরক্ষনেই নিজেকে ধাতস্থ করে বলল,,

“কি ভুল করেছেন? আর হঠাৎ করে আজকে কেন মনে হচ্ছে আপনি ভুল করে ফেলেছেন।”

“আমি আজ তোমায় সব,,

তখন আচংকা মুখর এলো এসেই বলল,,

“মেহু তোমায় আরবাজের বাবা ডাকছে?”

হুট করে ওর আসাতে মেহবিন আর আছিয়া খাতুন দু’জনেই চমকে উঠলো। মেহবিন বলল,,

‘আসছি দাদিজানের সাথে কথা শেষ করে।”

‘উনি এখনি যেতে বলেছে।”

‘নাতবউ তুমি যাও।”

আছিয়া খাতুনের কথায় মেহবিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,,

“কোথায় আছেন চেয়ারম্যান সাহেব?”

“ঐ তো সদর দরজার সামনে দেখো।”

মেহবিন তাকিয়ে দেখলো ওখানেই আছে। মেহবিন সেদিকে গেল। সদর দরজায় কেন যেতে বললো না মেহবিন বুঝলো না। মিশু আর মেহবিনের কথা বলার পরে মুনিয়া অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সব স্বাভাবিক করে নেয়। তার সাথে সবাই ও স্বাভাবিক হয়। মেহবিন শেখ শাহনাওয়াজ এর দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,,

“আমায় ডাকছিলেন চেয়ারম্যান সাহেব।”

শেখ শাহনাওয়াজ বললেন,,

“হুম চলুন বাগানে যাই।”

‘আপনার ছেলের এঙ্গেজমেন্ট এর অনুষ্ঠান চলছে চেয়ারম্যান সাহেব। এখানে আলাদা করে বাগানে আমার সাথে কথা বলা খুব একটা ভালো চোখে দেখা যায় না।”

“আমি আর পারছি না।”

মেহবিন মুচকি হেঁসে বলল,,

“সব জেনেশুনেই আপনি আপনার পথ বেছে নিয়েছিলেন চেয়ারম্যান সাহেব। তবে আজ কেন?”

“আমার বুকে বড্ড যন্ত্রনা হয় আজকাল তেমন সহ্য করতে পারি না।’

‘আপনার তো সবাই আছে তাও যদি এইরকম অবস্থা হয় তাহলে ভাবুন আমার কি অবস্থা হয়। তবে আমি দুর্বল নই চেয়ারম্যান সাহেব।
যে দূর্বল সে অল্প আঘাতেই ঘায়েল হয় কিন্তু যে মেন্টালি অনেক শক্ত সে যতই ক্ষতবিক্ষত হোক তার দূর্বলতা প্রকাশ পায় না সেই হিসেবে সে ঘায়েল ও হয় না।

কথাটা শুনে শেখ শাহনাওয়াজ এর চোখ ছলছল করে উঠলো। তখনি বাইরে হুট করেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। হুট করে বৃষ্টিটা বোধহয় কেউ আশা করেনি। মেহবিন মুচকি হেঁসে বলল,,

“আপনার কথায় বাগানে গেলে এখন ভিজে যেতাম চেয়ারম্যান সাহেব।”

এমনিতেও দূরে দেখে কেউ কিছুই শুনতে পাচ্ছে না তার ওপর ঝুম বৃষ্টি সেদিকের কোন কথাই ভেতরে যাচ্ছে না। চেয়ারম্যান সাহেব মেহবিনের কথায় কথা পাল্টালো না। তিনি তার প্রসঙ্গে থেকেই বললেন,,

“আপনি এতো কঠিন কেন? আমি তো আপনার মতো নই।”

“আপনার যে অবস্থা সেটা আপনি ডিজার্ভ করেন।”

“এতটাও কি আমার প্রাপ্য!”

“যদি বলি হ্যা।”

তখন আরবাজ এলো ওখানে এসে বলল,,

‘না এতটা তার প্রাপ্য নয়।”

তখন মেহবিন মুচকি হেঁসে বলল,,

‘আপনিও আপনার বাবার দেখানো পথেই হাঁটছেন। যদি খুব একটা ভুল নাই হই আপনিও শেখ শাহনাওয়াজ এর মতো একই অতীত পুনরাবৃত্তি করবেন।”

মেহবিনের কথায় আরবাজ বুঝতে পারলো ও কি বুঝাতে চাইছে। তাই ও বলল,,

‘”বাবাকে নিয়ে আর একটা কথাও বলবি না তুই।”

“কেন এখানে মিথ্যের কি দেখলেন আপনি। আর তুই তোকারি করছেন কেন আপনি?

তখন শেখ শাহনাওয়াজ বললেন,,

‘এসব কি হচ্ছে আরবাজ তুমি এরকম ব্যবহার করছো কেন?”

“ও কি বলছে তুমি শুনতে পাচ্ছো না।”

“আমি সব শুনতে পাচ্ছি। তবে এটাও বুঝতে পারছি এখানে আমার অগোচরে কিছু হয়েছে তার ইঙ্গিত বারবার দিচ্ছে সে।”

তখন মেহবিন বলল,,

‘কিছু না চেয়ারম্যান সাহেব আপনি এখান থেকে চলে যান। আমার উনার সাথে কিছু কথা আছে।”

“না আমি কোথাও যাচ্ছি না আরবাজ তুমি এখানে থেকে যাও।”

“চেয়ারম্যান সাহেব আপনাকে কি বললাম আমি। আপনি এখান থেকে যান উনার সাথে কথা আছে আমার।”

মেহবিনের দৃঢ় কন্ঠে বলা কথাটা শুনে শেখ শাহনাওয়াজ চলে গেলেন। তখন মেহবিন বলল,,

“নাফিয়া আপুকে খুব ভালোবাসেন তাই না?”

হুট করে এমন প্রশ্নে আরবাজ একটু চমকালো তবুও শান্ত হয়ে বলল,,

“হুম।”

‘তার হাত কখনো ছাড়বেন না তাই না।”

“আমৃত্যু পর্যন্ত না।”

‘যদি কোনো এমন পরিস্থিতি আসে যা সামলাতে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়।”

‘দরকার পরে নেব তবুও নাফিয়ার গাঁয়ে একটা আঁচ লাগতে দেব না।”

“শুনে ভালো লাগলো। আসছি তাহলে?

‘আপনি কি কোন কারন নিয়ে ভয় পাচ্ছেন ?”

“হুম একটু তো হচ্ছে কে জানে শেখ বাড়ির অতীতের পুনরাবৃত্তি ঘটে কি না।”

“তা কোনদিন ও ঘটবে না। যাই হোক না কেন সেই অতীতের কখনো পুনরাবৃত্তি হবে না।”

“আরিফা জামান কিন্তু শেখ শাহনাওয়াজ কে কম ভালো বাসেনি। তবুও তার স্বার্থপরতার জন্য আরেকজন কে শেখ শাহনাওয়াজ এর সাথে জড়াতে হয়েছে।”

“না তবুও এইসব কিছুই হবে না।”

“তার গ্যারান্টি আপনি দিতে পারবেন না‌। কারন শেখ শাহেনশাহ তার বংশবৃদ্ধির জন্য একজনকে ঢুকিয়ে ছিল তিনিও কিন্তু খারাপ মানুষ নন। কে বলতে পারে শেখ শাহনাওয়াজ ও এমন করবে না। শেখ বাড়ির সব মানুষ কিন্তু স্বার্থপর । তাদের স্বার্থপরতার জন্য কখনো কখনো অনেক দাম দিতে হয়েছে।”

“বাবার নামে কোন কথা বলবি না তুই।”

“কেন বলবো না? না বলার কারন কি?

‘দেখ আমি তোকে ভালোমতো বলছি।”

“আপনার বাবা একটা স্বার্থপর মানুষ।”

“তিনি স্বার্থপর কিভাবে হলেন?”

“সেটা না হয় আপনার বাবার থেকেই জেনে নিয়েন।”

“না আমি তোর মুখ থেকে শুনতে চাই।”

“তার একটা স্বার্থপরতার কথা যদি বলি তাহলে আপনি। আপনাকে পাওয়ার জন্য তিনি আরেকজন কে নিজের সাথে জড়িয়েছিলেন।”

‘মেহু!”

“একদম চিৎকার করবেন না চিৎকার করলেই সত্য পাল্টে যাবে না।”

“বাবা মাকে ভালোবাসতো।”

‘আচ্ছা মেনে নিলাম তাহলে বুকে হাত দিয়ে বলুন তো তাকে বিয়ে করেছিল কিসের জন্য ভালোবাসার জন্য নাকি তার ওয়ারিসের দরকার ছিল। যেই আপনি আছেন তখন তাকেও আর দরকার নেই সেই সাথে আরেকজনকেও।”

আরবাজ মেহু বলে হাত ধরলো কিন্তু মেহবিনের দিকে তাকাতেই সে হাত নামিয়ে ফেলল। দূর থেকে সবাই দেখছে ওর হাত ধরার কারন কিছুই বুঝতে পারলো না কেউ। কারন কেউ কিছু শুনতেই পাচ্ছে না। আরবাজ কিছু একটা ভেবে বলল,,

“একদম না জেনে কোন কথা বলবি না। মায়ের মৃত্যু তে সবথেকে কিন্তু সেই ভেঙে পরেছিল তুই ছিলিস না। তুই থাকবি কি করে তুই তো পালিয়ে গিয়েছিলি।

কথাটা শুনেই মেহবিনের হাত শক্ত হয়ে এলো। তখন আরবাজ বলল,,

‘আমার কি মনে হয় জানিস মায়ের মৃত্যুর কারন তুই। তাই বাবা তোকে খোঁজেনি। সবাইকে বলেছে মায়ের ওখানে গিয়ে তোকে কোথাও পায় নি। এই জন্য বাবা তোকে আমাদের মতো তুমি করে ডাকে না। এই জন্যই বাবা তোকে ঘৃনা করে আর তোর দিকে তাকিয়ে কথা বলে না।

মেহবিন নিজেকে যথআসম্ভব সামলে বলল,,

“শেখ আরবাজ শাহনাওয়াজ মুখ সামলে কথা বলুন।”

‘কেন এখন কেন? আমি তো মনে হয় বলেছিলাম এখন তো মনে হচ্ছে তুই সত্যিই মায়ের মৃত্যুর কারন।”

মেহবিন এবার নিজেকে সামলাতে পারলো না। ও আরবাজের নাক বরাবর ঘুষি মেরে দিল। আর বলল,,

‘আপনার সাহস কি করে হয় আমাকে এসব বলার।”

“আমাকে মারলে সত্যি মিথ্যে হয়ে যাবে না।”

মেহবিন আরেকটা ঘুষি মারলো এবার আরবাজ মাটিতে পরে গেল। প্রথম ঘুষির সময়ই সবাই চমকে দরজার দিকে তাকিয়েছিল। আরেকটা ঘুষি মারতেই সবাই ও দিকে এগিয়ে যেতে নিল। তার আগে শেখ শাহনাওয়াজ তিনি আসেপাশেই ছিলেন। তিনি সকলকে নিষেধ করলেন সেখানে যেতে তিনি যাচ্ছেন। কেউ যেন ওখানে না যায়। তিনি আলাদা কিছু আন্দাজ করতে পেরেছেন বলেই সবাইকে মানা করলো
তাই কেউ ওদিকে এগুলো না। মেহবিন আরবাজের কলার ধরলো আরেকটা ঘুষি মারবে তখন শেখ শাহনাওয়াজ মেহবিনের হাত ধরে চিৎকার করে বললেন,,

‘ডক্টর মেহবিন মুসকান আপনার সাহস হয় কি করে আমার ছেলের গায়ে হাত তোলার।”

মেহবিন রেগেই শেখ শাহনাওয়াজ এর দিকে তাকিয়ে বলল,,

‘যেভাবে উনার সাহস হলো আমার সম্পর্কে বলার। হাত ছাড়ুন আপনি আমার একদম আমাকে ছুঁবেন না। আমাকে ছোঁয়ার কোন অধিকার নেই।”

কথাটা শুনে তিনি বললেন,,

‘শান্ত হোন আপনি।”

মেহবিন হাত ঝাড়া দিয়ে বললেন,,

‘হাত ছাড়তে বলেছি আমি।”

মেহবিনের কথায় সকলেই চমকে উঠলো। আর কিছু না শুনলেও মেহবিনের এই চিৎকার টা জোরেই ছিল তাই সকলের কানে পৌঁছেছে। এতটাই জোরে ছিল যে শেখ শাহনাওয়াজ ও চমকে ওর হাত ছেড়ে দিলেন।আরবাজ ও চমকে গেছে ও ভাবেই নি এখানে এরকম কিছু হবে ও উঠে দাঁড়ালো। এদিকে মেহবিনের ঝাড়ি শুনে তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন,,

“মুসকান।”

কথাটা মেহবিনের কানে যেতেই মেহবিন শান্ত চোখে ওনার দিকে তাকালো। ওর একটু আগের কথা মনে পরে মায়ের মৃত্যুর পর ওর এই উনিশ বছরে প্রথমবার চোখ ছলছল করে উঠলো ও শেখ শাহনাওয়াজ খুব কাছে গিয়ে ধীরে ধীরে বলল,,

“আমার দিকে তাকিয়ে আপনি কেন কথা বলতে পারেন শেখ শাহনাওয়াজ। কি করেছেন আপনি আমার সাথে? শুনেছি মানুষ কারো সাথে অন্যায় করলে নাকি তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারে না। আপনিও তেমন নাকি আপনি আমায় ঘৃনা করেন।

শেখ শাহনাওয়াজ মেহবিনের চোখের দিকে তাকিয়ে থমকে গেলেন কারন তিনি সেদিনের পর কখনোই ওর চোখে পানি দেখেনি। তবে আজ কেন সে কি খুব কষ্ট পেয়েছে। মুহুর্তেই তার চোখ দুটো ভিজে উঠলো সেই সাথে গড়িয়েও পড়লো। আর কথাগুলো যেন তার বুকে আরো বেশি আঘাত করছে। তিনি বললেন,,

“মুসকান আম্মা কি হয়েছে আপনার? আপনি ,,

তিনি আর কিছু বলতে পারলো না তার আগে মেহবিন মুচকি হাঁসি ফুটিয়ে বলল,,

“আচ্ছা আপনি আমায় তুমি করে কেন বলেন না । আপনার বাকি ছেলেমেয়েদের মতো। আরে বলবেন কি ভাবে আমি তো আপনার বউকে মেরে পালিয়ে গিয়েছিলাম তাই না। এই জন্যই কি আপনি আমায় খুঁজেন নি সবার কাছে হারিয়ে গেছি বলে ঘোষনা করেছেন। এই কারনেই ঘৃনায় আপনি আমার দিকে তাকাতে পারেন না তাই না।”

চোখে পানি মুখে অদ্ভুত মুচকি হাঁসি এটা দেখে একটা মানুষের কিরকম অনুভুতি হওয়া উচিত। এতোক্ষণ যে মানুষটা মেহবিন কে নিয়ে বলছিল সেই মানুষটাও মেহবিনের কথা শুনে থমকে গেল । সে তো জানে না কি হয়েছিল আন্দাজে কয়েকটা কথা বলেছিল সে কিন্তু এখন বুঝতে পারছে তার মস্তবড় ভুল হয়ে গেছে। সব শুনে শেখ শাহনাওয়াজ বললেন,,

“মুসকান আম্মা এসব কি কথা বলছেন আপনি?”

“একটু আগে এই কথাগুলোই শেখ আরবাজ শাহনাওয়াজ আমাকে বলেছেন।

মেহবিনের চোখের পানি গড়াতেই মেহবিন তাতে হাত দিয়ে বলল,,

‘সেদিনের পর আমার চোখে কোনদিন পানি ছলছল করেনি । তাহলে আজ কেন? না না আমার চোখের পানি কেউ দেখতে পারবে না। মা বলে গেছে আমায় না কাঁদতে।”

বলতে বলতেই মেহবিন এই ঝড় বৃষ্টির মধ্যে দৌড়ে চলে গেল। পেছন থেকে শেখ শাহনাওয়াজ ডাকতে লাগলো

“মুসকান আম্মা দাঁড়ান।”

বলতে বলতে তিনিও বেরিয়ে গেল। মেহবিন দৌড়ে একটা বড় গাছের নিচে দাঁড়ালো। বারবার ওর পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ছে। চোখ দু’টোও বারবার ঝাঁপসা হয়ে আসছে‌। ও গাছে ধরে বলল,,

‘না মুসকান তোমার কান্না মানায় না। তুমি তো সবার মতো নও। তোমার মা বলেছে তুমি princess। আর Princess Doesn’t Cry … একদম কাঁদবে না তুমি।”

তবুও বারবার কান্নারা দলা পাকিয়ে যাচ্ছে। ও গাছে ইচ্ছে মতো ঘুষি মারতে লাগলো। আর চিৎকার করে বলতে লাগলো,,

‘মা! মা! কোথায় তুমি তোমার প্রিন্সেস কে দেখতে পাচ্ছো আজ। আজ তার ভাই তাকে বলেছে আমি তোমার মৃত্যুর কারন।”

বলেই আরও জোরে জোরে ঘুষি মারতে লাগলো গাছে। হাত দুটো থেঁতলে যাচ্ছে এতে ওর ভ্রুক্ষেপ নেই। তখনি কেউ মেহবিন কে শক্ত করে ধরে জড়িয়ে ধরে বলল,,

‘আম্মা শান্ত হোন আপনি।”

মেহবিন তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। সে আবারও ধরলো আর বলল,,

‘প্লিজ আপনি শান্ত হোন নাহলে আপনার ক্ষতি হবে।”

মেহবিন আবারো ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল,,

“একদম না শেখ শাহনাওয়াজ আপনি আমায় ধরবেন না। আপনি আমার মায়ের খুনীদের জেনেও কোন শাস্তি দেন নি। আপনার আমাকে ছোঁয়ার কোন অধিকার নেই। আপনার জন্য আমি নীড়হীন আপনার জন্য আমি এতিম হয়েছি । আমার জীবনের সবকিছুর জন্য আপনি দায়ী।”

‘আমার কথাটা শুনুন?”

‘কি শুনবো আমি? কি শুনাবেন আপনি? আপনি কি আপনার প্রথম স্ত্রীর আর বাবার হয়ে ওকালতি করতে এসেছেন। আপনি আমার মাকে ধোঁকা দিয়েছেন।”

“আমি আপনার মাকে অনেক ভালোবাসি মুসকান?”

‘না ভালোবাসেন না আপনি? যদি বাসতেন তাহলে এর একটা বিহিত আপনি করতেন কিন্তু আপনি তা করেন নি।”

‘আমি আপনাকে আর আপনার মাকে দুজনকেই অনেক ভালোবাসি আমি। সেই জন্যই আপনাকে আমি দূরে রেখেছিলাম।”

‘আমি আর কিছু শুনতে চাই না। চলে যান আপনি আমার কাউকে দরকার নেই। আমার কাউকে লাগবে না। চলে যান এখান থেকে আপনাকে আমার একটুও সহ্য হচ্ছে না চলে যান আপনি। যেভাবে তখন ছেড়ে দিয়েছিলেন এবারো ছেড়ে দিন। আর এই মেহবিন মুসকান কখনো আপনার আর আপনার বাড়ির ত্রী সীমানায় পা রাখবে না। আর হ্যা ভুলেও আমার পেছনে আসার চেষ্টা করবেন না নাহলে আমার চেহারাও কোনদিন দেখতে পাবেন না আপনি।”

বলেই মেহবিন দৌড়ে চলে গেল। শেখ শাহনাওয়াজ ওখানেই দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন। যা উনার জীবনে কোনদিন হয় নি। তিনি চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,,

“আমাকে মাফ করে দিও মেহের। আমাদের সবথেকে প্রিয় আদরের কলিজাকে আগলে রাখতে পারি নি। আমি একজন ব্যর্থ পিতা মেহের। আমাদের মেয়েটা খুব কষ্ট পেয়েছে আজ মেহের। আজ তার চোখে পানি এসেছে তোমায় ভেবে নিশ্চয়ই তার ভয়ঙ্কর অতীত তার চোখে ভাসছে। কিন্তু এই মুহূর্তে আমি কিছুই করতে পারছি না। আমায় মাফ করে দিও তুমি। তোমার ভালোবাসার মর্যাদা আমি রাখতে পারি নি।”

মেহবিন বেরিয়ে চেয়ারম্যান বাড়ির পেছনের রাস্তা দিয়ে যাতে ওর পিছু কেউ না নিতে পারে। কিন্তু শেখ শাহনাওয়াজ বুঝতে পেরেছিলেন তাই তিনি ওর পেছনেই আসে। ওনাদের বের হতে দেখে মুখর দৌড়ে আসে ও কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছে ও নিজেও বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে যায়। কিন্তু ও রাস্তা খুঁজে পায় না কোন রাস্তায় গিয়েছে।আর বাড়ির সবাইকে বলে এখানে থাকতে। সবাই একপ্রকার থমকে গেছে কেউ কিছুই বুঝতে পারছে না। এতক্ষন যে মানুষ টা থম মেরে দাঁড়িয়ে ছিল সে হলো আরবাজ মিশু এসে ওর হাত ধরতেই ও মিশুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো আর বলতে লাগলো,,

‘আমি অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি মিশু।”

“বাবা আর ফুল কোথায় গেল বাজপাখি?”

কথাটা কানে যেতেই ওর মস্তিষ্ক সচল হয়ে উঠলো। ও দৌড়ে বেরিয়ে গেল। এদিকে কি হচ্ছে এখানে কিছুই কেউ বুঝতে পারছে না। মিশু নিজেও আরবাজের পেছনে বের হলো আজ আর কোন ভয় কাজ করছে না ওর ভেতরে। ওরা বেরিয়ে গেল কিন্তু পেছনে বাড়ির ভেতর রেখে গেল একঝাঁক প্রশ্ন।

রাত সেই সাথে ঝুম বৃষ্টি রাস্তায় কাক পক্ষি কেউই নেই। মেহবিন পাকা রাস্তায় বসে পরলো আর চিৎকার করতে লাগলো। উনিশ বছরের যতো কষ্ট আছে আজ সব যেন চিৎকারের মাধ্যমেই বের করতে চাইলো। ঝুম বৃষ্টি দেখে কেউ ওর বুকফাটা আর্তনাদে ভরা চিৎকার শুনতে পেল না। দুই জায়গায় দুই বাবা মেয়ের আর্তনাদের সাথে কি প্রকৃতিও চলতে চাইছে তাই তো থামার নাম নিচ্ছে না।

~ চলবে,,

#কাব্যের_বিহঙ্গিনী
#পর্ব_৩৮
#লেখিকা_আজরিনা_জ্যামি

শেখ শাহনাওয়াজ আর মেহেরুন নিসা ছিলেন ক্লাসমেট। দুজন দুজনের সাথে চোখাচোখি হতো মাঝে মাঝে একটু কথাও হতো দুজন দুজনকে পছন্দ করতো। শেখ শাহনাওয়াজ ভেবেছিলেন পড়াশোনা শেষ করে তারপরে মেহেররুনিসার বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবে। মেহেরুননিসার পরিবার ছিল শিক্ষিত মার্জিত ও রাজনৈতিক পরিবার। রাজনীতি পছন্দ করতো না বলে মেহেরুননিসা তার পরিবারের সাথে থাকতো না‌ হলে থাকতো। কিন্তু পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই শেখ শাহেনশাহ তার বন্ধুর মেয়ে আরিফা জামান কে পছন্দ করে তার ছেলের জন্য বিয়ে ঠিক করেন। তিনি এই বিষয়ে কিছুই জানতেন না। বাবার বাধ্যগত সন্তান আর যেহেতু ঠিক করে ফেলেছে আবার মেহেরুননিসা কে মনের কথা জানানোও হয় নি। সবদিক বিবেচনা করে শেখ শাহনাওয়াজ দেখলেন ওনার বাবার কথা মেনে নেওয়া ছাড়া পথ নেই। তাই তিনি না করতে পারলেন না। পড়াশোনা চলাকালীন তৃতীয় বর্ষে থাকতেই উনার বিয়ে হয়ে গেল। বলা বাহুল্য তিনিও শেখ শাহনাওয়াজ এবং মেহেরুননিসা ও ডাক্তারি পরছিলেন। ছেলের জন্যই শেখ শাহেনশাহ এস.এস. হাসপাতালটি খুলেছিলেন। শেখ শাহনাওয়াজ এর বিয়ের কথা শুনে মেহের ভেতরে ভেতরে অনেক ভেঙে পড়ে কিন্তু ওপরে বুঝতে দিতে চায় না। কিন্তু এই বিষয়ে তারই বা কি করার যেখানে শেখ শাহনাওয়াজই কিছু বলছেন না। আরিফা জামান আর শেখ শাহনাওয়াজ এর বিয়ে হয়। শেখ শাহনাওয়াজ সব ভুলে তার দায়িত্ব পালন করছিলেন। মেহের এর থেকে মন সরিয়ে আরিফার দিকে দিয়েছিলেন। এভাবেই একে অপরের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা তৈরি হয় তাদের। আরিফা জামান বাচ্চার চেষ্টা করেন কিন্তু হয় না অতঃপর তিনি ডক্টরের শরনাপন্ন হলে তিনি জানান আরিফা জামান কখনো মা হতে পারবে না। ব্যস এতেই তিনি অনেক ভেঙে পরেন। এদিকে শেখ শাহনাওয়াজ এর পড়াশোনা শেষ হয়ে যায়। শেখ শাহনাওয়াজ ও মেহেরুননিসা এস.এস. হাসপাতালের ডাক্তার হন। মেহেরুননিসা চাইতেন শেখ শাহনাওয়াজ এর আশেপাশে থাকতে তাই তিনিও শেখ হাসপাতালের ডাক্তার হন। আরো একটা বছর কেটে যায় কিন্তু আরিফা জামান নিজেকে শান্ত করতে পারে না এরপর শেখ শাহেনশাহ তিনবেলা সমানে বলেন তার ছেলে ওয়ারিস চাই। তার বংশ এগিয়ে নেওয়ার জন্য। আরিফা জামান সহ্য করতে পারলেন না। একদিন তো বলেই ফেললেন তিনি শেখ শাহনাওয়াজ কে আবার ও বিয়ে করাবেন। শেখ শাহেনশাহের সাথে তিনি কথা বললেন। ওয়ারিসের জন্য তিনি শুনেই রাজি হয়ে গেলেন। শেখ শাহেনশাহ এই জন্য দুই তিন জন মেয়েও দেখলেন ব্যস হয়ে গেল ।

আরিফা জামান কোন ভাবে শেখ শাহনাওয়াজ যে মেহেরুননিসা কে পছন্দ করতেন এটা জানতে পারেন। তিনি শেখ শাহনাওয়াজ কে মেহেরুননিসার সাথে কথা বলতে বলেন। শেখ শাহনাওয়াজ ও মেহেরকে মনে মনে ভালোবাসতেন তাই রাজি হয়ে যায়।তখনও মেহেরুননিসা তার পছন্দের মানুষ কে পায়নি বলে অবিবাহিত ছিলেন। মেহরব চৌধুরীর বাবা বা তিনি ও কখনো জোর করেনি তবে ছেলে দেখেছিলেন কোনটাই ঠিকঠাক হচ্ছিল না এই জন্য বিয়ে হয় নি। তবে শেখ শাহনাওয়াজ প্রস্তাব টা রাখবেন কি না এই নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। তিনি এমনিই মেহরব চৌধুরীর বাড়ি যান। তিনি নিজে সাহস যুগিয়ে কিছু বলতে পারলো না চলে এলো। আরিফা জামান কে জানালে তিনি পরের দিন মেহেরের হাসপাতালে গেল ওর সাথে কথাবার্তা বললো একটা পর্যায়ে বলেই ফেলল কথাটা। তিনি না করে দিলেন একসময় যতোই পছন্দ করুক না কেন স্বার্থের জন্য তিনি কোন সম্পর্কে জড়াবেন না। আরিফা জামান জানান তিনি তার সকল দায়িত্ব পালন করবেন। তবুও তিনি রাজি হলেন না।

কিন্তু বিয়ে নিয়ে মেহেরুননিসা আর আর ওনার বাবার মাঝে এক সময় তর্কবিতর্ক হয় তাদের কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে তিনি রাগে সিন্ধান্ত নিলেন তিনি শেখ শাহনাওয়াজ কে করবেন।এই জন্য বলা হয় রাগের মাথায় সিদ্ধান্ত কখনো সঠিক হয় না। তিনিই মানা করেছিলেন কিন্তু তার বাবার জন্য তিনিই আবার রাজি হলেন। এটা অবশ্য শেখ শাহেনশাহ আর আরিফা জামান লাগিয়েছিলেন তিনি মেহের কিছু কথা ওনার কানে তুলেছিলেন। এই জন্য তিনি রেগে মেয়ের সাথে বিয়ের কথা তুলেন। কিন্তু হিতে বিপরীত হয় তার তো কথা খাটেই না উল্টো আরিফা জামানের ফাদে পা দিয়ে মেয়েকে রাজি করেন। পরে অবশ্য বিষয়টা তিনি বুঝতে পারেন।মেহরব চৌধুরী জানতেন মেহের শেখ শাহনাওয়াজ কে পছন্দ করেন তাই তিনি বাঁধা দেন না। অতঃপর মেহেরুননিসা জানান শেখ শাহনাওয়াজ কে বিয়ে করবেন। মেহেরের সাথে শেখ শাহনাওয়াজ এর বিয়ে হয় তখন মেহরব চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। আরিফা জামান প্রথমে হাঁসি মুখে মেনে নিলেও ভেতরে ভেতরে সহ্য করতে পারতেন না। তবুও তিনি সন্তানের আশায় মুখিয়ে ছিল। অতঃপর এক বছর পর আরবাজ আর মিশু হয়। ছেলে হয়েছে এই খুশিতে আরিফা জামান তার নামের সাথে মিলিয়ে রাখেন আরবাজ। এই নিয়ে শেখ শাহনাওয়াজ কিংবা মেহের কিছুই বলে নি। কারন আরিফা জামান এর অনুভূতি বুঝতে পেরেছিলেন। মেহেরুননিসা তার মেয়ের নাম রাখলো মিশুমনি।

বাচ্চা হওয়ার পর থেকে আরিফা জামান শুধু তাদের নিয়েই থাকতেন। এদিকে শেখ শাহনাওয়াজ আগে থাকতেই মেহের কে ভালোবাসতেন বাচ্চা হওয়ার পর থেকে যেন তা ভালোবাসাটা যেন বেড়ে গেল। তা আরিফা জামানের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। তবুও তিনি কাউকে বুঝতে দিতেন না। মেহের ও আরিফা জামান কে আপা বলতো তাদের দেখে কেউ বলতেই পারবে না তারা সতিন ছিল বরং তারা দুই বোন ছিল। তার চার বছর পর মেহবিন আসে কোল আলো করে‌। মেহবিন নাম রাখে মেহেরুননিসা আর মুসকান রাখে শেখ শাহনাওয়াজ। তারা দু’জনেই মেহবিন কে আদর করতো সেই সাথে আরবাজ আর মিশু তো আছেই। আরবাজ কে মামনি বলতে শেখালেও আরবাজ কখনো আরিফা জামান কে মামনি বলেনি বড় মা বলেছে কিন্তু মিশু মায়ের কথা শুনে মামনিই বলেছে। আরবাজকে আর মিশুকে এক বছর পর স্কুলে দেওয়া হবে তাই আরিফা জামান শেখ শাহেনশাহ কে বলেন । শেখ শাহেনশাহ নাতি কী গ্ৰামের স্কুলে পরবে নাকি তাদের শহর স্কুলে পড়ানো উচিৎ। এ কথা শুনে তিনিও তাই মনস্থির করেন। উনি এই কারনেই বলেছিলেন যে মেহেরকে তার পছন্দ নয় সে ওনাকে সহ্য করতে পারছিলেন না। তাই সুযোগে চোখের সামনে থেকে সরিয়ে ফেলেন। শেখ শাহনাওয়াজ পরে যান বিপদে ( তখন হাসপাতাল মহুয়াপুর গ্ৰামেই ছিল পরে সেটা অন্য জায়গায় শিফ্ট করা হয় গল্পে এখনো সেটা উল্লেখ করিনি।) তাছাড়া দুই বউ ওনার থাকারও তো একটা সাম্যতা রাখতে হবে। অতঃপর তিনি মনস্থির করেন পনেরোদিন আরিফার কাছে থাকবে পনেরোদিন মেহেরের কাছে। এক কথা শুনে দুজনেই রাজি হয়।

এভাবেই চলতে থাকে সাত বছর। ঢাকায় আসার পর মেহেরুননিসা আরবাজদের ঠিকমতো মানুষ করার জন্য চাকরি ছেড়ে দেন। কিন্তু এই সাত বছরে আরিফা জামান আর মেহেরুন মুখোমুখি খুব কমই হয়েছে। মেহবিন পাকা পাকা কথা বলতে শিখেছে। বেশিরভাগ সময়ই তার শেখ শাহেনশাহ এর সাথে ঝগড়া লাগতো। আরিফার পেছনেও বড়মা বড়মা বলে লাফালাফি করতো। সবথেকে দুরন্ত বাচ্চা ছিল মেহবিন তবে এই নামটি শুধু তার মা বলতো আর সবাই মুসকান বলতো। এই জন্যই মেহবিন নামটা সবার অপরিচিত। আর ভুলে গেছে সবাই। আরবাজ আর মিশু মেহবিন কে ফুল বলতো। মেহবিনই ছোটবেলায় আরবাজকে নাম দিয়েছিল বাজপাখি। মিশুকে ও সবসময় ফুল আপু বলতো‌। তিন ভাইবোন পুরো বাড়ি মাতিয়ে রাখতো।

সেবার স্কুল ছুটি বিধায় মিশু আর আরবাজ ওর বাবার সাথে গ্ৰামে আসে। মেহবিন আর ওর মা ঢাকায় রয়ে যায়। মেহবিন পড়ার সময় বলল,,

“আচ্ছা মা বড়মা আমায় বাজপাখির মতো এতো আদর করে না কেন?”

মেহের মুচকি হেসে বলল,,

“মানুষ স্বার্থপর স্বার্থ হাসিল হলে কেউ কারো পরোয়া করে না।”

“তাহলে কি আমিও স্বার্থপর মা? তুমিও কি স্বার্থপর? বাবাও বাজপাখি ফুল আপু সবাই কি স্বার্থপর?”

“তুমি আরবাজ মিশু স্বার্থপর কি না তা এখনো বুঝিনি কারন তোমাদের মাঝে আমি এখনো স্বার্থপরতা দেখিনি। তবে আমি আর তোমার বাবা স্বার্থপর। আমরা একে অপরের স্বার্থের জন্য একে অপরের সাথে জড়িয়েছি। আমি জরিয়েছি আমার পছন্দের মানুষটাকে প্রাপ্তির খাতায় রাখবো বলে। আর তোমার বাবা জড়িয়েছে এই তোমাদের কে পাবে বলে।”

“তুমি কি বললে আমি কিছুই বুঝলাম না।”

“তোমার এইটুকু মাথায় এতকিছু বোঝাতে হবে না পাকুন্নি। শুধু একটা কথা মাথায় রাখবে মেহবিন তোমার জন্য যেন কারো কখনো ক্ষতি না হয়। সবসময় যেন ভালো হয়।

“আচ্ছা। আজ তো কেউ নেই চলো আমি আর তুমি মিলে কানামাছি খেলবো।”

“এই রাতে?”

“আমাদের বাড়ি কি অন্ধকার নাকি যে রাত দিন আলাদা করতে হবে চলো তো তুমি।”

“তোমার কুসুম আপু ( কাজের মেয়ে)কোথায়? ওকেও ডাকো তিনজনে একসাথে খেলবো।”

“আচ্ছা ঠিক আছে।”

মেহবিন তাকে গিয়ে নিয়ে এলো। অতঃপর তিনজনে মিলে কানামাছি খেললো। রাতে খাবার দাবার সেড়ে নয়টার দিকে ওরা শুতে গেল মেহবিন দুষ্টুমি করছিল ওর মায়ের সাথে। শেখ শাহনাওয়াজ ফোন করলে তারা দুজন সবার সাথে ফোনে কথা বলে। ফোন রেখে মেহবিন কে শুয়াবে এমন সময় তখন কুসুম নিচে ডাক দিল তিনি মেহবিন কে শান্ত হয়ে বসে থাকতে বলল। তিনি মেহববিনকে চুপচাপ শুয়ে থাকতে বলে বের হন।। মেহের সিঁড়ির কাছে আসতেই কুসুম মেহেরের হাত ধরে বলল,,

“আপনার সময় ফুরাই আইছে কিছুজনের আপনারে এক ফুটাও সহ্য হয় না।”

বলেই দিল ধাক্কা। উনি ব্যাথাতুর আওয়াজ করতে করতে একদম নিচে চলে যায়। এদিকে মেহবিন মায়ের আওয়াজ পেতেই দৌড়ে আসে। সিঁড়ির কাছে আসতেই ও দেখলো ওর মা নিচে পরে আছে মাথা দিয়ে রক্ত পরছে। ও “মা; বলে চিৎকার করে নিচে নামলো তারপর কুসুম কে ডাকতে লাগলো কিন্তু পুরো বাড়িতে কেউ নেই মনে হলো। তিন চার মিনিট পর তখনি আল্লাহ বলে কুসুম এলো। মেহবিন বলল,,

“কুসুম আপু তাড়াতাড়ি মাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।”

সে বলল,,

“তুমি খাড়াও আমি তো নিতে পারুম না ড্রাইভাররে আর দারোয়ান রে ডাইকা নিয়া আসি।”

কুসুম যেতেই মেহবিন ওর মায়ের হাত ধরে বলল,,

“তোমার কিছুই হবে না মা আমরা হাসপাতালে যাবো।”

উনি কিছু বলার চেষ্টা করলেন কিন্তু পারলেন না। শুধু মেয়ের কান্না দেখতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর কুসুম এলো দুজনকে নিয়ে অতঃপর হাসপাতালে নেওয়া হলো ততক্ষণে মেহের অজ্ঞান হয়ে গেছে। মেহবিন ওনার হাত ধরে রইল এক মুহুর্তের জন্যও ছাড়লো না। ডাক্তাররা কতো বলল তবুও মেহবিন জেদ ধরে মায়ের হাত ধরেই রইলো। কিন্তু সব ট্রিটমেন্ট করার পর এতক্ষনে মেহেরের জ্ঞান ফিরে আসার কথা কিন্তু আসছে না দেখে ডাক্তাররা একটু চিন্তিত হলেন। উনারা একটা ইনজেকশন দিলে মেহেরের জ্ঞান ফিরে আসে।প্রথম চোখ খুলেই তিনি দেখতে পান তার সেই ছোট্ট কলিজাটা তার হাত ধরে কাঁদছে। মুহুর্তেই তার মুখে হাঁসি ফুটে উঠল। তিনি মেয়ের হাত ধরে বলল,,

“মেহবিন?”

মেহবিন মাথা উঁচু করে মায়ের দিকে তাকালো চোখ মুখ ফুলে গেছে ফর্সা চেহারাটা লাল বর্ন ধারন করেছে‌।‌ মেহবিন মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,,

“মা তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে।”

“যেখানে আমার মেহবিন আমার সাথে আছে সেখানে কষ্ট কিসের?”

“তুমি জানো মা কুসুম আপু সেই যে গেল আর এলো না।কাউকেই দেখছি না আমি কুসুম আপুকে বলেছি বাবাকে খবর দিতে দিয়েছে কিনা। বাবাও তো এলো না মা।”

“তোমার বাবা খবর পেলে ঠিকই আসবে মেহবিন।”

মেহেরুননিসা মেহবিন কে তার বুকের ওপর শুয়ালেন ডাক্তার নার্স মানা করল তবুও তিনি শুনলেন না। মেহেরুননিসা ডাক্তারদের বলল ওখান থেকে চলে যেতে তিনি তার মেয়ের সাথে থাকবেন। তারা চলে গেল। মেহের বলল,,

“মেহবিন?”

মায়ের বুকে শুয়ে শুয়েই বলল,,

“হুম!”

“আমি যা বলবো একদম মন দিয়ে শুনবে। আর আমি যখন থাকবো না তখন আমার এই কথাগুলো মনে রাখবে।”

“তুমি কোথায় যাবে মা আমি তোমায় যেতেই দেব না। তোমার বুকে না শুলে তো আমার ঘুমই আসে না। তোমাকে ছাড়া আমি ঘুমাবো কিভাবে? তুমি সবসময় আমার সাথে থাকবে।”

“আল্লাহ চাইলে থাকবো তো মা।এখন মন দিয়ে শুনো।

এই দুনিয়ায় কেউ কারো না সবাই নিজেদের স্বার্থের জন্য ব্যবহার করে একটা সময় ছুড়ে ফেলতে পারে। নিজেকে এমন ভাবে তৈরি করবে যাতে কেউ তোমাকে তার স্বার্থের জন্য কাজে লাগাতে না পারে। এই দুনিয়ায় মুখোশধারী ভালোবাসার অভাব নেই। তবে সবার আগে তুমি মানুষ চিনতে চেষ্টা করবে কে কেমন সহজেই কাউকে বিশ্বাস করবে না। তুমি নিজেকে ভালোবেসো আর নিজের ওপর সবসময় বিশ্বাস ভরসা রেখো আর আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ভরসা করে চলবে জীবনে ধোঁকা খাবে না। নিজের দূর্বলতা কারো কাছে প্রকাশ করবে না তাই কেউ তোমার দূর্বলতা জানবে না আর আঘাত ও করতে পারবে না। যতো যাই হয়ে যাক না কেন কখনো কাঁদবে না। কারন কান্না মানুষ কে দূর্বল করে দেয়। আর কাদলে কি কখনো সব ঠিক হয়ে যায় নাকি হয়না তো তাহলে শুধু শুধু চোখের পানি ঝড়িয়ে কি লাভ। কেউ তোমার সাথে অন্যায় করলে তাকে তুমি অবশ্যই শাস্তি দেবে তবে সবসময় মারামারি করে নয় মাঝে মাঝে এমন ভাবে দেবে সে নিজেই যেন নিজের চোখে চোখ রাখতে পারে না। যাতে সে নিজেই বুঝতে পারে সে কি ভুল করেছে। আর যদি তাও না বুঝে তাহলে তুমি তাকে কঠিন শাস্তি দেবে যেটা তোমার মনে চায় তবে কখনো অন্যায়ভাবে নয়। আমি জানি তুমি বুঝতে পারবে কখন কাকে কিভাবে শাস্তি দিতে হবে। নিজেকে এমন ভাবে তৈরি করবে তোমাকে ছুঁতেও যেন কেউ দশবার ভাবে।

তুমি থাকবে মুক্ত বিহঙ্গিনীর মতো বিহঙ্গিনী বুঝোতো মেয়ে পাখি। তুমি থাকবে বিহঙ্গিনীর মতো তার নিজের মর্জির মালিক সে নিজে থাকবে। একটু অবাধ্য হবে অন্যের মন যুগিয়ে চলার জন্য কিছু করবে না। কারো মনমতো হওয়ার তার কোন দায় থাকবে না। সে থাকবে তার নিজের মতো। তার কাছে তার আত্মসম্মান সবার ওপরে থাকবে। সে এতটাই শক্ত থাকবে যে কেউ সহজে তাকে ভাঙতে পারবে না। নিজের পায়ের তলার মাটি সবসময় শক্ত রাখবে যাতে চাইলেও সহজে তোমার পায়ের তলার মাটি সরিয়ে না ফেলতে পারে। কখনো অন্যায় দেখলে তার প্রতিবাদ করবে। তোমার চোখের সামনে কেউ যেন অন্যায় করে পার না পায়‌। সবসময় মাথা ঠান্ডা রাখবে ঠান্ডা মাথায় কিভাবে সব সামাল দেওয়া যায় সেটা ভাববে। তাড়াহুড়ো করে কোনদিন সিদ্ধান্ত নেবে না। আর রাগের মাথায় তো কোনোদিন ও না। কারন রাগের মাথায় সিদ্ধান্ত গ্ৰহন করলে সেই সিদ্ধান্ত কখনো সঠিক হয় না। তার প্রমান আমি নিজেই।কেউ কিছু বললে সাথে সাথেই তার জবাব দেবে না। এক মিনিট সময় ব্যয় করে তারপর জবাব দেবে দেখবে জবাব পাল্টে গেছে আর তুমি তাকে এমন একটা জবাব দিয়েছো যার প্ররিপেক্ষিতে সে আর কিছুই বলতে পারছে না। নিজেকে খুশি থাকার উপায় নিজেই খুঁজবে সর্বদা হাসিমুখে সব সামাল দেবে। কারো কথা ভেবে বা দুই কথা শুনে ভেঙে পরবে না। নিজেকে শক্ত ভাবে তৈরি করবে। জীবনে যাই হোক না কেন কেউ যেন বিহঙ্গিনী কে বুঝতে না পারে। নিজের চারপাশে একটা গন্ডী টানবে সবাইকে বিশ্বাস করতে সময় নিবে। যেখানে তোমার অসম্মান হবে সেই স্থান ত্যাগ করবে।

আর এটা মনে রাখবে তোমার জীবনে যা হবে তা তকদিরে লেখা ছিল যাই হোক না কেন কখনো আফসোস করবে না। আল্লাহর ওপর ভরসা আর তাওয়াক্কুল রাখবে। কারন কেউ তোমার সাথে না থাকলেও ঐ একজন সবসময় তোমার সাথে থাকবে। সবশেষে যারা তোমায় নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবাসবে তাদের নিজের সবটা উজাড় করে ভালোবাসবে। তোমার দ্বারা যেন অন্যের ভালো ছাড়া ক্ষতি না হয়। অন্যায়ের জন্য কঠোরতা রাখলেও মন থেকে যেন কোমলতা হাঁড়িয়ে না যায়। অসাধারণ ব্যক্তির অধিকারী হবে তুমি। যাকে কেউ ভাঙতে পারবে না। নিজেকে আগুনের ন্যয় তৈরি করবে যাকে ছোয়া তো দূর কাছে আসতেও যেন আশংকা সে যেন ঝলসে না যায়। অতঃপর যাই হোক না কেন তুমি বাঁচবে প্রানখুলে। তোমাকে বাঁচতে হবে আমার জন্য।

সবশুনে মেহবিন অনেক কিছুই বুঝতে পারলো আবার কিছুই বুঝতে পারলো না তেমন করে। তবুও সে মায়ের কিছুটা বুঝতে পেরে ও বলল,,

“আমি সব করবো মা তুমি শুধু আমার সাথে থেকো।”

মেহেরুননিসার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। এতোক্ষণ খুব কষ্ট করে শান্ত ভাবে মেয়েকে কথাগুলো বলেছিল। তিনি বললেন,

‘আল্লাহ চাইলে থাকবো মা। আমি সবসময় তোমার সাথে থাকবো।”

“হুম আর কোন কথা বলো না মা। ডক্টর আন্টি বললো না বেশি কথা না বলতে। তুমি এখন ঘুমাও কুসুম আপু মনে হয় বাবাকে ফোন করেছে বাবা এসে পরবে মা।”

‘হুম তুমিও ঘুমাও মা অনেক রাত হয়ে গেছে।”

‘হুম।”

“মেহবিন?”

“হুম!”

“আমি তোমায় অনেক ভালবাসি মেহবিন। হয়তো সবসময় আমি তোমার সাথে থাকতে পারবো না। কিন্তু তুমি মনে রেখো তোমার মা তোমায় অনেক ভালোবাসে। আর যখন আমাকে খুব মনে পরবে তখন চোখ বন্ধ করে ভাববে আমি তোমার পাশেই আছি।”

“এসব কেন বলছো মা।”

“কিছু না এমনিই।”

“ঘুমাও এখন তুমি। আমার ও খুব ঘুম পাচ্ছে মা।”

“আচ্ছা আমি আর একটা কথাও বলবো না। তুমি ঘুমাও আমি তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।”

মেহেরুননিসা মেয়েকে অনেক শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। মেহবিন ঘুমিয়ে পরেছে‌। তিনি মাথায় একটা চুমু দিয়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,,

“আমি তোমায় অনেক ভালোবাসি মেহবিন মা। জানিনা তোমার সাথে থাকতে পারবো কিনা। আরবাজ আর মিশু ঠিক থাকবে কারন তারা শাহের কাছে এখন। কিন্তু তোমাকে অথৈ সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে যাচ্ছি আমার কিছু করার নেই। এই জন্য ক্ষমা করে দিও আমায়। তোমায় অনেক শক্ত হতে হবে মা। নাহলে ওরা যে তোমায় বাঁচতে দেবে না। কারো কারো স্বার্থপরতার কাছে আমাকে বিলীন হতে হলো কিন্তু আমি চাই না তুমিও হও। অনেক ভালো থাকবে তুমি মা এই দোয়াই করি। সবশেষে ভালোবাসি আমার কলিজা।”

বলতে বলতেই ওনার চোখ থেকে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পরলো। তিনি আস্তে আস্তে চোখ বুঝলেন। ঘন্টাখানেক পর কারো টান পরায় মেহবিনের ঘুম ভেঙে গেল। ও চোখ খুলেই দেখলো ওর মায়ের মুখটা সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিচ্ছে ডাক্তার। তা দেখে মেহবিন নার্সের কোল থেকে নেমে দৌড়ে এসে বলল,,

“ডাক্তার আন্টি তুমি মায়ের মুখ ঢাকছো কেন? মা তো ঘুমাচ্ছে আর মা মুখ ঢেকে ঘুমাতে পারে না‌। মায়ের দমবন্ধ হয়ে আসে। কাপড় সরাও মুখ থেকে।”

মেহবিনের কথায় ডাক্তারের চোখ ছলছল করে উঠলো। তিনি আজ পর্যন্ত এমন বাচ্চাকে দেখেনি যে সবটা সময় তার মায়ের হাত ধরে বসেছিল। এমনকি মায়ের মৃত্যুর পরও তার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে ছিল। এই মেয়েটাকে তিনি কি করে বলবেন তার মা ঘুমের মাঝেই চলে গেছেন। আর এতোক্ষণ তার মৃত মায়ের বুকে শুয়ে ছিল। তিনি মেহবিন কে কোলে নিয়ে বলল,,

“তোমার মা একেবারে ঘুমিয়ে গেছে আম্মু। তোমার আম্মু আল্লাহর খুব প্রিয় ছিল তো তাই আল্লাহ তায়ালা তার কাছে নিয়ে গেছে।”

ডাক্তারের কথায় মেহবিন গোল গোল করে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে রইল। আর বলল,,

“তুমি মিথ্যা কথা কেন বলছো? একটু আগেও মা আমার সাথে কথা বলছিল কতো কিছু বলছিল। আমি মায়ের বুকের ওপর শুয়ে ছিলাম। মায়ের বুকে ঢিপঢিপ আওয়াজ হচ্ছিলো আমার তো সেটা শুনতে ভালো লাগে। সেই আওয়াজ টা হচ্ছিল তো।”

“আর হবে না আওয়াজ আম্মু ।”

“হবে আমাকে নামাও আমি শুনছি।”

মেহবিন জোর করে নেমে আর মেহেরুননিসার ওপর থেকে কাপর সরিয়ে বুকের ওপর শুয়ে পড়লো আর বলল,,

‘মা দেখো তো ডাক্তার আন্টি কি বলছে তোমার বুকের ঢিপঢিপ আওয়াজ নাকি শোনা যাবে না। আমি তো সবসময় শুনি বলো। একটু আগেও শুনছিলাম।”

মেহবিন চুপ করে ওর মায়ের বুকের বুকের মাঝে লেপ্টে রইলো আর খুব মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করলো তার মায়ের বুকে ঢিপঢিপ আওয়াজ। অনেকক্ষণ চেষ্টার পরেও তখন শুনতে পেল না। তখন ও মাথা উঠিয়ে বলল,,

“ডাক্তার আন্টি দেখো তো মায়ের কি যেন হয়েছে আওয়াজটা হচ্ছে না। ইনজেকশন লাগাও একটা হবে তবে আস্তে দিও মা কিন্ত ইনজেকশন এ ভয় পায়।”

ডাক্তার এখন কেঁদেই দিলেন মেহবিনের কাজে তিনি নিজেকে সামলে বললেন,,

“তোমার মা মারা গেছে আম্মু। ঐ আওয়াজ কখনোই হবে না। তোমার মা তোমায় ছেড়ে আল্লাহর কাছে চলে গেছে।

“কি মারা গেছে?”

“হুম।ওনাকে হাসপাতালে আনতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। যদি আরো আগে আনা হতো তাহলে হয়তো তোমার মা বেঁচে থাকতো।”

এইকথাটা শুনে মেহবিন গোল গোল তার দিকে তাকিয়ে রইলো। ও মনে মনে আওয়ালো আরো আগে আনলে মা বেঁচে থাকতো। তারপর বলল,,

“উঁহু আমি বিশ্বাস করি না একটু আগেও আমার মা আমার সাথে কথা বলেছিল।

মেহবিন ওর মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। আর বলল,,

‘দেখো না মা ডক্টর আন্টি কি বলছে। তুমি নাকি মারা গেছো। তুমি একটু আগে বললে আমার সাথে সবসময় থাকবে। তাহলে তাছাড়া তোমার বুকে না শুলে তো আমি ঘুমাতেই পারি না। আমি তোমাকে ছাড়া থাকবো কিভাবে? আচ্ছা মা তুমি উঠছো না কেন আচ্ছা তুমি কি আজ তুমি ডক্টর ডক্টর খেলছো আজ খেলতে হবে না। তুমি তো সবসময় পেশেন্ট থাকো আজ তোমায় থাকতে হবে না। উঠো না মা। তুমি উঠে বলে দাও তুমি আমায় ছেড়ে যাও নি।”

ডাক্তার সামনে এগিয়ে গিয়ে মেহবিনকে উঠানোর চেষ্টা করলো। মেহবিন শক্ত করে ওর মাকে জড়িয়ে ধরলো। টপ ডাক্তার বলল,,

“উঠো আম্মু তোমার মাকে নিয়ে যেতে হবে।”

‘না না আমি মাকে কোথাও যেতে দেব না। মা আমার আমার সাথেই থাকবে।”

এবার মেহবিন চিৎকার করে কেঁদে উঠলো মাকে জড়িয়ে ধরে। যা দেখে ওখানে থাকা নার্স ডাক্তার সবার চোখেই পানি চলে এলো।এক নার্স গিয়ে মেহবিনকে জোর করে ছাড়াতে চাইলো মেহবিন বলল,,

“না আমি মাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না। মা আমার সাথে থাকবে।”

ডাক্তার আর নার্স মিলে জোর করে ওকে ছাড়ালো।আর শক্ত করে জরিয়ে ধরলো ডাক্তার। মেহেরুননিসাকে নিয়ে যাওয়া হলো যতোক্ষন পর্যন্ত না মেহবিনের চোখের আড়াল হলো সেই পর্যন্ত ও তাকিয়ে রইল। তাকে চোখের আড়াল করতেই মেহবিন কেমন যেন শান্ত হয়ে গেল। ওর মায়ের কথাগুলো মনে করতে লাগলো। ও চোখ মুছে নিল। হঠাৎ করে এমন হওয়ায় ডাক্তার অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো ওর দিকে। তারপর ওখানে কুসুম আসলো ওকে দেখে ডাক্তার চলে গেল।সে মেহবিনকে বলল,,

“তোমার বাবাকে আসতে বলেছি তিনি আসছে। তোমার মা কোথায় মুসকান?”

মেহবিন কোন কথা বললো না চুপ করে বেঞ্চে বসে রইলো। কুসুম তা দেখে অবাক হলো। ওর একটা ফোন আসতেই ও চলে গেল। তারপর একটা কেবিনে ঢুকলো তখন মেহবিনও কেন যেন ওখানে গিয়ে দাঁড়ালো। ও কেবিনে ঢুকবে এমন সময় ও শুনতে পেল একজনের গলা।

“এতোক্ষণ কোথায় ছিলে আমি তো ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম।”

তখন কুসুম বলল,,

“ভয়ের কি আছে এখানে তো ঐ ছোট বাচ্চা ছাড়া পেশেন্ট এর বাড়ির আর কেউ নেই। আর আসবেও না আর যে আসার সে জানেও না এখানে কি হয়েছে। আমি যে ওনাকে বিষ দিয়েছিলাম আগে তিন ঘন্টা পর পর সেই বিষ কাজ শুরু করে। আর সেটা করেছেও মেহেরুননিসা মরে গেছে। কিন্তু আফসোস সেটাও কেউ জানবে না। সেটার রিপোর্ট পাল্টাতে গিয়েই তো আসতে দেরি হয়ে গেল। ঐ ডাক্তার খুব চালাক সে মুসকানের মায়ের ভাব দেখেই টেস্ট করতে দিয়েছিল। সেই টেস্টের আসল রিপোর্ট এলে তো সবাই জেনে যেতো তার মৃত্যু সিঁড়ি থেকে পরে যাওয়ার কারনে হয় নি বিষের কারনে হয়েছে। এখন মুসকানকেও সরাতে হবে। এই মেয়েও খুব ধরিবাজ। এই জন্যই তো স্যার আর ম্যাডাম সরাতে বলেছে।”

‘ঐ বাচ্চা মেয়েটার জন্য খুব খারাপ লাগছে। মেয়েটা কতো কাঁদছিল ওকে না মারলে হয় না।”

“না হয়না ঐ মেয়েকে এখন তাদের দরকার নেই। কেন যেন ঐ মেয়েকে তারা সহ্য করতে পারে না তাই তো তাকে মেরে ফেলতে বলেছে। এখন অনেক হয়েছে এখন যাই ওকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে এই হাসপাতাল থেকে বের করতে হবে। বাইরেই গাড়ি রেডি আছে।”

এই সবকিছু মেহবিন আড়াল থেকে শুনলো ওর মায়ের একটা কথা ছিল। অতঃপর তুমি প্রানখুলে বাঁচবে। তোমায় বাঁচতে হবে আমার জন্য। কথাটা মস্তিষ্কে আসতেই ও ওখান থেকে চলে আসলো। ও খুব ভয় পেয়েছে সদ্য মা হারা মেয়ে এখন নিজের বাঁচার তাগিদে দৌড়াচ্ছে। এদিকে কুসুম বাইরে এসে মেহবিন কে খুঁজতে লাগলো। কয়েকজন কে জিজ্ঞেস করলো তখন একজন বলল বাইরে বেরিয়ে গেছে। মেহবিন দৌড়াতে দৌড়াতে অনেক দূরে এসে পড়লো রাত প্রায় একটা এখন ও রাস্তায় হালকা গাড়ি চলছে। হুট করেই মেহবিন দেখলো ওর বাবা এক হাসপাতাল থেকে বের হচ্ছে। তা দেখেই মেহবিন জোরে ডাক দিল।

“বাবা!

প্রথম ডাকটা শেখ শাহনাওয়াজ এর কানে গেল না। মেহবিন জোরে জোরে ডাকতে লাগলো। মেহবিন রাস্তা পার হওয়ার জন্য এগুতেই একটা গাড়ির সাথে ধাক্কা লাগলো ও রাস্তায় পরে গেল। চোখ সামনের দিকে মেহবিন দেখলো ওর বাবা ঠায় দাঁড়িয়ে ওর দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। ওর দিকে আসছেও না। তখন গাড়ি থেকে দুজন মানুষ নামলো তারা আর কেউ নয় আলম আহমেদ আর মিসেস সাবিনা। মিসেস সাবিনা ওকে কোলে তুলে নিল মাথা দিয়ে রক্ত পরছে তবুও ওর দৃষ্টি শেখ শাহনাওয়াজ এর দিকে। ওনাকে দেখতে দেখতেই মেহবিন চোখ বুঝলো। চোখ বোঝার আগে একবার অস্ফুট স্বরে বলেছিল “আমার বাবা!’আলম আহমেদ ওকে তাড়াতাড়ি করে সামনের হাসপাতালে নিয়ে গেল। তারপর নিজের বাড়িতে এভাবেই শুরু হয়েছিল মেহবিনের জীবনের আরেকটা অধ্যায়।

~চলবে,,

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ