#বিয়ে_থা
#পর্ব- ৪৪
#তাহিনা_নিভৃত_প্রাণ
দিব্য ঘুমাচ্ছে না। ধ্রুব লাইট অফ করলেই উঠে বসে বাবা বাবা করছে। ঘুমের মধ্যে নিনীকা ভ্রু কুঁচকে নিচ্ছে বার-বার৷ হয়তো লাইটের কারণে তার ঘুমের অসুবিধা হচ্ছে। ধ্রুব লাইট বন্ধ করে ফোনের ফ্ল্যাশ অন করে সাইটে রেখে দিলো। দিব্য মুখে আঙুল ঢুকিয়ে বাবাকে এটা ওটা বলছে। ধ্রুব ছেলের কথা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু ঘুমালো না দিব্য। সে উঠে বসে মায়ের পেটে মুখ গুঁজে দিলো। ফিসফিস করে ডাকলো,
‘ বোন? ‘
নিনীকা ফট করে চোখ মেলে তাকালো। দিব্য বলছে,
‘ বোন আতো খেলি। ‘
নিনীকা চুপচাপ ছেলের কান্ড দেখতে লাগলো। পেট থেকে তার বোন কোনো উত্তর না দেওয়াতে দিব্য ঠোঁট ফুলিয়ে তাকিয়ে আছে। কেঁদে দিবে ভাব। নিনীকা টেনে বুকে নিলো।
‘ কি হয়েছে আমার দিব্যর? ‘
‘ বোন কুথা বুলে না ‘
‘ বোন আরও কয়েকমাস পর কথা বলবে সোনা, তখন তুমি তাকে কোলেও নিতে পারবে। ‘
‘ তততি? ‘
‘ হ্যাঁ সত্যি। তোমার বাবা কি করে? ‘
‘ বাবা ঘুম ‘
নিনীকা পাশ ফিরলো। ধ্রুব একেবারে কোনায় গুটিশুটি মে*রে ঘুমিয়েছে। ফ্ল্যাশের আলোয় চেহারা কিছু টা স্পষ্ট। ছেলেকে নিয়ে উঠে বসলো সে। ঘুমন্ত ধ্রুবকে টেনে মাঝে আনলো। উপরে কাঁথা দিয়ে ছেলেকে নিয়ে নিজেও ঢুকে পড়লো কাঁথার নিচে। দিব্য মা বাবার উম পেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। দিব্যকে পেরিয়ে ধ্রুবর একটা হাত নিনীকার কোমড় জড়িয়ে ধরে রেখেছে। নিনীকা ঘুমন্ত স্বামী সন্তানকে ফ্ল্যাশের আলোয় দেখছে। দিব্য পুরো ধ্রুবর মতো হয়েছে। গায়ের রঙটা ছাড়া বাবার সবকিছু পেয়েছে সে। নিনীকা একে একে দুজনের মাথাতেই হাত চালাচ্ছে। তার শান্তি লাগছে। ভেতরের ক্লান্তি ভাব নেই। এই মধ্যরাতে তার ফুচকা খেতে ইচ্ছে করছে। বেশি করে টক দিয়ে চটপটি আরও কতো কি। নিনীকার জিহ্বায় জল চলে এলো। ধীরে ধীরে উঠে ছেলেকে পেরিয়ে ধ্রুবর পেছনে শুয়ে পড়লো। ঘুমের মধ্যে ধ্রুব টের পাচ্ছে তার কাঁধে মুখ রেখেছে কেউ।
নিনীকা ডুবে গেছে। ধ্রুব জেগে গেলো। চোখ না খুলেই হাত বাড়িয়ে আঁকড়ে ধরলো নিনীকাকে। অনেকক্ষণ পর নিনীকার ক্লান্ত মুখ তুলে ধরলো।
‘ মিসেস, ঘুমাওনি কেন? ‘
‘ ঘুম ভে*ঙে গেছে। ‘
‘ আদর পাওনি বলে? ‘
নিনীকা নাক ফুলিয়ে বলল,
‘ আমার ফুচকা, চটপটি খেতে ইচ্ছে করছে। ‘
‘ এখন তো পাবো না কোথাও। চিপস খাবে? ‘
নিনীকা মাথা নাড়ালো। যেটা পাওয়া যাচ্ছে সেটা দিয়েই কাজ চালানো যাক।
ধ্রুব উঠে চিপস বের করে আনলো।
‘ এগুলো একটু বেশিই স্পাইসি, তোমার ভালো লাগবে।’
নিনীকা বুকে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। ফুপিয়ে উঠে বলল,
‘ তুমি খাইয়ে দাও। ‘
ধ্রুব গালে হাত রাখলো,
‘ কাঁদছো কেন? মন খারাপ? ‘
‘ ভালো লাগছে না। একটুও ভালো লাগছে না। কিছু মিনিট আগেও কতো ভালো লাগছিল। এখন লাগছে না গো। ‘
ধ্রুব এক হাতে ধরে রেখে আরেক হাতে চিপস খাইয়ে দিচ্ছে। মাঝে মধ্যে তার ঠোঁট নামিয়ে আনছে চুলে ও কপালে। কখনো বা মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আর কিছু হোক বা না হোক প্রেগ্ন্যাসির সময় নিনীকার মুড সুইং হয় অনেক।
নিনীকা পা তুলে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। ধ্রুবর উদাম বুকে আঁকিবুঁকি করে মাঝে মধ্যে ঠোঁট ফুলচ্ছে। কখনো বা ঠোঁট উল্টে ধ্রুবর দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকাচ্ছে।
এই সময় ধ্রুব টু শব্দ ও করে না। অপেক্ষা করে নিনীকার কিছু একটা বলার। নিনীকা অনেকক্ষণ পর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল,
‘ তোমাকে একটা কথা বলি? ‘
‘ বলো না? ‘
‘ আমি তোমাকে অনেক ভালোাবাসি। ‘
ধ্রুব ঠোঁট প্রসারিত করলো। শব্দ করে ঠোঁটে চুমু খেলো।
‘ ধ্রুব ও তার মিসেস কে অনেক ভালোবাসে ম্যাডাম৷ ‘
‘ চলো বারান্দায়? ‘
ধ্রুব কোলে নিয়ে বারান্দার মেঝেতে বসে পড়লো। অন্ধকার আকাশ। উঁচুনিচু পাহাড় অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে৷ নিনীকা নিজের মতো করে কথা বলে চলেছে। ধ্রুব মনোযোগ দিয়ে শুনছে। কখনো নিজেও কিছু বলছে। আচমকা নিনীকা কপালে কপাল ঠেকালো।
‘ তুমি কি জানো? আমি একেবারেই পাল্টে গেছি! ‘
‘ জানি মিসেস। ‘
‘ আমার মধ্যে আগের আমি’র কোনো বৈশিষ্ট্য নেই ধ্রুব। আমি এখন পুরোপুরি তোমার উপর নির্ভরশীল হয়ে গেছি। ‘
‘ তো? ‘
‘ তুমি বুঝতে পারছো না। আমি যখন অফিসে যাই, এক সেকেন্ড ও তোমাকে না ভেবে থাকতে পারি না। বাসাতে থাকলে তোমার অপেক্ষা করি কখন তুমি ফিরবে। কখন তোমাকে জড়িয়ে ধরবো। আমার তোমাকে ছাড়া একদম ভালো লাগে না। আমার দমবন্ধ হয়ে আসে। অথচ আমার বয়স ত্রিশ ছুঁয়ে ফেলেছে। একজন ত্রিশ বছরের নারীর কি এমন আবেগ শোভা পায়? ‘
ধ্রুব দুহাতে মুখ তুলে ধরলো। ঠোঁটে দীর্ঘক্ষণ নিজের ভেতরের প্রেম ঢেলে দিলো।
‘ তুমি শেষ বয়স পর্যন্ত আমাকে এভাবেই ভালোবেসে যেও মাই মিসেস। তোমার ভালোবাসাতে কোনো ছলনা নেই। তুমি আমাকে ভালোবাসো বলেই আমাকে তোমার সবমসময় মনে পড়ে। আমার জন্যে তুমি অপেক্ষা করো। ‘
‘ কিন্তু এটা তো বাড়াবাড়ি ধ্রুব। বয়সের দিক থেকে যদি দেখা হয় তবে এটা.. ‘
‘ তোমার এই বাড়াবাড়িটাই আমি চেয়েছি মাই ওয়াইফ৷ তুমি সব ভুলে শুধু আমাকেই ভালোবেসে যাবে। ‘
‘ এরকম আবেগ টিনেজারদের মানায়। আমার এই বাড়াবাড়ি রকম আবেগ আমাকে কখন না জানি ছোট করে ফেলে! আমি আমার আত্নসম্মান বিসর্জনের ভয় পাচ্ছি ধ্রুব। তুমি কখনো আমাকে অসম্মান করোনি। কিন্তু ভবিষ্যতে যদি কোনো কারণে করে ফেলো তখন আমি হয়তো আত্নসম্মান বিসর্জন দিয়ে দিবো! আমি তো এরকম ছিলাম না ধ্রুব। মায়ের মতো হয়ে গেলাম কিভাবে! ‘
ধ্রুব দীর্ঘক্ষণ নিনীকার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর বলল,
‘ এতোদিন যখন তোমার অসম্মান হয়নি, তোমার আত্নসম্মানে যখন আঘাত লাগেনি তার মানে ভবিষ্যতেও লাগবে না। মেজর ধ্রুব মাহবুবের কাছে নিজের বউয়ের আত্নসম্মান মানে তার নিজেরও আত্নসম্মান। তোমাকে অসম্মান করা হলে আমার নিজেকেও নিচু করা হবে। তুমি বরং নির্দ্বিধায় আমাকে ভালোবেসে যাও৷ তোমার আত্নসম্মান রক্ষার দায়িত্ব তোমার হাসবেন্ডের মাই ওয়াইফ। ‘
নিনীকা বুকে মুখ গুঁজে দিলো।
‘ তুমি প্রশ্রয় দিয়ে আমাকে এরকম বানিয়ে দিয়েছো। কোনোরকম শাসনই করো না। ‘
ধ্রুব হাসলো,
‘ তোমাকে ঢংঙি আহ্লাদী রুপেই মানায়। পাষাণী রুপে নয়। আমি তোমার পাষানী রুপ অনেক ভয় পাই। ‘
‘ তুমি কখনো আমাকে ছেড়ে যেও না গো। ‘
‘ দিব্যর আব্বু দিব্যর আম্মুকে রেখে কোথাও যাবে না মাই মিসেস। ‘
নিনীকা কিছু বলার আগেই দিব্যর গলা ভেসে এলো। সে ডাকছে বাবা মাকে। নিনীকা নিজেকে ছাড়াতে চাইলো।
‘ ছাড়ো দিব্য উঠে গেছে। ‘
ধ্রুব শক্ত করে ধরে রাখলো। ছেলের উদ্দেশ্যে বলল,
‘ দিব্য সাবধানে নেমে আসো তো বাবার কাছে। ‘
দিব্য বাবার গলা শুনেছে। ধীরে ধীরে বিছানা থেকে পিছলিয়ে নেমে গেলো৷ ডাকলো,
‘ বাবা ‘
‘ ধ্রুব উত্তর দিলো,
‘ এসো বাবা ‘
দিব্য গলা অনুসরণ করে চলে এলো। বাবার কাছে আসতে পেরে খুশিতে চিৎকার করলো। নিনীকা ছেলেকে টেনে নিজের কোলে বসালো৷
‘ দিব্য সোনার ঘুম ভে*ঙে গেছে? ‘
দিব্য হাত দিয়ে দেখিয়ে বলল,
‘ ঘুম নাই ‘
ধ্রুব পেছন থেকে দুজনকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। দিব্য হাত নাড়িয়ে বড়োদের মতো বাবা মা’র সাথে কথা বলছে। মাঝে মধ্যে নিনীকার পেটে হাত রেখে বোনের কথা জিজ্ঞেস করছে।
(চলবে)