Friday, June 5, 2026







চন্দ্রকিরণ পর্ব-০৬

#চন্দ্রকিরণ
কলমে:লাবণ্য ইয়াসমিন
পর্ব:৬

মায়ের ডায়রী হাত বসে আছে আরিয়ান। অর্ধেক অংশ পড়া শেষ। ঝাপসা চোখ দুটো মুছে আবারও শুরু করবে এমন সময় হুট করে কক্ষের দরজা খুলে গেলো। কমোলিনি হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো। আরিয়ান হাতের ডায়রী দ্রুত লুকিয়ে জিঞ্জাসু চোখে তাকালো। কমোলিনি উত্তেজিত হয়ে বলল,
> বাবা সর্বনাশ হয়েছে। তোমার ফিরোজ ভাইজানকে পুলিশ থানায় আটকে রেখেছে। সে গতকাল রাতে নারী কেলে*ঙ্কারিতে জড়িয়েছে। কতবার বললাম ফিরে যেতে কিন্তু এই ছেলে কথায় শুনে না। বাবা কিছু একটা করো। ওকে ছাড়িয়ে এনে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করো। এই পরিস্থিতিতে কিছুতেই এখানে ওকে দেশে রাখা যাবে না।
ফুপি মায়ের কথায় আরিয়ানের কপালে চিন্তার ভাজ পড়লো। ফিরোজ সম্পর্কে ওর যথেষ্ট ধারণা আছে। লোকটা রাজনীতিকে ভালোবাসে। দেশের মানুষের পাশে থাকবে বিধায় দেশে ফিরে এসেছে। লোকটা আর যাইহোক এসব আজেবাজে কাজে থাকবে না। এর পেছনে গভীর ষড়*যন্ত্র আছে। কথাটা ভেবে ও উঠে আসলো। বিছানা থেকে ফোনটা নিয়ে বেরিয়ে আসার সময় জাহানের সঙ্গে দেখা। মেয়েটা চিন্তিত মুখে বলল,

> আমিও যাব আপনার সঙ্গে। প্লিজ নিয়ে চলুন। আমি আব্বাজানকে বলেছি উনি মিটিংয়ে আছেন। ঘন্টা খানিকটা পরে আসতে পারবেন।

আরিয়ান কথা বললো না। ওকে ইশারায় সঙ্গে আসতে বললো। কিন্তু কমোলিনি মানলেন না। ধমক দিয়ে বললেন,

> বাড়ির বউ থানায় যাবে মান সম্মান থাকবে? আরিয়ান ফিরোজকে ফিরিয়ে আনতে পারবে। থানায় বলে আসবে আমরা আজকের মধ্যেই ফিরোজের বিয়ের ব্যবস্থা করবো।

আরিয়ান প্রথমবার ফুপিমায়ের উপরে বিরক্ত হলো। ঝামেলা হয়েছে সেটা না জেনেই বিয়ের কথা আসছে কেনো বুঝতে পারছে না। তবে উত্তর দিলো না। সোজাসুজি জাহানের হাত ধরে দ্রুতগতিতে পা চালিয়ে বলল,

> হবু ব্যারিষ্টারের আজ কঠিন পরীক্ষা। ফেল করলে শাস্তি হিসেবে আজীবন সংসারের গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। বাচ্চাকাচ্চা ছা-পা নিয়ে হাড়ি পাতিল ছুড়াছুড়ি করে জীবন কাটাতে হবে। পারবেন তো?

আরিয়ানের কণ্ঠ গম্ভীর কিন্তু মনে হলো মজা করছে। জাহান এক প্রকার ছুটটে। সমানে পা চালাতে কষ্ট হচ্ছে। লোকটা লম্বা পা ফেলছে জাহান তাল রেখে হাটতে পরছে না। দৌড়ে দৌড়ে গিয়ে অর্ধেক পুরাতন জিপটাতে উঠলো। এটা বাড়ির গাড়ি। আরিয়ানের গাড়ি গতকাল ফিরোজ নিয়ে গিয়েছিল। হয়তো ওর সঙ্গেই আছে। দুজনের থানায় পৌঁছাতে আধা ঘন্টা টাইম লাগলো। সারা রাস্তায় দুজনে চুপচাপ ছিলো। থানার ভেতরে প্রবেশ করেই আরিয়ান ছুটলো বড় বাবুর সঙ্গে কথা বলতে কিন্তু জাহান গেলো লকাপের দিকে। থানার পরিবেশ খুব একটা ভালো না। লকাপের অবস্থা আরও বাজে। ওয়াশরুমের ভাঙা দরজা। মশার উৎপাত। সঙ্গে বাজে গন্ধ।জাহান সামনে দাঁড়িয়ে চোখ বুলিয়ে নিলো। ফিরোজ ফ্লরে বসে আছে। উস্কোখুস্কো চুল গায়ের সার্ট গরমে ভিজে জবজব করছে। অসহায় অবস্থা। জাহান মৃদু কণ্ঠে ডাকলো,

> ভাইজান শুনছেন?

জাহানের ডাক কানে পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে ফিরোজ উঠে আসলো। মাথা নিচু করে ছলছল চোখে বলল,
> বিশ্বাস করো আমি এসব জঘন্য কাজ করিনি। বাড়িতে ফিরলাম রাস্তার মধ্যে ফোন এসেছিল। একটা মেয়ে সাহায্য চাইছিলো। বলছিলো ওকে আটকে রেখেছে। পাচার*কারীরা রাতের মধ্যে বিক্রি করে দিবে। এটা ওটা বলে খুব কাঁদছিলো। একটা মেয়ে বিপদে আছে আর আমি সাহায্য করবোনা এমন হয় বলো? তখনই গাড়ি নিয়ে ছুটে গেছি। কিন্তু ওর বলা ঠিকানায় গিয়ে অবাক হলাম।। পুরাতন ভাঙাচুরা বাড়ি। লোকজন কেউ ছিল না। আমি আশেপাশে তাকিয়ে সোজা কক্ষের দিকে এগিয়ে গেলাম। দরজা খোঁলা ছিল কিন্তু কক্ষে আলো ছিল না। আমি কতবার ডাকলাম কেউ সাড়াশব্দ করলোনা। তারপর হুটকরে দরজা বন্ধ হয়ে গেলো।কিছুক্ষণ করে কক্ষের মধ্যে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম।বুঝলাম কেউ আছে।আমি অন্ধকারে মেয়েটার কাছে গিয়ে হামু হতেই আলো জ্বলে উঠলো। সামনে তাকিয়ে আমি চমকে উঠলাম। ওই মেয়েটা এলোমেলো চুলে অর্ধনগ্ন হয়ে বসে ছিলো। কিছু জিঞ্জাসা করবো তার আগেই দরজা খুলে কতগুলো মানুষ ভেতরে প্রবেশ করলো। কিছু জানিনা অথচ ওরা বলছে আমি নাকি এই মেয়ের সঙ্গে বাজে কিছু করেছি। ওই মেয়েকে বিয়ে করতে হবে। এখন তুমিই বলো কিভাবে রাজি হবো? ওরা যদি আমাকে না ফাঁসাতো সব সত্যি হতো আমি উদার মনে এই মেয়েকে মেনে নিতাম। মেয়েতো মেয়েই হয়। ওসব লাঞ্ছিত শব্দের সঙ্গে আমার ঘৃণা টৃনা আসেনা। আমার ক্যারিয়ারটা শেষ করে দিলো। অদ্ভুত কথা কি জানো এই মেয়ে আরিয়ানের সৎবোন। আত্মীয় মানুষ হয়ে কেনো এমন করছে ওরা?

সংক্ষেপে ফিরোজ নিজের সঙ্গে হওয়া ঘটনা বর্ণনা করলো। ছেলেটা বারবার ঢোক গিলছে। হয়তো গতকাল থেকে খালি পেটে আছে। জাহান হাতের ফোনটা নিয়ে কাকে একটা টেক্সট করে বলল,

> ভাইজান আমি আপনাকে সাহায্য করবো। ওসব বিয়ে টিয়ে করতে হবে না। কিন্তু আমার কথা আপনাকে শুনতে হবে। সত্য মিথ্যা যায় বলি আপনি শুধু মাথা নাড়বেন। পারবেন না?

ফিরোজ বেশ লজ্জা পাচ্ছে। বাংলাদেশের পাতি নেতা থেকে শুরু করে বিখ্যাত কুখ্যা*ত সকলের নামের সঙ্গেই প্রায় এসব ঘটনা জড়িয়ে আছে কিন্তু ফিরোজ নতুন। তাছাড়া এসব বিষয়ে ওর ধারণা নেই। দলের লোকজন জানলে সম্মান যাবে এটা ভেবে আরও দুমড়ে যাচ্ছে। জাহানের কথায় ও ভরসা পেলো। ভাবছে আরিয়ান এসেছে নিশ্চয়ই ওকে নিয়ে যাবে।কিন্তু দোষী শাস্তি না পেলে আসল সত্যি সামনে না আসলে ফিরোজ শান্তি পাচ্ছে না। ওদের দুজনের কথার মধ্যেই একজন লোক ভেতরে প্রবেশ করলো। লোকটা একটা কোর্ট পেপার সামনে এগিয়ে দিলো জাহানের দিকে। জাহান সেটা ফিরোজের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,

> ভাইজান আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় একটা সিদ্ধান্ত আপনার বোন নিচ্ছে। কথা দিচ্ছি যদি কখনও মনে হয় আপনার বোন ভুল করেছে তবে আপনি চাইলে নিজের মতো পদক্ষেপ নিতে পারেন। এখানে সাইন করুন। বোনের উপরে ভরসা রাখুন।

ফিরোজ কথা বললোনা। সোজা সাইন করে ওর হাতে পেপারটা এগিয়ে দিয়ে বলল,

> তোমাকে আমি বিশ্বাস করি। মেহের আপা আমার কয়েক বছরের বড় ছিল কিন্তু ওর মন খুব পবিত্র ছিল। আমাদের সবাইকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতো। বাবা আমাকে অস্ট্রেলিয়া না পাঠালে মেহের আপাকে কিছুতেই ম*রতে দিতাম না। তুমি আপার মতো দেখতে। তোমাকে নিজের বোন ভাবি আমি।

জাহান বিশ্বজয় করা হাসি দিলো। ফিরোজকে দিয়ে এমনটা কাজ করিয়ে নিলো।চৌধুরী বাড়িতে ধামাকা লাগবে। ইট পাথর সব নড়েচড়ে সরে বসবে। কথাটা ভেবেই পাশের লোকটাকে বলল,

> এক ঘন্টার মধ্যে কোর্টে গিয়ে এই পেপারে আসাদ আঙ্কেলের থেকে সাইন করিয়ে নিবেন। আমি আঙ্কেলকে টেক্সট করেছি। দ্রুত যাবেন হ বাকিটা আঙ্কেল বুঝে নিবেন।

জাহান লোকটাকে পাঠিয়ে দিলো তখনই পানির বোতল নিয়ে আরিয়ান ভেতরে আসলো। মুখটা কাচুমাচু করে বলল,

> কথা বলেছি কিন্তু এখানে ঝামেলা হচ্ছে। মনে হচ্ছে এসব কেউ থানায় টাকা দিয়ে করাচ্ছে। ওরা বিয়ে ছাড়া ভাইজানকে মুক্তি দিবেন না। প্রয়োজনে মিডিয়ায় তথ্য প্রকাশ করবে। তাছাড়া নারী নির্যাতনের জন্য ফাঁসি পযর্ন্ত হতে পারে বলে হুমকি দিচ্ছে। আমি টাকা দিতে চেয়েছি কাজ হচ্ছে না। আইন সকলের জন্য সমান। কোর্টে চালান করলে অসুবিধা হবে। কি করবো?

কথাটা শুনে ফিরোজ উত্তেজিত হয়ে পড়লো। মিডিয়ায় এসব পৌঁছনো মানে সম্মান নষ্ট সঙ্গে রাজনীতির থেকে আজীবনের জন্য মুক্তি। নির্জনতা কাটিয়ে জাহান মুখ খুললো।

> বিবাহিত মানুষের আবার বিয়ে হয় নাকি? ভাইজান বিবাহিত পুরুষ। প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া বিয়ে হবে না। চলুন আপনাদের বড় বাবুর সঙ্গে কথা বলি।

আরিয়ান অবাক হয়ে দুজনের মুখের দিকে চেয়ে আছে। ফিরোজ নিজেও চমকে গেছে কিন্তু বোনের উপরে ভরসা রেখে মৃদু হাসলো।। জাহান অপেক্ষা করলোনা। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গিয়ে বড় বাবুর সামনে গিয়ে বসলো। ভদ্রলোকের জাদরেল গোপ আছে মাঝে মাঝে বাম হাত সেখানে বুলিয়ে দিচ্ছে। মুদ্রাদোষ বলা যায় । জাহান সোজাসুজি বলল,

> ফিরোজ চৌধুরীকে ফাঁসানো হয়েছে। উনি চৌধুরী বাড়ির ছেলে। যথেষ্ট ভদ্রলোক। উনার নামে বলা প্রতিটা কথা মিথ্যা।

ওর বলা কথাগুলো ভদ্রলোকের পছন্দ হলো না। গলা পরিস্কার করে উত্তর দিলেন,

> এসব পাতি নেতার চরিত্র সম্পর্কে আমাদের ভালো করে জানা আছে। সারাদিন দেশের কথা বলে মিছিল মিটিং করবে আর রাত হলে মহিলা নিয়ে এখানে সেখানে অনৈতিক কাজকর্ম করবে। কত দেখলাম। সাক্ষী প্রমাণ উনার বিপক্ষে। ভিকটিম মধ্যবিত্ত পরিবারের। উনারা সম্মান নিয়ে ভয় পাচ্ছেন। বিয়ে হলেই কেবল কেস কোর্টে উঠবে না।

> ভিকটিমের সঙ্গে কথা বলতে চাই। আমার পরিচিত ডাক্তার আছে আমি উনার মেডিক্যাল করাতে চাইছি। আপনি বরং কেসটা কোর্টে পাঠিয়ে দিন। বাকীটা আমি দেখছি।

জাহানের কথায় বড়বাবু চটে উঠলেন,

> আজব বুদ্ধি আপনার। আপনি জানেন বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা কেমন? একবার যদি কেস কোর্টে উঠে বছরের পর বছর লাগবে সমাধান পেতে। তাছাড়া নারী নির্যাতন কেস এতো সহজ না। সত্যি মিথ্যা যাইহোক দোষী কিন্তু ছেলেটাই হবে। ঝামেলা না করে মেনে নিন।

জাহান কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকলো। ফোন থেকে একটা টেক্সট পাঠিয়ে বলল,

> মেয়েটাকে ডাকুন আমি কথা বলবো। ভয় নেই আমি কোনো ঝামেলা করবো না। আপনি সেখানে থাকতে পারেন। জাষ্ট কয়েকটা কথা বলবো।

জাহানের কথা শুনে বড়বাবু বেশ সন্তুষ্ট হলেন। ভাবলেন মেয়েটা হয়তো রাজি হবে তাই বললেন,

> পাশের কক্ষেই আছে। হাসপাতাল থেকে সোজাসুজি এখানে এনেছি। একবারে ঝামেলা শেষ হলে শশুর বাড়িতে পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ করবো।
> নিশ্চয়ই।
জাহান উঠে আসলো। অফিস কক্ষের সঙ্গেই লাগোয়া একটা কক্ষ আছে বিশ্রামের জন্য। জাহান পুলিশের সঙ্গে বন্ধ কক্ষের দরজা খুঁলে ভেতরে ঢুকলো। বিছানার উপরে মেয়েটা উপুড় হয়ে শুয়ে আয়েশী ভঙ্গিতে ফোন ঘাটাঘাটি করছে। হঠাৎ ওদের দেখে ফোনটা লুকিয়ে ফেলল। কাচুমাচু উঠে বসলো। জাহান মেয়েটার পা হতে মাথা অবধি স্ক্যান করে নিলো। চিকন পাতলা গড়ন,পরনে হলুদ রঙের থ্রিপিচ। ফর্সা না আবার কালোও না। মোটামুটি দেখতে মেয়েটা। ঠোঁটের পাশে আর কপালে তুলো দিয়ে ব্যান্ডেজ করা। জাহান অনুমতি নিলো না। মেয়েটার পাশে গিয়ে বসলো। মৃদু কণ্ঠে জিঞ্জাসা করলো,

> ফিরোজা ভাইজানকে চিনো তুমি? উনার সঙ্গে আগে কখনও কথা বলেছো?

মেয়েটা মাথা নাড়িয়ে না বলে আবার হ্যাঁ বলল।

> সোজাসুজি উত্তর দাও। উনার সঙ্গে কথা হয়েছে তোমার?
> জ্বী উনি নিজেই আমাকে ফোন করে বিরক্ত করতেন। গতকাল নিজ থেকে আমাকে দেখা করতে বলেছিলেন। দেখা করলে আর বিরক্ত করবেন না ভেবে ওখানে গিয়ে এমন হলো।

মেয়েটার চোখেমুখে ভয়। জাহান এক দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে বলল,

> ভাইজানের ফোনে অটো রেকর্ডিং চালু আছে এটাকি তুমি জানতে না? গতকাল তুমি যা যা বলেছো সবটা কিন্তু ফোনেই আছে। শুনবে কি বলেছো?
মেয়েটা এবার ঘাবড়ে গেলো। পাশ থেকে বড়বাবু খেকিয়ে উঠলেন। উনাকে দমন করা কষ্টের ।

> আপনি ভয় দেখাচ্ছেন কেনো? বাচ্চা মেয়ে ভয় পাচ্ছে। শুনন ভিকটিমকে ভয় দেখানো আইনের বিরুদ্ধ আচরণ। এর জন্য আপনার নামে কেস হতে নারে।
জাহান চমৎকার করে হাসলো।মেয়েটিকে বললো,

> তোমার মেডিক্যাল করা হবে। কোর্টের অনুমতি নেওয়া এতোক্ষনে শেষ। তাছাড়া রেকর্ডিংসহ যাবতীয় প্রমাণ আমি কোর্টে জমা দিব। আরেকটা কথা ফিরোজ ভাইজান কিন্তু বিবাহিত। এলাকার এমপি সাহেবের বোনের জামাই। কিছুক্ষণের মধ্যে এমপি সাহেব আসছেন। আর বলতে ভুলে গেছি আমি আরিয়ান শাহরিয়ারের স্ত্রী, আপনাদের এমপি ইব্রাহিম খানের মেয়ে। তুমি কিছু ভেবো না মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর জন্য আমার মনে হয় কমপক্ষে বছর খানিকটা জেল আর লক্ষাধিক নগর অর্থ জরিমানা করা হবে। চিন্তা নেই সবটা আমি নিজ দায়িত্বে শেষ করবো। উম্মে দিলরুপা জাহান খান এলাকার হবু ব্যারিষ্টার আমি। আইনের ভাষা খুব চমৎকার বুঝি।

জাহান ঠান্ডা মাথায় সামনে অবস্থান করা দুজনকে হুমকি দিয়ে থামলো।। কিন্তু ততক্ষনে মেয়েটা হাউমাউ করে কান্নাকাটি করে জাহানের পায়ের উপরে পড়ে গেছে। বড় বাবুর মুখটা দেখার মতো হলো। ভেবেছিলেন মহিলা মানুষ হ্যান ত্যান ধমক দিয়ে বুঝি এই বিয়েটা করিয়ে দিবেন কিন্তু প্যাচ লেগে গেছে। ইব্রাহিম খান লোকটা মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে বাশ দিতে উস্তাদ। অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করে না। তাছাড়া উনি জানতেন না এই ঝামেলার সঙ্গে ইব্রাহিম খান নামটা জড়িয়ে আছে। উনি হতাশ হলেন। তাছাড়া জাহানের পরিচয় জানা ছিল না।মেয়েটা এখনো জাহানের পা ধরে কান্নাকাটি করছে,

> আপা ক্ষমা করে দেন। প্লিজ আমাকে জেলে দিবেন না। আমি নিজ থেকে কিছুই করিনি। ওরা বলেছে তাই রাজি হয়েছি। ফিরোজ ভাইয়ের বিপক্ষের কিছু লোক আমাকে লোভ দেখিয়েছে। আমি আর এমন ভুল করবো না। প্লিজ আপা।

জাহান বড় বাবুর দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হাসলো। ভ্রু নাচিয়ে বলল,

> চলুন ফিরোজ ভাইজানকে ছেড়ে দিবেন। উনি কষ্ট পাচ্ছেন।

বড়বাবু চুপচাপ বেরিয়ে আসলো। জাহান উনার পিছু নিলো। আরিয়ান অপেক্ষা করছিলো। বড়বাবু গিয়ে ফিরোজকে বের করতে হুকুম দিয়ে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলেন। আরিয়ান এখনো জানেনা ভেতরের খবর। ওকে ভাবতে দেখে জাহান নিজের ফোনটা ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
> এটা আপনার জন্য। আমি জিতে গেছি। গিফট নিজ দায়িত্বে দিয়ে দিয়েন। চাইতে আমার লজ্জা করে।

আরিয়ান হাসলো। মেয়ে কথায় না কাজেও আছে। ফোনের ভিডিও দেখে বলল,
> সত্যি রেকর্ডিং আছে?
> আরে দূর ওসব কিছুই নেই। আমি জাষ্ট টোপ দিয়েছি।
> আর বিয়ের বিষয়টা?
> সত্যি।
আরিয়ান মুখে হাত রেখে বলল,
> কি সাংঘাতিক আপনি সত্যি সত্যি ভাইজানের বিয়ে করিয়ে দিলেন? ফুপিমা কিন্তু ভীষণ রেগে যাবে।
জাহান পাত্তা দিলো না। সামনে হাটতে হাটতে বলল,
> বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছি একটু আধটু রাগ হজম করে নিব।
ওদের কথার মধ্যেই ইব্রাহিম খান থানায় এসে হাজির হলেন। আরিয়ান আলাপ করে ফোনটা উনার দিকে এগিয়ে দিলো। বিষয়টা বুঝতে যাতে অসুবিধা না হয়। সবটা দেখে ইব্রাহিম খান মেয়েকে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে নিলেন। মাথায় হাত রেখে বললেন,

> আমি জানতাম আমার মা সবটা সামলে নিবে তাইতো লেট করলাম। যাইহোক এবার কি চাই বলো?
জাহান কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
> আব্বাজান এই কেসটা উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দিন। যারা এমন করেছে তদন্ত করে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তার আগে এই বড়বাবুর একটা গতি করে দিন। এমন লোক থাকলে ফিরোজ ভাইজানের মতো অনেকেই ঝামেলায় পড়বে। বাড়িতে চলুন। আমি ফিরোজ ভাইজানের সঙ্গে আপার বিয়ের অর্ধেক কাজ সেরে ফেলেছি বাকিটার দায়িত্ব আপনার। রাগ করবেন না। বিয়েটা না হলে যেভাবেইহোক এই মেয়েকে ভাইজানের ঘাড়ে গছিয়ে দিতো। তাছাড়া ওরা একে অপরকে পছন্দ করে।

ইব্রাহিম খান হাসলেন। মেয়েকে ছেড়ে দিয়ে বললেন,
> তোমরা গাড়িতে গিয়ে বসো। বাকীটা আমি দেখছি।
জাহান মাথা নাড়ালো। আরিয়ান এতোক্ষন চুপচাপ শুনছিলো বাবা মেয়ের কথোপকথন। ফিরোজ ইতিমধ্যে মেয়েটাকে হুমকি ধামকী দিচ্ছে। পুলিশের উপরে বেশ চটেছে। পার্টির লোকদের ফোন করে থানায় আসতে বলেছে। ভেবেছিল ফেঁসে যাবে নিজেকে প্রমাণ করতে পারবে না। আল্লাহ সহায় হয়েছে। ভালো মানুষের সঙ্গে খারাপ কিছু হলেও সেটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়না। জাহানের প্রতি কৃতজ্ঞ। তাছাড়া পছন্দের মেয়েকে এতো সহজে নিজের করে পাওয়ার জন্যও যথেষ্ট ভালো ভাগ্য থাকা লাগে। সব মিটমাট করে বাড়িতে ফিরতে ওদের দুপুর হয়ে গেলো। রাগে দুঃখে কমোলিনি প্রথমবার আরিয়ানকে কিছু কটু কথা শুনিয়ে দিলেন । ছেলেটা মাথা নিচু করে সবটা শুনেছে প্রতিবাদ করেনি। কিছু সময় চুপ থাকতে হয়। চৌধুরী বাড়ির ছেলে আশ্রয়হীন অনাথ মেয়েকে বিয়ে করেছে বিষয়টা কেউ মানছে পারছে না। এদিকে ফিরোজ মহা খুশি। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য ইব্রাহিম খানের সঙ্গে কথা বলেছে। অস্থির হয়ে উঠেছে কমোলিনি। জাহান উনার অস্থির অবস্থা দেখে ফিসফিস করে বলল,

> ইতিহাস কথা বলে। আমার মনে হয় কি জানেন? অতীত বারবার সামনে আসে। আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার পূণরাবৃত্তি হয় আর কি। যাইহোক ফুফিমা দুবোন এক বাড়িতে জমিয়ে সংসার করবো কেমন হবে বলুনতো? আপনি আর কতকাল সংসার ধর্ম পালন করবেন? ভাবছি এবছর আপনাকে হজ্জ করতে পাঠাবো। নামাজ কালাম দান খয়রাত করবেন। আমরাতো আছি সবটা সামলাতে পারবো।
কমোলিনি কথার খোচা শুনে উত্তেজিত হলেন না। বরং নিজেকে শান্ত রেখে হাসিমুখে বললেন,

> ঠিকই বলেছো ইতিহাসের পূণরাবৃত্তি হয়। মেহেরের জন্য কেনো জানি আজ আমার ভীষণ আফসোস হচ্ছে জানো? মেয়েটা অল্প বয়সে বাসর ঘরে স্বামীর দেখা পাওয়ার আগেই কেমন ছটফট করতে করতে পৃথিবীর ছাড়লো। সবটা আমার চোখের সামনে। ঘর ভর্তি মেহমান, আলো ঝলমলে রাজপ্রাসাদ আর চাঁদের টুকরোর ন্যায় রাজকুমারী সবটা মূহুর্ত্তের মধ্যে গায়েব। নসিবে না থাকলে জোর করে সুখী হওয়া যায়না।

জাহান চোখ বন্ধ করলো। মনে হলো চোখের সামনে সবটা ভাসছে। গলা শুকিয়ে একাকার অবস্থা। ঢোক গিলে আশেপাশে চাইলো। কমোলিনি কাজের মেয়েকে ইশারা করলো পানি দেবার জন্য। মেয়েটা পানির গ্লাসটা ওর হাতে ধরিয়ে দিতেই আরিয়ান এসে হাজির। হন্তদন্ত হয়ে গ্লাসটা এক প্রকার ছিনিয়ে নিয়ে সবটুকু পানি খেয়ে যেভাবে এসেছিল সেভাবেই চলে গেলো। জাহান ভড়কে গেলো এমন ব্যবহার দেখে। কমোলিনি চুপচাপ উঠে আসলো। জানালায় দাঁড়িয়ে থাকা অবয়ব দৃশ্যটা দেখে মৃদু হাসলো।

উচ্চারণ করলো,
“আহা মেয়ে, সূর্যোদয়ের আগেই এই সুন্দর বদনখানি রাতের আকাশের উজ্জ্বল চন্দ্রের মতোই টুপ করে ডুবে যাবে। চন্দ্রকিরণ তোমার ভাগ্যে লেখা নেই।”

চলবে

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ